তথ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের জবাবে বিএফইউজে ও ডিইউজে

বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০১৩

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

inuগত ১৮ মে দেশের ১৫টি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের সম্মানিত সম্পাদকরা এক যৌথ বিবৃতিতে দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার, আমার দেশ-এর ছাপাখানা খুলে দেয়া এবং দুই টিভি চ্যানেল দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করাসহ সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের দাবি জানিয়েছিলেন। সম্পাদকদের বিবৃতি দেয়ার এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। গত ২০ মে এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্যমন্ত্রী এমনকি সম্পাদকদের সদিচ্ছা ও প্রজ্ঞা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২২ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। ওই সম্মেলনে পঠিত বক্তব্য নিচে প্রকাশ করা হলো :

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন গভীর উত্কণ্ঠা এবং অপার বিস্ময়ে লক্ষ্য করছে যে, বাংলাদেশের সংবাদপত্র, সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য চক্রান্ত শুরু হয়েছে। সরকারের খোদ তথ্যমন্ত্রী এবং একটি চিহ্নিত মহল মত প্রকাশের অধিকারকে দুর্বিনীত অপপ্রয়াসে দমনের পাশাপাশি সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্রে নেমেছেন।

গত ১৮ মে ১৫ জন বিশিষ্ট সম্পাদক এক ঐতিহাসিক যুক্ত বিবৃতিতে দৈনিক আমার দেশ-এর ছাপাখানায় তালা দিয়ে মুদ্রণ বন্ধ রাখা, পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার, বিকল্প ব্যবস্থায় ছাপতে না দিয়ে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মাহমুদুর রহমানের মাতা মাহমুদা বেগম এবং দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদের বিরুদ্ধে মামলা, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের অধিকারের ওপর আশঙ্কাজনক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা দৈনিক আমার দেশ প্রকাশ, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার চালু এবং মাহমুদুর রহমানের মুক্তির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। আমরা মনে করি, সম্পাদকদের এই আহ্বান সময়োচিত এবং গণতন্ত্রের প্রতি সুতীব্র অঙ্গীকারবোধ সম্পন্ন। বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং মত প্রকাশের অধিকারকে সমুন্নত রাখার লড়াইয়ে আমাদের সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান নিরন্তর সোচ্চার রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে ওই বিবৃতি। কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং সম্পূর্ণ পেশাগত অবস্থান থেকে তারা সমস্বরে সময়তাড়িত উদ্বেগের জানান দিয়েছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অব্যাহত অভিঘাতে সম্পাদকরা বুঝে নিতে চেয়েছেন তাদের শাণিত বিবেকের অবস্থান।

সম্পাদকদের ঐক্যবদ্ধ অভিপ্রায় যখন জাতীয় জীবনের সব পর্যায়ে সব সময়ে নিন্দামুক্ত থেকেছে, তখন বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গত ২০ মে নজিরবিহীনভাবে সম্পাদকবৃন্দের প্রজ্ঞাকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভাষায় চ্যালেঞ্জ করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম দলনের পক্ষে পুরনো সাফাই গাওয়ার পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘সম্পাদকরা না জেনে ওকালতি করেছেন’। সম্পাদকরা জানেন না—এ ধরনের মতামত একান্তই অর্বাচীন। তথ্যমন্ত্রীর এই অপরিণামদর্শী মন্তব্য মনে করিয়ে দেয়, সংবাদপত্রের বোধবিবর্জিত কেমন রাজনীতিক আজ তথ্যমন্ত্রীর গদিতে সমাসীন। আমাদের এবং আম-মানুষের মনে কোনো সংশয় নেই যে, মনীষার সচেতনতায়, অভিজ্ঞতার অকৃত্রিমতায় এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতায় সম্পাদকরা তাদের বিবৃতিতে যথাযথ উচ্চারণই করেছেন। স্বাভাবিক অধিকারের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যাওয়ার এই জাতীয় দুর্যোগক্ষণে সম্পাদকদের সাহসী বক্তব্যে আমরা সবাই উজ্জীবিত হয়েছি। স্বাভাবিক আইন ও স্বাভাবিক অধিকারের পর্ব থেকে সরে গেলে ব্যক্তি স্তরের তথ্য নিরাপত্তা আর থাকে না।

সম্পাদকগণের বিবৃতি জাতিসংঘ সনদের ১৯ ধারার প্রতি বিশ্বস্ততারই অঙ্গীকার যাতে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকেরই মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার আছে, এই অধিকারের মধ্যে আছে বিনা বাধায় মতামত পোষণ করা এবং সীমানা নিরপেক্ষভাবে যে কোনো মাধ্যমে তথ্য ও চিন্তা সন্ধান করা, পাওয়া এবং অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়ার অধিকার, এর মধ্যে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশনের অব টিভি চ্যানেল ওনার্স-এর পক্ষ থেকে একই আহ্বান জানানো হয়েছে। অথচ তথ্যমন্ত্রী সম্পাদকদের সভ্য আহ্বান নাকচ করেছেন এবং সম্পাদকদের উপলব্ধিকে আঘাত করা তার দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেছেন।

তথ্যমন্ত্রী আমার দেশ-এর ছাপাখানায় তালা দেয়া, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধের পক্ষে যে আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। সম্পূর্ণ গায়ের জোরে কুশাসনকে আড়াল করতে এই বেআইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মন্ত্রী আইনেরও অপব্যাখ্যা দিচ্ছেন। যেমন মুদ্রণ ও প্রকাশনা আইনে ভিন্ন ছাপাখানা থেকে পত্রিকা ছাপানোর ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসককে অবহিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তথ্যমন্ত্রী বলছেন, অবহিত নয় অনুমোদন নিতে হবে। এসব গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং মাহমুদুর রহমানকে নানা ছুতায় গ্রেফতারের চেষ্টা সরকার আগে থেকেই করছে। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে এসব গণমাধ্যম বন্ধের দাবি ও মাহমুদুর রহমানকে হত্যার হুমকি প্রদানের ঘটনাগুলো প্রকাশ্যেই ঘটেছে। এ হচ্ছে এক ধরনের ফ্যাসিবাদ।

এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ভিন্ন মতের পত্রিকা পোড়ানো, সংবাদপত্র এবং কার্যালয়গুলোতে অগ্নিসংযোগ, রাজপথে কর্তব্য পালনরত সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের গুলি, মাহমুদুর রহমানকে পত্রিকার কার্যালয় থেকে বন্দুক ঠেকিয়ে অপহরণমূলক গ্রেফতার, মাহমুদুর রহমানের মা এবং সংগ্রাম সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনাগুলো বাংলাদেশের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। ‘এই মুহূর্তে দেশের গণমাধ্যম স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে’ এবং ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মতোই আজ দেশের সব পর্যায়ের আদালত অসীম স্বাধীনতা ভোগ করছে’—তথ্যমন্ত্রীর এহেন দাবি নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা বলি, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আজ সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন। বর্তমান সরকারের আমলে সাংবাদিক খুন ও নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা, চ্যানেল ওয়ান, যমুনা টিভি বন্ধসহ সংবাদ মাধ্যমের ওপর সার্বক্ষণিক পীড়ন এবং অঘোষিত সেন্সরশিপ, বরেণ্য সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক এবং টক শো’র অতিথিদের প্রতি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের তীব্র অপমানকর মন্তব্য এবং হুমকি আজ দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বার বার ডেডলাইন দিয়েও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির প্রকৃত খুুনিদের গ্রেফতার এবং হত্যা রহস্য উন্মোচনে সরকারের লাগাতার ব্যর্থতা তথা অনীহায় এ সঙ্কেতই স্পষ্ট যে, আজ সাংবাদিক খুন ও নির্যাতনের কোনো প্রতিকার নেই।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
তথ্যমন্ত্রীর কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের পাশাপাশি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, ১৫ জন পরিচিত নাগরিকসহ কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্পাদকদের বিবৃতির প্রতি উষ্মা জানিয়ে গণমাধ্যম ও সাংবাদিক দলনে সরকারের ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে সমর্থন জানিয়ে বলা হয়েছে—‘সম্পাদকের আলখাল্লা পরে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা ও ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে সরকার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন।’

পেশাগত অবস্থান থেকে প্রদত্ত সম্পাদকদের মতামতকে রাজনৈতিক বক্রদৃষ্টিতে বিতর্কিত করার এমন অপসাধনা আমরা আগে কখনও দেখিনি। মাহমুদুর রহমান সম্পর্কে তাদের কটূক্তি রুচিবিবর্জিত এবং একজন নাগরিকের বিশিষ্ট হয়ে ওঠার মানসিকতার পরিচায়ক নয়।
সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ ও সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতি নগ্ন সমর্থনের মধ্য দিয়ে তারা তাদের আস্তিনে লুকিয়ে রাখা ফ্যাসিবাদের ছুরিকেই প্রকাশ্য করেছেন। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের রাতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এবং পত্রিকার অফিসে হানাদার পাকবাহিনীর গোলাবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, স্বাধীনতার সংগ্রামে সাংবাদিকদের ভূমিকা এবং আত্মাহুতির ঘটনাই শুধু নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস যে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ইতিহাস ব্যতীত অপূর্ণাঙ্গ সে কথা আমরা তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ধর্মবোধ ও সম্প্রীতি রক্ষায় ‘আমার দেশ’ এবং মাহমুদুর রহমানের ভূমিকা প্রোজ্জ্বল বলেই জাগরণ মঞ্চের নেপথ্য কুশীলবরা আজ এমন কর্কশ উচ্চারণে মেতেছেন। আমরা আশা করি, তারা অভিশপ্ত আশ্রয় এবং অমানবিকতার অমানিশা থেকে দ্রুত আলোর পথে ফিরবেন। সংবিধানে সন্নিবেশিত স্বাধীনতার ঘোষণায় শুধু তিনটি বিষয়কে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য বলে নির্ণয় করা হয়েছে—১. সাম্য ২. মানবিক মর্যাদা ৩. সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ। এই তিন স্তম্ভই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আসুন তা বাস্তবায়নে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করি।

সবশেষে আমরা তথ্যমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান রাখব, ১৫ জন বিশিষ্ট সম্পাদকের আহ্বান বাস্তবায়ন করুন। আমার দেশ-এর ছাপাখানা খুলে দিন, ‘দিগন্ত’, ‘ইসলামিক টিভি’, ‘চ্যানেল ওয়ান’, ‘যমুনা টিভি’র সম্প্রচার চালু করে দিন। সাগর-রুনির প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতার করুন। সব সাংবাদিক খুন ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিচারের ব্যবস্থা করুন। সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদপত্রসেবীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। না হয় তথ্যমন্ত্রিত্ব থেকে বিদায় নিন। আজকে আমরা সভা-সমাবেশের ওপর বেআইনি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন পর্যন্ত হতে পারবে না, এমন অবস্থা বাংলাদেশের জনগণ কখনও দেখেনি। মনে রাখবেন, ‘কিছু করার দায়িত্ব সংবাদিকতাকে তার জন্মদিন থেকেই ব্যস্ত রেখেছে। খবর সংগ্রহ আর পরিবেশন এবং সংবাদের পর্যালোচনাতেই সাংবাদিকতার দায়িত্ব ফুরিয়ে যায় না। সমাজ ও জীবনের প্রবাহে অসভ্যতার আবির্ভাবে সাংবাদিকতা সব সময় রুখে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়াবেই।’