মফস্বল সাংবাদিকতা: ক্ষুধার অনলে পুড়ছে নীতি-নৈতিকতা

শনিবার, মে ২৫, ২০১৩

মুহম্মদ নাজিম উদ্দিন ::

kolom02নিশীথ রাত, আর দু-এক ঘণ্টা পরে ফুটবে ভোরের আলো। সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। গ্রামাঞ্চলে নেমে এসেছে শীতের আবহ। ঘরের টিনে কুয়াশার টুপ টাপ শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের হাঁক-ডাক। আর মাঝে মধ্যে আমার সাত মাস বয়সী আদুরে মেয়েটি জেগে ওঠে। নজর কেড়ে নেয় সে। একাগ্রতা ভেঙে যায়।

রাত জেগে পড়া ও লিখা পুরোনো অভ্যাস। অনেক গালমন্দ শুনছি তবুও নিশাচরের অভ্যাস বদলাতে পারিনি। আগে সঙ্গী ছিল বই, খাতা আর কলম। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে ল্যাপটপ। তবে এখনও বইয়ের প্রতি টান বেশি। কত রাত যে নির্ঘুমে কেটেছে তার ইয়ত্তা নেই।

ঈদের পর থেকে লেখালেখিতে ভাটা পড়েছে। বিভিন্ন জেলার কয়েক জন বন্ধু (বাংলানিউজের সূত্র ধরে) ফেইসবুক ও মুঠোফোনে বার বার জানতে চেয়েছেন, পরবর্তী লেখা কখন আসছে। মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে কয়েকটি লেখা ছাপা হয় বাংলানিউজে। অবহেলিত-নিগৃহীত গ্রামীণ সাংবাদিকতার সুখ-দুঃখের কথা উঠে এসেছে এসব লেখায়। লেখাগুলো নিয়ে অনেকের ভালবাসা-উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা পেয়েছি। অনেক বিদগ্ধ সাংবাদিক নানা পরামর্শ দিয়েছেন। আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ।

কিশোরগঞ্জ জেলার সুলতান মাহমুদ কৃতজ্ঞতা স্বীকারের সূত্রটা যেন তুলে দিয়েছেন। তিনি বললেন, বাংলানিউজের এডিটর-ইন-চিফ আলমগীর হোসেন ভাইয়ের সাথে আমার কথা হয় কিনা। বললাম, প্রথম লেখা নিয়ে তিনি ফোন করেছেন। আর কথা হয়নি। সুলতান ভাই বললেন, আলমগীর ভাই মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য অবারিত সুযোগ খুলে দিয়েছেন, তিনি তো অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। তিনি মফস্বল সাংবাদিকতার অবহেলা-বঞ্চনার সাতকাহন ছাপিয়েছেন। কোনো পত্র-পত্রিকা ছাপায়নি। আদৌ ছাপাবে বলে মনে হয় না। ছাপাবেও না। সুলতান ভাই ঘুম ভাঙালেন। তবে আলমগীর ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করার মতো বেয়াদবি করতে পারব না। মফস্বল সাংবাদিকদের পক্ষে সমস্বরে বলব, ‘আমরা আলমগীর ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

কয়েক দিন ধরে অবশ্য লেখার মনস্থির করলেও বসা সম্ভব হচ্ছে না। চোখ উঠেছে। শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক দুচিন্তায় অস্থির সময় কাটছে এখন। যেন বিষিয়ে উঠেছে চারপাশ। মনপাখি বার বার বলছে, নাজিম এতদিন (প্রায় ১০ বছর) সাংবাদিকতা করলে …! সত্যিই তো কি করলাম। বন্ধু-বান্ধব কোথায় আর আমি কোথায়। তবে কিছুই পাইনি বললে ভুল হবে। অকৃতজ্ঞের সামিল হবে। পেয়েছি অনেক কিছু। জনগণের ভালবাসা আর সম্মান। ব্যর্থ হয়েছি পুলিশ ও প্রশাসন-প্রেমিক সাংবাদিক হতে, তাদের পদলেহন করতে। আল্লাহর অমূল্য দান-দুই চোখে যা দেখেছি, যা সত্য তা লিখে চলেছি। পাছে লোকের কথা মাথায় থাকে না।

আমার কর্মক্ষেত্র চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কথাই বলি, অনেক সাংবাদিক গাড়ি হাঁকাচ্ছে। শহরে (যেখানে একখন্ড জায়গা সোনার হরিণ) জায়গা কিনেছে। দালান করেছে। আর এ প্রজন্মের তরুণেরা লেখাপড়া শিখে সাংবাদিকতার মহান পেশায় এসেছে। তারা এসবের কিছু করা তো স্বপ্নের কথা। অনেক তরুণ সাংবাদিক আজও সৎ, সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সুসাংবাদিকতা করছেন। তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উপজেলার গণ্ডি থেকে সাংবাদিকতার বৃহৎ ক্ষেত্র। আরেকটি বর্ণিল জগৎ।

যারা বাড়ি, গাড়ি আর দালানের মালিক হয়েছেন, তাদের সারাদিন-সারা বছর দেখেছি, পুলিশ আর প্রশাসনের তোয়াজগিরি করতে। জনগণের বিপদাপদ ও মামলা-মোকদ্দমায় পক্ষপাতিত্ব বা পুলিশের সাথে খাতিরের সুযোগে দু’এক পয়সা হাতিয়ে নিতে। সরকারি টিআর-কাবিকা, কাবিটার প্রকল্প নিয়ে উদরপূর্তি করতে। সংবাদের নামে অর্থ হাতিয়ে নিতে। জনগুরুত্ব ও নির্যাতিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের সংবাদ অর্থের বিনিময়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে। অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, দখলদারিত্ব আর টেন্ডারবাজির সংবাদ না করার বিনিময়ে পারিতোষিক নিতে। তারা পুলিশ আর প্রশাসনের সংবাদ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ব্যস্ত থাকেন প্রেসরিলিজ নিয়ে। ঘুর ঘুর করেন নেতা-পাতি নেতাদের পেছন পেছন।

দেশের সবকটি উপজেলা-থানায় একাধিক প্রেসক্লাব দেখা যায়। জানি না, বুঝি না। কারণ সাংবাদিকতা জীবনে কখনো প্রেসক্লাবের দায়িত্বে আসার সুযোগ হয়নি। তবে একাংশের সাথে রয়েছি। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে মনে হয়, সৎ, নিষ্ঠা, সুসাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা-এ নিয়ে শুরু মূল দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব থাকা ভালো। প্রতিযোগিতা বাড়ে। কোন সংবাদ কাকে ফেলে কে আগে করবে-তার দৌঁড় থাকবে। নিজেদের হাত পাকা হবে। জনগণ, দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়বে। তা যেন সুদূরপরাহত। উপেক্ষিত হচ্ছে সুসাংবাদিকতা। আমাদের বিবেক দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। উপরন্তু চলছে ল্যাং মারার অসুস্থ-হীন মানসিক প্রতিযোগিতা।

সৎ ও সত্য সংবাদ লিখলে যেন সুবিধাবাদী সাংবাদিকদের আঁতে ঘা লাগে। পুলিশ-প্রশাসন বা অন্যায়, দুর্নীতি, দখলবাজি, অনিয়ম, অসঙ্গতির সংবাদ লিখলে তো কথাই নেই। সত্য লিখলে প্রশাসনপ্রেমিক সাংবাদিকদের সম্মানে আঘাত হানে। ইরাজার অর্থ যেন বেহাত হয়ে যাওয়ার ভয়ে তটস্থ থাকে। সৎ ও সততার সাথে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অসৎ সাংবাদিকদের ল্যাং খাওয়ার ভয়ও তাড়া করে। কারণ সংবাদের চেয়ে অর্থের মোহে নিমজ্জিত থাকেন অসৎ সাংবাদিকরা। তাদের হাতে প্রচুর সময়। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানার মতো কাজকর্ম তাদের।

একটা সত্য সংবাদের উদারহণ টানছি। বোয়ালখালী থানাপুলিশ মাস দেড়েক আগে এক হাজার ৩০০ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করেছে। আটক আছে এক মাদক ব্যবসায়ী। পুলিশপ্রেমিক সাংবাদিকদের সে কী ব্যস্ততা। পুলিশ সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে আগ বাড়িয়ে তথ্য দিল, ছবি তুলল। সাংবাদিকেরা নেমে গেল সংবাদ লিখন ও পরিবেশনায়। কিন্তু সন্ধ্যার আঁধারে এক হাজার ৩০০ লিটার মাদক হয়ে গেল মাত্র ৪৫০ লিটার। তাও আবার পরিত্যক্ত। আর ওই মাদক ব্যবসায়ী হয়ে গেল সাধারণ মাদকসেবীতে। তার কাছ থেকে মাত্র ২লিটার চোলাই মদ উদ্ধার দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ৩ মাসের কারাদণ্ড দিল। কী কেরামতি পুলিশের-প্রশাসনের। সাংবাদিকদের একজন সন্তর্পণে এই তথ্য পান। তা যাচাই-বাছাই করে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। তাতে প‍ুলিশ, প্রশাসনের চেয়ে পুলিশপ্রেমিক সাংবাদিকদের যেন গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াল। তাদের স্যারেরা যেন গোস্বা হয়ে গেল। তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এই সংবাদের পর প্রশাসন নানা সভায় সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ লিখার পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। প্রশাসনপ্রেমিক গুণধর সাংবাদিকেরা তা ভালোই হজম করে চলেছে। অবশ্য তারা লিখেছিল, পুলিশের মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান।

শুধু কী মফস্বল সাংবাদিকতায় তা দেখা যায়। নগরেও ভুয়া সাংবাদিক ভুড়ি ভুড়ি। আমার অগ্রজপ্রতীম সহকর্মী টিপু সুলতানের ভাষায়, ভুয়া হলেও সাংবাদিক গন্ধ আছে, জাতভাই। এদের কি ব্যস্ততা, দম ফেলার ফুসরত নেই। পুলিশ প্রশাসনও তাদের তোয়াজ করে। সাথে নিয়ে চলে ম্যারাথন আড্ডা। চলে নানা পদের নাস্তাসমেত চা-কিফি।

কথায় বলে, কাক কখনো ময়ূর হয় না। যতই লিখি না কেন অভ্যেস বদলানো কঠিন। প্রযুক্তি এসে সব বদলে দিয়েছে। গ্রামে-গঞ্জেও এখন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। এ প্রযুক্তির বদৌলতে অসৎ সাংবাদিকেরা তা পড়ে শুধু মন ভরে গালাগালি আর বদনাম ছাড়া কিছুই করবে না। চরিত্র বদলাবে না। মরিচীকায় ক্ষয়ে ফেলেছে।

নানা হতাশার মাঝেও গ্রামাঞ্চলে আশার আলো দেখাচ্ছে একঝাঁক শিক্ষিত-উদ্যমী তরুণ সংবাদকর্মী। তারা নানা হতাশার মধ্যেও সমাজ ও জাতির কল্যাণে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। দুর্বিষহ জীবনযাপন করে সত্যানুসন্ধানে কাজ করে চলেছেন। কারণ তারা সৎ ও সততার বাইরে আয়-রোজগার করতে জানেন না। সূত্র জানে না অপসাংবাদিকতা করে কিভাবে রোজগার করে খেতে হয়।

আমাদের পত্রিকাওয়ালারা কী অলিখিতভাবে প্রতিনিধি-সংবাদদাতার অনুমতি দিয়ে অপসাংবাদিকতার লাইসেন্স দিয়েছে তাদের? কোনো কাজ নেই, লেখালেখি নেই, অন্যের লেখা ধার করে চলে। নিধিরাম সর্দার (ব্যস্ত সাংবাদিক) সাংবাদিকদের ই-বা দোষ কী। সংবাদ সংগ্রহ ও পাঠানোর যে খরচ পড়ে, তা তো পত্রিকাওয়ালারা দেন না। কিছু কিছু পত্রিকা সম্মানীর নামে অসম্মানী ভাতা দিলেও তা একেবারে যৎসামান্য। তা দিয়ে সংসার চলার ভাবনা কল্পনাতীত। সম্মানী ভাতা পাওয়া সাংবাদিকদেরও অপসাংবাদিকতা করতে দেখে লজ্জায় মুখ ঢেকে যায়।

অবশ্য অসৎ সাংবাদিকদের ওপর দোষ চাপানো যায় না। সমাজের নানা অবস্থান থেকে তারা এ মহান পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। জড়িয়ে পড়েছে টাউটশ্রেণীর লোকজনও। গ্রামের অধিকাংশ লোকই অশিক্ষিত। তারা সাংবাদিক-অসাংবাদিক তফাৎ কম খুঁজে পান। এজন্য দায়ী অবশ্য সংবাদপত্র নিয়ে দেখভালোর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিরা। সরকার বাহাদুরের তথ্য মন্ত্রণালয় ও প্রেস ইনস্টিটিউটের। দেশে কত পত্রিকা রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কালভদ্রে বের হয়। মফস্বল এলাকায় এরকম পত্রিকার প্রতিনিধিদের বেশ দাপট। ব্যস্ত সাংবাদিক। তাদের কত নামডাক। কোন ঘটন-অঘটনে তাদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। আর নির্বাচন, সভা-সমাবেশ হলে তো কথাই নেই। তাদের ধারেকাছে যায় কে।

এর শেষ কোথায় জানি না। সাংবাদিকতার হৃতগৌরব কখন ফিরে আসবে তাও জানি না। নগর সাংবাদিকদের মতো কখন উন্নতমানের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে গ্রামীণ সাংবাদিকেরা-এই প্রশ্ন এখন সবার কাছে। যুগ বদলেছে। দিন দিন বেড়েই চলেছে দ্রব্যমূল্য ও শ্রমবাজার। শুধু বাড়ছে না মফস্বল সাংবাদিকদের শ্রম আর ঘামের মূল্য। দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কী আছে। হায়রে নিয়তি, হায়রে ভাগ্যদেবী, কোন গগনে আছ তুমি। এই ধরাধামে কি তোমার আসা হবে না।

লেখক: সংবাদকর্মী, চট্টগ্রাম।
e-mail: [email protected]
( লেখাটি ২৩ নবেম্বর ২০১১ সালে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম এ প্রকাশিত হয়েছিল। )