আমরা সবাই ‘সাংবাদিক’

রবিবার, ০২/০৬/২০১৩ @ ৫:৪১ অপরাহ্ণ

শক্তিমান ভারতীয় অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের জন্ম এলাহাবাদে, ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর। তিনবার জাতীয় পুরস্কার, ১৪ বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, পদ্মশ্রী পুরস্কার (১৯৮৪) ও পদ্মভূষণ পুরস্কার (২০০১) লাভ করেন তিনি। ১৯৯৯ সালে বিবিসির জরিপে তিনি ‘গ্রেটেস্ট স্টার অব স্ক্রিন অব দ্য মিলেনিয়াম’ নির্বাচিত হন। ২০১০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সিএনএন-আইবিএন সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তিনি নিচের বক্তব্যটি দেন।

omibatউপস্থিত সবাইকে শুভসন্ধ্যা। এখন মঞ্চে উঠে আমার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের জুলিয়াস সিজার নাটকের একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে। সিজারের সিনেট সভায় সেনাপতি মার্ক অ্যান্টনি খুব ছোট একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণে অ্যান্টনি বলেন, ‘আমাকে আজ যে সম্মান দেওয়া হয়েছে, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আজ যাঁদের সম্মানিত করা হয়েছে, আমি অন্তর থেকে তাঁদের সাহস ও বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করছি।’ আজ এখানে যেসব সাহসী সাংবাদিক বন্ধুরা এসেছেন, আমিও তাঁদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই।

আমরা যদি আমাদের সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় দেখতে পাই। আমাদের পূর্বপ্রজন্মের মেধা ও পরিশ্রমের জোরেই আমরা এখন সভ্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বাস করছি। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতার কারণেই আমরা ভারতকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। এই বিশাল রাজনৈতিক স্তম্ভের ক্ষুদ্রতম একক হলেন আপনি, আমি—আমরা সবাই। এ দেশের সব নাগরিকই তো এই দেশের শিকড়। নাগরিক হিসেবে আমাদের রয়েছে ব্যক্তিগত অনূভূতি ও বিচার-বুদ্ধি। নাগরিক হিসেবে সংবিধান আমাদের ওপর বেশ কিছু দায়িত্ব অর্পণ করে। একজন নাগরিক যখন আরেকজন নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার হন, তখনই সবাই পারস্পরিকভাবে একে অন্যের জন্য কাজ করতে উদ্যোগী হন।

আজ এখানে যেসব সিটিজেন জার্নালিস্ট বা নাগরিক সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছেন, আমরা তাঁদের নিছক কটি শব্দ দিয়ে সম্মানিত করতে পারি না। আমরা তাঁদের এমন শব্দে স্তুতি গাইতে চাই, যার মাধ্যমে তাঁরা আরও উৎসাহিত হবেন। নিজেরাই সমাজবদলের জন্য অনুপ্রাণিত হবেন।

গণতান্ত্রিক সমাজে একজন নাগরিকের প্রতিটি কাজ, আচরণ ও নৈতিক ধ্যান-ধারণায় লুকিয়ে থাকে নাগরিক সাংবাদিকতার বীজ। মানসিক অবস্থা ও নিত্যদিনের আচার-আচরণেই কিন্তু সত্যিকারের নাগরিকতার চিত্র ফুটে ওঠে।
আমরা যদি আমাদের দেশকে ভালোবাসি, যদি নাগরিক সাংবাদিকদের শক্তি নিয়ে গর্ববোধ করি, যদি আমাদের শিশু ও আগামী প্রজন্মের জন্য ভালো কিছু করতে চাই, যদি মানবসভ্যতার লক্ষ্যকে পরিপূর্ণ করতে চাই; তাহলে আমাদের সবাইকে নাগরিক সাংবাদিকতা করতে হবে। আমাদের সবাইকে হয়ে উঠতে হবে সাংবাদিক।

তথ্যপ্রযুক্তির জগতে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক উন্নয়ন এসেছে। যার কারণে সাধারণ মানুষও এখন গণমাধ্যমের অংশ। সংবাদমাধ্যমগুলো এখন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করছে। প্রত্যেকে একে অন্যের পরিপূরক। কেউ কখনো একাকী বড় কাজ করতে পারে না। আমাদের বেশি বেশি দক্ষ সংবাদকর্মী প্রয়োজন।

পেশাগত সাংবাদিকতা নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠা পায়। সেই নৈতিকতা থেকেই সমাজের জন্য ভালো কিছু করার আকুতি জন্মায়। গণতান্ত্রিক সমাজে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়, কিন্তু এটাই আমাদের বেশি করে প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষকে নির্ভরযোগ্য ও সঠিক তথ্য প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকির কাজ। কুসংস্কার, অপবাদ, পক্ষপাতকে পাশ কাটিয়ে তদন্ত করে নির্ভুল তথ্য প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার আলোকিত দিক। তথ্য প্রকাশ করাই তো সাংবাদিকতা পেশার মহান স্তম্ভ। সাংবাদিকতা পেশা মানেই সাহসিকতা।
সবকিছুর মূলেই থাকে বিশ্বাস।

ফরাসি বিপ্লবের উদ্দীপ্ত নীতি ছিল ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ’। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই শুরু হয় আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। আপনি ইচ্ছে করলেই স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন, সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে কষ্ট হবে না, কিন্তু আপনি ইচ্ছে করলেই ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। বিশ্বাসের ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয় ভ্রাতৃত্ববোধ। বিশ্বাসই আমাদের পুঁতির মালার মতো একসঙ্গে আটকে রাখে। ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা, সহযোগিতাই তো বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভদ্রতা শেখায়। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শিক্ষা তো আমরা বন্ধুত্ব থেকেই লাভ করি। এর মাধ্যমেই সভ্যতার বিনির্মাণ ঘটে।
আমাদের নাগরিকত্ব কোনো শিশুতোষ বিষয় নয়। ভারতের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বদলে আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতাই বেশি। দায়িত্ব পালন করাই আমাদের সত্যিকারের ব্রত। ভ্রাতৃত্ববোধই আমাদের সংকল্প। এর মাধ্যমেই আমরা এক হয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাব। আমরা যদি পারস্পরিক বিশ্বাসকে অবহেলা করি, তাহলে তা আমাদের জন্যই ক্ষতি। নিজেদের ভুলের জন্য মেধাশক্তিকে নষ্ট করে ফেললে আমরা সামাজিক নানা সমস্যার মুখে পড়ব। আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকার পরও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জন্য আমরা কি পিছিয়ে থাকব? আমাদের এগিয়ে যেতে হবে আরও সামনের দিকে। যার যার অবস্থান থেকে আমরা নিজেরাই পারি আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

সূত্র: সিএনএন আইবিএন ওয়েবসাইট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর
জাহিদ হোসাইন খান
সৌজন্যে- প্রথম আলো।