চট্টগ্রামের যুদ্ধ বিমান বন্দরের কাহিনী

বুধবার, ০৫/০৬/২০১৩ @ ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ

কাজী আবুল মনসুর ::

bomb২০০০ সালের ঘটনা। দোহাজারীর কৃষক আবদুল মিয়া সকালে উঠে ক্ষেতে চাষ করতে গেলেন। অনেক দিনের পুরানো মাটি তুলতে গিয়ে কোদালের সাথে কিছুতে আঘাত লাগার জোরে আওয়াজ। আবদুল মিয়া বুঝলেন, কোন গুপ্তধন বুঝি তার কপাল খুলে দিল। কাউকে না ডেকে নিজেউ খুড়তে লাগলেন মাটি। অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বেরিয়ে এল বিশাল এক বোমা। ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলেও পরে সাহস করে বোমাটি তুলে আনলেন। নিয়ে আসেন বাড়িতে। দোহাজারী জুড়ে হৈচৈ পড়ে যায়।

সংবাদপত্রের লোকজন ছুটে যায় আবদুল মিয়ার বাড়িতে। দেখেন উঠানে পড়ে আছে এক বিশাল বোমা। ছুটে আসে সেনাবাহিনীর লোকজন। তারা পরীক্ষা করে দেখলেন, এটি আসলে একটি শক্তিশালি জাপানী বোমা। যে বোমাটি ১৯৪৫ সালে ফেলার পর বিস্ফোরিত হয়নি। দোহাজারী এয়ারফিল্ড লক্ষ্য করে বোমাটি ফেলা হয়। সৌভাগ্য ক্রমে এটি ফাটেনি। সেনাবাহিনী বোমাটি নিয়ে গিয়ে পাহাড়ের তলদেশে বিস্ফোরণ ঘটায়। এভাবে ১৯৪৫ সালের পর দোহাজারী, চকরিয়া, হাটহাজারীতে অসংখ্য না ফোটা বোমা পাওয়া যায়। বছরের পর বছর ধরে এগুলো নিয়ে চলে অনেক গাল-গল্প।
তবে প্রবীণদের যারা এখনো বেচেঁ আছেন তাদের জন্য ১৯৪৪-৪৫ এর চট্টগ্রামের প্রতিটি রাত ছিল বিভীষিকার রাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগার ঢেউ চট্টগ্রামে এসে পড়ার পর একদিকে জাপান, অন্যদিকে বৃটেন-আমেরিকা-ভারতের যুদ্ধ বেশ জোরে শোরে লেগে যায়। বার্মা ফ্রন্ট নামে অবিভক্ত বাংলার এ অঞ্চল জুড়ে বোমার পর বোমা হামলা চলে। জাপানী আক্রমন মোকবেলা চট্টগ্রামের বিশাল এলাকা জুড়ে নির্মান করা হয় যুদ্ধ বিমান রানওয়ে। ছোট্ট আকারের বিমান বন্দরের সব ধরনের অবকাঠামো স্থাপন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুদ্ধ জাহাজ আসতে থাকে চট্টগ্রাম।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা। চট্টগ্রামে তখন বৃটিশদের রাজত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঢেউ লাগে চট্টগ্রামে। হাজার হাজার বিদেশী সৈন্যের সমাবেশ ঘটে। একদিকে জাপান, অন্যদিকে আমেরিকা-ব্রিটেন। চট্টগ্রামে যুদ্ধ বিমান বন্দর তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়। সাগর পাড়ে একটি বিমান বন্দর (বর্তমান শাহ আমানত বিমান বন্দর) তো আছে। তারপরও যুদ্ধ মোকাবেলায় চকরিয়া, হাটহাজারী, দোহাজারী, ফেনী, সন্দ্বীপে নির্মিত হয় রানওয়ে। ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে যুদ্ধ বিমানগুলো উড়ে আসতে থাকে এসব বিমান বন্দরে। চট্টগ্রাম হয়ে উঠে বৃটিশ সেনাদের অন্যতম ঘাটি।

bimanচট্টগ্রামে আসতে থাকে বৃটিশ, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকান সেনারা। জাপানীদের বিরুদ্ধে লড়তে বিদেশী যৌথবাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠে। যুদ্ধে লড়তে সেনাদের প্রশিক্ষন চলে। একইসাথে চট্টগ্রামে বাড়তে থাকে উদ্ধাস্ত সংখ্যাও। যুদ্ধের দামামা বাজার সাথে সাথে বোমা নিক্ষেপ শুরু হয়।
যুদ্ধ সমাধিতে এখনও ৭৫৫টি কবর। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এরা প্রাণ হারায়। সমাধিস্থ করা সেনাদের মধ্যে বৃটিশ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, ভারত, মায়ানমার, নেদারল্যান্ড, পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা,জাপানের। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে বৃটিশ সেনা। তবে হাজারেরও বেশি সেনা চট্টগ্রামের যুদ্ধে মারা গেলেও অনেকের পরিচয় পাওয়া যায় নি। মারা গেছে অনেক বেসামরিক বিদেশী ব্যাক্তিও। নেদারল্যান্ডের একজন নাবিক, ২০ জন জাপানী সেনার লাশ পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বেশ কয়েকটি যুদ্ধ বিমান বন্দর তৈরি করা হয়। বিশেষ করে আমেরিকান বিমান বাহিনী এসব যুদ্ধক্ষেত্র নিজেদের কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করে। একই সাথে শুরু হয় অপারেশন। এখানে সারিবদ্ধভাবে রাখা হতো যুদ্ধ বিমান। সুযোগ বুঝে আক্রমন চলতো। হাটহাজারী বিমান বন্দর ছিল সবগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি ব্যবহার করতো যৌথবাহিনীর ‘প্রথম কমবাট কার্গো গ্র“প’। ১৯৪৫ সালের ১৫মে থেকে জুন পর্যন্ত এ এয়ার ফিল্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়। এখানে একটি রেডিও রিলে কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ১২৮তম আর্মি কমিনিউকেশনস সিসটেম স্কোয়াড্রন রিলে স্টেশন বলে পরিচিত ছিল। এখানকার রিলে স্টেশন ব্যবহার করে সি-৪৭ স্কাই ট্রেন (এক ধরনের অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান)এবং সি-৪৬ কমান্ডো যুদ্ধ বিমান আসা যাওয়া করতো।

১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এখান থেকে যাবতীয় সরঞ্জামাদি গুটিয়ে ফেলা হয়। ফেনীতে তৈরি যুদ্ধ রানওয়েটি ব্যবহার করতো আমেরিকান ১০ তম বিমান বাহিনীর ১২তম বোমবার্ডমেন্ট গ্র“প। যাদের ছিল মধ্য লেভেলের বি-২৫ মিশাইল বোমারু বিমান। ১৯৪৪ সালের জুলাই থেকে ১৯৪৫ সালের জুন পর্যন্ত এ বিমান বন্দরটির ব্যবহার চলে। জাপানীদের আক্রমন ঠেকাতে ভারতের যৌথবাহিনীও এটি ব্যবহার করতো। এ বিমান বন্দর দিয়ে বিদেশ থেকে যুদ্ধ সরঞ্জাম আনা নেয়া হতো। দোহাজারী এয়ারফিল্ডটি কার্যত হাটহাজারী বিমান বন্দরকে সার্পোট দেয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। হাটাহাজারীর একই গ্র“প, এ এয়ার ফিল্ডের সাথে সমন্বয় করে আক্রমন চালাতো। এক পর্যায়ে এখানে যৌথবাহিনীর দ্বিতীয় ও চতুর্থ কমবাট গ্র“প সি- ৪৬ কমান্ডো বিমান ব্যবহার শুরু করে। ১৯৪৫ সালের অক্টোবরে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়।

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম