পাহাড়ে মিশ্র পুলিশ ও আমার অনুভূতি

বুধবার, জুন ৫, ২০১৩

হিমেল চাকমা ::

Himel Chakmaকিছুদিন আগে অফিসের একটি অ্যাসাইনমেন্টের জন্য রাঙ্গামাটির লংগদুতে যেতে হয়েছিল। রাঙ্গামাটি থেকে পাক্কা ৪ ঘন্টা পথে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার পাশাপশি নতুন একটি দৃশ্য আমাকে বেশ নাড়া দিল। যেটির মধ্যে আমি সুখের ঠিকানা কল্পনা করি। সেদিন ৪ ঘন্টার যাত্রা পথে পুরো সময়টা কেটেছে ১জন চাকমা এবং ৫ জনের অধিক বাঙালী পুলিশ কনেষ্টেবল ও একজন এএসআইয়ের সাথে। কর্মক্ষেত্রে ওদের মধ্যে সমন্বয় দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। ভাবলাম সব যদি এমন হতো। আমাদের কথা বলাবলি দেখে বেশ কয়েকজন চাকমা ও বাঙালী আমাদের সাথে যোগ দিল।

তার প্রধান কারণ ছিল পাহাড়ি-বাঙালী পুলিশ আর একজন সাদা পোষাকে চাকমা হাসিমাখা আড্ডায় লঞ্চের ছাদ জমে তুলেছে। এই দেখে কেবিন ছেড়ে তারা যোগ দেয় আমাদের সাথে। এভাবে ৪ ঘন্টার পথ কখন যে শেষ হয়েছে তা বুঝতে পারিনি। যখন লংগদু পৌছি তখন পশ্চিমা আকাশে মৃদু সর্যটি উচু করে দাড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলোর সাথে আলিঙ্গন করছে।

এই ৪ ঘন্টার অভিজ্ঞতার আলোকে পার্বত্যাঞ্চলে মিশ্র পুলিশের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। শৈশব থেকে আজকে অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বলতে পারি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ কোনদিন পুলিশকে আপন ভাবেনি। মৃত্যু মুখোমুখি হওয়া সত্বেও তারা পুলিশের কাছে যায়নি। কারণ তারা জানে পুলিশ তাদের আপনজন নয়। কারণ একসময় পার্বত্যাঞ্চলের আদিবাসীরা খাকী রঙে পোশাকে পুলিশকে দেখেছিল শান্তিবাহিনী খোজরত আর্মিদের টহল টিমের লাইনের ফাঁকে ফাঁকে। আর এখন পার্বত্যাঞ্চলে পুলিশ অনেক স্বাধীন।

পুলিশের কাজ হল মানুষকে সেবা করা কিন্তু পাহাড়ের আদিবাসীরা জানে পুলিশের কাজ আর্মির সাথে থাকা। আর আর্মি তো শুধু শান্তিবাহিনীকে খুজে। বাংলা ভাষা দিয়ে বুঝাতে না পারলে ছালার বেটা তুই শান্তিবাহিনীর চর হওয়ার অজুহাতে নিরীহ মানুষকে মারধর করা। পার্বত্য চুক্তির আগে আমার দেখা আর্মির কথা বলছি। এখনকার আর্মিদের কথা বলছি না। কারণ এখনকার আর্মি আর সেই আমলের আর্মির অনেক পার্থক্য। উল্লেখিত এসব কারণে আদবাসীরা কোনদিনই আর্মি ও পুলিশকে আপনজন হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। আর এখন? এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পাহাড়ের আদিবাসীরা পুলিশের পাশাপাশি আর্মিকেও আপনজন হিসেবে মেনে নিচ্ছে এটা স্বীকার করতে হবে।

আমি মনে করি, পাহাড়ে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজন মিশ্র পুলিশিং ব্যবস্থা করা। থানায় যদি একজন মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা পুলিশ থাকে কোন আদিবাসী যদি হয়রানী, প্রতারণা, ক্ষতির শিকার হয় তাহলে ভিকটিম সেই আদিবাসীটি অবশ্যই পুলিশের কাছে যাবে। আর সে যদি ভিন্ন ভাষা মনের কথা ব্যক্ত করতে না পারে তাহলে তার অবশ্যই স্ব জাতীয় ভাষার পারদর্শীকে খুজে নিতে হবে। যদি ভিকটিম পুলিশকে ঘটনা বুঝাতে পারে তাহলে সে অবশ্যই ন্যয় বিচার পাবে। আর বিচার পেলেই সে পুলিশের কাছে যাবে। কিন্তু আমরা বিগত সময়ে তা দেখিনি। এখন একটু একটু দেখছি। যা আরো বাড়ানো দরকার। পুলিশের প্রতি আদিবাসীদের যে ধারণা ছিল তা পরিবর্তন আনা জরুরী। আদিবাসীরা পুলিশের কাছে যায় না আমলাদের এমন অভিযোগ কোনভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রই আদিবাসীদের কাছ থেকে পুলিশকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। পুলিশের কাছে যাওয়ার জন্য সরকারকে ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কারণ ভুল সরকারই করেছিল, আদিবাসীরা করেনি।

আমি এও জানি, মিশ্র পুলিশ নিয়ে গুটি কয়েক সেটেলার বাঙালী কত না থোরা যুক্তি উপস্থাপন করে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তারা চিলে কান নিয়ে গেলরে গেল, বলে হরতাল অবরোধ করে। তাই বলে কি আমরা অন্ধকারে থাকব? আমরা কান আছে নাকি চিলে নিয়ে গেছে এটা ছুয়ে দেখব না কান আছে কি নাই। আমি জানি আদিবাসী ও পাহাড় নিয়ে সেটেলাররা অধিকাংশ সময় নেটিবাচক চিন্তা করে। ইতিবাচক চিন্তা এদের খুব কম। তারা বারে বারে আদিবাসীদের অধিকারকে অস্বীকার করে। অস্বীকার করে বলেই সরকারের কাছে দাবী চাইতে গিয়ে তারা স্লোগান ধরে.. জুম্ম ধর জবাই কর, জবাই কর জুম্ম ধর। যাই হোক, এই জুম্ম ধর জবাই কর, জবাই কর জুম্ম ধর এগুলো সেটেলাররা বলবে। কারণ এগুলোর বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দিয়েই তো সরকার এদের পাহাড়ে বসতি করার ব্যবস্থা করেছে। যারা যারা এসেছে তারা সরকার কিংবা শাসক গোষ্ঠীর কাছ থেকে পুর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ পেয়েছে। আর বলছি না। কারণ বেশী বললে আমি লিবারেল পরিচিতি না পেয়ে জুম্মরেল পরিচিতি পাবো।

যাই হোক আমি সেটেলারদের দাবীকে স্বীকার করে বলতে চায় পার্বত্য জেলা, উপজেলা, ফাঁড়িতে অন্তত এক তৃতীয়াংশ আদিবাসী পুলিশ হলেও পাহাড়ের আইন শৃঙ্খলা ভাল থাকবে। তখন ইব্রাহিম এলাহীর মত মানুষ সুজাতাকে ধর্ষণ ও হত্যা করার সাহস করবে না। থুমাচিংকে গরু আনতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হতে হতো না। মিশ্র পুলিশ হলে এগুলো কমে যাবে। কিন্ত সেটেলাররা তা চায় না। তারা সুজাতা চাকমা, থুমাচিং মারমা, বুলিমিল চাকমাকে ধর্ষণের পর হত্যা করতে চায়।

কথায় আছে “মুর্খ বন্ধুর চেয়ে পন্ডিত শত্রুও ভাল”। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে মিশ্র পুলিশ অত্যন্ত প্রয়োজন। কেননা পুলিশরা শিক্ষায় শিক্ষিত। এক পুলিশ বাঙালী বা আদিবাসী হতে পারে কিন্তু তার প্রধান পরিচয় হল সে পুলিশ। পুলিশ কি করে? এক কথায় জনসেবা। পরিশেষে আমি বলব যত দ্রুত সম্ভব পাহাড়ে মিশ্র পুলিশ ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। পাহাড়ে শান্তি আসলে দেশের শান্তি আসবে। পাহাড় উন্নয়ন হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, রাঙ্গামাটি।
[email protected]