সেঁজুতি আর নাজিম উদ্দিনদের সংগ্রাম

শনিবার, মে ২৫, ২০১৩

ফজলুল বারী ::

kolomসুমি খানকে এখন হিংসা করি। সেঁজুতিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে দেশি মিডিয়ার অন্দরমহলের আড়ালে থাকা অনেক কিছু নিয়ে তিনি যে ঝাঁকুনির সৃষ্টি করেছেন, বোয়ালখালীর মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিক মুহম্মদ নাজিম উদ্দিন অথবা বাংলানিউজের আসাদ জামান, আদিত্য আরাফাতসহ আরও কিছু লেখায় এর প্রতিক্রিয়া এসেছে। মিডিয়ার অন্দরমহলের ভিতরের ক্ষোভ-কান্না সমগ্র যে আরও কত বিশাল-ভয়ংকর তা ওয়াকিবহাল যারা অন্ধ-বধির না, তারা তা ভালো জানেন। শেরপুরের শ্রীবর্দীর গ্রামের এক ইমামের চিঠিকে কেন্দ্র করে পত্রিকা অফিসে চলে আসা বিচলিত তিন দয়ালু পরিবারের টাকায় জনকণ্ঠের শেরপুর প্রতিনিধি মনিরুল ইসলামের সহযোগিতায় দরিদ্র গ্রামবাসীর মধ্যে কোরবানির আয়োজনের সত্যি একটি ঘটনাটি নিয়ে লিখেছিলাম।

ফেইসবুকে লেখাটির শেয়ার দিতেই দেশের আরেক বিশিষ্ট সাংবাদিক শংকর লাল দাশ যে মন্তব্য লিখেছেন, তাতেও চোখ ভিজে আসে। শংকর দা লিখেছেন, গ্রামীণ সংবাদকর্মীরা এভাবে মানুষের কথা তুলে ধরেন। কিন্তু তারা কোরবানি দিতে পারেন কী না, তা নিয়ে কিন্তু কিছু লেখা হয় না। কিন্তু কেন? এরপর মাঠ-পর্যায়ের সাংবাদিক নেতৃত্বের প্রয়াত এক পুরোধা ব্যক্তিত্বের চলতি পারিবারিক ট্র্যাজেডির করুণ একটি তথ্য দিয়েছেন শংকর লাল দাশ। বালানিউজের পাঠকদের সঙ্গে তা শেয়ার করতে ইচ্ছে করল।

প্রয়াত এই সাংবাদিক নেতা দেশের প্রাচীনতম একটি দৈনিকের সঙ্গে গ্রামীণ সংবাদকর্মী হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় চল্লিশ বছর। অল পাকিস্তান ন্যাপের (মোজাফফর) কেন্দ্রীয় কমিটির, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্য ছিল মণি সিং-এর। এমনই সেই সময়ের প্রধান সব রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগতভাবে জানাশোনার সম্পর্ক ছিল। বিশাল সেই মানুষটি মারা গেছেন প্রায় একযুগ আগে। ব্যক্তিগত জীবনে সততা-নিষ্ঠা নিয়ে চলতে চলতে চিহ্নিত নিঃস্ব অবস্থায় মারা যান। অতএব তার অশীতিপর বৃদ্ধা স্ত্রীর পেশা এখন ভিক্ষাবৃত্তি। টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মরতে বসেছেন তার বড় ছেলে। শংকর লাল দাশ লিখেছেন, অথচ এই মানুষটি চাইলেই কিন্তু অনেক কিছু করতে পারতেন। বিবেক বন্ধক দিতে যাননি। তাই অনৈতিক কিছু করেননি। পরিবারটির কাহিনি লিখেছিলেন শংকর লাল দাশ। কিন্তু তার পত্রিকা তা ছাপেনি। এই সুযোগে একটি কথা বলে নেই। মিডিয়ার অন্দরমহলের যে লেখাগুলো এখন বাংলানিউজ ছাপছে আর কোন মিডিয়া তা ছাপত কী? অথবা বাংলানিউজ প্রিন্ট মিডিয়া হলে ছাপত কী এসব কঠিন সত্য?

বাংলাদেশের মিডিয়া মোঘলদের যারা সারাদিন দেশের চিন্তায় ঘুমাতে পারেন না, গার্মেন্টসসহ নানা সেক্টরের শ্রম শোষণসহ নানা বঞ্চনার বিষয়াদি নিয়ে উচ্চকণ্ঠ, তাদের কাছে কী আমাদের প্রিয় একজন সাংবাদিক শংকর লাল দাশের প্রশ্নের কোনো জবাব আছে? তিনি গলাচিপায় বসে কাজ করেন, ঢাকায় আসলে ভদ্রতাবশত অনেককে সালাম দিয়ে চলেন বলে, এখনও অনেকের মান-ইজ্জত বহাল আছে। কিন্তু এসবের পলেস্তরা খসে পড়তে কতক্ষন?

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে নিজস্ব কিছু মূল্যায়ন আছে। জীবন থেকে নেওয়া অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন। অস্ট্রেলিয়া আসার আগে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়িনি অথবা পড়ার সুযোগ হয়নি অথবা পড়া লাগেনি। পেশায় খারাপ অবস্থায়ও ছিলাম না। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে গিয়ে মনে হলো এমন সহজ পত্রিকার দোকান খুলে বসা বা সাংবাদিকতা(!) করার সুযোগ দুনিয়ার আর কোথাও কী আছে? পত্রিকা তো সারা দুনিয়ায় একটা ইন্ডাস্ট্রি। এটি বের করতে বাজার চাহিদার পাশাপাশি যেখানে যা যা লাগে তা দিতে সামর্থবানরাই দুনিয়াতে পত্রিকা বের করে। কাগজ কিনতে যেমন টাকা লাগে, ছাপতে যেমন মেশিন লাগে, সাংবাদিককেই শুধু টাকা দেব না বা দিতে পারব না, এমন দুর্বৃত্ত লোকজনকে পত্রিকা বের করতে বা এর মাধ্যমে পেশাকে মানুষের কাছে ছোট-কালিমাযুক্ত করার দায়িত্ব নিতে তো কেউ কারও হাতেপায়ে ধরেনি!

আর সাংবাদিকতা বা সংশ্লিষ্ট পেশায় পড়াশুনা ছাড়া সে পেশায় কেউ কাজ করবেন, চাকরি পাবেন, এমনটি কল্পনায়ও অস্ট্রেলিয়ায় কেউ ভাবতে পারেন না। বাংলাদেশে মাশাল্লা চিকিৎসক-প্রকৌশলী-আইনজীবী এমন নির্দিষ্ট কিছু পেশা ছাড়া এসবের বালাই নেই। বিসিএস-এ পোস্ট বেশি থাকায় এমবিবিএস পাস পুলিশ অফিসার, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার ম্যাজিস্ট্রেটও অনেক আছেন! চিকিৎসক-প্রকৌশলী-আইনজীবীদের বড় অংশের আবার পেশার চাইতে রাজনীতিতে ঝোঁক-মন বেশি। আবার রাজনীতিকদের মতো সাংবাদিক-ব্যবসায়ী-আর্মি অফিসাররাও ভাবেন তারা সকল কাজের কাজী! দুনিয়াতে পারেন না এমন কিছু তাদের অভিধানে নেই!

কিন্তু বাস্তবে একজন মানুষ তো গোল আলুর মতো সব তরকারিতে ব্যবহার বা কাজে আসতে পারেন না। মানুষ হিসাবে আমাদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। বাইরে যত ভাব করে চলি না কেন এসব সীমাবদ্ধতার কথা আমরা নিজেরা জানি। কিন্তু মুখে স্বীকার করি না। মনে করা হয়, সীমাবদ্ধতা স্বীকার করলে বুঝি আমরা ছোট হয়ে যাব। চেয়ার থাকবে না। সে কারণে সীমাবদ্ধতা আড়াল করে রাখতে প্রয়োজনে আমরা মুখের ওপর মিথ্যা বলি বা লিখি। কিন্তু আমাদের পাঠক বা শ্রোতা যে আজকের যুগের মানুষ, তারা আবুল না বা আমাদের চেয়েও অনেক পড়াশুনা জানা মানুষ তা আমরা ঠিকমতো ভাবি না। বা সে যোগ্যতাও আমাদের নেই।

আমাদের রিপোর্ট পড়ে পড়ে একেকজন পাঠক ডেভলপ করেন। অনেক পত্রিকার রিপোর্ট পড়তে পড়তে আমাদের লেখার ফাঁকফোকরগুলো তারা চিহ্নিত করতে পারেন অনায়াসে। এরা যখন আমার কাছে আরও চান তখন হতাশ হন। কারণ তার পড়াশুনা বাড়লেও আমাদের ঘটিতো সীমিত। কবে কী পড়াশুনা করেছিলাম, তাইতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খাচ্ছি, নতুন কোন পড়াশুনা নেই। ইচ্ছে, সুযোগ অথবা সামর্থ্য নেই! অথবা পড়াশুনা লাগে না! দুনিয়াতে সবচেয়ে স্মার্ট, প্রম্পট, পড়াশুনা জানা রিপোর্টাররা নিউজ এজেন্সিতে কাজ করেন। ফ্রি-ল্যান্সার মানে আরও মর্যাদার। কিন্তু বাংলাদেশে তো ফ্রি ল্যান্সার মানে বেকার! পড়াশুনা জানা বা বেশি জানার বিপদও আছে। একবার ইলেকশনের আগে অফিসে রিপোর্টারদের জন্য কিছু ল্যাপটপ কম্পিউটার কেনার সিদ্ধান্ত হলো। বাধ সাধলেন চিফ রিপোর্টার! অসম্ভব, ল্যাপটপের জন্য রিপোর্টারের জীবন যাবে! রিপোর্টারকে জানে মেরে ল্যাপটপ নিয়ে যাবে ছিনতাইকারীরা! মালিকপক্ষ তো এমন কিছু লোকজন অফিসে চায়! অতএব সিদ্ধান্ত বাদ।

আসলে সেই চিফ রিপোর্টার কম্পিউটার ব্যবহার করা জানতেন না। তখন দেখেছি অফিসে যে যত সিনিয়র সে তত প্রযুক্তি বিমুখ! সেই চিফ রিপোর্টারের দৃষ্টান্তটি আনার কারণ অফিসে অফিসে এমন চরিত্রের কারণেও ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরের সাংবাদিকরা অনেক বঞ্চিত হচ্ছেন। আরেকটি কারণও আছে। আমাদের সংসারগুলোতে যেমন অনেকক্ষেত্রে মেয়েরা শাশুড়ি-ননদ জাতীয় নারী সদস্যদের হাতে নিগৃহিত হন বেশি, কারণ এই চরিত্রগুলোও ব্যক্তিজীবনে অনেক নিগ্রহের শিকার হয়েছে। অতএব আমার সমস্যা হয়েছে তো তোর কেন হবে না, এমন মনোভাব দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও নতুন নিগ্রহের ঘটনা বাড়ে। বাংলাদেশের মিডিয়ার মফঃস্বল ডেস্কের লোকজনের কারণেও অনেক নিগ্রহ- বঞ্চনার শিকার হন।

যেমন আমাদের মিডিয়া হাউসগুলোর বেশিরভাগ মফঃস্বল ডেস্ক সে অফিসেই হরিজন এলাকা চিহ্নিত! সেখানে যারা বসেন নানা কারণে তারা অফিসে উপেক্ষিত। নাইক্ষ্যাংছড়ি পোস্টিং-এর মতো অনেকে সেখানে বদলিকৃত। অতএব যিনি অফিসে নিজে হরিজন, যিনি নিজের চাকরি নিয়ে ইয়া নফসি ইয়া নফসি করেন, তিনি কাকে সেল্টার বা প্রটেকশন দেবেন? ঢাকায় আমি যে দৈনিকে প্রথম কাজ করি সেখানে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের মাসিক ঘোষিত বেতন ছিল ২০০ টাকা! সেই ২০০ টাকা বেতনের একটি অ্যাপয়েন্ট অথবা আইডি কার্ড বাগাতে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাজিয়ে ল্যাং মারার নোংরা প্রতিযোগিতার খবর তো মাঠ-পর্যায়ের সাংবাদিকরা নিজেই ঢের জানেন। অতএব তাদের দুর্গতির কারণ শুধু ঢাকার জানোয়ারগুলো না, তাদের আশেপাশের নিজেদের লোকজনও। ঢাকার জানোয়াররা এর সুযোগও নিচ্ছে।

ব্যক্তিগত পেশাজীবনে দু’ভাবে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়। প্রথমে পর্যটক জীবনে। সারাদেশ বাউন্ডেলে ঘুড়ে বেড়াবার সময় মফঃস্বলের অনেক প্রেসক্লাবে যাওয়া হয়েছে। এরপর পেশা জীবনে যেহেতু প্রায় সব জেলায় গিয়ে সরেজমিন রিপোর্টের সূত্রে অনেকের সঙ্গে ব্যক্তিগত-পারিবারিক বন্ধুত্ব হয়। বাংলাদেশে মাঠ-পর্যায়ে বিস্তর পড়াশুনা জানা-স্মার্ট সাংবাদিকদের নিজের চোখে দেখা হয়েছে। এরা ঢাকায় আসলে কিন্তু অনেকের চেয়ার থাকবে না। সে কারণে জেনেশুনেও তাদের অনেককে ঢাকায় স্থায়ীভাবে আসতে নিরুৎসাহ করা হয়। আবার ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে যেমন সাংবাদিক নামধারী দুর্বৃত্ত আছেন, তা মাঠ-পর্যায়েও আছেন।

সে কারণে অনেক মফঃস্বল শহরে প্রেসক্লাব সাইনবোর্ডের কোনো মর্যাদার ভাবমূর্তি নেই। উপজেলা পর্যায়ে একাধিক প্রেসক্লাবও আছে। কিন্তু স্থানীয় মানুষজন এসব প্রেসক্লাব, অনেকক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাইনবোর্ডকেও মর্যাদার সঙ্গে দেখা হয় না। অনেকের মধ্যেই ধারণা এসব জায়গায় এমন কিছু লোকজন বসেন, যাদের নিজস্ব স্থায়ী কোনো আয়-রোজগার নেই। আয়-রোজগার তারা ম্যানেজ করেন অথবা লোকজনকে জিম্মি করেন। কোনো কোনো এলাকায় এমনও প্রচার আছে যে থানার ওসি-টিএনও পাবলিকের কাছ থেকে ঘুষ খায় আর সাংবাদিক ওসি-টিএনওর কাছ থেকে ঘুষ খায়!

এসব ঘুষ-দুর্নীতি আবার পত্রিকা বা মিডিয়ার বাজার-কাটতি অথবা প্রভাবের ওপরও নির্ভর করে। আজকাল ডান্ডা তথা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রভাব বেশি। ঢাকায় বা প্রধান শহরগুলোতে বা মফঃস্বলে ডান্ডা দেখিয়ে টাকা আদায়ের অনেক প্রচার আছে। মিডিয়ার লোকজনের আবার আরেক বাস্তবতা, তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লোকজন ২-৫ হাজারের বেশি দেয়ওনা। বা মনে করে এগুলারে এই দিয়েই ম্যানেজ করা সম্ভব! কিন্তু সব সময় অভিযোগ ছড়ায় লাখ লাখ টাকার দুর্নীতির! এসব টাকাপয়সা অবশ্য যারা নেন টাকার জ্বালা অথবা ভাবমুর্তির সমস্যার কারণে তারা ভালো রিপোর্ট করতে পারেন না। যারা এসব থেকে মুক্ত, কষ্ট করে মানবেতর চলেন, তারা কিন্তু রিপোর্ট করতে পারেন ভালো। এলাকার মানুষজনও তাদের মর্যাদার চোখে দেখে।

ঢাকায় প্রধান মিডিয়াগুলোর অফিসে রিপোর্টারদের বিট ভাগ করা আছে। কিন্তু মফঃস্বলে তা নেই। জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ সবই একজনকে করতে হয়। একজন যেখানে টাকা পায় না, রিপোর্ট কীভাবে পাঠাবে সে ব্যবস্থা নেই, কিন্তু রিপোর্ট পাঠাতে দেরি হলে বা পাঠালে কিন্তু খবর আছে! ঢাকা বা প্রধান শহরগুলোর বেশিরভাগ মিডিয়া হাউসেরও একই অবস্থা। এরা সাংবাদিককে ওয়েজবোর্ডে বেতন দেয় না, যা দেয় তাও নিয়মিত দেয় না। এমন বছরের পর বছর ধরে চলছে। ‘গণতন্ত্রের শত ফুল ফুটিতে দাও’ স্লোগানের অপব্যবহার এমন চলছেই বেশুমার!

আসাদ জামান যার কথা লিখেছেন তাকে তো ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই চেনেন-জানেন। ঢাকার একটি দৈনিকে চাকরির সময় যখন তিনি তার সাপ্তাহিকটি বের করেন তখন সেটি কী করে কেন বেরুতো তাও ওয়াকিবহালরা জানেন। একদিন হঠাৎ শুনি তিনি একটি মিডিয়া হাউসের মালিক! যে কোনো হাউসের পণ্যের তো মার্কেট থাকতে হবে। এরপর তো তিনি এর স্টাফ-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেবেন! এসবকিছুর স্বচ্ছতার বালাই যেখানে নেই, কাঁঠাল গাছে তো আম আশা করে লাভ নেই। এরা আমাদের আদর্শ না, আবর্জনা। এসব আবর্জনার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতায় আদর্শের সঙ্গে ফারাক আমরা চিনতে পারি। আদিত্য আরাফাত যে ঘটনা লিখেছেন, এর ভুরিভুরি অভিজ্ঞতা সব মিডিয়া হাউসের লোকজনের আছে।

সবকিছুর সঙ্গে জড়িত অর্থনীতি! ঢাকার অফিসগুলোয় যারা অফিস সহকারীর কাজ করে তারাও জানে এসব মফঃস্বলের সাংবাদিক টাকা-পয়সা পায় না। ফাও খাটে। তাই এসব মাঠ-পরযায়ের সাংবাদিকরা যখন ঢাকার অফিসে আসেন, অনেক ক্ষেত্রে অফিসে ঢুকতে অথবা কারও সঙ্গে দেখা করতে এসব অফিস সহকারীর পাত্তা আদায়েই গলদঘর্ম হতে হয়। ঢাকার বাইরে রিপোর্ট করতে মফঃস্বলের রিপোর্টার বন্ধুদের সময় নিতাম অনেক। অবহেলা দুঃখকষ্টের জীবনে থেকেও তাদের আন্তরিক সহযোগিতার কোনো বিনিময় কী কোনদিন দিতে পেরেছি? উল্টো অনেক বাজে অভিজ্ঞতাও হয়েছে।

অনেকক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের রিপোর্টাররা ঢাকায় এলে নিজের ডেস্কের পাশে চেয়ার টেনে বসিয়ে এক কাপ চা খাওয়ানোর অপরাধেও তাদের অনেকের সমস্যা হয়েছে। কারণ মফঃস্বল ডেস্কের লোকজন এসব বাড়তি মাখামাখি হিসাবে দেখে ভালোভাবে নেয়নি। ও আবার নিজের গ্রিপের বাইরে চলে যাচ্ছে কি না ভেবে উল্টো এদের সাইজ দিয়েছে! এমন নানা আচানক সমস্যায় জড়িত আমাদের মিডিয়া হাউসসমূহ–মফঃস্বল সাংবাদিকতা। তাই প্রিয় নাজিম উদ্দিনদের বলি, এসব উৎকট সমস্যা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ তাদের ঐক্য। যা দিয়ে অনেক ভয়কে জয় করা যায়। এ পরিস্থিতি যেমন একদিনে তৈরি হয়নি তেমন এমন চলবে না দীর্ঘদিন । প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে অনেক পত্রিকা এখন জেলা শহরগুলোতে নিজস্ব অফিস, স্টাফ-সেটআপ গড়ে তুলেছে। সামনে এমন দিন আসবে এমন টাল্টিবাল্টি করে মিডিয়া নামের হাউস চালানো আর যাবে না। শ্রম নেবেন দাম দিবেন। দিতে হবে। মাঠ-পর্যায়ের সংগ্রামী সাংবাদিকদের সংগ্রামকে লাল সেলাম। আবারও বলি ঐক্য দিয়ে আদায় করতে হবে শ্রমের মূল্য আর মর্যাদা। সঙ্গে পড়াশুনা মাস্ট। প্রযুক্তির চর্চা-ব্যবহারও বাড়াতে হবে। ঠকানেওয়ালারা পরাস্ত হবে দিনে দিনে। সামনে সেই দিন। আমাকে সাথে নেবেন আপনাদের। সাথে থাকতে দেবেন। প্লিজ।

লেখক: সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক।
( লেখাটি ২ নবেম্বর ২০১১ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম এ প্রকাশ হয়েছিল।)