জাহিদ আনোয়ার

বৃহস্পতিবার, ৩০/০৫/২০১৩ @ ১:২২ অপরাহ্ণ

মফিদুল হক ::

jahedপয়লা বৈশাখ থেকে কয়েক দিন দেশের বাইরে ছিলাম, খবরটি নিশ্চয় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ছোট খবর হবে হয়তো, তবে উপেক্ষা করার মতো সংবাদ তো নয়। ছাপা হলেও আমার চোখ তা এড়িয়ে গেছে। এখন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের মধ্যে সুমুদ্রিত একটি খামের ওপর চোখ আটকে গেল, স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম একবার-দুবার বারবার। নাগরিক শোকসভা কথাটা বড় করে লেখা, পাশে ছাপা হয়েছে ‘জাহিদ আনোয়ার-এর অকালপ্রয়াণে’, বিশ্বাস করা কঠিন এই বার্তা।

বৈশাখেই তাঁর জন্ম, ২৮ এপ্রিল, ১৯৫৮ এবং লোকান্তরিত হলেন আরেক বৈশাখে, ১৬ এপ্রিল, ২০১৩। প্রাণবন্ত তরুণ জাহিদকে চিনি অনেককাল, দেখা-সাক্ষাৎ হতো কম, ওর দিক থেকে উদ্যোগ থাকলেই হতো সাক্ষাৎ, তবে যখনই দেখা হতো, জানতে পারতাম কোনো একটা কিছু নিয়ে মেতে আছে জাহিদ আনোয়ার। বলিষ্ঠ শক্তপোক্ত শরীর, ঘুরে বেড়ায় নানা কাজের পেছনে, হুঁশিয়ার মানুষেরা বলবেন অকাজের পিছু পিছু, কিন্তু জাহিদ প্রাণের আনন্দ খুঁজে পান এসব অকাজেই। তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নওগাঁর সংগঠক এবং দেশজুড়ে যেসব পাগলপ্রাণ তরুণকে একত্র করতে পেরেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, বেশ বোঝা যায় সেখানে জাহিদের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। নওগাঁর আরও নানা কাজে জাহিদের সম্পৃক্তি, অমন এক ছোট মফস্বল শহর, যা পূর্বতন সৌন্দর্য ও গুরুত্ব হারিয়েছে অনেক আগে, সেখানে আবার সাহিত্যের ও শিল্পের দীপশিখা জ্বালাতে যাঁরা মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করছিলেন, তাঁদের একজন ছিলেন জাহিদ আনোয়ার। তাঁর প্রাণোচ্ছ্বাস আবর্তিত হতো লিটল ম্যাগাজিন অঞ্জলি লহ মোর ঘিরে, সম্পাদক-প্রকাশক তিনি নিজেই, কোনোভাবেই পত্রিকার কোনো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ছিল না, ছিল আকাশচুম্বী স্বপ্ন।

এই স্বপ্নই জাহিদ আনোয়ারকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল, আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল নিঃস্বার্থ শুভব্রতী কর্মতাড়িত এক যুবকের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে নিজের মনের জোর আরেকটু বাড়িয়ে তোলা। সামান্য এক অনুরোধ ছিল জাহিদ আনোয়ারের, কলকাতা বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে তিনি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে হাজির হতে চান। আমি ভালোভাবেই বুঝি এই প্রস্তাবে বাণিজ্যিক কোনো সুবিধা অর্জিত হওয়ার নেই, লিটল ম্যাগাজিন যাঁরা প্রকাশ ও ফেরি করে বেড়ান, তাঁদের সঙ্গে বাণিজ্য-লক্ষ্মীর যোগও বিশেষ নেই। আমার দিক থেকে দু-একটি মামুলি সুপারিশপত্র দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। পরে দেখা গেল, কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে জাহিদ আনোয়ার নিজের জন্য শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসন করে নিতে পেরেছেন, তাঁর মতো আরও অনেক সমমনা মানুষ তিনি সেখানে পেয়েছিলেন এবং এঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশ নিবিড় হয়ে ওঠে। একবার বইমেলায় দেখি, জাহিদ আনোয়ার সস্ত্রীক মেলা আলো করে বসে আছেন। পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন ছোট শহর থেকে উঠে আসা তাৎপর্যময় লিটল ম্যাগাজিনের যাঁরা সম্পাদক-প্রকাশক, তাঁরাও জাহিদ আনোয়ারের মধ্যে নিজ সত্তার প্রতিরূপ খুঁজে পেয়েছিলেন এবং পরস্পরের জন্য আনন্দদায়ক হয়েছিল এই যোগ।

জাহিদ আনোয়ারকে দুই বাংলার লিটল ম্যাগাজিনের সেতুবন্ধ হিসেবে আমি দেখেছি, জেনেছি। জানি না তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজ ও অবদানের কোনো ধরনের স্বীকৃতি তিনি কখনো পেয়েছেন কি না, কিন্তু মনের আনন্দে এমন কাজ করে গেছেন জাহিদ আনোয়ার, যদিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় জীবনে ও সংসারে সফলতা পাওয়ার জন্য এসব মোটেই অনুকূল ছিল না। তাঁর কাছ থেকে অনেকবারই উপহার পেয়েছি অঞ্জলি লহ মোর, যখনই হাতে নিয়েছি সেই লিটল ম্যাগাজিন, আমার মনে পড়েছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নওগাঁর কথা, যার শ্রীমন্ত রূপ ধরা আছে ‘কাল মধুমাস’ কবিতায়। মনে হতো হারিয়ে যাওয়া পুরোনো সেই নওগাঁ তার সৌন্দর্য ও শক্তিময়তা নিয়ে আবার বুঝি জেগে উঠতে চাইছে নতুনভাবে। সেই নতুনের প্রতীক এই তরুণকে যে আমি ভালোবেসেছিলাম, সেটা কবুল করতে দ্বিধা নেই।

আজ এ-কথা ভাবতে গিয়ে মন আরও বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে যায়, স্ব-সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিনের নাম জাহিদ আনোয়ার কেন রেখেছিল অঞ্জলি লহ মোর, যে নাম-পরিচয়ে কেবল নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার আকুতি আছে, বিনিময়ে কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই। ওর কি কোনো তাড়া ছিল, আর তাই সবটুকু এমন উজাড় করে দিয়ে চলে গেল, সবাইকে ফাঁকি দিয়ে, কারও কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি না রেখে।
কিন্তু ঋণ তো আমাদের রয়ে গেল অপরিশোধ্য।

মফিদুল হক: লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
সৌজন্যে- প্রথম আলো।