মোহাম্মদ তোহা খান

মঙ্গলবার, মে ২১, ২০১৩

toha-khanতোহা খান সাংবাদিক, লেখক ও প্রগতি চিন্তার এক সচেতন মানুষ ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁকে ঋদ্ধ করেছিল প্রবলভাবে। ছোটবেলায় মনুষ্যসৃষ্ট ছিয়াত্তরের (বাংলা সন) মন্বন্তর ও ইংরেজি ছেচল্লিশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং অখণ্ড ভারতকে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দুই ভাগ করে পাকিস্তান-হিন্দুস্থান করার কারসাজি প্রত্যক্ষ করেছেন।

জন্ম এবং শিক্ষা
তোহা খান ১৯২৭ সালের ১ এপ্রিল তাঁর নানাবাড়ি এখন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার হাকিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। লেখাপড়া করতে তিনি সাতক্ষীরা প্রাণনাথ হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৪৩ সালে তিনি প্রবেশিকা পাস করে কলকাতা ক্যাম্বেল হসপিটাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নে আত্মনিয়োগ করেন।

‘সুন্দরবন’ নিয়ে তার কাজ
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল এই বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক সম্পদ ‘সুন্দরবন’। আশির দশকের প্রথম দিকে সরকারি অর্থানুকূল্যে সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে জগৎজোড়া সুন্দরবনের প্রচারে সহায়তা করেছেন তিনি। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তোহা খান নিরন্তর সুন্দরবন সফর করেছেন। সুন্দরবনকে নিখুঁতভাবে অনুসন্ধান ও অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন বলেই একাধিক গ্রন্থ: রূপসী সুন্দরবন, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সুন্দরবনের বাওয়ালী, বাঘের সন্ধানে সুন্দরবনে ইত্যাদি রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর সুন্দরবন প্রাকৃতিক সম্পদ আর বন্য প্রাণীর মুক্ত জীবন নিয়ে আজও বিশ্বের বিস্ময়, শ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ হিসেবে লড়ে যাচ্ছেন বিপর্যয় ও সংকটের বিরুদ্ধে। সাংবাদিকতা তোহা খানের পেশা ছিল; কিন্তু নেশায় ধরেছিল সুন্দরবন।

কর্ম জীবন
তোহা খান রাজনীতি এবং পারিবারিক সম্পৃক্ততার সুবাদে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন ১৯৪৭ সালে দৈনিক আজাদ-এ। আজাদ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। তোহা ভাই ১৯৫১ সালে ঢাকা অর্থাৎ পাকিস্তান নামের নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের পূর্বাংশের রাজধানী শহরে চলে এলেন। এসে দৈনিক আজাদ-এ যোগ দেন সহসম্পাদক হিসেবে। এমনিভাবে সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা অর্জন করে সংবাদ, ইত্তেফাক, গণকণ্ঠ-এ সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ৪১ বছর এই পেশায় অধ্যবসায় এবং মেধা দিয়ে যেমন সমাজ ও রাষ্ট্রকে সেবা করেছেন, তেমনি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সাক্ষ্যও রেখে গেছেন। সংবাদপত্র থেকে বিদায় নিলেও ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি কলাম লিখতেন। নব্যদর্শীর দিব্যদর্শন, ‘আমরা খাসা আছি’। সাহিত্যসাধনায়ও খ্যাতি লাভ করেন মোহাম্মদ তোহা খান। বিশেষ করে বন্য প্রাণী নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। তোহা খান জগৎখ্যাত সমাজসেবী হেলেন কেলারের জীবনী অনুবাদ করে গ্রন্থাকারে ছেপেছেন। আর জনপ্রিয় নাটক গাজী কালু চম্পাবতী, যা বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত হয়। অনুবাদক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল।

পুরুস্কার
১৯৮২ সালে খুলনা প্রেসক্লাব তোহা খানকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় ‘মাহবুবউল্লাহ-জেবুন্নেছা স্বর্ণপদক’ লাভ করেন।

মৃত্যু
তোহা খান মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৯৬ সালের ১৪ এপ্রিল।