আহমদ জামান চৌধুরী

মঙ্গলবার, মে ২১, ২০১৩

ahmed jamanসংবাদপত্রের পাতায় আজাচৌ,পূর্ণ নাম আহমেদ জামান চৌধুরী এবং চলচ্চিত্রের অগণিত মানুষ, যাদের কাছে তিনি খোকা ভাই নামে পরিচিত। আহমদ জামান একজন বিশিষ্ট গীতিকার, নাট্যকার, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। তিনি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক চিত্রালীর সাবেক সম্পাদক। তিনি এযাবৎ শতাধিক চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখে ঢাকার চলচ্চিত্রকে করেছেন ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ।

পরিবার এবং শিক্ষা
আহমদ জামান চৌধুরীর জন্ম চাঁদপুর শহরে। বাবা শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক নূরুজ্জামান চৌধুরী। পাঁচ ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে আহমদ জামান চৌধুরীর অবস্থান সর্বকনিষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্ব বিষয়ে অনার্সসহ মাস্টার্স করেছেন তিনি।

তার যত কাজ
তার কাহিনী, চিত্রনাট্য কিংবা সংলাপ মানেই তুমুল দর্শকপ্রিয়তা পেয়ে এসেছে বরাবর। আর তার লেখা পাঁচ শতাধিক হৃদয়ছোঁয়া গানও ঢাকার চলচ্চিত্রকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রার ব্যঞ্জনা। এসব কারণে ঢাকার চলচ্চিত্রে আহমদ জামান চৌধুরী এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম।

তাঁর লেখা চিত্রনাট্যে নির্মিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে পিচঢালা পথ, নতুন নামে ডাকো, নাচের পুতুল, বাদী থেকে বেগম, আগুন, যাদুর বাঁশি, মাস্তান, তুফান, শেষ উত্তর, লাভ ইন সিঙ্গাপুর, শ্বশুরবাড়ি, মিস লংকা, দূরদেশ প্রভৃতি।

তাঁর লেখা জনপ্রিয় কিছু গান
তাঁর লেখা ব্যাপক জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে রয়েছে পিচঢালা এ পথটারে ভালবেসেছি, যেও না সাথী, নতুন নামে ডাকবো তোমায়, কে তুমি এলে গো, ও দরিয়ার পানি, এ বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেও না, চুরি করেছো আমার মনটা, মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না, যাদু বিনা পাখি যেমন বাঁচিতে পারে না, এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও, বিদায় দাওগো বন্ধু তোমরা এবার দাও বিদায়, প্রেম পিরিতি চাই বলে সবাই আমায় পাগল বলে প্রভৃতি।

সাংবাদিকতা
তার সাংবাদিকতা শুরু জনপ্রিয় সিনেমা পত্রিকা ‘চিত্রালী’র মাধ্যমে ১৯৭০ সালে। এরপর নানা দায়িত্ব পালন শেষে পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন দীর্ঘ ১০ বছর। সব মিলিয়ে চিত্রালীর সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন দীর্ঘ ২০ বছর। চিত্রালীর পর তিনি দু’বছর ফিচার এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও একই বিষয়ের ওপর পাঠদান করিয়েছেন।

এ দেশে চিত্রনায়ক রাজ্জাককে নায়করাজ উপাধিটি তিনিই দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও চলচ্চিত্রের স্বর্ণালী যুগের প্রধান স্বাক্ষী হিসেবে তার লেখা বিখ্যাত ‘আজাচৌ এর কলাম’ বিনোদন সাংবাদিকতার অন্যতম উদাহরণ।

অভিনীত নাটক
দীর্ঘ সাংবাদিকতা ও লেখালেখির জীবনে প্রথমবারের মতো অভিনয় করেছেন আহমদ জামান চৌধুরী। নিজের রচনা ও সৈয়দ জামিমের পরিচালনায় এটিএন’ এর ‘পথ জানা নাই’ নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।

৬৬ বছর পর্যন্ত চিরকুমার খেতাবে ভূষিত ছিলেন আহমেদ জামান চৌধুরী।

আহমদ জামান চৌধুরীকে নিয়ে প্রথম আলোতে মতিন রহমান এর একটি লেখা

‘বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়,
ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়,
মানুষকে কী করে চিনবে বল?’
—গীতিকার: আহমেদ জামান চৌধুরী

মানুষকে চেনার সংকট এবং অস্থির সামাজিক প্রেক্ষাপটকালে গানটির গীতিকার আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন। শূন্যতায় রেখে গেলেন এ দেশের চলচ্চিত্রের অগণিত মানুষ, যাদের কাছে তিনি খোকা ভাই। সংবাদপত্রের পাতায় আজাচৌ, পূর্ণ নামে আহমেদ জামান চৌধুরী। নির্ভীক চিত্রসাংবাদিক খোকা ভাই ছিলেন চলচ্চিত্রের মানুষের কাছে এক পরম নির্ভরতার আশ্রয়। তাঁকে হারিয়ে চলচ্চিত্র জগতের সবার একটাই উচ্চারণ: আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে গেলাম!’
সত্যিই কি এক শূন্যতা সৃষ্টি হয়ে গেল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে? কী এমন উপাদানে পূর্ণতায় ভরা ছিল খোকা ভাইয়ের জীবনচরিত? চার দশকের অধিক একজন চলচ্চিত্র সাংবাদিক, সমালোচক, কাহিনিকার, সংলাপ লেখক ও গীতিকারের বর্ণাঢ্য জীবনের ইতিপাঠ স্বল্প কথায় বলা সহজ, লেখা কঠিন।
সত্তরের দশকে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ গতি সীমিত ছিল। সহজেই বিশ্ব চলচ্চিত্রের খবর চোখের নাগালে পাওয়া যেত না। সেই তথ্যসংকটের সময় খোকা ভাইয়ের চলচ্চিত্র জ্ঞান অনুশীলন, একই সঙ্গে ইংরেজি, উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষা দখলের কারণে তাঁর লেখার উদাহরণসম্ভারে যুক্ত হতো হলিউড, পাকিস্তান ও ভারতীয় চলচ্চিত্রের সতেজ খবর। খোকা ভাই বিশ্বাস করতেন দেশীয় সংস্কৃতি ও তারুণ্যে অপার শক্তিতে।
এই বিশ্বাসের শক্তিতে খোকা ভাই তরুণ চিত্রনির্মাতা, কুশলী ও শিল্পীদের উৎসাহ দিয়ে লিখে গেছেন চলচ্চিত্রবিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন ও ফিচার। আজাচৌর কলমের একটি বাক্য যেকোনো চলচ্চিত্রকর্মীর জন্য পরম পাওয়া ছিল। জীবনের সব দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ইতিবাচক প্রত্যয়ে বিশ্বাসী। সে কারণেই আজাচৌ সবার কাছে খোকা ভাই। শুভ প্রয়াসের পূজারি খোকা ভাই নিজস্ব একব্যক্তিক বৈশিষ্ট্যের দাবিতেই সর্বদা চলচ্চিত্রের গল্প, গান ও সংলাপে খুঁজেছেন মৌলিকত্ব। তাঁর চিত্রনাট্য ও কাহিনির গতিসূত্র ধরে উঠে এসেছে মানুষের অন্তঃক্ষরণ, যন্ত্রণা, অপমৃত্যু ও অসীম বেদনা। জাদুর বাঁশি, বাঁদি থেকে বেগম, আগুন অথবা রাঙা ভাবি চলচ্চিত্রগুলোর চরিত্রবিন্যাস এবং তাঁর লেখা ‘মাগো, তোর কান্না আমি সইতে পারি না’, ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি, কেন একা বয়ে বেড়াও’, ‘জাদু বিনে পাখি’ গীতগুলোই প্রমাণ। খোকা ভাইয়ের রচিত পাঁচ শতাধিক গানে মানবজীবনের অবাঞ্ছিত বেদনার কথার পাশাপাশি মানবপ্রেমের আকুতি, নতুন দিনের আহ্বানও প্রকাশ পেয়েছে ‘যেয়ো না সাথি’, ‘নতুন নামে ডাকব তোমায়’, ‘এই বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেয়ো না’ ইত্যাদি গানে।
খোকা ভাই সর্বদায়ই একটা নিজস্ব কৃতিত্ব রাখার চেষ্টায় থাকতেন। যেমন চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপি রচনা করতে গল্পের ভাবনাকে প্রথমেই কাহিনির কাঠামো অথবা লাইনআপে দাঁড় করানো প্রচলিত নিয়ম ভাঙলেন তিনি। নিয়ম ভেঙে গল্পের লাইনআপ করা বাদ রেখে সংলাপসহ পূর্ণ দৃশ্যপরিকল্পনা দিয়ে পাণ্ডুলিপি রচনা করলেন জাদুর বাঁশি চলচ্চিত্রে। তাঁর যুক্তি সংলাপের প্রয়োগ, যুক্তি এবং শক্তিমাত্রায় গল্প সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাবে। পরিচালক আবদুল লতিফ বাচ্চুর ভাষায়, এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে জাদুর বাঁশির লেখা বহুবার থেমে গিয়েছিল। তবুও শিল্পীর স্বভাবে সুস্থির খোকা ভাই ঠিকই সাফল্যে পৌঁছেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর শিল্প সৃষ্টির ক্ষিপ্রতা, যা ফিকশন স্টোরি লেখার এক ধরনের কৌশল। বারবার কল্পনায় বাস্তবতা নির্মাণ, আবার নির্মাণকে গুচ্ছিতভাবে পূর্ণরূপ দিতে পূনর্নির্মাণ করা—চলচ্চিত্রের কাহিনি রচনার এসব লজিক্যাল অথবা ফিলোসফিক্যাল গঠনমূলক চিন্তাশক্তি ছিল বিধায় লেখার ক্ষেত্রে পরিচালক, প্রযোজক অথবা শিল্পীদের প্রভাবিত করা তাঁর পক্ষে সহজ কর্ম ছিল।
১৯৮৯ সাল। রাঙা ভাবি চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাবনা শুরু। চলচ্চিত্রটির জন্য লোকেশন নির্বাচন করা হলো নেপাল। স্ক্রিপ্ট রাইটার খোকা ভাই জানালেন, নেপালের লোকেশনে থেকে তাঁকে লিখতে হবে। নির্ভেজাল কিছু যৌক্তিক কারণে প্রযোজক শাবানা ওই শর্তে খোকা ভাইকে নেপালে পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন।
খোকা ভাইয়ের সংলাপে বহুমাত্রিকতা, যুক্তিবোধ, রসবোধ ও অনিঃশেষ ধাক্কা দেওয়ার মতো নাট্য-উপাদানের কারণে মাস্তান, নাচের পুতুল, শেষ উত্তর, বাসনা, আলী বাবা চল্লিশ চোর, দূর দেশ বক্স অফিস মাত করা চলচ্চিত্র।
শুধু গীতিকার-কাহিনিকার হিসেবেই নয়, একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেও সফল ছিলেন খোকা ভাই। অর্থলগ্নির ক্ষেত্রে অথবা শ্রেষ্ঠ কিছু অর্জনে তাঁর আপস ছিল না। ১৯৭৫ সাল। এফডিসির ১ নম্বর ফ্লোর। তাঁর প্রযোজিত বাঁদি থেকে বেগম-এর শেষ দৃশ্যের চিত্রায়ণ। ডে শিফট শুটিং। চারপাশের শব্দে নায়ক রাজ্জাকের মনোযোগ বসছে না। শুটিং প্যাকআপ। নতুন আয়োজনে পুনঃখরচে নাইট শিফটে আবার শুটিং শুরু। বাঁদি ববিতার জন্য রাজ্জাকের মৃত্যুদৃশ্য এক অপূর্ব সৃষ্টি ছিল!

পুনশ্চ খোকা ভাই
৬৬ বছর পর্যন্ত চিরকুমার খেতাবে ভূষিত ছিলেন আমাদের খোকা ভাই। তাঁর কর্মজীবন ছিল সুপরিসর। কিন্তু ব্যক্তিজীবন ছিল স্বল্প পরিসরে আবৃত। কাউকে জানতে দেননি সংসার নামক জীবন সমৃদ্ধিতে তাঁর কেন আগ্রহ ছিল না। বেদনার কোন রঙে তাঁর জীবনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রাঙানো ছিল। জীবদ্দশাতেই খোকা ভাই ছিলেন অপ্রকাশিত। চিকিৎসকের ধারণা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে খোকা ভাইয়ের মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে। অনেক চলচ্চিত্রবোদ্ধার মতে, নিঃসঙ্গের পথিক খোকা ভাই হূদয়ের রক্তক্ষরণে অনেক আগেই মরে বেঁচে ছিলেন, যা ছিল চলচ্চিত্রের মানুষের চরম দুর্ভাগ্য।
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-03-14/news/336206