খবরের ফেরিওয়ালারা যখন মগজ বিক্রির হাটে

বৃহস্পতিবার, মে ৩০, ২০১৩

ফজলে এলাহী ::

ফজলে এলাহী

ফজলে এলাহী

মোনাজাতউদ্দীন-ফখরে আলম-রুকুনুদ্দৌলারা প্রতিদিন কুঁড়ে খায় আমায়। পথে থেকে পথে, গ্রাম থেকে গ্রামে, এই শহর থেকে ওই শহর ঘুরে কত খবর প্রতিদিন কত সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় আসে। রাশি রাশি খবর। কোনটা মানবিক, কোনটা নান্দনিক, কিছু খবর বেদনার আবার কিছু খবর আনন্দের। সারাদেশের, সারা পৃথিবীর সব খবর নিয়ে প্রতিদিন সকালে হাতে আসে তরতাজা খবরের পত্রিকা।

নানা খবরে নানা প্রতিক্রিয়া পাঠকের। কখনো হাসি, কখনো কান্না আবার কখনো কেবলি দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু কেউ জানেনা খবরের পেছনের খবর। সংবাদটি তৈরি হওয়ার গল্পটি আড়ালেই পড়ে থাকে। তবু একদিন খবরের নেশায় নিজের অজান্তেই আমিও হয়ে উঠি সংবাদের ফেরিওয়ালা । একটি সংবাদের জন্য কত পথ ঘুরি, কত ফোন, কতজনের কাছে কত কি জানতে চাই। কত প্রলোভন, কত হুমকী, কত অনিশ্চয়তা তবুও খবরের খোঁজে ঘুরি পথ থেকে পথে, ঘাট থেকে নগরে বন্দরে।

চাকরীর অনিশ্চয়তা, জীবনের নানা দৈন্য, বেতন বৈষম্য, বুর্জোয়া দুর্নীতিবাজ মালিক, মালিকের তাবেদার সম্পাদক-বার্তা সম্পাদক, মালিকপক্ষের নানা আদর্শ আর পলিসি, চাকরীর জ্যামিতিক সরলীকরণ সবকিছু ভূলে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত কেটে যায় একজন সংবাদকর্মীর।

তবুও নানা সীমাবদ্ধতা আছে। এই মহৎ পেশা আজ আর মহৎ নেই। যোগ্যতার সংকটে আজ প্রশ্নের মুখে সংবাদকর্মীরা। আমরা এখনকার সাংবাদিকরা যেনো দিনে দিনে ঠুটো জগন্নাথ। পড়াশুনা নাই। পড়াশুনা মানে কেবল একাডেমিক নয়- ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রবাহ। অধিকাংশ সাংবাদিকই এসব খবর রাখে না। রাখার প্রয়োজন মনে করেনা।

কলম আর কাগজ আর ইদানীং একটি টিভি চ্যানেলের লোগো সম্বলিত মাইক্রোফোন হাতে পেলেই নিজেকে মনে করে দুনিয়ার সবচে শক্তিশালী মানুষ। যা খুশি তাই লিখি। কারো বক্তব্যের ধার ধারিনা, কাউকেই পরোয়া করিনা। আর এখন আবার চালু হয়েছে বিনিময় প্রথা। আমি আপনার নিউজটি করব আর আপনি আমাকে একটা প্যাকেট দেবেন। প্যাকেটে দুইশ থেকে দুই হাজার থাকতে পারে,কখনো কখনো তারো বেশি। আপনার গাউড লাইন অনুসারেই ছাপা হবে আমার সংবাদ।

আমাকে এখন আমি পরিচালনা করিনা, করে মার্কাওয়ালা নেতারা, ধান-চালের আড়তধার, কালোবাজারি, নির্বাহী প্রকৌশলী, বন সংরক্ষকরা। নিয়মিত মাসোয়ারা চলে আসে কোন কোন জায়গা থেকে। তাহলে আজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে আমার মূল্যবোধ ! সাংবাদিককে আজ নিরাপদে কিনে নিতে চায় মার্কাবাজ ঠিকাদার, গোপন সমঝোতার তথ্য প্রকাশ না করার শর্তে। সাদা আর হলুদ খামে মুদ্রা আসে, সাদাসিদে জীবনে সাময়িক চাকচিক্যও আসে কারো কারো। কিন্তু আসলেই জীবন বদলায়না। তবে কেনো বিক্রি হওয়া?

তবে কেনো অসৎ প্রকৌশলী, দুর্নীতিবাজ আমলা, বনবিভাগের ডিএফও, রেজ্ঞার, কাঠ ব্যবসায়ী, চালের কালোবাজারি, পঁচে যাওয়া রাজনীতিবিদ কিনে নিতে চায় মগজের বিশুদ্ধ কোটর?

কিছুটা আলো চাই, শুদ্ধ আলো, মুক্ত আলো। আগামীর কোন পূর্ণিমায় এই শহরের সব নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা হয়ত হাতে হাত রেখে শপথ নেবে ‘‘আমরা কোনদিন বিক্রি হবোনা, বিক্রি হওয়ার জন্য আমরা সাংবাদিক হতে আসি নাই ।”

এই সমাজের, এই শহরের, এই জনপদের যাবতীয় অপকর্মের মুখোশ খুলে দেবে আগামীর কোন সাহসী সাংবাদিক, জীবনের কাছেও আপোষ করবেনা যে… এমন একজন, একঝাঁক সাংবাদিকের প্রত্যাশায় রইলাম..

লেখক: সংবাদকর্মী, রাঙ্গামাটি।