দুর্যোগ সাংবাদিকতা

মঙ্গলবার, ১৪/০৫/২০১৩ @ ১২:১৪ অপরাহ্ণ

নাসিমূল আহসান ::

Omayraবাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগ প্রবণ এলাকা । প্রতিবছরই বাংলাদেশ বিভিন্ন রকমের দুযোর্গের মুখে পড়ে, যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ও নদী ভাঙন প্রধান । এগুলো মাঝে মধ্যেই ভয়াবহ আকারে আঘাত হেনে প্রান ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে । এসব দুর্যোগের করাল ছোবল যেমন দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে বাধাগ্রস্থ করে তেমনি জাতীয় অর্থনীতি ও সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ।
২০১০ সালে পৃথিবীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে চার কোটি কুড়ি লাখের মতো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে । সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা, জাপান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়াচ্ছেই । সাথে বাড়ছে নিহত মানুষের পরিসংখ্যান, ধ্বংস হয়ে বস্তুগত সম্পত্তি।

২০০৯ সালে আমাদের দেশের উপর দিয়ে বয়ে যায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আইলা এবং ২০০৭ সালে সিডর, যা তছনছ করে দেয় দেশের উপকূলীয় অঞ্চল । ১০০ মাইল বেগে বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এ ঘূর্ণিঝড়ে ১ হাজারের ও বেশি মানুষ মারা যায় । এর ভয়াবহতা ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়েরর থেকেও বেশি ছিলো এবং এটা টাইম ম্যাগাজিনের তালিকায় ২০০৭ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের তালিকায় প্রথম হয় ।

বিগত ১০০ বছরে এ দেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে প্রায় ৫৮ টি প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় । গত ৫০ বছরে এ এলাকায় যে ৫৩ টি বন্যা হয়েছে তার মধ্যে ৬ টি ছিলো মহাপ্লাবন, ১৩৫ বছরে সংঘটিত হয়েছে প্রায় বড় ধরনের ২০ টি ভূমিকম্প । ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯৭ সালের জুন পর্যন্ত এদেশে ছোট বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, টর্ণেডো, কাল বৈশাখীর সংখ্যা দাড়িয়েছে প্রায় ১৬৭ টি এবং এর মধ্যে ১৫ টি ছিলো ভয়াবহ । এতে প্রানহানীর সংখ্যা দাড়ায় প্রায় ৬ থেকে ৮ লক্ষের মতো এবং সম্পদের ক্ষতি প্রায় ২৫ থেকে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা যা আমাদের মতো দরিদ্র দেশকে চরম মাত্রায় পিছিয়ে দিয়েছে । ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘুর্ণিঝড়ে প্রায় ৩ লক্ষ লোক মারা যায় এবং প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমান সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় । বিগত দশক সমূহের মধ্যে ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৪, ১৯৮৪, ১৯৯৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালের বন্যা ছিলো ভয়াবহ । ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ( প্রায় ৫২ টি জেলা ) তলিয়ে যায় এবং ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের বিস্তির্ন অঞ্চল তলিয়ে যায় । এছাড়া বিগত দশকগুলোতে দেশের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ খরা দেখা যায় , যা প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে । পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা সহ বিভিন্ন নদীতে নদী ভাঙনের ফলে হাজার হাজার লোক নদী ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ছে এবং দেশজুড়ে এইসব গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে ।
দেশে দুর্যোগের এই ব্যপকতা দেশকে অনিশ্চিত অন্ধকারে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ । আর সে কারনেই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জাতীয় নীতি ২০১০-২০১৫ ঘোষণা করেছে ।

দুর্যোগ সাংবাদিকতা

গত দুই দশক ধরেই সারা পৃথিবীতে দুর্যোগের পূর্বে, দুর্যোগকালীন, দূর্যোগ পরবর্তি উদ্ধারকার্য ও ত্রানকার্য পর্যবেক্ষন, দুর্যোগ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগকালীন সময়ে তাৎক্ষনিক সতর্কতা, নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে দুর্যোগ সাংবাদিকতার তাৎপর্য ও প্রযোজনীয়তাকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে । পাশাপাশি দুর্যোগ কালীন সময়ে সাংবাদিকরা কিভাবে প্রতিবেদন তৈরী করবে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকল্পে তারা কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, জনসচেতনতা তৈরিতে সাহায্যসহ জনগনকে কিভাবে শিক্ষিত করে তুলতে পারে, সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেগুলো কিভাবে জনসাধারনের কাছে উপস্থাপন করতে হবে, দুর্যোগ প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো দিকে গুরাত্বরোপ করবে এসব নিয়ে বিশ্বব্যাপি বিভিন্ন আর্ন্তজার্তিক সংস্থা নানা ধরনের সভা সেমিনার আয়োজন করে চলছে । এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকতা শেখার বিদ্যায়তনিক প্রতিষ্ঠানসমূহে দুর্যোগ সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা কার্যক্রম চালু আছে ।

দুর্যোগ সাংবাদিকতা বলতে মূলত বিভিন্ন গণমাধ্যমে দুযোর্গ সংশ্লিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করার দায়িত্বে নিয়োজিত সাংবাদিকদের দুর্যোগের পূর্বে, দুর্যোগকালীন সময়ে ও দুর্যোগ পরবর্তি সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার কাজকেই বোঝায় ।

দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নজরে আনার জন্য সাংবাদিকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । দুর্যোগ কালীন সময়ে গনমাধ্যম কর্তৃক সঠিক বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরন, দ্রুত সাড়া প্রদান, দুর্যোগকবলিত জনগনকে নিজেদের করনীয় ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারনা দিতে সাহায্য করে ।

চরিত্রগত ভাবে গণমাধ্যম একটি শক্তিশালী যোগাযোগ মাধ্যম । দুর্যোগকালীন সময়ে গনমাধ্যম অতি দ্রুত অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে বার্তা পৌছে দিতে পারে । দুর্যোগকালীন সময়ে তথ্য একটি অতি জরুরি উপকরন, যা জনসাধারনের দুর্যোগ সম্পর্কিত তাৎক্ষনিক অনিশ্চয়তা দূর করার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবেলায় বিভিন্ন দায়িত্বরত গোষ্ঠিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবহিত করে ।

দুর্যোগের বিপদ হ্রাস করার পরিমান এবং বিপন্নতা প্রশমিত করার মাত্রার উপর দুর্যোগের ব্যাপ্তি ও প্রভাব নির্ভরশীল । দুর্যোগ প্রতিরোধ ও হ্রাসকরন এর ভয়াবহ প্রতিকুল ফলাফলকে কমাতে পারে । আর এসব বিষয়সমূহকে নিশ্চিত করার জন্য গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে । একটা নিদৃষ্ট সময় ধরে দুর্যোগ সম্পর্কিত সংবাদ, ফিচার, দুর্যোগ কালীণ সময়ে করনীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষন ও জনসেচতনামূলক অনুষ্ঠান দীর্ঘ মেয়াদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে সফল করতে প্রভাবকের ভুমিকা পালন করে ।

উপকূলের সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত নিজেেেদর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দুর্যোগ সম্পকিত সংবাদ প্রচার করছে । কোনো কোনো সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের জীবনের ঝুকি সহ নানা ধরনের হুমকির মধ্যে পরতে হচ্ছে । জলোচ্ছাসে নদী পাড়ের মানুষের দুখ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরার জন্য সাংবাদিককে ছুটে যেতে হয় আক্রান্ত এলাকায় । ঝড়ো হাওয়া, নদী ভাঙনের ফলে ঝুকিপূর্ণ এলাকায় যেতে হয় সচিত্র খবর প্রকাশের জন্য । প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় সাংবাদিককে শরনখোলায় ছুটে যেতে হয়েছে । মানুষের অগুনতি লাশ আর মরে পড়ে থাকা প্রানীকূল, দূর্গত মানুষের বিপন্ন মুখের সামনে বসে সংবাদ মাধ্যমের জন্য তাকে প্রতিবেদন তেরি করতে হয়েছে । টেলিভিশন সাংবাদিককে পাঠাতে হয়েছে দূর্ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন । দুর্যোগ সাংবাদিককে এরকম নানান অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে দুর্যোগ সাংবাদিককে জনগনকে তথ্য সরবরাহ করতে হয় ।

মূলত দুর্যোগ সাংবাদিকেরা জনমানুষের দূর্ভোগকে বিভিন্ন মিডয়াতে উপস্থাপন করে, যা ত্রান সরবরারহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে এগিয়ে আসতে উদ্যমী করে । দেশ ও দেশের বাইরে দুর্যোগ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান দেয়ার কাজটি করতে হয় তাদেরকেই । আর সে কারনেই দুর্যোগ সংঘটনের পূর্ব থেকে বিপদ চিহ্নিতকরন ও আগাম সতর্কতা প্রদান, বিপন্নতার বিশ্লেষণ, দুর্যোগকালীন ঝুকি বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে তথা সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকান্ডে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন ।

দুর্যোগ সাংবাদিকদের করনীয়

দুর্যোগ সাংবাদিকদেরকে দুর্যোগকালীন সময়সহ বিভিন্ন সময়ে নানা রকম দায়িত্ব পালন করতে হয় । সেগুলোর মধ্যে :

১. দুর্যোগ সাংবাদিককে জনগনকে দুর্যোগপূর্ব সময়ে পূর্বাভাস ও সতর্কতামূলক বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে হয় । একটি দূর্যোগের ঘটনাকে অনুমান করে , দুর্যোগ পরবর্তি সময়ের জন্য করনীয় বিষয়সমূহ নির্ধারনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য, পূর্বাভাস, সতর্কতা ও প্রস্তুতিকৌশল সংবাদ আকারে জনগনের কাছে পৌছানো । এটি দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে সহজতর করে তোলে । জনগনকে দুর্যোগকালীন সময়ে করনীয় সম্পর্কে শিক্ষিত করে । সঠিক সময়ে পূর্বাভাস ও সতর্কতামূলক বিভিন্ন সংবাদ দুর্যোগের বিপদ ও ঝুঁকিকে হ্রাস করতে সাহায্য করে ।

২. দুর্যোগ সাংবাদিককে দুর্যোগ কালীন সময়ে তাৎক্ষনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাতে হয় । এ সময়ে সংবাদের মোড়কে দুর্যোগ সাংবাদিককে জরুরী সাড়া প্রদান (ত্রান কার্যক্রম) সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ, সমস্যা বিশ্লেষন, চাহিদা নিরুপন, করনীয় কার্যাবলী, কৌশলগত দিক নির্দেশনা প্রদান করতে হয় ।

৩. সরকারসহ দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপ সমূহ সম্পর্কে জনগনকে জানানো । পাশাপাশি জনসাধারনকে দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি, দুর্যোগ কিভাবে হয়েছে, এর কারনসমূহ জানানো ।

৪. দুর্যোগকালীন সময়ে গৃহিত বিভিন্ন কর্মসূচি, উদ্ধার ও স্থানান্তর কার্যক্রম, জরুরী চিকিৎসা, আশ্রয়স্থলের খোজখবর, অবকাঠামো ও পূনর্বাসন ব্যবস্থার খোজখবর পাঠক-দর্শকের কাছে পৌছে দেয়া । জনগনকে নিরাপদ জায়গায় সংঘবদ্ধভাবে স্থানান্তর করার জন্য গৃহিত পদক্ষেপগুলো গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা । দুর্যোগের মতো একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে উদ্ধারকমীসহ দুর্যোগাক্রান্ত লোকজনকে বিশেষ পরিস্থিেিততে করনীয় সমূহ কি কি, সেগুলো সম্পর্কে ফিচার আকারে জনগনকে জানানো যেতে পারে ।

৫. গণমাধ্যম দুর্গত অঞ্চলে তথ্য পৌছে দেয় । আর দুর্যোগ বিষয়সম্পর্কে গণমাধ্যমকর্মীকে দূর্গত অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করতে হয় । দুর্গত, চরম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল সম্পর্কে, বিপদের সাথে সম্পর্কিত জনগোষ্ঠির অবস্থান, দুর্যোগাক্রান্ত পরিবেশের সর্বশেষ অবস্থা, অর্থনৈতিক ও বস্তুগত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক বিবরন তুলে ধরা । দুর্যোগের সময় প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন ও গোষ্ঠিসমূহকে চিহ্নিত করে তাদের ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের নজরে আনার জন্য প্রতিবেদন তৈরী করা যেতে পারে ।

৬. দুর্যোগ কালীন সময়ে জনগন তথ্যবিভ্রান্তিতে ভোগে । দুর্যোগের তাৎক্ষনিকতা ও ব্যপকতা তাকে উদভ্রান্ত করে তুলতে পারে । সেক্ষেত্রে সাংবাদিককে সঠিক তথ্য সরবরাহ করে জনসাধারনকে দুর্যোগ সম্পর্কিত ভীতি থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করতে হয় ।

৭. দুর্যোগ কর্মপরিকল্পনা প্রনয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ভাবনাকে ফলপ্রসূ করার জন্য পরামর্শ, এডভোকেসি করা সহ প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন রচনা করা ।

৮. দূর্গত জনগনের চাহিদাকে জনসম্মুখে প্রকাশ করা ।

৯. দুর্গত এলাকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও তা গণমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে সরকারী কর্তৃপক্ষ, ত্রান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসহ জনসাধারনকে জানানোর মাধ্যমে দুর্যোগ বিষয়ে প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জোরদার ও কার্যকর করতে সাহায্য করতে পারে ।

১০. সময়মতো, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জীবন বাচানোর পাশাপাশি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসসহ জনগনকে দুযোর্গ বিষয়ে শিক্ষিত ও সচেতন করে তুলতে পারে । এটি জনগনকে নিজেদের বাচানোর জন্য বাস্তবমুখি পদক্ষেপ নিতে প্রভাবিত করে ।

১১. ফলোআপ রিপোর্টের মাধ্যমে দুর্যোগ পরবর্তি বিভিন্ন কার্যক্রম মনিটরিং করা । ত্রান কার্যক্রম, সরকারী বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগনকে জানানোর জন্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা । এছাড়া দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন গৃহিত পদক্ষেপ ও তার প্রেক্ষিতে সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জনগনের জীবন যাপন, তার পরিবর্তিত পেশা, কাজসমূহ সম্পর্কে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরী করা । দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি মোকবেলায় সরকারের ঔদাসিন্য বা সংশ্লিষ্ঠ কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দূর্নীতি সম্পর্কে সজাগ থাকা এবং সে ব্যাপারে জনসাধারনকে অবহিত করাও দুর্যোগ সাংবাদিকের কাজের আওতায় পরে ।

দুর্যোগ সাংবাদিকতার বিাভন্ন স্তর

দুর্যোগ নিয়ে প্রতিবেদন রচনা করা সামগ্রিক সাংবাদিকতার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ । দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকি সম্পন্ন এলাকায় সাংবাদিকরা জনসাধারনকে শিক্ষিত করে তুলবার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগ প্রতিরোধ, হৃাসকরন, সাড়া প্রদান ও পুণর্বাসন বিষয়ে শিক্ষিত করে তুলতে পারে ।

দুর্যোগ সাংবাদিকতা ও প্রতিবেদন রচনা সম্পর্কে ই সি পার্কার বলেন, দুর্যোগ প্রতিবেদক অবশ্যই সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ, সুনিদৃষ্ট, তথ্য নির্ভর সংবাদ সরবরাহ করবে । সেক্ষেত্রে সাংবাদিক দুর্যোগ সংবাদকে সেনসুয়ালাইজ তো করবেনই না, বরং দুযোর্গের সাথে দুর্যোগগ্রস্থ এলাকার জনসাধারনের বোঝাপড়াকে স্বচ্ছ করে তুলবে ।

দুর্যোগ সংঘটন এবং এর পূর্ব ও পরবর্তি বিভিন্ন সময়ে দুর্যোগ প্রতিবেদক নানা ধরনের প্রতিবেদন রচনা তৈরি করতে পারেন । এক্ষেত্রে দুর্যোগ সাংবাদিকতার জন্য চারটি স্তরকে চিহ্নিত করা যায় ।

দুর্যোগহীন স্তর

দুর্যোগ সংঘটনের কোনো লক্ষন নাই এমন মূহুর্তে দুর্যোগ সংক্রান্ত বিষয়াদি সমূহে নীতিমালা প্রনয়নকারী ব্যাক্তিবর্গও সচেতন থাকে না । এক্ষেত্রে দুর্যোগ সাংবাদিক নানা ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে ।

দুর্যোগ সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইনকানুন সম্পর্কে লেখাজোখা করতে পারে
দীর্ঘমেয়াদী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যত দুর্যোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্পর্কে বিভিন্ন গোষ্ঠি ও সংশ্লিষ্ঠ ব্যাক্তিবর্গের সাক্ষাৎকার নিতে পারে ।
গবেষণা পরিচালনা করা ও দুর্যোগ সম্পর্কে জ্ঞান ও বোঝাপড়াকে বৃদ্ধি করার চেষ্ঠা করা ।
জনসাধারনকে দুর্যোগ সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে অবগত করার পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সহজ করে পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা ।
দুর্যোগ সংঘটনের ক্ষেত্রে মানবসৃষ্ঠ নানা কারন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জনসংখ্যা বিস্ফোরন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সমূহ বিচার করে দুর্যোগ সাংবাদিক আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত পরিবর্তন গুলো বিশ্লেষনের পাশাপাশি সম্ভব্য দুর্যোগাবস্থা সম্পর্কে ধারনা করবেন ।
প্রায়শই নীতিমালা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে জনসাধারনের বিবেচনা করা হয় না । এছাড়া কোনো বিষয়ে জনগন তার মতামত প্রদানের ক্ষেত্র ও পায় না অনেক সময় । সেক্ষেত্রে দুর্যোগ সাংবাদিক জনগনের মতামতকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারে । তারা দুর্যোগ মোকাবেলায় কি ভাবছে, কিভাবে প্রশাসনের সাথে অংশগ্রহনের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবেলায় সে ব্যাপারে জনগনের মতামত তুলে ধরার দায়িত্ব সাংবাদিকের ।

দুর্যোগ পূর্ব কালীন স্তর

দুর্যোগ সংঘটনের পূর্ববর্তী সময়ে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরনসহ দুর্যোগ মোকাবেলায় জনসর্ম্পক্ততা বৃদ্ধি ও জনসাধারনকে সচেতন করা, জনগনকে দুর্যোগ কালীন সময়ে দ্রুত করনীয়সমূহ সম্পর্কে শিক্ষিত করে তুলবার জন্য এ সময়টা দুর্যোগ সাংবাদিকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ । প্রতিবেদক দুর্যোগের ঝুকি ও বিপদ কমানোর জন্য পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদন তৈরী করে সিদ্ধন্ত গ্রহনকারী কর্তৃপক্ষ ও ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠিকে দুর্যোগ মোকাবেলায় উৎসাহিত করতে পারে । নীচে দুর্যোগ পূর্ব কালীন সময়ে সাংবাদিকদের করনীয় সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দেয়া হলো ।

তথ্য সরবরাহ করে জনগনকে বিভিন্ন ইস্যূতে শিক্ষিত করে তোলা গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ । সাংবাদিক দুর্যোগ সংক্রান্ত সকল ধরনের তথ্য জনসাধারনের মধ্যে ব্যাপক ভাবে প্রচার করতে পারে । একজন সাংবাদিক এই সময়ে দেশের বিপদ ও ঝুঁকি সমূহ সম্পর্কে জনগনকে অবহিত করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে পারে । বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস সরবরাহ সহ উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা গোষ্ঠিসমূহকে তথ্য সরবরাহ করে দুর্যোগের প্রস্তুতি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরনে ভূমিকা রাখতে পারে ।
সম্ভব্য ক্ষতি এড়ানোর জন্য তাৎক্ষনিক সর্তকতা সরবরাহ করা দুর্যোগ সাংবাদিকতার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ । দুর্যোগ সাংবাদিক দুর্যোগ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা সমূহ প্রচার করার দায়িত্ব পালন করবেন, তবে সেক্ষেত্রে যাতে দুর্যোগের কারনে জনগনের মধ্যে ভীতির সঞ্চার না হয় এবং ভুল তথ্য না যায়, সে ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ রাখতে হবে ।
সরকারের দুর্যোগ কর্মপরিকল্পনা, গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপ সমূহ প্রচার করা যেতে পারে । সরকারের সাথে কার্যক্রমে সম্পর্কিত থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনসাধারনের মধ্যে দুরুত্ব থাকলে সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিবেদন করা যেতে পারে । এটা দুর্যোগ মোকাবেলায় সাহায্য করতে পারে ।
দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সম্ভব্য প্রস্তুতি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারী প্রশাসনের বিভিন্ন অংশের মধ্যকার সম্পর্ক ও তাদের কাজসমূহ বোঝা দুর্যোগ সাংবাদিকের জন্য একটি দরকারী কাজ । এই বোঝাপরা সাংবাদিককে দুর্যোগ হৃাসকরনের সরকারের অবস্থান ও কার্যক্রম কে বোঝার জন্য সাহায্য করবে এবং এর ধারাবিহকতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারের অবস্থান, অগ্রগতি, সফলতা, ব্যর্থতা নিয়ে প্রতিবেদন রচনা করা সম্ভব হবে ।

দুর্যোগকালীন স্তর

দুর্যোগ কালীন সময়ে সাংবাদিকের দায়িত্ব আরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে । এই সময়ে একই সাথে সাংবাদিককে আক্রান্ত জনগন ও সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে হয় । ত্রান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের সাথে আক্রান্ত জনগনের মধ্যে সেতু তৈরীর গুরুত্বপূর্ণ কাজটি দুর্যোগ সাংবাদিককেই করতে হয় । দুর্যোগ পরবর্তি সময়ে তাৎক্ষনিক ভাবে একজন দুর্যোগ প্রতিবেদক যে সব কাজ করতে পারে :

সতর্কতার সাথে ক্ষয়ক্ষতির পরিমানসহ দুর্যোগ আক্রান্ত মানুষ ও পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো । দুর্যোগে হতাহতের সঠিক সংখ্যা, দুর্যোগের কারন, বিস্তারিত বিবরন, ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা, গৃহিত তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ, বিশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জনসাধারনের করনীয় প্রভৃতি বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা ।
ত্রান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্গত জনগনের ত্রান চাহিদা সম্পর্কে অবগত করা । সে লক্ষে সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করা । পাশাপাশি ত্রান যাতে সর্বত্র, সব মানুষের হাতে পৌছায় সে ব্যাপার নিশ্চিত করার জন্য সাক্ষাৎকার, মানবিক আবেদনমূলক প্রতিবেদন তৈরি করা ।
সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রাখা । সরকারী তাৎক্ষনিক পদক্ষেপসমূহ জানা ও জনসাধারনকে জানানোর পাশাপাশি ত্রান কিভাবে জনগনের কাছে পৌছাচ্ছে, নারী পুরুষ দল মত ক্ষুদ্র গোষ্ঠি নির্বিশেষে সবাই ত্রানের ক্ষেত্রে সম সুযোগ পাচ্ছে কিনা সেটা সম্পর্কে অবগত থাকা । এক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য দেখা দিলে সে ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা ।
দুর্যোগের কারনে বিভিন্ন জায়গা যেমন ঘরের ছাদ, গাছ, দূর্গত জনবিচ্ছিন্ন এলাকায় জনগনের ব্যাপারে প্রতিবেদন রচনা করতে হবে এবং দুর্গত মানুষদের খোজখবর মিডিয়ার মাধ্যমে দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের কাছে পৌছাতে হবে ।
জনসাধারনকে কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান সমূহ কর্তৃক গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে তথ্য জানানোর ব্যবস্থা করা । সরকার জীবন ও সম্পদ বাচানোর তাগিদে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, ত্রান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ কোথায় কোথায় ত্রান সরবরাহ করছে, কিভাবে করছে এ সব ব্যাপারে পাঠককে বিস্তারিত জানাতে হয়।
নিরাপদ পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য সেবা, পূনর্বাসন প্রভৃতি বিষয়গুলো নজরদারি করাসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়া দুর্যোগ সাংবাদিকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে ।

দুর্যোগ পরবর্তি স্তর :

দুর্যোগ পরবর্তীকালিন এই সময়ে সাংবাদিককে পরিস্থিতি, পূনর্বাসন ব্যবস্থাপনা, নতুন উদ্যেমে মানুষের বেঁচে থাকার তাগিদ, চেষ্ঠা, পদক্ষেপ সমূহকে পাঠককে জানাতে হয় । এই পর্যায়ে আসলে কিভাবে দুর্যোগ সংঘটিত হলো, এর ফলে যে বস্তুগত ও অবস্তুগত ক্ষতি সাধিত হয়েছে , সে সব ব্যাপারে বিস্তারিত প্রতিবেন তৈরি করা যেতে পারে । এছাড়া সাংবাদিক যে সব কাজ করতে পারে :

দুর্যোগগ্রস্থ এলাকা ও পাশ্ববর্তি হাসপাতাল থেকে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা ।
তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা ।
পরিবর্তিত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য এলাকা বিবেচনায় জনগনের প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা চিহ্নিত করা ।
রিলিফ ক্যাম্প ও পূনর্বাসন কেন্দ্র সমূহ ভ্রমন করা এবং সেখানকার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন রচনা করা । এ সময় জনসাধারনের স্বাস্থ্য, সেনিটেশন প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ত্রান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষন করা ।
দুর্যোগ সাংবাদিক দুর্যোগ পরবর্তি কালীণ সময়ে দুর্গত জনগনের মতামত জরিপ করে সেটা প্রকাশ করতে পারেন, যেখানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সাথে জড়িতে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহিত পদক্ষেপ ও দুর্যোগ আক্রান্ত লোকজনের চাহিদা, সমন্বয়ের বিষয়গুলো উঠে আসতে পারে ।
নিয়মিত দুর্যোগ পরবর্তি পুনর্বাসন কার্যক্রমসমূহের ফলোআপ সংবাদ করা ।

দুর্যোগ প্রতিবেদন রচনার মৌল বিষয়সমূহ
দুর্যোগ প্রতিবেদনের কার্যকারিতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম কে অনেক গতিশীল ও ফলপ্রসূ করে তুলতে পারে । পাশাপাশি একজন সাংবাদিকের দুর্গত মানুষের সমস্যা, সুবিধা তুলে ধরে মানবতার পাশে দাড়ানোর যে দায়, সেটাও পূরণ করা হয় । দুর্যোগ বিষয়ে প্রতিবেদন রচনার ক্ষেত্রে সাংবাদিককে কিছু বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়, যেগুলা দুর্যোগ প্রতিবেদনকে প্রতিবেদন হিসেবে সফল ও কার্যকর করতে সাহায্য করতে পারে । নিচে কিছু বিষয়ের অবতারনা করা হলো :

কি : সংঘটিত দুর্যোগ ( ঘূর্ণিঝড়, ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস, বন্যা, শৈত্যপ্রবাহ, খরা প্রভৃতি )

কে/ কাকে নিয়ে : দুর্গত ব্যাক্তি, হতাহত লোকজন, বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি ( পুরুষ, মহিলা, শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী জনসাধারনের উপর প্রভাব ।

কোথায় : দুর্যোগগ্রস্থ এলাকা , যাকে ঝুকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং দুর্যোগের কারনে ব্যপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে ।

কখন : দুর্যোগ সংঘটন পূর্ব , দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তি সময়ে ।

কেন : সাধারনত দুর্যোগ কেনো সংঘটিত হলো, এর পেছনের ভৌগলিক ও জলবায়ু পরিবর্তনগত কারনসহ এর পেছনের ক্রিয়াশীল উপাদানগুলো কিকি, দুর্যোগ সংঘটনের ব্যপারে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অবস্থানসমূহ ।

প্রতিবেদনের পাঠক সংশ্লিষ্ঠতা : প্রতিবেদন ও এতে সরবরাহকৃত তথ্য পাঠক সংশ্লিষ্ঠ কিনা এবং প্রদত্ত তথ্য পাঠক আগ্রহী করে উপস্থাপন করা হচ্ছে কিনা ।

প্রতিবেদনের প্রভাব : প্রতিবেদন টি প্রয়োজনীয় প্রভাব রাখতে পারবে ? এর মাধ্যমে টার্গেট পিপল কি উপকৃত হবে ? প্রতিবেদন কি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমসহ এর নীতি ও প্রস্তুতির বিষয়ে সাহায্য করতে সক্ষম হবে ?

প্রয়োজনীয় নির্দেশনা : প্রতিবেদনে দুর্যোগ মোকাবেলা, এর ঝুকি ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকল্পে দুর্গত লোকজনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা থাকতে পারে । তারা বিপেদে আপদে কাদের সাথে, কিভাবে যোগাযোগ করবে , সে ব্যাপারেও তথ্য থাকতে পারে ।

দুর্যোগ প্রতিবেদনের গঠনশৈলী :

সূচনা : পাঠককে সংবাদের দিকে টেনে আনার জন্য প্রতিবেদনের সূচনা পাঠক আগ্রহী করে তুলতে হবে । তবে সেখানে যেনো তথ্য বিকৃতি বা সংবাদকে সেনসুয়ালাইজড করা না হয়, সে ব্যাপারেও মনোযোগি হতে হবে ।

সংবাদ প্রতিবেদনের মূল ফোকাস কি হবে, সে ব্যাপারটা চিহ্নিত করতে হবে ।

প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ গুরুত্বানুসারে সাজাতে হবে, যাতে সেটা পাঠক আগ্রহী হয়ে ওঠে ।

পাশাপাশি প্রতিবেদন তৈরির জন্য পর্যাপ্ত তথ্য আছে কিনা, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে ।

সংবাদ প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে প্রধান বিষয়গুলো আগে সাজাতে হবে । তারপর সেকেন্ডারি তথ্য সমূহ সাজাতে হবে ।

দুর্যোগ প্রতিবেদন তৈরির সময় বিভিন্ন পরিভাষা ও জার্গনসমূহকে সহজবোধ্য ভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে পাঠকের বুঝতে কোনো অসুবিধা না হয় ।

প্রতিবেদনের আকার অনেক গোছালো হতে হবে । অপ্রয়োজনীয় তথ্য, উক্তি সমূহ ছেটে ফেলে প্রতিবেদনকে মেদমুক্ত করার পাশাপাশি বাক্য গঠনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে ব্যবহৃত বাক্যে বাড়তি, অপ্রয়োজনীয় শব্দ না থাকে ।

প্রতিবেবদন তৈরির সময় এর পাঠক চিহ্নিত করে নেতে হবে । কাদের জন্য প্রতিবেদনটি রচিত হচ্ছে, সেটা নির্ধারন করে উদিষ্ঠ পাঠক মনস্তত্ব, দুর্যোগ বিষয়ে তাদের জ্ঞানগত স্তর বিবেচনা করে প্রতিবেদন নির্মান করতে হবে ।

প্রতিবেদনের সাথে পূর্বতন সংশ্লিষ্ঠ ঘটনাসমূহ কি পরিমান, কোন মাত্রায় ব্যবহার করা হবে, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখা জরুরী ।

প্রতিবেদনে ব্যবহৃত টেকনিক্যাল শব্দ ও বিষয়সমূহ পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষন থাকতে হবে । এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উধাহরন ব্যবহার করে পাঠককে এসব শব্দ বা পরিভাষা সমূহ বুঝতে সাহায্য করতে হবে ।

বিভিন্ন সংখ্যাত্বক বিবরন, গ্রাফ, পরিসংখ্যান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে । ব্যবহৃত পরিসংখ্যান যাতে পাঠকের মধ্যে দ্বিধা তৈরি না করে সেটা নজরে রাখতে হবে ।

দুর্যোগ প্রতিবেদনের অন্যান্য দিকসমূহ

ভারসাম্য : প্রতিবেদন রচনার সময় এতে ব্যবহৃত সংবাদ উৎস সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে । ব্যবহৃত উৎসসমূহের যাতে ভারসাম্য বজায় থাকে, সংশ্লিষ্ঠ সব কর্তৃপক্ষ ও গোষ্ঠির বক্তব্য যাতে গুরুত্বানুযায়ী সমানভাবে স্থান পায়, সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে ।

সংবাদ উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা : সংবাদ প্রতিবেদনটি যে সব উৎসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হবে, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে । প্রয়োজনে অন্য বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ উৎসের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ও ধারনাসমূহকে মূল্যায়ন করে নিতে হবে । পাঠককে পর্যাপ্ত তথ্য দিতে হবে, যাতে সে সংবাদ উৎসকে নির্ভরযোগ্য ভাবতে পারে ।

একটিভ রিপোটিং : দুর্যোগ প্রতিবেদককে প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী হতে হবে । সর্বদা সরকারী বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ঠ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ ও দুর্যোগ সম্পর্কিথ আপডেট তথ্য, বিভিন্ন প্রেস রিলিস সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে ।
প্রতিবেদনকে শক্তিশালী করে তুলবার জন্য দুর্যোগ আক্রান্ত এলাকায় যাওয়া, দুর্গত লোকজনের স্বরকে তুলে আনার চেষ্টা করতে হবে । বিতর্কিত বিষয় ও ইস্যূ, যদি থাকে, সেগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে আলাপ করতে হতে পারে ।

সংবাদ উৎস : বিভিন্ন ধরনের সংবাদ উৎস সংবাদ প্রতিবেদনকে যেমন শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি একে ভিন্ন ও শক্তিশালী মাত্রাও দিতে পারে । দুর্যোগ প্রতিবেদন করার সময় সাধারনত যে সব উৎসের সাথে সাংবাদিককে যোগাযোগ রাখতে হয় :

১. জাতীয় ও আঞ্চলিক সরকারি কর্মকর্তা, যারা দুর্যোগ সম্পর্কিত বিষয়ে দায়িত্বরত ও অবগত আছেন ।
২. দুর্যোগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ।
৩. বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সংশ্লিষ্ঠ গবেষক ।
৪. হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা বিজ্ঞানী ।
৫. দুর্গত এলাকায় কর্মরত পুলিশ, সেনাসদস্য, ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ।
৬. বিশেষজ্ঞ এনজিও কর্মী ।
৭. দুর্যোগ সংশ্লিষ্ঠ বিষয়ে আন্তজার্তিক প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ ব্যাক্তি ।
৮. দুর্যোগ আক্রান্ত ব্যাক্তিবর্গ
৯. আঞ্চলিক ভাবে দুর্যোগ মোকাবেলার সাথে সম্পর্কিত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের কর্মী ।
১০. প্রত্যক্ষদর্শী , যারা দুর্যোগকালীন সময়ে ঘটনাচক্রে পুরো বিষয়টিকে অবলোকন করেছেন ।
১১. বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান সমূহ, আবহাওয়া অফিসসমূহ ।

দুর্যোগ প্রতিবেদনের বিভিন্ন ধরন ও উপযোগিতা:

সংবাদ প্রতিবেদনের কাঠামো ও গঠনগত ভিন্নতা এর প্রভাব কেমন হবে, অনেকক্ষেত্রে সেটা নির্ধারন করে দেয় । দুর্যোগ কালীন সময়ে করা একটা ফটোফিচারই হয়তো দুর্যোগ সম্পর্কে পাঠকের মনোভাবকে অধিকমাত্রা তীব্রতর ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে । আবার দুর্যোগের সময়ে সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও দূর্নীতি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পুরো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে । বিভিন্ন ধরন ও কাঠামোর সংবাদ প্রতিবেদনের উপযোগিতা সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো :

ফটো ফিচার : কথায় বলে, ১ টা ছবি ১০০০ শব্দের চেয়ে বেশি কথা বলে। দুর্যোগ আক্রান্ত সময়ে ফটো সাংবাদিকতার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেকগুনে বেড়ে যায় । লিখিত প্রতিবেদনের চেয়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া দুর্যোগগ্রস্থ এলাকার ছবি, বিপন্ন মানুষের মুখ পাঠককে বেশি আকৃষ্ট ও প্রভাবিত করে তেমনি দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে দৃশ্যমান ধারনা লাভ করতে সাহায্য করে ।
ফটোফিচার করার মাধ্যমে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাব বৃদ্ধি পায় ।

মানবিক আবেদনমূলক ফিচার : দুর্যোগ কালীন সময়ে মানবিক আবেদন মূলক প্রতিবেদন খুব শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে । চরিত্রগত কারতে মানবিক আবদেনমূলক প্রতিবেদন বা ফিচার মানুষকে বেশি টানে । আর দুর্গত মানুষের প্রতিমূহুর্তের সংগ্রাম , দুর্যোগের সাথে তার টিকে থাকার লড়াই ফিচারের ঢং এ তুলে আনলে দুর্যোগের সময়কার পুরো বিষয়টা সম্পর্কে পাঠক হুবুহু ধারনা পেতে পারে, যা সংবাদের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না ।

ব্যাখ্যামুলক সংবাদ : পাঠক সব কিছুর বিশ্লেষন জানতে চায় । দুর্যোগের মতো বিষয়ে তার জানার চাহিদা আরও বেশি । দুর্যোগ কেনো হলো, এটাকে মোকাবেলা ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস কিভাবে করা যাবে, দুর্যোগ পরবির্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ঠ কৃর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহিত পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন খুব কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারে । এছাড়া ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের মাধ্যমে সরকারসহ নীতি নির্ধারক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের করনীয় সম্পর্কে নির্দেশনা বা পরামর্শ দেয়ার সুযোগ থাকে ।

অনুসন্ধানী সংবাদ: দুর্যোগের ঝুকির মধ্যে পড়ে থাকা সব থেকে প্রান্তিক মানুষটি বা দুর্যোগের ত্রান ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের কোনো অনিয়ম, দূর্নীীতির ঘটনা তুলে আনাটা সাংবাদিকের কর্তৃব্য । সেক্ষেত্রে অনুসন্ধানী সংবাদের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ঘটনার ভেতরের ঘটনা গুলো তুলে আনা একই সাথে সংবাদ প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকের দায়িত্ব । দুর্যোগের সঠিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ভূমিকা অনস্বীকার্য ।

সাক্ষাতকার : দুর্যোগের ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার সাধারনত বিভিন্ন জায়গা থেকে নেয়া যায় । ভুক্তভোগির যেমন বিপন্নতা আর দূবির্ষহ বাস্তবতাকে পাঠক ও ত্রান ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত লোকজনের কাছে পৌছে দেয়া যায় সাক্ষাতকারের মাধ্যমে, তেমনি কর্তৃপক্ষ বা বিশেষজ্ঞ ব্যাক্তির সাক্ষাৎকার প্রকাশের মাধ্যমে দুর্যোগ দুর্গত পাঠককে কাছে নিত্য নতুন সিদ্ধান্ত, বিষয় সম্পর্কে অবগত করা যায় । সাক্ষাতকার প্রকাশের মাধ্যমে তথ্য মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্যোগের ঝুকি ও প্রস্তুতিমূলক কাজে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা সহজতর ।

নিয়মিত সংবাদ বুলেটিন ও ফলোআপ সংবাদ : খুব দ্রুত সময়ে, তাৎক্ষনিক ভাবে দুর্যোগর বিভিন্ন তথ্য ও নিদৃষ্ট সময় পর পর সংবাদের ফলোআপ ও বুলেটিন সংবাদ দুর্যোগ কালীন সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ । এগুলোর উপর ভিত্তি করেই সাধারন জনগন দুর্যোগ কালীন সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয় ।

টেলিভিশন মিডিয়া দুযোর্গ পূর্ববর্তি সময় বিভিন্ন নির্দেশনা ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে জনগনকে সঠিক ও প্রয়োজনীয় তথ্য, ধারনা, জ্ঞান সরবরাহের মাধ্যমে সচেতন করে তুলতে পারে । তাৎক্ষনিক বিপদ মোকবেলা সহ দীর্ঘকালীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সফল করার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুষ্ঠান কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে ।

দুর্যোগ প্রতিবেদন তেরির ক্ষেত্রে সাংবাদিক যা যা করবেন না :

দীর্ঘ বাক্যে প্রতিবেদন রচনা থেকে বিরত থাকবেন, যাতে সংবাদ প্রতিবেদনের পঠনযোগ্যতা বাড়ে ।

দীর্ঘ পরিচ্ছদ রচনা থেকে বিরত থাকবেন এবং একটি পরিচ্ছদে একাধিক বিষয়ের আলোকপাত করবেন না ।

পাঠকের বোধগম্য নয় এমন শব্দ ব্যবহার করবেন না ।

অতিরিক্ত মাত্রায় টেকনিকাল পরিভাষা বা জার্গন ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন ।

দীর্ঘ, বিরক্তি উদ্রেককারী, অর্থহীন উক্তি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন ।

ভুল বাক্য, ভুল শব্দ প্রয়োগ বা প্রতিবেদনে ব্যাকারণগত ভুল না করার ব্যপারে সচেতন থাকবেন ।

অস্পষ্ঠ, দুর্বোধ্য গ্রাফ, পরিসংখ্যান, সংখ্যাগত হিসেব, ইলাস্ট্রেশন সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকবেন ।

ধারনার উপর প্রতিবেদন রচনা করবেন না । তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নিশ্চিত না হয়ে তথ্য ব্যবহার করবেন না ।

দুর্যোগ সাংবাদিকতায় নিউজরুমের প্রস্তুতি :

দুর্যোগ দেখা দিতে পারে হঠাৎ করেই । আর সেজন্য সাধারন জনগন, সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের তথা তার নিউজ রুমের থাকতে হয় আলাদা প্রস্তুতি । দুর্যোগ সংবাদ সরবরাহের ক্ষেত্রে মূলত প্রতিদিনকার বেশির ভাগ সংবাদের বাইরে সাংবাদিককে দুর্যোগ সংক্রান্ত ব্রেকিং নিউজটি দিতে হয় । এবং জরুরি ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারনে নির্দৃষ্ট সময় পর পর ফলোআপ, বুলেটিনসহ দুর্যোগের সকল ধরনের তথ্য সরবরাহ করতে হয় । আর এসব কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় নিউজরুমকে । প্রতিটি নিউজরুমে দুর্যোগ পরিকল্পনা গাইড থাকতে হয়, যার কপি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিবেদকের কাছে থাকা জরুরী । দুর্যোগ পরিকল্পনা গাইডটিতে যে সব বিষয় থাকতে পারে :

সংবাদ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক প্রতিবেদকের যোগাযোগের ঠিকানা । প্রয়োজনে ম্যাপ সহকারে তার বাড়ির বিস্তারিত ঠিকানা । যদি দুর্যোগ এসে পড়ে, তাহলে কেউ যেন দ্রুততার সাথে দুর্গত অঞ্চল থেকে সংবাদ প্রেরন করতে পারে, সে জন্য ব্যবস্থা করে রাখা ।

তাৎক্ষনিক কভারেজ দেয়ার ক্ষেত্রে একটি ‘স্টার্ট-আপ-গাইড’ সরবরাহ করা যেতে পারে, যেটা অনুসরন করে সংবাদকর্মীরা দুর্যোগ সংবাদ প্রচারের কাজ শুরু করবেন ।
দুর্যোগ কালীন সময়ে তথ্য সংগ্রহ থেকে সেটাকে সংবাদ আকারে প্রচারের পুরো প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পাদিত হবে , সে বিষয়ে হুবুহু গাইড লাইন থাকতে হবে । কোন প্রতিবেদন নিউজ কভার করার জন্য দুর্গত অঞ্চলে যাবেন, অফিসে বসে কে পাঠানো সংবাদটি সম্পাদনা করবেন বা তথ্য সংগ্রহের কাজের জন্য ফোন বা মোবাইল রিসিভ করার কাজটি পর্যন্ত কে করবেন, সে বিষয়টিও পরিপূর্ন ভাবে লিখিত থাকতে হবে ।

সংশ্লিষ্ঠ বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া অফিস, জরুরী সাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসহ দুর্যোগ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যাক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগের জন্য পূর্নাঙ্গ তথ্য, মোবাইল বা ফোন নাম্বার, ই-মেল ঠিকানা থাকতে হবে ।

বিভিন্ন আঞ্চলিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান, ফ্রি ল্যান্সার হিসেবে কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকতে হবে ।

জেনারেটর, যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস তাৎক্ষনিক ভাবে পাওয়ার জন্য যোগাযোগের তথ্য সংযুক্ত থাকতে হবে দুযোর্গ পরিকল্পনা গাইডটিতে ।

মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে এভাবে দুর্যোগ পরিকল্পনা গাইড করার পাশাপাশি কর্মরত সাংবাদিকদের দুর্যোগ প্রতিবেদনের কলাকৌশল ও গুরুত্বপূর্ন বিষয়গুলো শেখানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যেগ নিতে পারেন । এছাড়া দুযোর্গ কালীন সময়ে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের নিজেরও দুর্যোগ মোকাবেলা সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয় । মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের যদি দুর্যোগের ক্ষেত্রে ঝুকি থাকে, তবে নিউজরুমের ব্যাক-আপ পরিকল্পনা থাকতে হবে । যদি বিদ্যুত না থাকে বা কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যায়, কম্পিউটারের বিভিন্ন ডাটা, গুরুত্বপূর্ন ফাইলপত্র ব্যাক-আপ রাখাটা জরুরি । যোগাযোগের সমুদয় তথ্য, নাম্বারও ব্যাক আপ করে রাখা দরকার । দুর্যোগের মুহূর্তে যদি কোনো রকমে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান থেকে বার্তা সরবরাহ করা না যায়, সেক্ষেত্রে বিকল্প কি হতে পারে , সেটা ভেবে রাখতে হবে ।

শেষ কথা
দুর্যোগ সাংবাদিকতা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি প্রশোমন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে গতিশীলতা দান করে । পাশাপাশি পরবর্তি দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনার ব্যপারে জনসাধারনকে সচেতন করার বিষয়টি ও করে । ১৯৭০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলে যে ভয়াবহ সাইক্লোন হয়েছিলো, তাতে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের প্রানহানি হয় আর গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রায় ১.৩ মিলিয়ন মানুষ । ১৯৮৫ সালেও একই অঞ্চলে প্রায় একই ধরনের সাইক্লোন আঘাত হানে, কিন্তু এবার ক্ষয়ক্ষতি ও জীবনহানির মাত্রা অনেক কমে যায় । আইডিএনডিআর এর পরিচালক ড. ওলাভী ইলোর মতো , এইবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুর্যোগসংঘটন পূর্ব সতর্কতা সরবরাহ ও জনগনের পূর্বপ্রস্তুতি বেশি ছিলো , যে কারনে ১৯৭০ সালের তুলনায় খুব কম প্রানহানি ঘটে , যা শতকরা হিসেবে মাত্র ৩% বা ১০ হাজার । একইভাবে ১৯৯৪ সালে এই অঞ্চলে আবারও ভয়ানক সাইক্লোন দেখা দেয়, যেখানে প্রানহানীর সংখ্যা ছিলো ১ হাজারের ও কম । বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রস্তুতি কেন্দ্রের পরিচালক মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের মতে, এ এসময় রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে আগাম সর্তকতা ব্যবাস্থা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি প্রমোশনে দারুন ভুমিকা রেখেছে । তিনি তৎকালীন সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকার ভূয়শী প্রশংসা করেন । গবেষকরাও দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরনে দুর্যোগ সাংবাদিকতার বিষয়টি উল্লেখ করেন । ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে ১৯৭৭ সালে ঝড়ের কারনে যেখানে প্রায় ১০,০০০ লোকের প্রানহানী ঘটে , সেখানে মাত্র ১৩ বছর পরে একই রকম ঝড়ে প্রানহানীর সংখ্যা কমে হয় ৯১০ জন । এই প্রানহানী হ্রাসের ক্ষেত্রে দুর্যোগ পরবর্তিকালীন সময়ে গণমাধ্যমের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ভূমিকা অনস্বীকার্য ।
বাংলাদেশের মতো উচ্চ দুর্যোগ ঝুঁিকপূর্ণ দেশে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস ও জনগনকে সচেতন করার জন্য মিডিয়া ভূমিকা অনস্বীকার্য । এক্ষেত্রে সরকারকে যেমন দুর্যোগ সাংবাদিকতার চর্চা বাড়াতে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে হবে, তেমনি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্যোগ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষন, মিডিয়ায় সেটা টেলিভিশন বা সংবাদপত্র যাই হোক না কেনো, বেশি বেশি পরিমানে দুর্যোগ সংশ্লিষ্ঠ সংবাদ, সতর্কতা ও সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করতে হবে ।

তথ্যসূত্র :
১. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সহায়িকা, ডিজিস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট, কেয়ার-বাংলাদেশ, জুলাই ২০০২ খ্রি : ।
২. দুর্যোগ কোষ, পান্ডুলিপি-মুহাম্মদ সাইদুর রহমান, সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচী ( সিডিএমপি), জুলাই ২০০৯ খ্রি : ।
৩. দুর্যোগের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন উপক’লের সাংবাদিকরা, বাংলা নিউজ ২৪ ী ৭. কম , রবিবার ১৯ জুন, ২০১১ খ্রি : ।
৪. National Plan for Disaster Mamagement 2010-2015, Disaster Management Bereau, April 2010, Dhaka.
৫. Disaster Reporting Handbook, UN Disaster Risk Management Joint Programme, UNDP/NDMA Pakistan, 2011.
৬. Reuters Reporters Handbook, Reuters Foundation, April 2006.
৭. The role of news media in natural disaster risk and recovery, Brian Miles, Stephanie Morse, The Rubenstein School of Environment and Natural Resources, The University of Vermont, ELSEVIER 2006.
৮. Role of media in disaster Management: A studyof flood 2009 and print media (English) in Gujarat State, Dr. R. J. Yadav, Department of Banking, Malaviya College of Commerce, Rajkot, 2009.
৯. Disaster Information Kit for the Caribbean Media, Caribbean Disaster Emergency Response Agency (CDERA), Barbados 2004.
১০. Media in Disaster vs Media Disasters, Jude FernandoClark U, Anthropology News • April 2010.

১১. Disaster and Crisis Coverage by Deborah Potter and Sherry Ricchiardi, International Centre for Journalists.