একটি প্রশ্ন, একটি উত্তর ও তোলপাড় দেশ!

মঙ্গলবার, ২১/০৫/২০১৩ @ ৭:৪৫ অপরাহ্ণ

আজাদ তালুকদার ::

kolom02স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর ১৯ মে মিরসরাই আসছেন একটি নতুন থানার (জোরারগঞ্জ) কার্যক্রম উদ্বোধন করতে। আগের দিন সেই খবর পেয়ে দুলাল ভাইসহ (মাঈনুদ্দিন দুলাল, একাত্তর টিভির চট্টগ্রাম অফিস ইন-চার্জ) সিদ্ধান্ত নিলাম একাত্তর টেলিভিশনের পক্ষ থেকে আমরা সেটা কাভার করবো।

এমনিতেই গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর, ওবায়দুল কাদের, আবুল মাল আবদুল মুহিত মানেই বাড়তি আকর্ষণ, বাড়তি আগ্রহ! একটি কৌশলী ও যুঁৎসই প্রশ্ন করতে পারলেই তাদের কাছ থেকে একটা ভালো নিউজ পাওয়া যায়; যেটি ক্ষেত্র বিশেষে লিডও হয়ে যেতে পারে।

আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি, সবসময় আমাদের প্রত্যাশা থাকে, যেখানেই যাই সেরা নিউজটাই যেন তুলে আনতে পারি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে একটা নিউজ পাবো সে আশা নিয়ে ১৯ মে সকালে রওয়ানা হলাম চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে ফেনী জেলার কাছাকাছি মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জের উদ্দেশে। পৌঁছেই অনুষ্ঠানস্থলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম আমরা। তখনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান আকাশে!

হ্যালিপ্যাডে অবতরণের পর আধঘণ্টার মধ্যেই অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাবেন বলে এরই মধ্যে সংবাদকর্মীদের জানানো হয়েছে। নতুন থানার কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেবেন।

এ সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বললাম থানার কার্যক্রম উদ্বোধনের পর পরই আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্রিফিংয়ের জন্য বলবো। অন্যথায়, সময় মতো নিউজ ধরাতে পারবো না। এতে সবাই সায় দিলেন।

আমরা ‌ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কী প্রশ্ন করবো, মনে মনে ঠিক করে রেখেছি। প্রশ্ন শুনে এসএ টিভির রিপোর্টার অনুপম শীল, জিটিভির আরিফুর রহমান সবুজও সম্মতি দিলেন। পৌনে একটার দিকে বেলুন ও কবুতর উড়িয়ে জোরারগঞ্জ থানার কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমরা ঘিরে ধরলাম।

তিনি নতুন থানার প্রয়োজনীয়তা ও কার্যক্রম নিয়ে নিজে থেকে কিছু ব্রিফ দেওয়ার পর বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নটি করলাম “গণতান্ত্রিক দেশে সভা-সমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হিসেবে আরও বেশি আছে বিএনপির। কিন্তু, তাদের সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এমনকি তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনেও সমাবেশ করতে দিচ্ছেন না। এর কারণ কী?”

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, “যারা সমাবেশের অনুমতি নিয়ে সমাবেশকে দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেন, জনসাধারণের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন করেন, গাড়ি পোড়ান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জিনিসপত্র নষ্ট করেন, দোকান লুট করেন, তাদের যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে আমরা সমাবেশ করার অধিকার স্বীকার করা সত্ত্বেও আগামী একমাস পর্যন্ত কোনো সভা-সমাবেশ কোনো দলকেই করতে দেওয়া হবে না।”

ব্যাস, সাংবাদিকতার ছোটজ্ঞানে বুঝে গেলাম প্যাকেজ তো বটেই, এটা নিশ্চিত ‘লিড স্টোরি’। এরপর সময় টিভির বখতেয়ার মুন্না সংলাপ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন করলেন। কিন্তু, সেদিকে আমার তেমন খেয়াল নেই। আমার চিন্তা দ্রুত শেষ করে কীভাবে বিষয়টি অফিসকে জানানো যায়। ফোন দিলাম আমাদের ন্যাশনাল ডেস্কের বিপ্লব দাকে (সিনিয়র নিউজরুম এডিটর, একাত্তর টিভি)।

বললাম- “দাদা, দ্রুত একটা টিকার লিখুন- “আগামী একমাস কোনো রাজনৈতিক দলকে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না-চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর।”

পরক্ষণে আবার ফোন করে তিনি জানতে চাইলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দিষ্ট কোনো এলাকার কথা বলেছেন কিনা। বললাম- সে ধরনের কিছু বলেননি তিনি।

দুইমিনিট পরে আবার ফোন দিলেন শাকিল ভাই (শাকিল আহমেদ, একাত্তর টিভির, হেড অব আউটপুট)।
শাকিল ভাই জানতে চাইলেন- “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসলে কী বলেছেন?” আমি পুরো বিষয়টি জানিয়ে শাকিল ভাইকে বললাম- আমার কাছে তার বক্তব্যের রেকর্ড আছে। এবার শাকিল ভাই পুরোপুরি আশ্বস্ত হলেন। বললেন- “বিষয়টি নিয়ে দুপুর একটার বুলেটিনে ফোনো করতে হবে।”

তখন বুলেটিনের বাকি আর মাত্র ৩ মিনিট! দ্রুত ফোনোর জন্য তৈরি হয়ে গেলাম। ফোনোতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল পয়েন্টগুলো।

এর পর শুরু হলো নতুন টেনশন! সময় মতো নিউজটা ধরাতে না পারলে সব কষ্ট তো বৃথা যাবে! কী করি এখন! এরই মধ্যে অফিসের ল্যাপটপ নিয়ে থানা কম্পাউন্ডেই বসে পড়েছেন এনটিভির রিপোর্টার আরিচ আহমেদ, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের রনি দত্ত।

সময় টিভির ফেনী প্রতিনিধি বখতেয়ার মুন্না জানালেন, সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার মধ্যে তিনিও নিউজ ধরাতে পারবেন। কারণ, অনুষ্ঠানস্থল থেকে তার গন্তব্য মাত্র ২৫ মিনিটের।

এ সময় ফোন করলেন পলাশ ভাই (পলাশ আহসান, একাত্তর টিভির ন্যাশনাল ডেস্কের ইন-চার্জ)। জানতে চাইলেন, অফিসে পৌঁছতে আমার কতক্ষণ লাগবে। বললাম, ন্যূনতম দুই ঘণ্টা। শুনে অনেকটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন পলাশ ভাই। বললেন, “তাহলে কি সময় মতো নিউজটা ধরাতে পারবো না আমরা!”

পলাশ ভাইকে আশ্বস্ত করে বললাম, দেখি, অন্য কোনো উপায়ে দ্রুত পাঠানো যায় কিনা। এরপর এনটিভির রিপোর্টার আরিচ আহমেদের দ্বারস্থ হলাম। দুপুর ২টার দিকে তার ল্যাপটপের সাহায্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও এ সংক্রান্ত ফুটেজ পাঠাতে সক্ষম হলাম।

তৃপ্তির ঢেকুর তুলে পলাশ ভাই বললেন, তিনটার বুলেটিনে এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতাকে চট্টগ্রাম নিউজ সেন্টার থেকে কানেকটিভিটিতে রাখার জন্য ইতোমধ্যে দুলাল ভাইয়ের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন।

একই সঙ্গে ওই বিএনপি নেতার একটি বক্তব্যও নিয়ে রাখতে বলেছেন দুলাল ভাইকে। আমি বললাম, “খুবই ভালো হয়েছে।” এরপর পলাশ ভাই বললেন, “বিএনপি নেতার বক্তব্যসহ অফিসে পৌঁছে এ নিয়ে একটা প্যাকেজ স্ক্রিপ্ট পাঠান। সন্ধ্যা ৭টার বুলেটিন থেকে আপনার প্যাকেজ যাবে।” শুনে খুশিই লাগলো। কষ্ট করে এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসাটা যেন সার্থক হয়েছে!

অন্য গণমাধ্যমকর্মীরাসহ ফুরফুরে মন নিয়ে নগরীর পথে! এরই মধ্যে একের পর এক খবর আসছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে প্রায় সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেল। তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহল, সুশীল সমাজসহ পুরো দেশজুড়ে।

মুহূর্তের মধ্যে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু।

তিনি এ জন্য কঠোর কর্মসূচি দেওয়ারও হুমকি দিলেন। তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখে ওইদিন বিকেলে দলের একটি সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ ব্যাপারে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন।

বললেন, “সাভার ট্র্যাজেডি ও মহাসেনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ত্রাণ তৎপরতার সুবিধার্থে একমাস সভা-সমাবেশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

একইদিন সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বললেন, “কেবল ঢাকা শহরেই আগামী একমাস সভা-সমাবেশ বন্ধ থাকবে।”

সব টেলিভিশনের খবর ও টকশোতে যখন এ নিয়ে তুমুল আলোচনা, দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তখন রাত ১১টার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।

সেখানে বলা হয়, ‘যেসব সভা-সমাবেশ থেকে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও নাশকতার সম্ভাবনা দেখা দেবে, সেসব সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হবে না। এরপরও এটা নিয়ে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো অনেক মাতামাতি হচ্ছে, হৈচৈ হচ্ছে।

মজার বিষয় হলো, আমার একটি প্রশ্নের কারণে সেদিন একটি ভালো রিপোর্ট কিংবা প্যাকেজ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ঠিকই; কিন্তু, সেই প্যাকেজ অনেক টেলিভিশন করলেও আমি করতে পারিনি। সঙ্গত কারণে আমার প্যাকেজ যাওয়া দূরের কথা, সামান্য কাটশট যাওয়ারও সুযোগ ছিল না।

অফিসে ফেরার পর স্ক্রিপ্ট লিখে সন্ধ্যা ৬টার দিকে পলাশভাইকে যখন ফোন দিলাম, তখন তিনি বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, আমাদের টেলিভিশিনে দুপুর থেকে যে ওসি/ভিউ/শট যাচ্ছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের গুরুত্ব ও ব্যাপকতা বোঝাতে তা-ই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে প্যাকেজ না করলেও চলে। হ্যাঁ, সেটাই বাস্তবতা। অনেকসময় একটি ওসি/ভিউ/শটও যে লিড আইটেম হতে পারে, প্যাকেজের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে, সেটা সেদিন আবার বুঝলাম।

একটা প্যাকেজ কিংবা কাটশট আমি হয়ত পেলাম না। কিন্তু, আমার প্রশ্নের সুবাদে অনেক টিভি-রিপোর্টারই সেদিন লিড পেয়েছেন। লিড আইটেম করেছে অনেক দৈনিকও। মূলত সেখানেই আমার সান্ত্বনা!

লেখক: আজাদ তালুকদার স্টাফ রিপোর্টার, একাত্তর টিভি, চট্টগ্রাম ব্যুরো।
সৌজন্যে-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম