সম্পাদকদের যৌথ বিবৃতি প্রসঙ্গে

বৃহস্পতিবার, ২৩/০৫/২০১৩ @ ১০:৩২ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ::

rezaআমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি আর দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি আবারো চালুর দাবি করে বিবৃতি দিয়েছেন ১৬ সম্পাদক। দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি খোলার দাবি নিয়ে তেমন একটা কথা না বললেও, মাহমুদুর রহমানের মুক্তি চেয়ে সম্পাদকদের বিবৃতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে সেক্টরস’ কমান্ডারস’ ফোরাম। তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, সম্পাদকরা না জেনে বিবৃতি দিয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন এমন একটা বিবৃতি দিতে গেলেন সম্পাদকরা? শুধু মাত্র স্বগোত্রীয় বলেই?
বন্ধুবর প্রভাষ আমিন ১৬ সম্পাদকের বিবৃতি প্রত্যাহারের আহবান জানিয়েছেন। আহবান তারা জানাতেই পারেন, কিন্তু যারা বিবৃতি দিয়েছেন, তারা আসলে জেনে শুনেই দিয়েছেন। এবং আমরা বুঝতে পারি, এই বিবৃতি কোথায় ড্রাফট হয়েছে, কে কে স্বাক্ষর গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছেন।

এখানে এমন দু’একজন সম্পাদক আছেন, যাদের নীতি-নৈতিকতা অনেক আগে থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। আবার দু’একজন আছেন, যারা মনেই করেননা যে, তারা পত্রিকা চালান। তাদের ভাবনায় বাস করে যে তারাই আসলে এই দেশের নিয়ামক, তারাই ঠিক করবে দেশ কিভাবে চলবে, তাদের কেউ কেউ জড়িত থাকেন রাজনীতিকেই নির্বাসনে পাঠাতে। তারা চেয়েছিলেন এবং এখনো চান আরাজনৈতিক গোষ্ঠী দ্বারা দেশ শাসিত হোক। তারা অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলবে, কিন্তু একটা সময় সাম্প্রদায়িকতার চর্চাই তাদের কাছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তথা মত প্রকাশের অধিকার হয়ে উঠে। তারা নারী জাগরণের কথা বলবে, কিন্তু জাগ্রত নারীকেই নিয়েই আবার বানানো অশ্লীল গল্প ছাপাবে।

মাহমুদুর রহমান আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নেয়ার পর এই পত্রিকাটি কি কোন পত্রিকার পর্যায়ে ছিল? বিশেষ করে গণজাগরণ মঞ্চ শুরু হওয়ার পর মাহমুদুর রহমান তার লেখায় আর প্রতিবেদনে যেভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়েছেন, ধর্মীয় সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছেন, তা পৃথিবীর কোন সংবাদপত্র করেছে কিনা জানা নেই। কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তনের ছবিকে যিনি সাইদীর মুক্তির দাবিতে কাবা শরীফের আলেমদের মিছিল বলে ছাপাতে পারেন, যিনি সরাসরি যেকোন মুসলামানকে নাস্তিক বলতে পারেন, তার পক্ষে সাফাই গাইলেন সম্পাদকরা, এটা ভাবতে কষ্ট হয়। বিস্মিত হই যখন তারা এর সাথে গন মাধ্যমের স্বাধীনতার কথা জুড়ে দেন।

মিডিয়া সমাজ ও জাতির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরীতে ভূমিকা রাখে, যদি সে সমাজে বা রাষ্ট্রে তার জানার অধিকার নিশ্চিত হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার হলো আরেকটি বিষয় যা মিডিয়ার কাছে প্রত্যাশিত। মিডিয়া মানে কোনো ঘটনা বা বিষয় তুলে ধরবে, প্রকাশ বা প্রচার করবে, তা নয়, বরং সে ঘটমান বিষয়ের বিশ্লেষণ দেবে যেন সমষ্টির কল্যাণে নীতি প্রণীত হয়।

একটি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় সমাজে, সরকার ও গণমাধ্যম, সমাজের নেতৃত্ব ও তার অনুসারী, অভিজাত ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ, সকলের মাঝে এমন একটা তথ্য প্রবাহ তৈরী হবে, যেন সকলেই সবসময় আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রাখে। কিন্তু সাংবাদিকরা যেন কখনোই পেশাদারিত্ব ও তাদের জন্য প্রযোজ্য নীতি-নৈতিকতার অঙ্গীকার থেকে সরে না আসে। যখন সমাজ বিপদে পড়ে, সমাজের প্রগতির চাকা থমকে দাঁড়ায়, তখন গণমাধ্যমকে এজেন্ডা সেট করতে হয়। সেই এজেন্ডা গণমানুষের আশা আকাংখা।

“এই যে সমষ্টির কল্যাণ বা গণমানুষের আশা-আকাংখা”..তার কি বিন্দুমাত্র ছিল আমারদেশের কর্মকান্ডে? যে সম্পাদকরা স্বাক্ষর করেছেন, তারা জোর গলায় বলতে পারবেন একথাটি?
গণমাধ্যম সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি ন্যায় বিচার করতে না পারলে, মানুষও তাকে ক্ষমা করে না। এই বাস্তবতা আমরা বুঝতে হয়তো চেষ্টা করিনা।

সমাজে শান্তি ও প্রগতির স্বার্থে কাজ করতে হয় গণমাধ্যমকে।তাই কোন পত্রিকা, টিভি, রেডিও, অনলাইন যাই বলি না কেন, যদি সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ, বৈষম্যকে উস্কে দেয়, যদি ব্যাপক জনমানুষের বিরুদ্ধে থাকে, বা সামরিক শাসন, একদলীয় শাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়, তাহলে সংবাদ বা মতামত প্রচার করলেও তা গণমাধ্যম নয়।

সবাই নয়, দু’একজন হয়তো অনুতপ্ত হচ্ছেন সেই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে। আমারদেশ আবার প্রকাশিত হোক, একটি সাম্প্রদায়িক পাতা হিসেবে নয়, সত্যিকারের সংবাদপত্র হিসেবে, তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন। প্রত্যাশা থাকবে, যেন সাম্প্রদায়িকতাকে তার মূল দর্শন করে না ফেলে। একই প্রত্যাশা বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই টিভি চ্যানেলের ব্যাপারে।

লেখক: পরিচালক (বার্তা), একাত্তর টেলিভিশন
[email protected]
সৌজন্যে- এইদেশ.কম