সাভার ট্র্যাজেডি ও সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ

শনিবার, ২৫/০৫/২০১৩ @ ১০:৪১ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ::

এ ছবি আর আমরা দেখতে চাই না

এ ছবি আর আমরা দেখতে চাই না

সাভার ট্র্যাজেডিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সংবাদকর্মীদের অতুলনীয় ও প্রশংসনীয় ভূমিকা। পাঠক, দর্শক, শ্রোতামাত্রই এত বিস্তারিতভাবে সাভার ট্র্যাজেডির সচিত্র খবর জেনেছেন যে তা অতুলনীয়। শুধু কি দেশের লোক? না, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী বিদেশি সবাই প্রতি মুহূর্তে আপডেট হয়েছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীদের এই ভূমিকার তুলনা নেই। তাঁদের প্রতি দর্শক, পাঠক, শ্রোতামাত্রই কৃতজ্ঞ। তাঁদের অপরিসীম শ্রম, আন্তরিকতা, পেশার প্রতি কমিটমেন্ট ইত্যাদি তাঁদেরকে অভিজ্ঞতার নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এত বড় একটি ট্র্যাজেডি কভার করতে গেলে কিছু ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক। অনেক সাংবাদিক বয়সে তরুণ। অভিজ্ঞতাও তাঁদের কম। অফিস থেকে যে তাঁদের যথাযথ নির্দেশনা দেবে, এমন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ সাংবাদিকের সংখ্যাও কম। ফলে অনেকে কোনো রকম গাইডলাইন ছাড়াই কভারেজে গেছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে কাজটাই জরুরি। ভুলটা বড় কিছু নয়। তবে ভুলকে স্বীকার করতে পারা ভালো। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াও জরুরি। দুর্ঘটনা বা বড় মাপের ট্র্যাজেডি আর কোনো দিন হবে না, এমন দাবি কেউ করতে পারবেন না। দুর্ঘটনা বলেকয়ে আসে না। কাজেই সাংবাদিক ও উদ্ধারকর্মীদের প্রতিদিনই প্রস্তুত থাকা দরকার।
আমাদের গণমাধ্যমের বড় দুর্ভাগ্য হলো: এই জগতের কার্যকর অভিভাবক নেই। অথচ অভিভাবক হওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন প্রেস ইনস্টিটিউট, প্রেস কাউন্সিল ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট (নিমকো)। সরকারি খরচে (জনগণের টাকায়) এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। কিন্তু বর্তমানে কোনো সাংবাদিক কি বলতে পারবেন, তাঁরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী উপকার পেয়েছেন? আমার ধারণা, উত্তর হবে ‘না’। তথ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ও উদাসীনতার ফলেই এই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হতে পারেনি। এগুলোর মধ্যে প্রেস ইনস্টিটিউট হয়েছে দূষিত রাজনীতির শিকার। দুই বড় দল তাদের আমলে এই ইনস্টিটিউটকে দলীয় লোকদের কর্মসংস্থানের গোডাউন করে তুলেছে। ফলে প্রেস ইনস্টিটিউট প্রকৃত প্রশিক্ষণ (সেমিনার নয়) ও গবেষণা বাদ দিয়ে দলীয় স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত রয়েছে। দেশের টিভি মিডিয়া বিকাশের পাশাপাশি ‘জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট’ যেভাবে সম্প্রসারিত ও উপযুক্ত হওয়া উচিত ছিল, তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতার কারণে তা হতে পারেনি। ফলে দেশের শত শত টিভি সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান, প্রযোজক, টেকনিক্যালকর্মী প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই (ফাউন্ডেশন কোর্স) বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে কাজ করার সুযোগ পেয়ে গেছেন। তাঁদের হাতে কিছু ভুলভ্রান্তি হওয়াই স্বাভাবিক। অন্তত ছয় মাসের ফাউন্ডেশন কোর্স করা ছাড়া কোনো ব্যক্তিরই টিভি মিডিয়ায় কাজের অনুমতি পাওয়া উচিত নয়। আরও দুঃখজনক যে বেসরকারি খাতেও একটি নির্ভরযোগ্য প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠেনি। অথচ এ দেশে পুরো গণমাধ্যম জগৎটিই বেসরকারি খাতে। একমাত্র ‘বিটিভি’ ও ‘বাংলাদেশ বেতার’ ছাড়া।
সাভার ট্র্যাজেডি কভার করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কী কী ভুল করেছেন, কী করা উচিত ছিল, তা নিয়ে পর্যালোচনার আয়োজন করবে কে? বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের ‘খবরের’ ফুটেজ দেখে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ইমেজ, মন্তব্য, ভাষ্য কে বা কারা চিহ্নিত করবে? প্রমাণহীন সমালোচনা করা খুব সহজ কাজ, যা রাজনীতিবিদেরা প্রায়শ করে থাকেন। কিন্তু তথ্য, প্রমাণ, উদ্ধৃতি ও ফুটেজ দেখিয়ে সমালোচনা করা কঠিন কাজ। আমরা আমাদের টিভি সাংবাদিকদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে চাইলে তাঁদের দুর্বল কাজের একটা ‘সংকলন সিডি’ আগে তৈরি করতে হবে। কোন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে, এটা বড় কথা নয়। ‘এটা প্রচারিত হয়েছে, এটাই সত্য। এ রকম প্রচার ভবিষ্যতে করা যাবে না। তার পরিবর্তে এ রকম প্রচার করতে হবে।’ প্রত্যেক টিভি সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান, সম্পাদককে এটা দেখাতে হবে, বোঝাতে হবে এবং ঠিক প্রয়োগটি কী, তা বলতে হবে।
প্রেস ইনস্টিটিউট বা নিমকো কি এ ধরনের পর্যালোচনা করার জন্য প্রস্তুত? আদৌ কি আগ্রহী? তথ্য মন্ত্রণালয় কি তাদের এ কাজ করার নির্দেশ দিতে সম্মত আছে? উত্তর হবে: না। তাহলে এই কাজটা কে করবে? এ ধরনের পর্যালোচনা করার জন্য দরকার বিশেষজ্ঞ জনশক্তি আমন্ত্রণ করা, সময় দেওয়া, বিদেশ থেকে পরামর্শক আনা, বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা, টিভি ও বেতারের এ-সংক্রান্ত ‘গাইডলাইন’ সংগ্রহ করা। তার ভিত্তিতে বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে ট্র্যাজেডি কভার করার ‘গাইডলাইন’ রচনা করা। এই গাইডলাইন (পকেট বুক সাইজ) প্রত্যেক সাংবাদিকের হাতের কাছে রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া, এ রকম অনেক কাজ।
সাধারণ, প্রতিদিনের সাংবাদিকতা করার জন্যও প্রত্যেক সংবাদপত্র, টিভি ও বেতারের একটা গাইডলাইন থাকা জরুরি। এই গাইডলাইন প্রতিষ্ঠানবিশেষে ভিন্নও হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার যে আন্তর্জাতিক ‘নীতিমালা’, তা ভিন্ন করার সুযোগ নেই। প্রত্যেক গণমাধ্যমকে তা মেনে চলতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের অনেক সংবাদপত্র ও টিভিতে সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। এসব গণমাধ্যমের মালিক বা সম্পাদকেরা টিভি টক শোতে সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমালোচনায় মুখর দেখা যায়। অথচ নিজের পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলে সাংবাদিকতার নীতিমালা মানা হয় না। কাজেই শুধু বড় মাপের ট্র্যাজেডি কভার করতে আমরা ভুল করেছি তা নয়, আমরা অনেকে সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালাও অনুসরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। প্রেস ইনস্টিটিউট বা নিমকো পারত গবেষণা ও আধেয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব অপসাংবাদিকতা তুলে ধরতে। অপসাংবাদিকতা, বিকৃত সাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা বা অজ্ঞানতা থেকে ভুল সাংবাদিকতা চিহ্নিত না করলে এবং এগুলোর শুদ্ধ রূপ না দিলে নবীন সাংবাদিকেরা শিখবেন কীভাবে?
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ সাভার ট্র্যাজেডির কভারেজ নিয়ে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করতে পারে। টিভির রিপোর্ট, ছবি, সংবাদপত্র, বেতারের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার সুযোগ রয়েছে। এসব আলোচনায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান ও সম্পাদকদেরও আমন্ত্রণ জানানো যায়। শোনা যেতে পারে তাঁদের অভিজ্ঞতা। সাংবাদিকতা বিভাগ ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সংগ্রহে সাভার ট্র্যাজেডির রিপোর্টের ও ছবির ক্লিপিং, টিভি রিপোর্টের সিডি রাখতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রশিক্ষণের জন্য ভালো হবে। এত বড় ট্র্যাজেডি কভারেজের দৃষ্টান্ত সহজে পাওয়া যাবে না। সাভার ট্র্যাজেডির কভারেজ থেকে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ছাত্রদের অনেক কিছু শেখার রয়েছে।
আমাদের সাংবাদিকতার আরেকটি দুর্বলতা হলো ফলোআপ না করা। সাংবাদিকেরা আজকের বিষয়টি হয়তো একদিন ভুলে যাবেন। সাংবাদিকতায় ফলোআপ, অর্থাৎ ছয় মাস পর কী হচ্ছে, তা তুলে ধরাও দরকার। সাভার ট্র্যাজেডি নিয়ে একটা বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রতিটি মিডিয়া নিতে পারে। যেমন তিন মাস পর ফলোআপ সিরিজ রিপোর্ট করা। যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবার ঠিকমতো টাকা পেয়েছেন কি না, কত টাকা পেয়েছেন, টাকা দিয়ে কী করা হয়েছে; যাঁরা আহত হয়ে চিকিৎসাধীন, তাঁদের কী অবস্থা, যাঁরা হাত বা পা হারিয়েছেন, তাঁদের কী অবস্থা, কতজন চাকরি পেয়েছেন, কোথায় পেয়েছেন, তিন মাসে কোন খাত থেকে কত টাকা সাহায্য পাওয়া গেছে, সেই ফান্ড কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির জন্য কারা কারা কী ধরনের শাস্তি পেয়েছে, বিচারের অগ্রগতি কত দূর, বিজিএমইএ কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, পূর্ত মন্ত্রণালয় কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, কী কী বাস্তবায়িত হয়েছে, বিদেশি ক্রেতারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন, কী বাস্তবায়িত হয়েছে—এ রকম অনেক বিষয়ে সিরিজ ফলোআপ স্টোরি হতে পারে তিন মাস পরে। আশা করি, বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকেরা এই ফলোআপ করবেন।
সাভার ট্র্যাজেডি আমাদের এক বিষণ্ন সাংবাদিকতা উপহার দিয়েছে। অনেক ছবি এত মর্মস্পর্শী যে দেখে চোখে পানি এসে যায়। অনেক রিপোর্ট, ফিচার পড়েও পাঠক অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। সাভারের নির্বাচিত ছবি ও রিপোর্ট নিয়ে একটি সংকলনও প্রকাশ করা যায়। নির্বাচিত ছবির একটি প্রদর্শনীও হতে পারে। সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ছাত্রদের জন্য এটা অমূল্য দলিল হয়ে থাকবে।
সাংবাদিকতা যে অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশা, তা সাভার ট্র্যাজেডির মাধ্যমে আরেকবার প্রমাণিত হলো। সাংবাদিকতা পেশায় অনেক চ্যালেঞ্জ, আনন্দ ও বিনোদন যেমন আছে, তেমনি আছে কঠিন পরিশ্রম ও ঝুঁকির আশঙ্কা। আমাদের তরুণ সাংবাদিকদের এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করার জন্য যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রয়োজন, তা আমরা তৈরি করতে পারিনি। সাভার ট্র্যাজেডি আমাদের এই অভাব বোধকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। এই অভাব দূর করবে কে?

লেখক: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।
সৌজন্যে- প্রথম আলো।