সাংবাদিক মহিম মিজান

বুধবার, মে ১৫, ২০১৩

সাংবাদিকতার বর্তমান যুগকে বলা হয়ে থাকে মেইড জার্নালিস্ট। সংগত কারণেই সাংবাদিকতা সহজাত নয়। একজন সাংবাদিককে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক থেকেই যথেষ্ট যত্নবান ও মনোযোগী হতে হবে। নিজের সততা এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে ঘটনার বিষয়বস্তু সকলের সামনে তুলে ধরা। এই প্রজন্মের এমনই একজন হচ্ছেন প্রতিভাবান সাহসী সাংবাদিক মহিম মিজান। তাকে নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার

mohimএকুশ শতকে ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার সুবাদে রিপোর্টিং করার বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেকোনো পেশার চেয়ে সাংবাদিকতা পেশায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ও সৃজনশীলতা রয়েছে। আর তাই ক্যারিয়ার হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিতে দারুণ আগ্রহী এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির সুবাদে কাগজ, কলম, প্যাড, নোট বুক আর ম্যানুয়াল ক্যামেরার পরিবর্তে ল্যাপটপ কম্পিউটার, ডিজিটাল ক্যামেরা, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের উপর সাংবাদিকদের নির্ভরতা বাড়ছে। তাই এ প্রজন্মের একজন চৌকস সাংবাদিক হতে হলে মেধা, দৃঢ়তা আর সাহসিকতার অনেক প্রয়োজন। এমনই একজন মেধাবী এবং সাহসী সাংবাদিক ২৪ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল একাত্তর টেলিভিশনের অপরাধ প্রতিবেদক মহিম মিজান। লেখাপড়া শেষ করে প্রথমে সাভারের স্থানীয় একটি পত্রিকায় তার সাংবাদিকতার শুরু। বেশ কয়েকদিন মফস্বল সাংবাদিকতা শেষে যোগ দেন দৈনিক অর্থনীতি পত্রিকায়। তখনও টিভি সাংবাদিকতার এত প্রসার হয়নি বাংলাদেশে। এরপর বেশ কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল পাড়ি দিয়ে এখন একাত্তর টেলিভিশনে। অপরাধ প্রতিবেদনের সাথে যুক্ত হন ২০০৫ সালে টেলিভিশনে যোগ দেওয়ার পর থেকে। ময়মনসিংহে জঙ্গি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই গ্রেফতার থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংবাদ কভার করার সুযোগ হয়েছে তার।

এরই মধ্যে মহিম মিজানের সাহসী সাংবাদিকতা দারুণ প্রশংসা অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি সরাসরি একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য স্থাপন করছে মহিম মিজান। খবরের পেছনের খবরের সন্ধানে, ঘটনার নেপথ্যের ঘটনার অনুসন্ধানে প্রতিনিয়ত একজন সাংবাদিককে সীমাহীন ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ উেসর পেছনে অবিরাম ছুটতে হয়। বোমা বিস্ফোরণ, মিছিল, গুলি, মারামারি, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প, নৌ দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে দেশের চলমান সহিংসতায় সবর্ত্র যেন ক্লান্তিহীন ছুটে চলেন মহিম মিজান। ঝুঁকি আর নিরাপত্তাহীনতায় ভরা এই পথচলা। কিন্তু সেই সাথে মহিম মিজানের রয়েছে প্রত্যয়, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অঙ্গীকার, দুর্বার মনোবল, কর্মস্পৃহা সর্বোপরি দেশপ্রেম।

আমরা জানি, বাক্যের গঠনে ভুল হলে, শব্দের প্রয়োগ ভুল হলে কিংবা বানানে ভুল হলে অর্থ বদলে যায়। এতে পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। তাই সংবাদপত্রে লিখতে হলে শুদ্ধ বানানে লেখা দরকার। সংবাদপত্রের প্রতিটি পর্যায়ের কাজ খুব ব্যস্ততার সাথে সম্পন্ন করতে হয়। অনলাইন পত্রিকায় বিষয়টি আরও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করতে হয়। টেলিভিশনের জন্য শুদ্ধ বাক্যজ্ঞান জরুরি, সেই সাথে শুদ্ধ উচ্চারণ। অনেকেই বলে মহিম মিজানই অন্যতম অপরাধ প্রতিবেদক যিনি সুন্দর সাবলীল ভাষায় তার সংবাদ উপস্থান করেন দর্শকের জন্য। সেই সাথে যখন সরাসরি সম্প্রচারে যায় তখনও সুন্দর বাচনভঙ্গি দিয়ে সরাসরি সম্প্রচারকে প্রাণবন্ত এবং উপভোগ্য করে তোলেন দর্শকের সামনে। একাত্তর টিলিভিশনে যোগদানের পর মহিম মিজানই প্রথম টিভি রিপোর্টার যিনি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা নিয়ে সিরিজ রিপোর্ট প্রচার করেন একাত্তর টেলিভিশনে। সেটি বেশ প্রশংসিত হয় সর্বমহলে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি বায়তুল মোকারমের উত্তর গেটে ঘটে যায় একটি নিকৃষ্টতম ঘটনা। ঘটনার বর্বরতার থাবায় আহত হয় বেশ কয়েকজন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা। সেদিন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সাথে সরাসরি সংবাদ প্রচার করেন মহিম মিজান। এদিন ঘটনার নির্মোহ বর্ণনা দেন এই সাংবাদিক। এই সাহসিকতাই পরবর্তীতে তার কাল হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনাটি ঘটে ৬ এপ্রিল। এই দিন হেফাজত ইসলামের লংমার্চ কভার করতে চট্টগ্রামে যান তিনি। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে বৃহত্তর মসজিদ জমিয়াতুল ফালাহ পাশ্ববর্তী রোডে সরাসরি সংবাদ প্রচার করতে থাকেন তিনি। এ সময় একদল দুষ্কৃতিকারী ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। মধ্যযুগীয় বর্বর হামলার শিকার হন তিনি। হামলাটি ছিল পরিকল্পিত। ঘটনার মাত্র ২০ মিনিট পরেই জামায়াত শিবিরে ব্লগ খ্যাত বাঁশের কেল্লায় প্রতিবেদকের ছবিসহ একটি নিউজ আপলোড করে দুর্বৃত্তরা। সেই সাথে হামলাকারীকে যাতে শনাক্ত করা না যায় এ জন্য ঝাপসা করে দেওয়া হয় হামলাকারীর মুখ।

সাংবাদিকতা মানে আড্ডা—কথাটি মহিম মিজানের। ‘কাজ শেষে আড্ডা দিতে দিতে প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতাগুলো পরস্পর ভাগাভাগি করে নেওয়ার মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি রয়েছে। আড্ডার ফাঁকে আধুনিক সাংবাদিকতা বিষয়ে বিভিন্ন আলাপ হয় আমাদের মাঝে।’ এ বিষয়ে তার মত স্পষ্ট, ‘তারুণ্যনির্ভর সাংবাদিকতা আমাদের অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর প্রযুক্তি দুনিয়াকে ছোট করেছে। বর্তমান দুনিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর সাংবাদিতকার সাথে যুক্ত হয়েছে এই তারুণ্য। এই দুয়ে মিলে সাংবাদিকতা পেয়েছে একটি শক্তিশালী প্লাটফর্ম। সেই সাথে প্রয়োজন সাহস ও টিম স্পিরিট। যা তাদের নিয়ে যেতে পারে সাফল্যের চরম শিখরে। একাত্তরে রয়েছে এই টিম স্পিরিট।’ সেই সাথে তার এই সাফল্যের পেছনে এক সহকর্মীর প্রবল উত্সাহ রয়েছে বলে জানান। তিনি জানান, পথ পরিক্রমায় অনেক ধরনের সংবাদ সংগ্রহ করেছি। এবার ইচ্ছা যুদ্ধ কভার করার। যদিও কোনো দেশেই যুদ্ধ কাম্য নয়।

একজন সাংবাদিককে পেশাগত জীবনে অর্জন করতে হয় মানুষের জীবনের বিচিত্র অনুভূতি সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞান। আয়ত্ত করতে হয় সীমাহীন ধৈর্য ও মনোবল। জানালেন, সাংবাদিকতায় সংস্কৃত ভাষার একটি কথা প্রচলিত রয়েছে—ভোজনোং যত্রতত্র শয়নং হট্ট মন্দির। কাজ করতে গিয়ে কথাটির সত্যতা আমি পেয়েছি। আর কর্মনিষ্ঠাই এনে দেয় সাফল্য।’ তাই নির্ভেজাল দেশপ্রেম ও সমাজ সংস্কারের মহত্ ব্রত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একুশ শতকের প্রত্যয়ী সংবাদকর্মী মহিম মিজান।
সৌজন্যে- ইত্তেফাক।