ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠাতা মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী শনিবার

শনিবার, ০১/০৬/২০১৩ @ ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

manik mia(১ জুন ২০১৩)- বাংলায় গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ ও নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রবাদপ্রতিম এই সাংবাদিক নিজের সম্পাদনায় দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার সাংবাদিকতাকে আমূল বদলে দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং হতাশা-বেদনাকে সহজ-সরল অথচ বলিষ্ঠ ভাষায় তুলে ধরার যাদুকরী ক্ষমতা ছিল তাঁর মধ্যে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনকল্যাণে নিজেকে সঁপে দিয়ে আমৃত্যু তিনি নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন আধুনিক বাংলা সংবাদপত্রের রূপকার এবং একইসঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা। দৈনিক ইত্তেফাকের পাতায় ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি,’ ‘রঙ্গমঞ্চ’, ও ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ ইত্যাদি নামের কলামে ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তিনি বাংলার স্বাধীনতাকামী জনগণকে উজ্জীবিত করে তোলেন। এর মধ্যে ‘ রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামের জনপ্রিয় কলামটি তিনি লিখতেন ‘মোসাফির’ ছদ্মনামে। এই কলামের নির্ভীক রাজনৈতিক সত্য ভাষণ ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনার কারণে দেশের মানুষের হূদয়ে তিনি চিরঅম্লান হয়ে আছেন। লেখনীর মাধ্যমে তত্কালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা অত্যন্ত সহজবোধ্য ভাষায় তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেন। নীতির প্রশ্নে আমৃত্যু আপোষহীন ও প্রতিষ্ঠানতূল্য এই মানুষ মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেও ছিলেন অবিচল। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তাঁর সেই সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ১৯৬৯ সালের এই দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ তত্কালীন পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি বারবার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েছিলেন। ইত্তেফাকের ওপর বিপর্যয় নেমে এসেছিল দফায় দফায়। এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা ইত্তেফাকের প্রকাশনাও বন্ধ করে দেয়। তবু কিছুতেই মাথা নোয়াতে রাজি হননি মানিক মিয়া। সেদিনের সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করার যে নির্ভীক ভূমিকা তিনি পালন করেছিলেন, ইতিহাসে তা এক বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। শোষণ-বঞ্চনা, সামপ্রদায়িকতা ও রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের পক্ষে মানিক মিয়ার কলম ছিল সদা সোচ্চার। তত্কালীন পাকিস্তানি শাসনামলে সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে উপজীব্য করে তিনি যেসব সাহসী লেখা লিখেছিলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, তাঁর সেসব লেখনী আজকের দিনেও প্রায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন উদার গণতন্ত্রের ধারক। একজন রাজনীতিমনস্ক মানুষ হলেও রাজনৈতিক কোনো উচ্চাভিলাষ তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের ‘আমাদের মানিক ভাই’ শীর্ষক লেখার এক স্থানে বলেছেন, ‘ আমার ব্যক্তিগত জীবনে মানিক ভাই’র প্রভাব যে কত গভীর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়’।

দিনব্যাপী কর্মসূচি

দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মরহুমের উত্তরসূরিগণের পক্ষ থেকে এবং ইত্তেফাক পরিবার আজ শনিবার দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এছাড়া জাতীয় পার্টি- জেপিসহ বিভিন্ন সংগঠন দিবসটি পালন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। এর মধ্যে আজিমপুর করবস্থানে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মাজারে আজ সকাল ৭টা থেকে কোরআনখানি শুরুর পর সকাল ১০টায় মোনাজাতের মধ্য দিয়ে তা শেষ হবে। মানিক মিয়ার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মরহুমের জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আজ এতিমখানায় কাঙ্গালিভোজের আয়োজন করেছেন। কনিষ্ঠ পুত্র আনোয়ার হোসেনের ধানমন্ডির বাসায় কোরআনখানি ও তবারক বিতরণ করা হবে। জ্যেষ্ঠ কন্যা মরহুমা আখতারুন্নাহার (বেবী) এর বাসভবনে বাদ এশা মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া কাজলার পাড়স্থ ইত্তেফাক ভবনে আজ সকাল থেকে কোরআনখানি এবং বাদ জোহর মিলাদ মাহফিল ও তবারক বিতরণ করা হবে।

জেপি’র কর্মসূচি

আজ সকাল ৮টায় আজিমপুর কবরস্থানে মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। বিকাল সাড়ে ৩টায় জেপি’র উদ্যোগে কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মানিক মিয়ার কর্মময় জীবনের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক, আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেবেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য দলের নেতা-কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম অনুরোধ জানিয়েছেন।

এছাড়া দিবসটি পালন উপলক্ষে জেপি গাইবান্ধা জেলা শাখার উদ্যোগে স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

মানিক মিয়া পরিষদ

আজ বিকাল ৪টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির তৃতীয় তলায় বীর উত্তর খাজা নিজাম উদ্দিন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমির উল ইসলাম ও বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বেগম আশরাফুন নেছা মোশারফ এমপি এতে উপস্থিত থাকবেন।

মানিক মিয়া রিসার্চ একাডেমী

ঢাকাস্থ মানিক মিয়া রিসার্চ একাডেমী আজ সকালে মরহুমের মাজার প্রাঙ্গণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে।

সংবাদপত্র প্রতিনিধি সংস্থা

বাংলাদেশ সংবাদপত্র প্রতিনিধি সংস্থা (বিএনআরএস) আজিমপুরস্থ মাজার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ১০টায় মাজার জিয়ারত ও পুষ্পমাল্য অর্পণ, সকাল সাড়ে ১০টায় মাজার প্রাঙ্গণে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কর্মময় জীবনের উপর বিশেষ আলোচনা ও দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ।

জেপি মহাসচিবের বাণী

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি-জেপি’র মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাঁদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাঁদের অন্যতম। তিনি কেবল একজন সাহসী সাংবাদিকই ছিলেন না, একজন দার্শনিকও ছিলেন। লেখনীর মাধ্যমে তিনি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও তিনি ছিলেন অন্যতম অনুপ্রেরণাদাতা। পাকিস্তানি শাসকদের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে তিনি অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করেন। এ জন্য তাঁকে কারাবরণ করাসহ নিপীড়নের মুখে পড়তে হয়েছিল। বাজেয়াফত করা হয় ইত্তেফাক। তবু তিনি আপোষ করেননি। তিনি ছিলেন উন্নত শির ও সংগ্রামী চেতনার প্রতিক। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মানিক মিয়ার কাছ থেকে সব সময় অনুপ্রেরণা ও সমর্থন পেয়েছেন। মানিক মিয়া সাংবাদিকতা করতেন রাজনীতির জন্য। ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে ঘুমন্ত জাতিকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জন্য তাঁর লেখা ছিল রাজনৈতিক পাঠ স্বরূপ। সূত্র; ইত্তেফাক।