কেবল ‘এক কলাম-চার ইঞ্চি সংবাদ’ই যার প্রাপ্য নয়

শনিবার, ০১/০৬/২০১৩ @ ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ

রাজীব নন্দী ::

manik mia-2ভূমিকা :সম্পাদক কে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন সাহিত্যিক অ্যালবার্ট হাবার্ড (Elbert Hubbard) রসিকতার ছলে বলছেন, ‘সম্পাদক :সংবাদপত্র কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন মানুষ, যার কাজ হচ্ছে গমের দানা থেকে খোসাগুলো আলাদা করা এবং দানার পরিবর্তে খোসাগুলো ছাপা হয়েছে দেখা’ (Editor : a person employed by a newspaper, whose business it is to separate the wheat from the chaff, and to see that the chaff is printed.)। নিশ্চয় সম্পাদক পদের প্রতি হাবার্ডের ছিল তীব্র শ্লেষ। কিন্তু আমার এই আলোচনা এমন একজন সম্পাদককে নিয়ে যিনি তাঁর পত্রিকায় হাবার্ড বর্ণিত ‘খোসা’ নয়, ‘গমের দানা’ই ছাপতেন। তিনি তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। যাকে বলা হয়—সাংবাদিকতাকে গণচেতনার মৌল চালিকাশক্তিতে রূপান্তরকারী।

আদর্শ হচ্ছে রাতের আকাশের সুদূরের তারা :বাঙালির পতনকাল কবে? এই প্রশ্নের উত্তরে পশ্চিমবঙ্গের এক বিতর্কসভায় বলা হলো—১৯১১ সাল! ১৯১১ সালই নাকি বাঙালির অধোগতির শুরু। সেই যে ১৯১১-র ডিসেম্বরে কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা হলো, সেখানেই নাকি পশ্চাদপসরণের সূচনা।

বাঙালির ‘রাজধানী ভাগ্য’ যখন স্থানান্তরিত হচ্ছে, সেই ১৯১১ সালেই জন্ম মানিক মিয়ার। এই মহান সম্পাদকের জন্ম সাল মনে রাখতে আমরা এই তথ্যটি মনে রাখতে পারি। কিন্তু ১৯১১ সালে রাজধানী বদল হওয়া ছাড়াও আরও দুটো ঘটনা ঘটেছিল। মোহনবাগান ইয়র্কশায়ার ইস্টার্ন রেজিমেন্টকে হারিয়ে শিল্ড জিতেছিল আর রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ‘জনগণমন’। অর্থাত্, রাজধানীভাগ্য হাতছাড়ার মাধ্যমে শুধু অধোগতি নয়, ওই বছর ঊর্ধ্বগতিও ছিল। মানিক মিয়ার জন্ম ‘হয়তো’ সেই ঊর্ধ্বগতির আরও একটি সূচক। দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর মানিক মিয়ার জীবনাদর্শ আমাদের কাছে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের বিখ্যাত একটি বাণীর প্রতিধ্বনি করে, ‘আদর্শ হচ্ছে রাতের আকাশের সুদূরের তারার মতো। ওদের কাছে পৌঁছাতে পারি না আমরা, কিন্তু ওদের দেখে সমুদ্রে আমরা আমাদের পথ করে নিতে পারি।’ ১৯১১ সালে জন্মানো এই আঁধার রাতের তারার মতো আমরা হয়তো হতে পারব না। কিন্তু অথৈ সমুদ্রে তিনি এখনও আমাদের ‘তারা’। পথ দেখান এখনও।

মানিক মিয়া আজও ভীষণ প্রাসঙ্গিক :চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিদ্যায়তনিক পরিসরে মানিক মিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিতে পারতেন। কিন্তু মানিক মিয়াকে আমরা কেবল সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছি। মানিক মিয়ার জীবনী, তাঁর কর্মতত্পরতা, সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার অবদান—ইত্যকার ভাবনা-গবেষণায় আমাদের কোনো মৌলিক সংযুক্তি নেই। প্রথাগত নোট, কয়েকটি চটি বই আর পেপার কাটিংকে সম্বল করে আমরা মানিক মিয়াকে বুঝি। আমরা শিক্ষকরা, খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে মানিক মিয়াকে ‘বোঝাই’ (মানে, শিক্ষার্থীদের মাথায় ‘সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার অবদান’ শীর্ষক একটি প্রশ্ন বা ‘বোঝা’ তুলে দিই)। পরীক্ষা পাসের জন্য যতটুকু না লিখলেই নয়, ঠিক ততটুকুই মানিক মিয়া পরীক্ষার খাতায় ধরা দেন। আরও অন্য ‘অনেক কিছু পড়তে/পড়াতে গিয়ে’ মানিক মিয়াকে জানার সীমাবদ্ধতাও আছে আমাদের।

তাই, মানিক মিয়াকে যারা আরও গভীরে জানার চেষ্টা করব, সাংবাদিকতার ইতিহাসের সাথে বর্তমানের সমন্বয় যারা করতে চাইব, তাদের একবাক্যে স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে আজকের নবীন সম্পাদকদের মধ্যে শুধু তারাই ‘ভবিষ্যতে’ স্থান করে নিতে পারবেন, যারা উত্তরসূরির রেখে যাওয়া সম্পাদকীয় মর্যাদাকে নিজের মধ্যে নবায়ন করে নিতে পারবেন। ১৯৫৪-‘৬৯-এর সাংবাদিক মানিক মিয়াকে ২০১৩ সালের বাস্তবতায় নবায়ন করে না নিলে আমরা হবো ‘ভিটেহারা উদ্বাস্তু সাংবাদিক’। মানিক মিয়া তাই আজ ভীষণ প্রাসঙ্গিক।

মানিক মিয়ার উত্থান :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালামের এক নিবন্ধ থেকে মানিক মিয়ার জীবনের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিকটি তুলে ধরি। যেখানে মানিক মিয়ার কর্মতত্পরতার বড় অংশই ওঠে এসেছে। শেখ সালাম লিখেছেন—১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগের বিরোধী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সে বছরই এই নতুন দলের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক। আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ১৯৫১-এর ১৪ আগস্ট থেকে এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন মানিক মিয়া। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিকরূপে আত্মপ্রকাশ করে। ইত্তেফাক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মানিক মিয়া ধীরে ধীরে পত্রিকাটিকে মুসলিম লীগবিরোধী ও পূর্ব বাংলার বঞ্চিত জনগণের মুখপত্র হিসেবে গড়ে তোলেন।

ইত্তেফাক অল্পদিনেই সাধারণ পাঠক তথা গণমানুষের পত্রিকা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবির পেছনে দৈনিক ইত্তেফাক সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। আর এ ক্ষেত্রে ‘মোসাফির’-এর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। হ্যাঁ, মোসাফির নামেই সমধিক পরিচিত তিনি। কাজী নজরুলের সেই বিখ্যাত মোসাফির, যিনি ‘আঁখি জল মুছে’ বাংলার জাতীয়তাবাদের বিকাশে ‘আপনি ফুটেছিল’ বাংলার ভাগ্যাকাশে!

মোসাফিরের রাজনৈতিক মঞ্চ :মানিক মিয়ার হাতে গড়া ইত্তেফাক মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে কখনও সংবাদ শিরোনাম, কখনও সংবাদ সূচনা, কখনও রূপক, কখনও সম্পাদকীয়, কখনও নিবন্ধের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির স্বাধিকার চেতনাকে ধারণ করত। ইত্তেফাকে প্রকাশিত তেমনি একটা নিবন্ধের নাম ছিল—’ঠগ বাছিতে গাঁ উজার’। এসব নিবন্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন একদিকে পরোক্ষ উত্সাহ দেওয়া হতো। তেমনি পাক সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হতো যে, স্বাধীন বাংলার স্বাধীন সাংবাদিকতা। জামায়াত ঘেঁষা দৈনিক সংগ্রাম ইত্তেফাকের সেই নিবন্ধের বিরুদ্ধে ‘অতএব ঠগ বাছিও না’ শিরোনামে একটি পাল্টা নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল। যেখানে বলা হলো—’ভারতের দালালরা ইত্তেফাকে বসে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোনোর চেষ্টা করছে। ইত্তেফাকে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা হচ্ছে।’ স্বাধীনতার পক্ষে ইত্তেফাকের এই যে বলিষ্ঠ ভূমিকা, তার সূচনা কিন্তু সেই পঞ্চাশের দশকেই নিহিত। তাই স্বাধীনতা সংগ্রামে ইত্তেফাকের ভূমিকা বুঝতে হলে আমাদের যেতে হবে কিছুটা পেছনে। ‘বাংলাদেশের সংবাদপত্র’ গবেষণা গ্রন্থে ড. সুব্রত শংকর ধর লিখছেন—’বস্তুত মানিক মিয়ার সাংবাদিকতার নির্ভীক দিকটি বাদ দিয়ে সম্ভবত এই দেশের তত্কালীন রাজনৈতিক ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়।’

কেন সম্ভব নয়? কারণ মানিক মিয়া বাংলার রাজনীতি-সাংবাদিকতায় হঠাত্ জুড়ে বসা কেউ নয়। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত পাকিস্তানে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হলো। কেন্দ্রীয় সরকারের অত্যাচার ও দমননীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সোচ্চার হলো জনগণ। শুধু ভাষাগত প্রশ্ন নয়; অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ক্ষমতার প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ঠিক সে সময়টাতেই ইত্তেফাকের আবির্ভাব। পূর্ব বাংলার প্রতিবাদী মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর স্থান পেল ইত্তেফাকের পাতায়। সেসময় ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ শিরোনামে মানিক মিয়ার লেখা ইত্তেফাকের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে তোলে।

উপনিবেশবিরোধী জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর লড়াই :১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো ছিল বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া বিকাশের প্রধান অন্তরায়। বাংলার উঠতি জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী পাকিস্তানি কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে জাতীয়তাবাদী শক্তি যেভাবে নেতৃত্বে আসে, তেমনটি। এই বুর্জোয়া শ্রেণী তার নিজের বিকাশের স্বার্থেই বাঙালির মুক্তি ও স্বাধিকার প্রশ্নে সোচ্চার হয়ে ওঠে। আর জাতীয়তাবাদী সকল আন্দোলনে ইত্তেফাক হয়ে উঠল অঘোষিত মুখপত্র। এই বিকাশমান জাতীয় বুর্জোয়াশ্রেণীর বিকাশে মানিক মিয়া ছিলেন একজন অগ্রনায়ক। মানিক মিয়ার হাত ধরে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে এই শ্রেণীর অঘোষিত মুখপত্র। গড়ে ওঠে বাংলার স্বাধীনতার চেতনা। ‘জাতীয়তাবাদ বিকাশের স্বার্থে স্পষ্ট অবস্থান’-এর কারণে মানিক মিয়ার ইত্তেফাক হয়ে ওঠে পাকিস্তানবিরোধী বাঙালির ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে হাতিয়ার।

মানিক মিয়া ছিলেন ইনস্টিটিউশন :ইত্তেফাক অফিসে মানিক মিয়ার পাশের টেবিলে বসে কাজ করা প্রয়াত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, ‘আমাদের বেতন কম। কিন্তু হূদয়ের সম্পর্ক ছিল অসাধারণ গভীর। আমাদের প্রত্যেক সাংবাদিকের রাজনীতির দিকটি ছিল মুসলিম লীগ বিরোধিতা এবং আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য প্রগতিশীল পার্টিকে সমর্থন করা। এই রাজনীতির নীতিমালা মানিক মিয়া আমাদের শেখাননি। তার চরিত্র ও মানসিকতার সাথে আমাদের রাজনীতির সম্মেলন ঘটেছিল। প্রত্যেক সাংবাদিকই এমনকি কর্মচারীরাও মানিক মিয়ার সাথে একাত্মতা বোধ করতেন।’ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ যেভাবে বলছেন তাতে আমরা বুঝি যে, মানিক মিয়ার চরিত্র ও মানসিকতার সাথে সকলের রাজনীতির সম্মেলন ঘটেছিল। পত্রিকার প্রত্যেক সাংবাদিকই এমনকি কর্মচারীরাও মানিক মিয়ার সাথে একাত্মতা বোধ করতেন। করতেন কারণ, মানিক মিয়া হয়ে উঠেছিলেন নিজেই একটি ইনস্টিটিউশন বা প্রতিষ্ঠান। এই একাত্মবোধের কারণ কী? কারণ, মানিক মিয়া সাংবাদিকতাকে যতটা না পেশা হিসেবে নিয়েছেন তারচেয়েও বেশি নিয়েছেন জনগণের ‘খেদমত’-এর অংশ হিসেবে। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ”আমি আমার চিন্তাশক্তি ও কর্মদক্ষতা সর্বতোভাবে ইত্তেফাকের পিছনেই নিয়োজিত করিয়াছিলাম। সংবাদপত্রের মারফত দেশবাসীর যতটুকু খেদমত করা যায় তাহাই ছিল আমার একমাত্র লক্ষ্য। এই দিক দিয়া আমি ‘ইত্তেফাক’কে শুধুমাত্র জীবিকা ও অর্থোপার্জনের অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করি নাই। যে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে ‘ইত্তেফাক’ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, সেই জনগণের অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করাই ছিল আমার ব্রত। …কোনো প্রলোভন বা স্বার্থচিন্তা দ্বারা আমি কখনও প্ররোচিত হই নাই।”

মানিক মিয়ার মৃত্যুর পর তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমস পত্রিকার তদানীন্তন সম্পাদক বলেছিলেন, ‘ইত্তেফাক সম্পাদক শুধু একজন সম্পাদক ছিলেন না, ছিলেন একটি ইনস্টিটিউশন।’ একজন ব্যক্তি মানুষ থেকে কীভাবে তিনি ইনস্টিটিউশনে পরিণত হলেন? তার উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯৬৯ সালের গোড়ার দিকে একটি ঘটনায়। এ সময় তিনি তাঁর রাজনৈতিক মঞ্চে লিখছেন—’আমাদের দেশের ধর্মব্যবসায়ীদের রাজনীতির আসল হায়দিস খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে।’ ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্ম গেলে-ধর্ম গেল বলে রব তুলল। সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী ২০০৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সমকালের সম্পাদকীয় পাতায় এক নিবন্ধে এ সম্পর্কে লিখলেন—’এখানে হায়দিস অর্থ ছিল ঠিকানা। কিন্তু জামায়তিরা শোরগোল তুলেছিল এই বলে যে, মানিক মিয়া পবিত্র হাদিসের অবমাননা করেছেন। এ ঘটনায় ইত্তেফাক অফিসে হামলা এবং মানিক মিয়ার উপর দৈহিক আক্রমণ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। মিছিল করে তার গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়। মানিক মিয়া কোনো হুমকির কাছে নতিস্বীকার করেননি।’ এই নত না হওয়াই তো ইনস্টিটিউশনের পরিচায়ক। এ রকম পারেন কতজন সম্পাদক?

১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অজুহাতে পূর্ববঙ্গেও একটি দাঙ্গা সৃষ্টি হয়। অসাম্প্রদায়িক জনগণ দাঙ্গা প্রতিরোধে সোচ্চার হয়। মানিক মিয়াকে সভাপতি করে গঠিত হলো ‘দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি’। ১৯৬৪ সালের ১৭ জানুয়ারি তারিখে ইত্তেফাক, আজাদ ও সংবাদ-এর প্রথম পৃষ্ঠায় একযোগে প্রকাশিত হয় ‘পূর্বপাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক একটি আবেদন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত বাঙালির নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি তুলে ধরে আবেদনটিতে বলা হয়, ‘পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনের ওপর এই পরিকল্পিত-হামলার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে আমরা পূর্ব বাংলার সকল মানুষকে আহ্বান জানাইতেছি।’ দাঙ্গা প্রতিরোধে একজন সম্পাদকের যে অবদান তা আজকের দিনেও ভীষণভাবে ভাবায়। আমাদের দেশে সম্প্রতি তরুণপ্রজন্মের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধবিরোধী গণআন্দোলন ও জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কট্টর ডানপন্থি একজন সম্পাদক যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়ে তার পত্রিকায় ভুয়া, কষ্টকল্পনা, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করে দেশে দাঙ্গা তৈরির মিশনে নেমেছিল। সম্পাদক পদটির এমন কুিসত দলীয়করণের পরিচয় বাংলাদেশে আর হয়েছে কি না তা গবেষণার বিষয়। এখানেই মানিক মিয়ার সম্পাদকীয় নেতৃত্ব আমাদের কাছে আজও অনুকরণীয়।

মুক্তিযুদ্ধে ইত্তেফাক :মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে ইত্তেফাকের ‘বড়’ ভূমিকা রয়েছে। ইত্তেফাকের সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছেন। ছয় দফা দাবিতে গড়ে-ওঠা আন্দোলনের জোরালো সমর্থনে ইত্তেফাকের ২৬ এপ্রিল, ১৯৬৬ তারিখের ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে ‘মোসাফির’-এর লেখায় আমরা দেখি—’জনতার কাফেলা চলিবেই। …আজ দেশবাসী এমন নেতৃত্ব চায় যাহারা নির্যাতন ও হয়রানিতে হতোদ্যম হইবেন না এবং জনতার অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে আগাইয়া নিতে পিছপাও হইবেন না। বরং জনদাবি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জেল জুলুম নির্যাতন হয়রানিকে দেশ সেবার সুযোগ বলিয়া গ্রহণ করিবেন।’

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনসহ গণবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় মানিক মিয়াকে একাধিকবার কারাঅন্তরীণ করা হয়। ছয় দফার পক্ষে তিনি লিখেছেন ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনে টগবগ করা বাংলায় দেহত্যাগ করেন মানিক মিয়া। কিন্তু ‘জীবন্ত’ মানিক মিয়ার স্পষ্ট সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন ঘটে ‘প্রয়াত’ মানিক মিয়ার ইত্তেফাকেও। ১৯৭১ সালের ৪ মার্চ ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়—’আবার আগুন লইয়া খেলা শুরু হইয়াছে। আবার দুর্ভাগা বাংলার বুকে রক্ত ঝরানো আরম্ভ হইয়াছে। ঊনসত্তরের ফেব্রুয়ারি-মার্চের ন্যায় একাত্তরের মার্চেও আবার গুলি চালিয়েছে, কার্ফু জারি হইয়াছে, আবার আগুন জ্বালিয়েছে, আবার জনতা পথে নামিয়াছে, জনসমুদ্রে আবার জাগিয়াছে প্রবল জল্লোচ্ছ্বাস আর উত্তাল ঊর্মিমালা।’ অর্থাত্, মানিক মিয়া নেই কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সম্পাদকীয় মর্যাদা ও অবস্থান রয়ে গেছে বাঙালির স্বাধিকার চেতনার কাছে। এরপর সামরিক শাসনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হলো সত্তরের নির্বাচন। ইত্তেফাক সমর্থন জানালো আওয়ামী লীগকে।

নাটবল্টু টাইট দেওয়া শ্রমিক :তরুণ সংবাদকর্মী থেকে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায় যোগদানের সুবাদে নানা ধরন-ধারণের বিচিত্র শিক্ষার্থীদের সাথে মেলামেশা আর হিমালয়সম জ্ঞানী সহকর্মীদের কাছে পাই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে আট বছরের পড়া ও পড়ানোর অভিজ্ঞতায় যে কয়েকটি হতাশা আমাকে অবসাদের দিকে ঠেলে দেয় তার মধ্যে একটি হলো, ‘আমরা বলি বেশি, কাজ করি কম’। আমরা অনেকেই কেবল ‘খেয়াল’ করি আমাদের এই সাংবাদিকতার বিদ্যালয়তনিক চত্বরে আমরা এক ছটাক জনসংযোগ কর্মকর্তা, এক পোয়া বিজ্ঞাপন কর্তকর্তা, খানিকটা বাংলা, খানিকটা ইংরেজি, কিছুটা জ্ঞাপনবিদ্যা আর কিছুটা সাংবাদবিদ্যা; এমনি সব বিচিত্র কায়দার মিশ্রণে একধরনের প্রশিক্ষণ পাচ্ছি-দিচ্ছি। এইসব শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সকল কাজের কাজী, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন একধরনের চটপটে, চৌকস মুখরা হিসেবে তৈরি করছে। আমাদের বিভাগ, আমাদের সমাজ, আমাদের রাজনীতি, আমাদের টেলিভিশন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসু, বিশ্লেষণী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের মন তৈরি করছে না। আমরা বড়জোর তৈরি করছি এই করিডোর থেকে বেরিয়ে প্রচলিত সমাজের চলমান মেশিনটার নানা সুবিধাজনক জায়গায় নাটবল্টু টাইট দেওয়ার মতো দক্ষ শ্রমিক। অনেকটা চার্লি চ্যাপলিনের ‘মর্ডান টাইমস’ সিনেমার নাটবল্টু টাইট দেওয়া শ্রমিক।

উপসংহার :সাংবাদিকতার বিদ্যালয়তনিক ভুবনে আমরা যারা কেবল নাটবল্টু টাইট দেওয়ার শ্রমিক না বানিয়ে ‘সৃজনশীল সংবাদকর্মী’ বানাতে চাই, তাদের ধ্যান-জ্ঞ্যান হয়ে ওঠুক মানিক মিয়াকে নিয়ে আরও আরও বেশি কাজ। বাংলার স্বাধীনতাপর্বে ইত্তেফাকের ভূমিকা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা ইত্যকার বিষয় নিয়ে গবেষণা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবছর মানিক মিয়ার প্রয়াণ দিবস, পহেলা জুন তারিখটি সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। যুদ্ধপরাধীদের বিচার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চলমান ‘গণজাগরণ’ আন্দোলনের বিরুদ্ধে একজন ‘কট্টর ডানপন্থি-হঠাত্ সম্পাদক’-এর কল্যাণে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলা ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে। সম্পাদক পদটি যখন দলবাজ বিশেষণে বিশেষায়িত হচ্ছে, সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান যখন মালিকের দলীয় স্বার্থের লিফলেটে পরিণত হয়; দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার এই চরম বেপথু সময়ে মানিক মিয়া তাই ভীষণ দরকারি। প্রতিবছর জন্ম ও মৃত্যুদিনে মানিক মিয়ার প্রাপ্য যে কেবল ‘এক কলাম-চার ইঞ্চির সংবাদ’ নয়, তা আমরা কবে বুঝতে পারব?

লেখক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চবি।
সৌজন্যে- ইত্তেফাক।

সর্বশেষ