সংবাদপত্র: আমাদের অর্জন

শনিবার, ২৫/০৫/২০১৩ @ ১০:৩২ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ::

jahangirবাংলাদেশে ‘সংবাদপত্র’ এখন একটি গণতান্ত্রিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এটা এখন শুধু ‘কোটেশন’ নয়, এটাই বাস্তবতা। জাতীয় সংসদ যেমন গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভ, সংবাদপত্রও ঠিক তেমনি একটি স্তম্ভ। অথচ এই দুটি স্তম্ভের মধ্যে অনেক পার্থক্য। যেমন: জাতীয় সংসদ সরকার পরিচালিত ও সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। অপরদিকে ‘সংবাদপত্র’ সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি খাতের একটি উদ্যোগ। ব্যক্তি উদ্যোক্তা নিজে টাকা লগ্নি করে সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। সরকারি কোনো সহায়তা সংবাদপত্র পায় না। প্রকাশনা ব্যয় এবং কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মিটিয়ে তাকে লাভ করতে হয়। অপরদিকে জাতীয় সংসদকে কোনো ‘লাভ’ করতে হয় না। শুধু খরচ আর খরচ। সংবাদপত্র দেশের গণতন্ত্রচর্চা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করার জন্য এক বিরাট দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সংবাদপত্র প্রসঙ্গে ব্যক্তি উদ্যোক্তার এই ভূমিকা সব সময় স্মরণ করা হয় না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, সেকালে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল ও ‘ন্যাপের’ মতো প্রগতিশীল দল নানা গণ-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও সংবাদপত্রের ইতিবাচক ভূমিকা ছাড়া সেদিন সেই আন্দোলন গতি লাভ করত না। একদিকে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপরদিকে ইত্তেফাকে সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ক্ষুরধার কলাম ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ পূর্ব বাংলার সংগ্রামী জনতাকে অধিকারসচেতন করে তুলেছিল। পূর্ব বাংলার মানুষের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সংবাদপত্রের এ রকম যৌথ ভূমিকা এর আগে বা পরে আর দেখা যায়নি। সে এক ঐতিহাসিক সময় গেছে।
স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশের সংবাদপত্র এই গণমুখী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। নানা আইনি বাধা, সরকারি নীতি, সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন ইত্যাদি নানা কারণে ’৭২ থেকে ’৯০ পর্যন্ত এ দেশের সংবাদপত্র গণতন্ত্রের সপক্ষে খুব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তবে ১৯৯০-এ এরশাদবিরোধী সংগ্রামে সংবাদপত্র তাৎপর্যময় ভূমিকা পালন করেছিল। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ’৭২ থেকে ’৯০ সময়কালে সংবাদ, ইত্তেফাক, গণকণ্ঠ, দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সাপ্তাহিক একতা, হক কথা প্রভৃতি পত্রিকা গণমানুষের কথা বলার চেষ্টা করে গেছে। ইত্তেফাকে খোন্দকার আবদুল হামিদের কলাম, পূর্বদেশ ও জনপদে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলাম, সংবাদে জহুর হোসেন চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত ও বজলুর রহমানের কলাম, দৈনিক বাংলায় নির্মল সেনের কলাম, সেকালে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পাঠককে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত রাখার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের শাসনামলে সংবাদপত্র জগতে একটি বড় আঘাত আসে ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন। এ দিন ‘নিউজ পেপার ডিক্লারেশন এনালমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করা হয়। এর আওতায় দেশে চারটি ছাড়া সব দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়। এই চারটি দৈনিক হলো: ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজারভার, দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ টাইমস। যদিও বাতিলকৃত সংবাদপত্রের সাংবাদিক ও কর্মচারীদের নানা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়া হয়। যত দিন চাকরি হয়নি, তত দিন তাঁদের বেতন-ভাতাও সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়। তবু কয়েক শ সাংবাদিকের সাংবাদিকতা পেশা থেকে বিচ্যুত হওয়া একটি বহুল সমালোচিত ঘটনা।
১৯৭৫-১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস নানা বিয়োগান্ত ঘটনায় রক্তাক্ত। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক দল বিভ্রান্ত সৈনিকের হাতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে ধানমন্ডির বাসায় মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। দেশের বাইরে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খন্দকার মুশতাক অভ্যুত্থানকারীদের সহায়তায়, সমর্থনে সরকার গঠন করেন। কিন্তু তাঁর সরকার মাত্র কয়েক মাস স্থায়ী হয়। ৩ নভেম্বর এক দল সেনাসদস্য তাজউদ্দীন আহমদসহ শীর্ষস্থানীয় চারজন আওয়ামী লীগের নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করেন। এ ঘটনার কয়েক দিন পর ৭ নভেম্বর সাধারণ সৈনিকদের এক অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। এরপর জিয়াউর রহমানই ছিলেন রাজনীতি ও সরকারের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭৬ সালে সরকার আবার সব পত্রিকার প্রকাশনার অনুমতি দেয়। বাংলাদেশে আবার অবাধে সংবাদপত্র প্রকাশনা শুরু হয়।
জিয়াউর রহমানের আমলের একটা বড় সময় দেশে সামরিক শাসন বা আধাসামরিক শাসন বলবৎ ছিল। ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। তবে জিয়ার সরকার সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক কাজ করেছিল। তা হলো: সাংবাদিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ, সাংবাদিকতাবিষয়ক গবেষণা ও সংবাদপত্রের একটি আর্কাইভের জন্য ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে ‘বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা।
১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে নিহত হন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাসনভার গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আরেক দফা সামরিক শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়। শুরু হয় আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়।
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিলেন সেনাপ্রধান এরশাদ। তাঁর শাসনামলটি নানা দুর্নীতি, অপশাসন ও একনায়কতন্ত্রে কালিমালিপ্ত। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলতে তখন কিছু ছিল না। তবে এ সময় বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি দৈনিক, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে শফিক রেহমান সম্পাদিত যায়যায়দিন সাপ্তাহিকটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। যায়যায়দিন রাজনৈতিক সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক কলাম লেখার একটি নতুন ধারা প্রবর্তন করে, যা ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এরশাদ আমলে তীক্ষ্ন রাজনৈতিক সমালোচনার জন্য যায়যায়দিন দুবার নিষিদ্ধ হয় ও একবার সম্পাদককে দীর্ঘ দুই বছর বিদেশ থেকে দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে প্রথম ব্যক্তিমালিকানায় বার্তা সংস্থা ‘ইউএনবি’ আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮২ সালের ২৬ এপ্রিল প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে সরকার ‘প্রেস কমিশন’ গঠন করে। ১৯৮৮ সালে কমিশন তার কাজ শেষে সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন পেশ করে। কিন্তু এরশাদ সরকারসহ পরবর্তী কোনো সরকারই প্রেস কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
১৯৮৭ সাল থেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। কিন্তু তখন তা চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। ১৯৯০ সালের জুন মাস থেকে আবার সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হয়। ‘ডাকসু’সহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংস্থা ঐক্যবদ্ধভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হলে তা এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। এই আন্দোলনে বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা, পথচারী, রাজনৈতিক কর্মী শহীদ হন। ছাত্রনেতা জেহাদ, ডা. মিলন ও রাজনৈতিক কর্মী নূর হোসেনসহ অনেকে রাজপথে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। ছাত্রনেতা জেহাদ, শহীদ নূর হোসেন ও ডা. মিলনের মৃত্যু আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। খ্যাতনামা কবি শামসুর রাহমান নূর হোসেনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কবিতা রচনা করেন—‘বুক তার বাংলাদেশের হূদয়’। সেই কবিতা স্লোগানের মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের শেষের দিকে সাংবাদিক সমাজ ও সাংবাদপত্র এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ২৭ নভেম্বর রাতে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। সংবাদপত্রের ওপর জারি করা হয় সেন্সরশিপ। সেন্সরশিপের প্রতিবাদে সাংবাদিক ইউনিয়ন সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। সব সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। ফলে ২৮ নভেম্বর দেশে কোনো সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। সাংবাদিক ইউনিয়নের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন পত্রিকার সম্পাদক ও মালিকেরা। দেশে সংবাদপত্রের অনুপস্থিতিতে এক যোগাযোগহীন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বিবিসি বাংলা ও ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা অনুষ্ঠান ছিল সারা দেশে তথ্য জানার একমাত্র অবলম্বন। অনেকে মনে করেন, নব্বইয়ের ডিসেম্বরে জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে সাংবাদপত্র প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়ায় এরশাদের পতন ত্বরান্বিত হয়। সেদিন সাংবাদিক সমাজ এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
এরশাদের পতনের পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিচালনায় জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়।
এর আগে একটি বড় ঘটনা ঘটেছিল। নির্বাচনের আগেই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সাংবাদিক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্সের কয়েকটি নেতিবাচক ধারা বাতিল করে দেন। এর ফলে সংবাদপত্র বন্ধ করার ক্ষমতা, প্রি-সেন্সরশিপ আরোপের ক্ষমতা, সংবাদের সূত্র প্রকাশে বাধ্যবাধকতা আর থাকেনি। সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন পাওয়াও কিছুটা সহজ হয়ে যায়। এর মাধ্যমে সংবাদপত্র জগতের এক বিরাট সরকারি দেয়াল অপসারিত হয়ে যায়।
প্রায় একই সময়ে দেশে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে এক বিপ্লব ঘটে। ডেস্কটপ পাবলিকেশনসের (ডিটিপি) মাধ্যমে সংবাদপত্র কম্পোজ করা, ছবি প্রসেসিং, প্রাক-মুদ্রণপ্রযুক্তি অনেক সহজ ও সস্তা হয়ে যায়। এ ব্যাপারে বিজয় কি-বোর্ডের উদ্ভাবক মোস্তাফা জব্বার এককভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কম্পিউটার প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার ফলে দেশের সংবাদপত্র প্রকাশনার জোয়ার শুরু হয়ে যায়। একদিকে ’৯১ সালের শুরুতে গণতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, অপরদিকে কম্পিউটার প্রযুক্তির সহজপ্রাপ্যতায় এ দেশে দৈনিক ও সাপ্তাহিক সংবাদপত্র এবং নানা ধরনের সাময়িকী প্রকাশনায় এক নতুন উদ্যম ও উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। এ সময় ঢাকা থেকে প্রকাশিত কয়েকটি দৈনিকের প্রকাশনা খুবই উল্লেখযোগ্য। এগুলো হলো: দি ডেইলি স্টার (সম্পাদক: এস এম আলী), আজকের কাগজ (সম্পাদক: নাঈমুল ইসলাম খান), জনকণ্ঠ (উপদেষ্টা সম্পাদক: তোয়াব খান) ইত্যাদি। এ সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শতাধিক দৈনিক, অনেক সাপ্তাহিক ও বেশ কিছু সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়।
১৯৯৬—২০০১ সময়কালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা করে। ১৯৭৫-এর পরে ১৯৯৬ সালেই আবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সুযোগ পায়। এ সময়ে মতিউর রহমানের সম্পাদনায় দৈনিক প্রথম আলোর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর। ষাটের দশকে দৈনিক পাকিস্তান (১৯৬৪) একবার বাংলা সাংবাদিকতায় আধুনিকতা এনেছিল। লাইনো টাইপে ঝকঝকে কম্পোজ থেকে শুরু করে কথ্য বাংলায় স্মার্ট গদ্যে সাংবাদিকতার সূচনা করেছিল দৈনিক পাকিস্তান। প্রথম আলো সেই আধুনিক সাংবাদিকতার পতাকা এগিয়ে নিয়ে যায়। বৈচিত্র্যময় রিপোর্ট, ফিচার, কলাম, ফিচার পাতা, সাপ্তাহিক নানা ফ্রি ম্যাগাজিন, সংবাদপত্রের নান্দনিক মেকআপ—সব মিলিয়ে প্রথম আলো বাংলা পত্রিকার পাঠকদের মধ্যে এক নতুন প্রাণস্পন্দনের সৃষ্টি করে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রথম আলো বিপুলসংখ্যক পাঠকের মন জয় করতে সমর্থ হয়।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি প্রথম আলো নানা সামাজিক ইস্যু নিয়ে ব্যাপক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। মাদকবিরোধী, এসিড-সন্ত্রাসবিরোধী, যৌতুকবিরোধী নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা, গণিত অলিম্পিয়াড, ভাষা প্রতিযোগ প্রতিযোগিতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সুশাসন ও সমাজবিষয়ক নানা গোলটেবিল আলোচনা প্রথম আলোর সাংবাদিকতাকে একটা বিশেষ স্থানে নিয়ে যায়। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজের কল্যাণের লক্ষ্যে প্রথম আলোর অনন্য ভূমিকার জন্য ফিলিপাইনের ‘ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে’ সম্মানিত হন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম সাংবাদিক, যিনি সাংবাদিকতার জন্য ম্যাগসাইসাই পুরস্কার লাভ করেছেন।
বাংলাদেশের সংবাদপত্র ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। যদিও ঢাকায় দৈনিক পত্রিকার পাঠক তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তবু ঢাকার বাইরে থেকে কয়েকটি মানসম্পন্ন পত্রিকা দীর্ঘকাল যাবৎ প্রকাশিত হয়ে আসছে। এসব পত্রিকার গণমুখী, গণতন্ত্রমুখী ও ইতিবাচক ভূমিকা দেশে সংবাদপত্রশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে।
সাংবাদিকতার মানের দিক থেকে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী (সম্পাদক: এম এ মালেক) ও পূর্বকোণ (সম্পাদক: তসলিমউদ্দীন চৌধুরী) ঢাকার অনেক দৈনিকের চেয়েও উজ্জ্বল। বগুড়ার দৈনিক করতোয়াও (সম্পাদক: মোজাম্মেল হক) ব্যাপক পাঠক সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
চট্টগ্রামের জনপ্রিয় দৈনিক আজাদী এ বছর প্রকাশনার ৫০ বছর উদ্যাপন করছে। আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এই অর্জন সামান্য নয়।
’৯০-এর পর থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় গণমানুষের কণ্ঠস্বর জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া বেশির ভাগ পত্রিকা একটি স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করেছে। গণতন্ত্র, সংসদীয় গণতন্ত্র, সুশাসন, সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নে এ দেশের সংবাদপত্র সব সময় একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সংবাদপত্র শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতায় অভিযোগ করা যত সহজ, তথ্য-প্রমাণসহ সংবাদপত্রে লেখালেখি করা তত সহজ নয়। দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন লেখার মতো দক্ষ সাংবাদিকও দেশে কম। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বেশ কয়েকটি দৈনিক ও দুটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচুর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের এই ভূমিকা সমাজে দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণাকে বেগবান করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনকে জোরদার করেছে।
জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও আমাদের সংবাদপত্রের ভূমিকা প্রশংসনীয়। বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক ও দুটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লাগাতার লিখে যাচ্ছে। ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা নিয়ে প্রথম আলো একাই অন্তত ২৫টি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও ধর্মের নামে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাপ্তাহিক ২০০০ ও সাপ্তাহিক-এর ভূমিকা খুবই প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশে স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে দলীয় সাংবাদিকতা। আরও এক ধরনের সাংবাদিকতা রয়েছে। সেটা হলো কোনো ব্যাপারে শক্ত অবস্থান না নেওয়া। শুধু সব পক্ষের বক্তব্য বা মতামত তুলে ধরা। নিজের বক্তব্য জোরালোভাবে তুলে না ধরা। প্রথা রক্ষার জন্য একটি-দুটি সম্পাদকীয় রচনা ছাড়া আর কোনো শক্ত অবস্থান না নেওয়া অনেক সংবাদপত্রের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোনো বিশেষ দলের প্রতি (প্রকারান্তরে সরকারের প্রতিও) জোরালো সমর্থন দেওয়াও কোনো কোনো সংবাদপত্রের এক বড় দুর্বলতা। এসব পত্রিকা সাধারণ পাঠকের চেয়েও দলীয় সমর্থক বা কর্মীদের কাছে আদৃত হতে বেশি পছন্দ করে। এসব দলীয় পত্রিকাকে ঘিরে কিছু দলীয় কলামিস্ট সাংবাদিকতার অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁরা এ কথা বুঝতে রাজি নন যে সংবাদপত্র কোনো দলীয় প্ল্যাটফর্ম হতে পারে না। এ রকম একাধিক দৈনিক পত্রিকার অস্তিত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার একটি ধারা ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সব পক্ষই অসন্তুষ্ট থাকে। কারণ, এসব পত্রিকা সবারই সমালোচনা করে, সবারই ভুলত্রুটি তুলে ধরে। এসব পত্রিকাকে সরকার, বিরোধী দল বা কোনো অপশক্তি নানা সুবিধার বিনিময়েও পকেটে ভরতে পারে না। এটাই স্বাধীন সংবাদপত্রের বৈশিষ্ট্য।
সাম্প্রতিককালে সংবাদপত্র জগতে আরও একটি নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তা হলো: নানা দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও লুটপাটের মাধ্যমে অবৈধভাবে প্রচুর কালো টাকার মালিক হয়ে দৈনিক পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল খুলে বসা। যাদের কালো টাকার অভাব নেই, তারা ব্যবসার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ‘দখলের’ দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করছে। নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে দুই হাতে টাকা ছড়াচ্ছে সাংবাদিক পাওয়ার জন্য। অনৈতিকভাবে অন্য সংবাদপত্র থেকে দুই-তিন গুণ বেশি বেতন দিয়ে দক্ষ সাংবাদিকদের নিয়ে যাচ্ছে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানে কালো টাকার অভাব নেই। এই কালো টাকার দাপট সংবাদপত্রশিল্পে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করছে। এই পরিবেশ কত দিন স্থায়ী হবে, কে জানে। তবে সচেতন পাঠক দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী বা লুটেরাদের হাতে প্রকাশিত সংবাদপত্রের ‘সুবচন’ ও ‘আদর্শের বাণী’ মেনে নেবেন কি না, এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ রয়েছে।
সংবাদপত্র যদিও একটি বৃহৎ ব্যবসা, কিন্তু আর দশটা ব্যবসার মতো নয়। সংবাদপত্র একটি আদর্শভিত্তিক ব্যবসা। মালিক, সম্পাদক, লেখক ও পত্রিকার সব সাংবাদিকের একটা নৈতিক মানদণ্ড থাকতে হয়। আলু-পটোলের ব্যবসার মালিক কে, কেউ তার খোঁজ করে না। কিন্তু ‘নতুন সংবাদপত্র কে বের করেছেন’ বা ‘পত্রিকাটির সম্পাদক কে’ পাঠক তা অত্যন্ত আগ্রহভরে জানতে চান। এখানেই সংবাদপত্র অন্য ব্যবসা থেকে পৃথক! সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। এই স্তম্ভের ভার সবাই নিতে পারে না। অর্থবল থাকলেও নৈতিক শক্তি সবার থাকে না।
সংবাদপত্র জগতে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় হলো স্বাধীন সংবাদপত্র। যে পত্রিকা অন্যায়-অবিচারের কাছে মাথা নত করে না। একমাত্র পাঠকের কাছে তার প্রতিদিনের জবাবাদিহি। সত্য, কেবল সত্য প্রকাশই তার একমাত্র অঙ্গীকার।
আমাদের সৌভাগ্য, বাংলাদেশে যেমন গণতন্ত্র রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সব সংবাদপত্র সেই স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে না বা করতে পারে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে ব্যবহার করার জন্য দুটি শর্ত দরকার। এক. মালিকের অঙ্গীকার; দুই. সাংবাদিকের দক্ষতা। এই দুইয়ের একটি থাকলেও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
তবে স্বাধীনতা একতরফা নয়। যা খুশি তা লেখা স্বাধীনতা নয়। সেটা স্বাধীনতার অপব্যবহার। সংবাদপত্রের সব প্রতিবেদন বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। তথ্য-প্রমাণ থাকতে হবে। প্রতিবেদনে সব পক্ষের বক্তব্য থাকতে হবে। এগুলো ছাড়া কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা স্বাধীনতার অপব্যবহার বলে বিবেচিত হবে। সত্য প্রকাশ্যের ব্যাপারে সাংবাদপত্রকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। অসত্য বক্তব্য, অসত্য তথ্য প্রকাশ করা খুব অন্যায় কাজ। সত্য প্রকাশই পাঠকের কাছে সাংবাদপত্রের প্রধান অঙ্গীকার।
কিন্তু এই অঙ্গীকার প্রায়ই মানা হচ্ছে না। বহু সংবাদপত্রে প্রতিদিনই অসত্য, মনগড়া সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার নেই। কয়েকটি সংবাদপত্র অসত্য প্রকাশ করার ব্রত নিয়েই বাজারে এসেছে।
অসত্য প্রকাশের দায়ে অভিযুক্ত সংবাদপত্রগুলো সব সংবাদপত্র ও সমগ্র সাংবাদিক সমাজের ওপর কালিমা লেপন করে দিয়েছে। সংবাদপত্রের নানা অর্জনের পাশাপাশি এই কালিমার কথাও স্মরণ করতে হবে। এটা সাংবাদিক সমাজের ব্যর্থতা।
আমাদের পাঠক অনেক সচেতন। তাঁরা দলীয় সংবাদপত্র, কালো টাকার সংবাদপত্র ও স্বাধীন সংবাদপত্রের পার্থক্য বোঝেন। স্বাধীন সংবাদপত্রের কাছেই পাঠকের প্রধান প্রত্যাশা। পাঠক চান সংবাদপত্র হবে সমাজের দর্পণ। রাজনীতি ও সমাজে যা কিছু ঘটছে, পাঠক তার প্রতিচ্ছবি দেখতে চান সংবাদপত্রে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকে এই ভূখণ্ডে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকেরা গণমানুষের স্বার্থে কাজ করে এসেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংবাদপত্র পালন করেছে এক যুগান্তকারী ভূমিকা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনায় সংবাদপত্র ছিল এক বিরাট শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর থেকেও সাংবাদিকেরা প্রকাশ করেছেন নানা দৈনিক ও সাপ্তাহিক। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এবং বিজয়ের ঊষালগ্নে দেশের খ্যাতনামা কয়েকজন সাংবাদিক পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী আলবদরের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। লাখ লাখ সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে সাংবাদিকের রক্তও স্বাধীনতার বেদিতে উৎসর্গিত হয়েছে।
স্বাধীনতার পরে, বিশেষ করে ১৯৯০-এ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণতন্ত্রকে শক্ত ভিত্তি দেওয়ার লক্ষ্যে এ দেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিক সমাজ এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও নানা কারণে গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা হচ্ছে না। পরিবারতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, গোষ্ঠীপ্রীতি, সাম্প্রদায়িকতা, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অভাব, অকার্যকর জাতীয় সংসদ, সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের লাগাতার অনুপস্থিতি, স্থানীয় সরকারের অকার্যকারিতা, ব্যাপক দুর্নীতি, প্রশাসনে দলীয়করণ, দেশের প্রধান সমস্যাসমূহ সমাধানে বাস্তবভিত্তিক নীতির অভাব, সন্ত্রাস, ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী তাণ্ডব, প্রশাসনে দলীয় হস্তক্ষেপ, সর্বত্র সুশাসনের অভাব, কালো টাকার দাপট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ঢাকার যানজট ইত্যাদি নানা সমস্যায় দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিপর্যস্ত। এ রকম পরিস্থিতিতে স্বাধীন সংবাদপত্র দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি সমস্যার সমাধানে সরকারকে নানা পরামর্শ দেবে, এটাই প্রত্যাশিত। স্বাধীন সংবাদপত্র যদি তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করে, তাহলে সরকার সাময়িক বিভ্রান্ত হলেও একদিন তাদের পরামর্শ শুনবে। সরকারকে বুঝতে হবে, ‘আমার সমালোচক আমার বন্ধু’।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
সৌজন্যে- প্রথম আলো।