‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’

শনিবার, ০১/০৬/২০১৩ @ ৯:২২ পূর্বাহ্ণ

আবেদ খান ::

manik mia-2১৯৬৪ সালের ১৪ জানুয়ারি। তত্কালীন পূর্বপাকিস্তানে অকস্মাত্ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর শুরু হলো একতরফা নৃশংস হামলা। কাশ্মীরের একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সাম্প্রদায়িক হামলার সূত্রপাত। হঠাত্ই উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পায় সংখ্যালঘু হত্যা ও তাদের ওপর নির্মম নিপীড়ন। সে সময় পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এই অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে কালক্ষেপণ করেননি। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা তখন একসঙ্গে হাজির হন ১ রামকৃষ্ণ মিশনের ইত্তেফাক ভবনে, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কাছে। কারণ বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে দৈনিক ইত্তেফাক এবং মানিক মিয়ার ভূমিকা ছিল অসামান্য।

আইয়ুবের সামরিক সরকারের রোষকষায়িত লোচনকে উপেক্ষা করে দৈনিক ইত্তেফাকে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পাঠকনন্দিত ‘মোসাফির’-এর কলাম সে সময় আইয়ুব-মোনায়েম চক্রের শিরঃপীড়ার কারণ হয়েছিল। কাজেই সাংবাদিকতা জগতে মানিক মিয়া ছিলেন বাতিঘরের মতো, যাঁর পরামর্শ এবং ভূমিকায় গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি সাহস সঞ্চার করতে পারত।

যাই হোক, সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে দূর করতে হবে দুঃশাসনের দানবকে পরাস্ত করতে হবে এবং আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রতিরোধ করার শক্তি জোগাতে হবে। আরও সিদ্ধান্ত হলো, সংবাদপত্র এক্ষেত্রে পালন করবে সংগঠকের ভূমিকা। সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানকে অকুতোভয়ে সমস্ত বাধার মোকাবিলা করতে হবে।

ওখানে বসেই ঠিক হয় কীভাবে এই সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাগানো যেতে পারে গণমানুষকে। সে সময়ই সবাই নির্ভর করলেন মানিক মিয়ার ওপর, সংবাদ সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরীর ওপর, অবজারভারের সম্পাদক আবদুস সালাম প্রমুখের ওপর। এরা সবাই তখন এগিয়ে এলেন এবং মানিক মিয়ার নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী মোর্চা গঠিত হলো। সে সময় পূর্ব বাংলার নেতৃস্থানীয় পত্রিকার সকল সম্পাদক একসঙ্গে বসে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছিলেন সাংবাদিকতার ইতিহাসে, সকলে মিলে অভিন্ন সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামের সেই সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল সকল দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায়। এভাবে প্রতিটি সংবাদপত্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখতে একতাবদ্ধ হয়েছিল মানিক মিয়ার নেতৃত্বেই।

সেই ১৪ জানুয়ারির সাম্প্রদায়িক নৃশংসতা আমাদের সাংবাদিক সমাজকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে একক প্লাটফর্মে দাঁড় করাতে মানিক মিয়ার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী, দ্বিধাহীন। এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে প্রাণ দিয়েছিলেন আমীর হোসেন নামে এক সাহসী যুবক। গল্পকার প্রজেশকুমার রায়কে প্রাণ হারাতে হয়েছিল সাম্প্রদায়িক ইন্ধনদাতা ও অত্যাচারীদের হাতে। সাম্প্রদায়িক নৃশংসতার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য ছিল তত্কালীন মতলবি শাসকদের। এই অস্থিরতা ও অত্যাচারের কারণে সেসময় বিপুল সংখ্যক সংখ্যালঘু দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ‘৬৪ সালের এই সাম্প্রদায়িক অত্যাচার-নিপীড়নের চক্রান্ত উদ্ঘাটিত করেছিলেন মানিক মিয়া, ইত্তেফাক পত্রিকার ভেতর দিয়ে। সাম্প্রদায়িক উস্কানির মাধ্যমে নিজের জনপ্রিয়তার বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আইয়ুব খান এটি করেছিলেন পরবর্তীকালে ফাতেমা জিন্নাহর বিরুদ্ধে একটি হাস্যকর নির্বাচনে বিশেষ সুবিধা পেতে। তা ছাড়া এই নৃশংসতা একটি যুদ্ধের প্লাটফর্ম তৈরি করতেও বিশেষভাবে সহায়তা করেছিল। সেটি ছিল ‘৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ।

মানিক মিয়া আসলে কেমন মানুষ ছিলেন, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই সব ঘটনার পরম্পরায় তাঁর দ্ব্যর্থহীন ভূমিকায়। ইত্তেফাক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচারী শাসকদের সঙ্গে আপস করেননি কখনও। তিনি বলেছিলেন, আইয়ুব-মোনায়েমের সঙ্গে সমঝোতা করে তিনি ইত্তেফাক বের করবেন না কিছুতেই। এইখানেই সম্পাদকের সাংবাদিকতা নীতিমালায় অবিচল থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। মানিক মিয়া বুঝিয়ে দিয়েছেন একজন প্রকৃত সম্পাদক রাষ্ট্রের প্রশ্নে, জাতির প্রশ্নে, মানবতার প্রশ্নে নিশ্চুপ থাকতে পারে না কোনো অর্থেই।

আজ মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী । এ সময় যখন আমরা সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার ঘটনা বারংবার ঘটতে দেখি, তখন আমাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে মানিক মিয়ার আপসহীন ভূমিকা। সম্পাদকীয় নীতিমালার নামে এই প্রতিষ্ঠানটাকেই যেভাবে আজ নানা অসাংবাদিকসুলভ এজেন্ডায় বিতর্কিত করা হচ্ছে, তাতে মনে করি এ সময় দরকার ছিল একজন মানিক মিয়ার। একজন মানিক মিয়াই বর্তমানের এই অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে নিশ্চিতভাবে, সবচেয়ে ঋজুতার সঙ্গে দাঁড়াতে পারতেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তিস্বার্থসংশ্লিষ্ট আত্মকেন্দ্রিক এবং অহমিকাসর্বস্ব সাংবাদিকতাকে ধিক্কার জানাতে পারতেন প্রচণ্ডভাবে।

এখন সাংবাদিকতা পেশায় বিরাজ করছে কৃষ্ণপক্ষ। এই পেশার নৈতিকতা, পেশাগত সততা এবং নিষ্ঠা আজ অন্তর্হিত প্রায়। স্বার্থের কারাগারে অবরুদ্ধ আমাদের সাংবাদিকতার জগত্। এই অচলায়তনকে ভেঙে কবে আমাদের সাংবাদিকতার জগতটি শুক্লপক্ষের তিথিতে পদার্পণ করবে, কে জানে। জানি না কবে একজন মানিক মিয়া তাঁর সাহস এবং সততার মশাল জ্বালিয়ে আমাদের পথ দেখাবেন।

লেখক: সাংবাদিক।
সৌজন্যে- ইত্তেফাক।