পত্রিকার দিন শেষ, আসছে অনলাইন যুগ

শনিবার, ১৮/০৫/২০১৩ @ ১:০৮ অপরাহ্ণ

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

newsweekসংবাদপত্র জগতে যে খবরটি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয় তা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারসংখ্যায় দ্বিতীয় জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নিউজউইক-এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়া। পত্রিকাটি ১৯৩৩ সালে যাত্রা শুরু করে ২০১২ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বের পাঠকের মন জয় করেছিল। বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময়ও পত্রিকাটির সার্কুলেশন ছিল ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১শ ৫৬। নিউজউইক প্রকাশ হওয়ার পর থেকে লাভের মুখ দেখে এলেও মূলত ২০০৭ সাল থেকে পত্রিকাটির লাভ কমতে থাকে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তাদের রাজস্ব আয় কমে যায় ৩৮ শতাংশ। ২০১০ সালে পত্রিকাটি বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এর ৯২ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা সিডনি হার্ম্যান। সে সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়িয়ে বছরের শেষের দিকে এসে দ্যা ডেইলি বিস্টের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে যুক্ত হয় নিউজউইক। উভয় প্রকাশনার সম্মতিক্রমে নতুন নাম দেয়া হয় নিউজউইক ডেইলি বিস্ট কোম্পানি। সম্পাদক হন টিনা ব্রাউন। প্রায় দুই বছর পর হঠাৎ করে ২০১২ সালের ১৮ অক্টোবর ঘোষণা দেয়া হয় ৩১ ডিসেম্বর ২০১২-এর মধ্যে নিউজউইক বন্ধ করে দেয়া হবে। তবে বন্ধ হয়ে গেলেও পত্রিকাটির অসংখ্য পাঠক নিউজউইক পাঠ থেকে বঞ্চিত হবে না। অনলাইন ভার্সন-এর মাধ্যমে প্িরকাটি সারা বিশ্বে বিরাজিত থাকবে। অনলাইন মাধ্যমে পত্রিকাটির নাম হবে নিউজউইক গ্লোবাল।

সংবাদপত্র বাজারের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী

২০০৯ সালের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবাই দেখলো সেদেশের গুরুত্বপূর্ণ মহানগরীয় পত্রিকাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, ক্রেতার সংখ্যা না বেড়ে দিন দিন কমতে শুরু করেছে। গুরুত্বপূর্ণ সেসব পত্রিকার মধ্যে ছিল ডেট্রয়েট সিটির দ্য ডেট্রয়েট ফ্রি প্রেস, দ্য ডেট্রয়েট নিউজ। সানফ্রান্সিসকো সিটির দ্য সানফ্রান্সিসকো ক্রনিকল। সিয়াটলের দ্য সিয়াটল পোস্ট-ইন্টেলিজেন্সার এবং দ্য রকি মাউন্টেন নিউজ। টাকসন সিটির দ্য টাকসন সিটিজেন পত্রিকাটির কোম্পানি দ্য গ্যানেট কোম্পানি চেয়েছিলেন পত্রিকাটি বন্ধ না করে বিক্রি করে দিতে। কিন্তু কোনো ক্রেতা না পেয়ে ২০০৯ সালের ২১ মার্চে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে আর্থিক সমস্যার মুখে পড়া সংবাদপত্রগুলো ক্রেতা খুঁজতে লাগলেন। অনেকে কম মূল্যে বিক্রি করে দিলেন। ২০০৯ সালে দ্য সান ডিয়েগো ইউনিয়ন-ট্রিবিউন বিক্রি করে দেয়া হয় মাত্র ৫০ মিলিয়ন ডলারে। অথচ এই পত্রিকাটির মূল্য ২০০৪ সালে হিসাব করা হয়েছিল ১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র বিশ ভাগের এক ভাগ মূল্যে এটি বিক্রি করা হল পাঁচ বছর পর। তেমনিভাবে ৩শ ১০ মিলিয়ন ডলারের দ্য সান টাইমস মিডিয়া গ্রুপ বিক্রি হয় মাত্র ৫ মিলিয়ন ডলারে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেউলিয়া হয়ে যাওয়া মার্কিন সংবাদপত্র কোম্পানিগুলোর আরো কয়েকটির নাম হলো- দ্য ট্রিবিউন কোম্পানি, দ্য জার্নাল রেজিস্টার কোম্পানি, দ্য মিনেপোলিস স্টার ট্রিবিউন, ফিলাডেলফিয়া নিউজপেপার্স এলএলসি এবং ফ্রিডম কমিউনিকেশন্স।

২০০৮ -২০০৯ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের অনেকগুলো সংবাদপত্র কোম্পানির শেয়ার কমে যায়। এমনকি কোনো শেয়ারের দরপতন হয়ে প্রতি শেয়ারের মূল্য চলে আসে এক ডলালেরও নিচে। নিউইয়র্কের দ্য নিউইয়র্ক টাইম্স কোম্পানির দর প্রতি শেয়ারে কমে পাঁচ ডলার। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যের দ্য ইন্ডিপে-েন্ট তাদের জনবল কমানোর ঘোষণা দেয় ২০০৮ সালে। তাদের দেখাদেখি ডেইলি মেইল ও লোক ছাটাই করে ২০০৯ সালে। যুক্তরাজ্যের দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস-এর কোম্পানি পিয়ার্সন পিএলসি এ সময় লোকসান গুণতে থাকে। এ সময় আলোচিত মিডিয়া মোঘল রূপার্ট মারডকের মিডিয়াও লোকসানের মুখে পড়ে। রূপার্ট মারডক যখন তার সংবাদপত্র ব্যবসায় লাভ করছিলেন তখন তিনি সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, ‘স্বর্ণের নদী’। কিন্তু ২০০৯ সালের দিকে এসে তিনি বলেন ‘নদী কোথাও কোথাও শুকিয়ে যাচ্ছে’। একই সময় তিনি আরেক মিডিয়া সম্রাট ওয়ারেন বাফেটের বাফেলো নিউজ-এ লেখেন ‘কেবল, স্যাটেলাইট ব্রডকাস্টিং এবং ইন্টারনেট যেভাবে বাড়ছে, মনে হচ্ছে সংবাদপত্রকে যেভাবে আমরা জানি তা বোধহয় একসময় থাকবে না।’

অনলাইন সংবাদপত্র আর ছাপানো সংবাদপত্রের মধ্যে পার্থক্য

অনলাইন সংবাদ আর ছাপানো সংবাদপত্র দুটো দুই ধরনের সংবাদপত্র। তাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। যেমন, অনলাইন সংবাদপত্রে একটা সংবাদ ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরা যায়। পাঠক সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পান। কিন্তু ছাপানো সংবাদপত্রে সংবাদটির জন্য পাঠককে পরের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অনলাইন সংবাদপত্র অনেক বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করার পিছনে এটি অন্যতম কারণ। সংবাদপত্র বহন করার ক্ষেত্রেও একটা পার্থক্য রয়েছে। ছাপানো সংবাদপত্র পাঠক যেখানে খুশি বহন করে নিতে পারেন। কিন্তু অনলাইন সংবাদ সঙ্গে রাখতে হলে পাঠককে একটা ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন সঙ্গে রাখতে হবে। আবার অনলাইন সংবাদপত্রে পাঠক একটা ক্লিক করেই পুরনো পত্রিকা দেখতে পারছেন। কিন্তু ছাপানো সংবাদপত্র মাধ্যমে পুরনো পত্রিকা দেখার কাজটি এত সহজ নয়। সেজন্য তাকে অনেকগুলো সংবাদপত্রের বা-িল একসঙ্গে বহন করতে হবে। অথবা কোনো লাইব্রেরী বা সংগ্রাহকের অনুমতি নিয়ে তার সংগ্রহ থেকে দেখতে হবে।

ছাপানো সংবাদপত্র বিশেষ অনুষ্ঠানে বা উৎসবের ছুটিতে বন্ধ থাকতে পারে। কিন্তু অনলাইন সংবাদপত্র একটা ধারাবাহিক প্রকাশনা। এটা বন্ধ হতে পারে না। অনলাইন সংবাদপত্রের এটি একটি অন্যতম সুবিধা। ছাপানো সংবাদপত্রে কোনো সংবাদের ওপর কেউ মন্তব্য করতে চাইলে পারে না। কিন্তু অনলাইন সংবাদপত্রে পাঠক চাইলে কোনো সংবাদের ওপর মন্তব্য করতে পারে। সেই সঙ্গে দেখতেও পারে কোন সংবাদে কি পরিমাণ মন্তব্য পড়েছে। এটি ছাপানো সংবাদপত্র এবং অনলাইন সংবাদপত্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

অন্যান্য দ্রুত মিডিয়ার মধ্যে রয়েছে রেডিও-টেলিভিশন ইত্যাদি। নির্দিষ্ট সময়ের খবরের বাইরে ইদানিং টেলিভিশন পর্দায় বড় স্ক্রলে ঘটনা-দুর্ঘটনার সংবাদ ‘ব্রেকিং নিউজ’, ‘এই মাত্র পাওয়া’ শিরোনাম দেখা যায়। এর বাইরে আছে টেলিফোনে বা সরাসরি তাৎক্ষণিক খবর। কিন্তু বেতার-টেলিভিশনে দেখানো সংবাদ বারবার দেখা দর্শকের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যায় না। এসব দেশের প্রবাসী বাঙালিদের তাজা খবরের জন্য স্বাভাবিকভাবেই নির্ভর করতে হয় অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের ওপর। পাশাপাশি দেশে বিদেশে বাসা-অফিস-মুঠোফোনে যাদের ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে এমন মানুষ সহজেই অনলাইনে সংবাদ দেখে নিতে পারছেন। আর তাই বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে অনলাইনের পাঠক নেটওয়ার্ক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেডিও-টিভির সংবাদে সময়ের এবং সংবাদপত্রে জায়গার সংকট থাকে। বিজ্ঞাপনের চাপসহ নানা সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু অনলাইনে রয়েছে অফুরন্ত স্পেস। খবরের পেছনের খবর, প্রয়োজনীয় নথি, ছবি, এমনকি ভিডিও ক্লিপ তুলে ধরতে অনলাইনকে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয় না। এসব কারনে অনলাইন সংবাদ একদিকে হয়ে উঠছে তথ্যবহুল অন্যদিকে অর্জন করছে পাঠকের আস্থা, বিশ্বাসযোগ্যতা।

কোন মাধ্যমটি দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দেয়?

সংবাদপত্র সৃষ্টির পর থেকে মানুষ সংবাদ সংগ্রহের জন্য তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরবর্তীতে সংবাদ সংগ্রহের কাজটি আরো সহজ হয় পঞ্চাশের দশকে টেলিভিশন মানুষের হাতে আসার পর। এরপর ১৯৯০ সালের দিকে ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হয়। এরপর মানুষ ঘরে বসেই যখনকার খবর তখন পাওয়ার সুযোগ লাভ করে। সেই অর্থে টেলিভিশন এবং ইন্টারনেট সবচেয়ে দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দেয়ার মাধ্যম।

বর্তমানে ছাপানো সংবাদপত্রের চেয়ে বেশি অনলাইন সংবাদপত্র পড়ে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জরিপ প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে পাঠকেরা ছাপানো সংবাদপত্রের চেয়ে অনলাইন সংবাদপত্র বেশি পড়ে। ২০১১ সালে পিউ প্রোজেক্ট ফর এক্সিলেন্স ইন জার্নালিজমের একটি জরিপে দেখা যায় ৪১ শতাংশ পাঠক বলেছে তারা অনলাইনে সংবাদপত্র পড়ে। আর ৩১ শতাংশের কেউ কেউ অনলাইনে সংবাদপত্র পড়লেও তারা বলেছে ছাপানো সংবাদপত্র তাদের পছন্দ। ৬৫ শতাংশ বলেছে ইন্টারনেটই বর্তমানে তাদের সংবাদের উৎস।

ছবি : সংবাদ সংগ্রহের উৎস।

পিউ’র জরিপ অনুযায়ী ইন্টারনেট হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদ সংগ্রহের দ্বিতীয় উৎস। টেলিভিশন এখনো এক নম্বর জায়গাটি দখল করে আছে। তবে ইন্টারনেট সংবাদ মাধ্যমই বর্তমানে একমাত্র মাধ্যম যার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। সেই তুলনায় রেডিও, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্র জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে ক্রমে নিচের দিকে নামছে। পিউ’র জরিপে দেখা গিয়েছে প্রায় অর্ধেক আমেরিকান বলেন তারা সংবাদ সংগ্রহের বা জানার কাজটি করে থাকেন তাদের মোবাইল বা ট্যাবলেটের মাধ্যমে।

ছবি : টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং ইন্টারনেটের চাহিদার তুলনামূলক চিত্র।

সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ

বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে অনেকগুলো সংবাদপত্র বন্ধ হয়েছে। কোনোটি দেওলিয়া হয়েছে, কোনোটি কর্মী ছাটাই করেছে। উদারহরণ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বললে সেখানে ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছাপানো সংবাদপত্রগুলোতে কর্মীর সংখ্যা কমে পাঁচ ভাগের এক ভাগ কমানো হয়েছে। মন্দার কারণে লাভ কমেছে। অন্যদিকে অনলাইন সংবাদপত্র রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে এসেছে অনলাইন সংবাদপত্র। সে দৌড়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে অনেক ছাপানো সংবাদপত্র কোম্পানি তাদের ছাপানো পত্রিকার পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণ করছেন। সমালোচক ও মিডিয়া গবেষকদের ধারণা ক্রমে সংবাদমাধ্যমগুলো সবাই ছাপানো মাধ্যম এক সময় ত্যাগ করবে। চলে আসবে অনলাইন মাধ্যমে। কারণ, এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের হাতে স্মার্টফোন সহজলভ্য না হলেও কিছুদিনের মধ্যে হয়ে যাবে। তখন তারা গাছের ছায়ায় বসে একটা টোকা দিয়েই সে সময়ের সংবাদ আপডেট দেখে নিতে পারবে।

ভবিষ্যত দৃষ্টিভঙ্গী

২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দ্য টাইমস-এর টেকনোলজিস্ট নিক বিল্টন বলেছিলেন শেষ পর্যন্ত ছাপানো সংবাদপত্র হয়তো বৃদ্ধ পাঠকের সঙ্গী হবে। এটা হাইব্রিডও হতে পারে- আংশিক ছাপানো, আংশিক ইন্টারনেট। অথবা কেবল ইন্টারনেটভিত্তিক। যেমনটি হয়েছে সিয়াটল পোস্ট-ইন্টেলিজেন্সার, দ্য ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর এবং দ্য অ্যান আরবার নিউজ। সংবাপত্রের ‘পত্র’ অর্থাৎ কাগজ হয়তো থাকবে না কিন্তু সংবাদ থাকবে।

যুক্তরাজ্যের দ্য ফিনান্সিয়াল টাইম্স পত্রিকার সিইও অলিভিয়ের ফ্লিউরট তার এক বক্তব্যে সম্প্রতি বলেছেন, ‘ভারত আর চীন ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে ছাপানো সংবাদপত্রের প্রচার কমেছে এবং ইন্টারনেট সংবাদপত্রের চাহিদা ও পাঠক বেড়েছে। পৃথিবী অনেক বেশি ডিজিটাল হচ্ছে প্রযুক্তির কল্যাণে। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতা আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এর সঙ্গে বিরোধীতা না করে আমাদের উচিত এর সঙ্গে থাকা।’

বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদপত্র

বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার বয়স খুবই কম। নয় বছর মাত্র। দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪.কম যাত্রা শুরু করে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে। যাত্রা শুরু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে সবচেয়ে আধুনিকমনস্ক হিসাবে পরিচিত আলমগীর হোসেনের হাত ধরে। তিনিই বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদপত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা। তখন তিনি প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে যেন এক যুদ্ধজয়ের সংকল্প নিয়ে সংবাদপত্র জগতে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকে প্রবেশ করান।

মাত্র এক বছরে বিডিনিউজ দেশে বিদেশে পরিচিতি পায়। দ্রুত ও সঠিক খবর প্রকাশের মাধ্যমে অর্জন করে আকাশসমান জনপ্রিয়তা। অনলাইন জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলেও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ ছিলো দুরূহ কাজ। তখনও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিতে ইচ্ছুক ছিলো না। ফলে নিজের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে দেশে ও দেশের বাইরে বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে কাজ করে কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে প্রতিষ্ঠা করা বিডিনিউজ২৪.কম কে বেশি দিন চালিয়ে নেওয়া আলমগীর হোসেনের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দুই বছরের মাথায় ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি প্রতিষ্ঠানটি অন্যের মালিকানায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তখন থেকেই বিডিনিউজ২৪.কম নতুন মালিকানায় চলছে।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আলমগীর হোসেন নতুন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম চালু করেন। মাত্র ছয় মাসেই দেশে অনলাইন সাংবাদিকতায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসে বাংলানিউজ। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে অনলাইন সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। যে কারণে জনপ্রিয় প্রিন্ট সংবাদপত্রগুলোও তাদের সংবাদপত্রের অনলাইন ভার্সন তৈরি করেছে। বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়াতে নতুন আরো কয়েকটি অনলাইন সংবাদপত্র নিয়ে আসছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভাগ, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ছোটকাগজের মতো ছোট ছোট অনলাইন নিউজ পোর্টালও গড়ে উঠেছে।

অনলাইন সংবাদপত্র কেবল তাংক্ষনিক ঘটনার সংবাদ পরিবেশন করছে না, পাশাপাশি জাতীয় দিবস, রাজনীতি, অর্থনীতি-ব্যবসা, খেলাধুলা, মুক্তমত, শেয়ারবাজার, বিনোদন, লাইফস্টাইল, আইন, ধর্ম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সাহিত্য, শিশুসাহিত্য, ফিচার, ধর্ম-দর্শন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সাফল্যগাথা-অর্জন সব বিষয়ে তথ্য-তত্ত্ব ও গবেষণালব্ধ বিশেষ প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করছে। বলা যায়, ২৪ ঘন্টা অতন্দ্র প্রহরীর মতো ভূমিকা রাখছে অনলাইন সংবাদপত্র।

৫ মার্চ ২০১৩-তে জাতীয় সংসদের আলোচনায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন অনলাইন পত্রিকার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। তিনি সেখানে অনলাইন সংবাদপত্রের গুণাবলী নিয়েও আলোচনা করেছেন। আলোচনা করেছেন তরুণ প্রজন্মের আগ্রহের কথা। কিন্তু একটা কথা অনস্বীকার্য যে, এখনো অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা সহযোগিতা তেমন একটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় কোনো বিজ্ঞাপন এখনো অনলাইন নিউজ পোর্টালে চোখে পড়ছে না। অনলাইন নীতিমালার বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেলেও তা বিতর্কের জাল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেনি এখনো। তবে আশা করা যায়, সরকার বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন অনলাইন সংবাদপত্রের জন্য। কারণ, এই সংবাদ মাধ্যমটি সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথের সঙ্গী।

(বক্স হতে পারে)

এক নজরে অনলাইন সংবাদপত্রের সুবিধা ও অসুবিধা

বিগত ১০ বছরে ইন্টারনেটের ব্যপক বিস্তার সাধিত হয়েছে। অনলাইন সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার এটি সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে অনলাইন সংবাদপত্রের কিছু সুনির্দিষ্ট সুবিধা আছে। পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন অনেকে বলে থাকেন সবার ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নাও থাকতে পারে। কিন্তু বলাবাহুল্য সুবিধার দিকটিই বেশি অনলাইন সংবাদপত্রে। নিচে সুবিধা ও অসুবিধার একটি তালিকা করে দেখানো হলো।

সুবিধা :

* বিনামূল্যে পড়া যায়।

* ছাপানো লাগেনা তাই কাগজ লাগেনা, সে কারণে গাছ কাটা লাগে না। অর্থাৎ পরিবেশ বান্ধব।

* দ্রুত পাওয়া যায়।

* সংবাদপত্র পড়তে বা পাতা উল্টাতে যেসব ঝামেলা রয়েছে তা এখানে নেই। সেই অর্থে পাঠকের জন্য ঝামেলাহীন।

* দিনের যে কোনো সময় যে কোনো জায়গা থেকে অনলাইন সংবাদপত্র পড়া যায়।

অসুবিধা :

* সংবাদপত্র কোম্পানিগুলো পত্রিকা বেঁচে টাকা নেয়ার সুযোগ পায় না।

* মানুষকে বেশি বেশি কম্পিউটার ব্যবহার করতে হয়।

* সংবাদপত্রের একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়াতে পারে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট।

* চাকরির অনেক পদ শূণ্য হয়ে যেতে পারে (যেমন বিতরণকারীর পদ)।

সর্বশেষ