“বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম এখন দুঃসময়ের মুখোমুখি”

রবিবার, ২৬/০৫/২০১৩ @ ৮:২২ পূর্বাহ্ণ

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

economistবাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম এখন দুঃসময়ের মুখোমুখি- এ উদ্বেগ জানিয়ে লন্ডনের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন দি ইকোনমিস্ট গত ২৫শে মে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি এ রকম: বলা হয় ভারতীয় মিডিয়া প্রকৃত সত্যের ১০০ ভাগেরও বেশি দিয়ে থাকে তার পাঠকদের। কিন্তু প্রতিবেশী বাংলাদেশে পাঠকরা এর চেয়ে কম পেতেই অভ্যস্ত। উদ্বেগের বিষয় এই যে, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম এখন দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে।

এ সপ্তাহে সংবাদপত্রের সম্পাদকরা একটি যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত বিরোধীদলীয় একটি পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুুক্তি দাবি করেছেন সরকারের কাছে। সরকার ওই পত্রিকাটি গত ১১ই এপ্রিল থেকে বন্ধ এবং ওই সম্পাদককে তারপর থেকে আটক করে রেখেছে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ওই বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘সম্পাদকদের আবেদন সংবাদপত্রের স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।’ সম্পাদকরা মাহমুদুর রহমানের ‘আমার দেশ’ ফের ছাপানোর অনুমতি দিতে আবেদন করেছেন। একই সঙ্গে তারা দু’টি টিভি স্টেশনকে ফের সমপ্রচারের অনুমতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সম্পাদকদের ওই দাবি সরকারও প্রত্যখ্যান করেছে। কট্টর ইসলামপন্থি প্রতিবাদীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান সরাসরি সমপ্রচার করার পর থেকে ওই দু’টি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ওই অভিযানে কয়েক ডজন মানুষ মারা যান।

বাংলাদেশে সংবাদ মাধ্যমের পরিবেশ ক্রমশ খারাপ হয়ে ওঠায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় নিবেদিত সংগঠন দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় একটিমাত্র দেশ আছে যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে বাংলাদেশের চেয়ে কম মর্যাদা দেয়া হয়। সেই দেশটি শ্রীলঙ্কা।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, পিছলে সবার নিচে চলে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের সামনে কিছু পথ এখনও খোলা আছে। এখনও গভীর রাতে রাজনৈতিক টক শো হয়, যা ব্যাপক জনপ্রিয়। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশে সংবাদপত্র বিকশিত হয়ে উঠছে নানাভাবে। কিন্তু গত কয়েক মাসে বিভিন্ন ঘটনার সূত্রে সরকারের যে আচরণ দেখা যাচ্ছে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হয়েই আসছে।

গত এপ্রিলে সরকার যখন চারজন নাস্তিক ব্লগারকে গ্রেপ্তার করে তখন ক্ষুদ্র একটি কট্টরপন্থি ইসলামিক গ্রুপের দাবি সরকার মেনে নিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল। যারা ইসলামের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করেছে সরকার তাদের শাস্তি দেয়ার কথাও বলেছিল। কিন্তু এ মাসে টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে কারিগরি সরঞ্জামের জন্য – যা দিয়ে তারা ইন্টারনেটের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইন্টারনেটে ক্ষতিকর উপাদান ও জাতীয় ঐক্য, সংহতির প্রতি হুমকি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস অথবা আপত্তিকর এমন সব বিষয় থেকে বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখা এ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতোই বাংলাদেশের মিডিয়া এদেশের পরস্পর বিদ্বেষী দুই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারদের কোন না কোন পক্ষের সমর্থক। বছর শেষে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। তাকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদের লড়াই দিনে দিনে কঠোর থেকে কঠোরতর হয়ে উঠছে।

মাহমুদুর রহমান সাবেক ব্যবসায়ী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ইদানীং তার সম্পাদিত পত্রিকা হট কেকের মতোই বিক্রি হচ্ছিল। সরকার এ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়ার আগের কয়েক মাসে এর প্রচার সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল ৬ গুণ। প্রতিদিন বিক্রি হয়েছে ২ লাখ কপি।

মাহমুদুর রহমানকে আটক করা হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে। গত ডিসেম্বরে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালের এক চেয়ারম্যান ও ব্রাসেলস ভিত্তিক এক আইনজীবীর স্কাইপ সংলাপ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন পত্রিকায়। সেখান থেকেই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের সূত্রপাত। ওই সংলাপে সরকারি কর্মকর্তা, বিচারক, প্রসিকিউটর ও আদালতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এক রকম বোঝাপড়া ফাঁস হয়ে পড়ে। সব কিছু মিলিয়ে এ থেকে ওই আদালতের বিচারের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইকোনমিস্ট এ সংলাপের বিষয়ে ও ব্যক্তিগত অনেক ই-মেইল প্রকাশ করে এবং এ নিয়ে প্রশ্ন করার পর আদালতের তখনকার চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। ওদিকে মাহমুদুর রহমান বলেছেন, নিরাপত্তা হেফাজতে তার ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। তবে সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদরা তীব্র সমালোচনা করেছেন মাহমুদুর রহমানের। কাউকে প্রভাবিত করতে তার প্রায় অলৌকিক ক্ষমতা আছে- এমন কথাও তাদের কেউ কেউ বলে থাকেন তার সম্পর্কে। তারা মনে করেন, তিনি যে কোন বিষয়ে জনগণকে উসকে দেয়ার বিশাল ক্ষমতা রাখেন। বিশেষত, বিএনপির সর্বশেষ সরকার অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ছিল বলে তিনি জনগণকে বোঝাতে পেরেছিলেন। অথচ ওই সময়ে অনেকেই, বিশেষত আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিরা, চরম পর্যায়ের দুর্নীতিতে জড়িত ছিল। ৫ বছর ধরে, বাংলাদেশ ছিল আন্তর্জাতিক দুর্নীতির একেবারে নিম্ন পর্যায়ে।

এছাড়া মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ধর্মীয় হিংসা ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী ব্লগে প্রকাশিত আপত্তিকর লেখা তার পত্রিকায় পুনঃপ্রকাশ হয়েছে। সমালোচকরা বলেন, শান্তিপূর্ণ একটি গণ-আন্দোলনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে তিনি এমনটা করেছেন। ওই গণ-আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রায় পুরো নেতৃত্বের মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হয়েছে। গত মাসে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে কয়েক লাখ ইসলামপন্থির ‘লং মার্চ’ আয়োজনেও মাহমুদুর রহমান সাহস যুগিয়েছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ লং মার্চ থেকে নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসি দাবি করা হয়। অভিযোগ করা হয় তারা ইসলামের অবমাননা করেছে।

যে প্রধান অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হয় তার চার মাস পর মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাকে গ্রেপ্তারের আসল কারণ সম্ভবত অন্য কিছু।

তাকে আটক করার আগের দিন ‘আমার দেশ’ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের আমলের ঘটনাবলী সম্পর্কে মার্কিন দূতাবাসের কূটনৈতিক তারবার্তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে। ওই ঘোষণা দেয়া হয় তাদের ওয়েবসাইটে। বলা হয়, উইকিলিকস-এ প্রকাশিত গোপন বার্তা সিরিজ আকারে তারা বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করবেন। এর শিরোনাম হবে ‘মুজিব: দ্য নিউ মুঘল’। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একদলীয় শাসন চালুর জন্য ‘চেয়ারম্যান মুজিব’ একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ে নেন- সেদিকেই এ ইঙ্গিত।
উইকিলিকসের আরেকটি বার্তায় বলা হয়েছে, শেখ মুজিবের মাথায় একনায়ক হয়ে ওঠার ভূত চেপে বসেছিল। বাঙালিদের আকাঙক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়ে তিনি ব্যক্তিগত ও বংশগত শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে ক্ষমতা নিতে চেয়েছিলেন নিজের হাতে।

ওই তারবার্তার ভাষ্য ও মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তারের সময় দেখে মনে হয় সরকার মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে টিকিয়ে রাখতে। এমন চাপে বাংলাদেশের যে প্রতিষ্ঠান প্রথমেই ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে পারে তা অবশ্যই মিডিয়া।
সূত্র: মানবজমিন।