দুস্থ ও দোস্ত সাংবাদিক সমাচার

শুক্রবার, ১৭/০৫/২০১৩ @ ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

রাজু আহমেদ ::

razuদুস্থ ও দোস্ত সাংবাদিক নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে ফেসবুক আর আড্ডায় নানা আলোচনা শুনছি। এর উৎস- সরকারের দেয়া দুস্থ সাংবাদিক ভাতা আর রাজউকের প্লট বরাদ্দে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি। কেউ না পেয়ে ক্ষুব্ধ, আবার কেউ কেউ কম পেয়ে তা বাড়িয়ে নিতে ব্যস্ত। এই দুইয়ের মাঝে কোনো কোনো সহকর্মী যাত্রার বিবেকের মতো নীতিকথা বলে বলে শত্রুর সংখ্যা বাড়িয়ে নিচ্ছেন। যদিও তাদের কথা কেউ কানে তুলছেন বলে মনে হয় না। আর খেটে খাওয়া অধিকাংশ সাংবাদিক এসবের খবর রাখেন না। এদের মধ্যে আবার কারো কারো সাংবাদিক সংগঠন (বিশেষ করে ইউনিয়ন) ও এর নেতাদের সম্পর্কে নাক ছিটকানো ভাব দেখা যায়। এমনকি হাতেগোণা কিছু ব্যক্তির সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে আম-সাংবাদিকরা যে বিক্রি হয়ে যাচ্ছেন- খবর না রাখারা তাও জানেন না।

অথচ এই ইউনিয়ন এবং এর নেতাদের মাঝেই যে তাদের সাংবাদিকতা পেশার মৌলিক অধিকারগুলো লুকিয়ে আছে- তা তরুণ সাংবাদিকদের অধিকাংশেরই অজানা। আর যারা এক সময় জানতেন বা এখনো জানেন- তারা হয় ভুলে গেছেন কিংবা ভুলে যাওয়ার ভান করছেন। এককালে সাংবাদিক ইউনিয়ন কতো শক্তিশালী ছিল, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে, জাতীয় স্বাধীকার অর্জন আর গণতন্ত্র রক্ষায় তার কি ভূমিকা ছিল- এসব গল্প এখন আর কারো মুখে তেমন শোনা যায় না। সত্যি কথা বলতে, অধিকাংশ সাংবাদিক ইউনিয়নের খবরও রাখেন না। কিন্তু এখনও আইনগতভাবে, নৈতিকভাবে এবং গঠনতান্ত্রিকভাবে ইউনিয়নই হলো সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের একমাত্র হাতিয়ার। অথচ ইউনিয়নকেন্দ্রীক সব আলোচনাই এখন রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভেদ আর প্লট-ফ্ল্যাট ভাগাভাগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে আপামর সাংবাদিক সমাজের অধিকার আদায়ে ইউনিয়নের ভূমিকা এখন অনেকটাই বিস্মৃত।

ভাতা বা প্লট-ফ্ল্যাট নিয়ে হাতে গোণা কিছু সাংবাদিক লাভবান হচ্ছেন। আর কেউ কেউ (আবেদনকারীর সংখ্যা বিবেচনায় বলছি) ক্ষতিগ্রস্ত বা বঞ্চিত হচ্ছেন। কিন্তু মহার্ঘ্য ভাতা না দেয়া, ওয়েজবোর্ড ঘোষণা না করা কিংবা বেশিরভাগ হাউসে তা বাস্তবায়ন না করায় সিংহভাগ সাংবাদিক বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন হাউসে আমাদের সহকর্মীরা মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না। আবার কোথাও কোথাও দু-তিন মাস পর এক মাসের বেতন পাচ্ছেন। বিনা নোটিশে চাকরি যাচ্ছে। স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিলে যেসব বেনিফিট পাওয়ার কথা, প্রায় কোনো প্রতিষ্ঠানেই তা দেয়া হয় না। নতুন কর্মী নিয়োগে চলছে যেমন খূশি তেমন প্রথা। সংবাদপত্রকে শিল্প বিবেচনায় মালিকরা রাষ্ট্র থেকে নানা সুবিধা নিচ্ছেন। কিন্তু সাংবাদিক-কর্মচারীদের জীবযাপন করতে হচ্ছে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে। আমি বড় বড় অনেক হাউসের অসংখ্য সহকর্মীকে চিনি,যারা অত্যন্ত কায়ক্লেশে জীবনযাপন করেন। বাজার দরে কেনা তো দূরের কথা- রাজউকের প্লট-ফ্ল্যাটের আবেদন ও কিস্তির টাকা যোগাড় করার কথাও চিন্তা করতে পারেন না বেশির ভাগ সাংবাদিক। সেই বিবেচনায় অধিকাংশ সাংবাদিকই দুস্থ।

অন্যদিকে সাংবাদিকদের উপর নানা দিক থেকে আক্রমন আসছে। এখানে চাকরি ও বেতনের নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি ক্রমশ কমছে জীবনের নিশ্চয়তা।

কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলো (বিএফইউজে-ডিইউজে) এসব ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাঁড়াচ্ছে না। সাংবাদিকদের এই দু’টি সংগঠন যে ট্রেড ইউনিয়ন বা সিবিএ (অর্থাৎ, শ্রমিকের প্রতিনিধি সংগঠন), অন্য পেশাজীবী সংগঠনের মতো নয়- তাই আমরা ভূলে যেতে বসেছি। আমাদের নেতাদের চলন-বলন দেখে মনে হয়, তারা এলিট শ্রেণীর প্রতিনিধি। তারা সব সময় পাল্লা দিতে চান, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা কৃষিবিদদের মতো পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে। আর আমরাও ডিআরইউ- প্রেসক্লাবের মতো ক্লাব সংগঠন বা বিনোদনমূলক সংগঠনের সঙ্গে ট্রেড ইউনিয়নকে (ডিইউজে-বিএফইউজে) গুলিয়ে ফেলি।

ফলে সপ্তম ওয়েজবোর্ডের সুবিধা পায় না অধিকাংশ সাংবাদিক, অষ্টম ওয়েজবোর্ডের সুপারিশ দিতে মাসের পর মাস যায়, মহার্ঘ্যভাতা দিতে গড়িমসি করে বেশিরভাগ মালিক, বেতন কাঠামো ছাড়াই বছরের পর বছর চলে ইলেট্রনিক মিডিয়া।

সারা দেশ জুড়েই যখন সুবিধাবাদের জয়জয়কার, তখন সাংবাদিকরা পুরোপুরি এর বাইরে থাকবে-এই আশা বাড়াবাড়ি। তবুও এসব রোগ সারাতে কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। জানি না, কে বা কারা হবেন আপামর সাংবাদিকদের কান্ডারি হয়ে………………

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।