‘কৈফিয়ত’ নয়

শুক্রবার, মে ২৪, ২০১৩

গোলাম সারওয়ার ::

golam sarwar১৫ সম্পাদকের বিবৃতি সম্ভবত কিঞ্চিৎ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। বেশ কিছু সংগঠন ও বিশিষ্টজন বিবৃতি দিয়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য প্রকাশ করে এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। কারও ভাষা নমনীয়, কারও বেশ শানিত। মাহমুদুর রহমান ও তার আমার দেশ প্রসঙ্গে সুশীল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট : এ পত্রিকাটি ও তার সম্পাদক সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নামে দিনের পর দিন স্বেচ্ছাচার করেছেন।

তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অনিবার্য ছিল। ‘আপাতত’ বন্ধ করে দেওয়া টিভি চ্যানেল দুটি হেফাজতের তাণ্ডবের দিনে সংঘাত-সংঘর্ষ ছড়িয়ে দিতে উস্কানিমূলক প্রচারণা চালিয়েছে_ এতেও সন্দেহ নেই। রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে ১৫ সম্পাদকের বিবৃতির ব্যাপারে ক্ষোভের কথা জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, সম্পাদকরা সম্ভবত ‘না জেনেই’ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মাহমুদুর রহমানের ব্যাপারে ‘ওকালতি’ না করার সুপরামর্শও দিয়েছেন। ছাপোষা ১৫ সম্পাদক তথ্যমন্ত্রীর এই হিতোপদেশ গুরুত্বের সঙ্গেই গ্রহণ করেছেন। গত বুধবার সহযোগী ডেইলি স্টার ‘না বুঝেই’ একটি সম্পাদকীয় লিখে ফেলেছে। সম্পাদকীয়টির শিরোনাম : রাইজিং ইনটলারেন্স :ইনফরমেশন মিনিস্টার্স লিটারাল ওয়ার্নিং। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, দেশের অধিকাংশ শীর্ষ দৈনিকের সম্পাদক ‘তথ্য’ না জেনেই যৌথভাবে একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন। আসল তথ্য
সম্ভবত শুধু মন্ত্রীই জানেন। আমার অনেক শুভার্থী মনে করেন, বিবৃতিতে আমার স্বাক্ষর না করাই শ্রেয় ছিল।

বারবার নিজের কথা বলা যে শোভনীয় নয়, তা জেনেও সবিনয়ে বলতে চাই, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার ও ব্যক্তি গোলাম সারওয়ারের মধ্যে একটি বিভাজন রেখা রয়েছে। উদার গণতান্ত্রিক মতাদর্শ সমকালের সম্পাদকীয় নীতির মূল স্তম্ভ। প্রকাশক, সম্পাদকসহ পুরো সমকাল পরিবার এ নীতি অনুসরণে দায়বদ্ধ। ব্যক্তি গোলাম সারওয়ারের দায়বদ্ধতার পরিধি একটু বিস্তৃত। এই দায়বদ্ধতা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অবিচল অনুসারী হিসেবে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হিসেবে। বিবৃতিটিতে স্বাক্ষর করেছে সমকাল সম্পাদক_ এখানে তার ব্যক্তি-পরিচয় নিতান্তই গৌণ।

সম্প্রতি গভীর রাতে টক শোতে অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়েছি। ‘না’ ‘না’ করেও কস্ফচিৎ-কদাচিৎ দু’একটি চ্যানেলে যেতে হয়। সেদিন ‘সময়’-এর ডাকে সাড়া দিলাম এ জন্য যে, সম্পাদকদের বিবৃতি নিয়ে সমালোচনা প্রসঙ্গে দু-চারটি কথা বলা প্রয়োজন। সময়ের ‘সম্পাদকীয়’ অনুষ্ঠানে প্রবীণ রাজনীতিক ও আমার প্রিয় মানুষ রাশেদ খান মেনন এবং ‘নিউজ টুডে’ সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদও ছিলেন। মেনন ভাই এ প্রসঙ্গে তেমন মন্তব্য করেননি। আমরা দুই সম্পাদক প্রায় অভিন্ন ভাষায় একটি কথাই বলার চেষ্টা করেছি_ ১৫ সম্পাদকের অবস্থান সম্পূর্ণ পেশাগত। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে চিরদিনই আমরা পেশাদারিত্বের ওপর জোর দিয়েছি।

বাংলাদেশের সাংবাদিকরা এ জন্য গর্ব করে আসছেন। সম্পাদকরা মনে করেছেন, আমার দেশ প্রকাশে বিঘ্ন সৃষ্টি ও তার সম্পাদককে গ্রেফতার এবং দুটি টিভি চ্যানেল সাময়িকভাবে বন্ধ করতে যে প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে, তা বিধিসম্মত হয়নি। আমাদের আপত্তির মূল জায়গাটি এখানেই। গণমাধ্যমে প্রাণ খুলে যা খুশি বলার, হাত খুলে যা খুশি লেখার অধিকার নিশ্চিত করেছে বর্তমান সরকার। রাতের টক শো, সকালের সংবাদপত্রই তার প্রমাণ। তাই কোনো মিডিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়মের আশ্রয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ সরকারের সহিষ্ণুতা কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিস্ময়কর ঘটনা ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র আবির্ভাব। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে যে নতুন জীবন ও যৌবনের দূতরা গর্জে উঠেছিলেন, তাদের প্রতি প্রথম দিন থেকেই সমকাল ও সমকাল সম্পাদকের অখণ্ড ও অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে সমকালের প্রথম পাতায় ব্যানার শিরোনাম ছিল_ ‘এ রায় মানি না’। তরুণরা এক সন্ধ্যায় শাহবাগ চত্বর লাখো মোমের আলোয় উদ্ভাসিত করে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি তুলেছিলেন। পরদিন সমকালের প্রথম পাতায় মোমের আলোর সেই ছবি ছিল পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে। ক্যাপশন ছিল : আলোর পথযাত্রী। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংবাদপত্র এভাবে একটি আন্দোলনের প্রতি এ রকম অখণ্ড সমর্থন ব্যক্ত করেছে বলে আমার জানা নেই। সমকাল দীর্ঘদিন যাবৎ ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নিয়ে চার পৃষ্ঠার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডবের বিস্তারিত সংবাদ, বিশেষ করে গভীর রাতে শাপলা চত্বর দুর্বৃত্তমুক্ত করতে বিশেষ অভিযানের বিশদ বিবরণ ও ছবি একমাত্র সমকালই ছেপেছে। সমকাল কর্মীরা এ জন্য অম্লান বদনে বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন।

আমি অতীতের ন্যায় এখনও মনে করি, ‘আমার দেশ’ সাংবাদিকতার নীতিমালা পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে দিনের পর দিন সাংবাদিকতার নামে অসাংবাদিকতার নিন্দনীয় পথ অনুসরণ করেছে। মিথ্যা প্রচারে দেশজুড়ে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে। মাহমুদুর রহমান তার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় নিজের ছবিসহ যে লেখা প্রতিদিনই লিখেছেন, তাতেও সাংবাদিকতার নীতিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছে। সত্যের অপলাপ করা হয়েছে। কখনও তিনি নোংরা ভাষাও ব্যবহার করেছেন। তিনি আমার বিরুদ্ধেও খারাপ ভাষায় তার পত্রিকায় বিষোদ্গার করেছেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মানে যথেচ্ছাচার, অপপ্রচার, মিথ্যা প্রচার নয়। এর সঙ্গে দায়িত্বশীলতাও যুক্ত। ‘হঠাৎ সম্পাদক’ মাহমুদুর রহমানের সাংবাদিকতার নীতিমালা, স্বাধীনতা, দায়বদ্ধতার বিষয় জানার প্রয়োজন নেই। বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তার সম্পাদক হিসেবে আবির্ভাব। আমার দেশের ‘ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক’ হিসেবে তিনি তার ওপর অর্পিত মিশনই পালন করেছেন। উলি্লখিত নানা কারণে আমার দেশের ডিক্লারেশন বাতিল করা যেত। বিদ্যমান আইনে সম্পাদক, প্রকাশকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। প্রতিকারের জন্য প্রেস কাউন্সিলে যাওয়া যায়। এর কিছুই করা হয়নি। আমাদের আপত্তি সেখানেই। দুটি চ্যানেলের ব্যাপারে একই বক্তব্য। তারাও সাংবাদিকতার নীতিমালা বিসর্জন দিয়ে দিন-রাত উস্কানিমূলক প্রচারণা চালিয়েছে। ৫ মে সরকারের এক শীর্ষ নেতাকে বলেছিলাম, দুটি চ্যানেলে অপপ্রচার চলছে। টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স নেওয়ার সময় যে শর্ত তারা মেনে নিয়েছেন, তা তারা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করছেন। ওদের সতর্ক করে দেওয়া উচিত। শেষ রাতে এ দুটি চ্যানেল যেভাবে বন্ধ করা হলো, তাও বিধিসম্মত হয়নি।

কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য এ লেখা নয়। ১৫ সম্পাদকের বিবৃতির প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্নটিই উত্থাপন করছি। আমাদের বিবৃতির প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রকৃতি, এর সীমারেখা এবং এর সঙ্গে দায়িত্ববোধের জরুরি প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে আমাদের একটি প্রেস কাউন্সিল আছে। সংবাদ কিংবা মন্তব্য নিয়ে সংক্ষুব্ধ যে কেউ সেখানে যেতে পারেন। কাউন্সিল বড়জোর সতর্ক কিংবা তিরস্কার করতে পারে। তাদের রায়ের পুরো বিবরণ সংশ্লিষ্ট পত্রিকা পাতাজুড়ে ছাপে (এখন প্রথম আলো ছাপছে), ব্যস এ পর্যন্ত। প্রেস কাউন্সিলকে সত্যিকার অর্থে ন্যায়পালের ভূমিকা দেওয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি। সে ক্ষেত্রে কাউন্সিলের গঠন-প্রকৃতির বর্তমান ধারণাটি বদলে দিতে হবে। এখন ক্ষমতাসীন সরকারের আস্থাভাজনরাই এ কাউন্সিলের সদস্য হন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ বাস্তবতা মেনে নিয়েও বলা যায়, দায়িত্বশীল ও প্রাজ্ঞ লোকদের মধ্য থেকেও ‘আস্থাভাজন’দের বেছে নিতে পারে সরকার। গত কয়েকটি কাউন্সিলের দিকে তাকালে কি আমরা সে চিত্র পাই? স্বাধীনতা ভোগের পাশাপাশি গণমাধ্যম কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে, সে প্রশ্নও অনেকেই তুলেছেন। এর জবাব দিতে গিয়ে আমাদের ইতস্তত করতে হয়। কী ছাপব, কী ছাপব না, কতখানি ছাপব এবং কী সম্প্রচার করব, কী করব না কিংবা কতখানি করব_ এ নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার। বিশ্বজুড়ে বড় বড় সংবাদপত্রের নিজস্ব আচরণবিধি রয়েছে। বিবিসি, সিএনএনসহ বড় বড় সম্প্রচার মাধ্যমও কঠোরভাবে নীতিমালা অনুসরণ করে। এ ব্যাপারে আমরা যত দ্রুত দায়িত্বশীল আলোচনা শুরু করতে পারি, ততই মঙ্গল।

সূত্র: দৈনিক সমকাল।