সাভার ট্র্যাজেডি: যোগাযোগ সমন্বয়হীনতা ও মিডিয়ার মানবিক মূল্যবোধ

সোমবার, মে ১৩, ২০১৩

তানভীর আহমেদ ::

tanvir ahmedসাভার ট্র্যাজেডির পর গণমাধ্যমে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য এবং সংবাদ পরিবেশনে টেলিভিশন সংবাদকর্মীদের দায়িত্বপালন নিয়ে সামাজিক নেটওয়ার্কজুড়ে যে পরিমাণ সমালোচনা হয়েছে, এতে করে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীর গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্য ও মিডিয়াকর্মীদের মানবিক মূল্যবোধের জায়গাটি ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

সাভারে ভবন ধসে পড়ার পরপরই বিবিসিকে দেয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেফাঁস মন্তব্য ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে সব মহলে। মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর ইউটিউব ও ফেইসবুকে বেশ কয়েকটি ভিডিও শেয়ার্ড হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে কয়েকজন তরুণ ইউরোপের কোনো একটি শহরের কয়েকটি উঁচু ভবনের নিচে গিয়ে ভবনের পিলার ধরে নাড়ছে আর বলছে, কই বিল্ডিং তো পড়ে না! আরেকজন পাশে থেকে বলছে, কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বললেন বিল্ডিংয়ের পিলার ধরে নাড়ার কারণে রানা প্লাজা ধসে পড়েছে, তাই আমরাও দেখছি এখানে ধাক্কা দিয়ে বিল্ডিং ফেলা যায় কি না!

দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সংসদে বলে ফেললেন, তিনি সাভার যুবদলের তালিকা সংগ্রহ করেছেন সেখানে রানার নাম নেই! কিন্তু ইতিমধ্যে যে সাভার যুবলীগের নেতা রানার রাজনৈতিক পরিচয় ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি মুরাদ জংয়ের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ ছবি ফেইসবুক আর ব্লগে সয়লাব হয়ে গেছে, প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে সে সংবাদ পৌঁছাননি, হয়তো তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ খরব রাখেনই না।

সংসদে কিংবা গণমাধ্যমে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি কথা বলার আগে যে তার হোমওয়ার্ক করতে হয় সে বিষয়টি মোটেও আমলে নেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগ দফতর। বিবিসিকে একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জানতে চাওয়া উচিত ছিল তাকে কী প্রশ্ন করা হবে এবং উত্তরে তিনি আসলে কী বলবেন।

মন্ত্রী যদি বিবিসিকে ‘কী বলবেন’ সেটি বলার আগে পড়ে দেখতেন, তাহলে আমি নিশ্চিত তিনি ওই বেফাঁস মন্তব্যটি করতেন না। এছাড়াও পুরো দুর্ঘটনাটির প্রেসনোট প্রচারের প্রক্রিয়াতে যোগাযোগ সমন্বয়কারী কে হবেন, সেটি নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে চার-পাঁচ দিন সময় লেগে গেছে। যেকোনো দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি তথ্যসেলের মাধ্যমে মিডিয়াকে উদ্ধারকাজের তথ্য সরবরাহ করবে, আর মিডিয়া সে তথ্য জানাবে জনগণকে। কিন্তু প্রথম কয়েকদিন মিডিয়াকর্মীরা এ তথ্যসেলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাই তাদের নিজ দায়িত্বে তথ্য সংগ্রহে অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদভিত্তিক চ্যানেল ‘ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্কের’ (সিএনএন) সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ানা আমানপোর অভিযোগ করেছেন, সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশে তাদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সংবাদ সংগ্রহের ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সিএনএনের সাংবাদিক আমানপোর প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, “বাংলাদেশের তরফ থেকে সিএনএনকে একটি ওয়েভার্স পেপারে সাইন করতে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, যাতে লেখা ছিলোসংবাদ প্রচারের আগে রিভিউ করে সংবাদ বাজেয়াপ্ত করার পূর্ণ অধিকার বাংলাদেশের থাকবে।” সিএনএন সেই শর্তে রাজি হয়নি। কিন্তু আমরা আবার দেখেছি বিবিসি, স্কাই, আল-জাজিরা কিংবা ইউরো নিউজসহ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সাভারের ঘটনা নিয়ে ক্রমাগত সংবাদ প্রচার করেছে। তাহলে সিএনএনের সঙ্গে যোগাযোগ সমন্বয়হীনতা কেন ঘটলো সেটি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

এতকিছুর পর আবার শুক্রবার নয়া দিল্লিতে সাভার ট্র্যাজেডি নিয়ে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, “নট রিয়েলি সিরিয়াস” । সাড়ে পাঁচশত শ্রমিক মারা গেলেও ঘটনা সিরিয়াস নয় বলে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী, তাহলে মৃতের সংখ্যা ঠিক কত হলে সরকার ঘটনাকে ঠিক সিরিয়াস বলবে সেই তথ্য জনগণের জানতে ইচ্ছা করে।

সাভার ট্র্যাজেডিতে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের লাগামহীন বক্তব্যের সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীরাও ক্ষেত্রবিশেষে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভবনধসে পড়ার পর আহত গার্মেন্টকর্মীদের উদ্ধার করতে যেখানে উদ্ধারকর্মীর প্রবেশ করার কথা, সেখানে ঢুকে যাচ্ছেন সংবাদকর্মী! সুড়ঙ্গে একজন সংবাদকর্মী প্রবেশ করে আটকেপড়া শ্রমিকের নাম জিজ্ঞাসের চেয়ে অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন একজন প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী কতটা নির্বিঘেœ সখানে প্রবেশ করে আটকেপড়া জীবিতদের উদ্ধার করতে পারছেন, সেটি বিবেচনায় আনা। দুই ডজন টিভি চ্যানেলের চার ডজন সংবাদকর্মী, গোটা পঞ্চাশেক ফটোসাংবাদিক মিলে যদি রানা প্লাজার ধসেপড়া ভবনের সুড়ঙ্গে ঢুকে ফটো ফ্লাশ করতে থাকেন, তাহলে উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার ওপর আশপাশের উৎসুক জনতা যেভাবে এলাকাটিকে ঘিরে রেখেছেন তাদের ভিড় ঠেলে উদ্ধারকর্মীরা গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো ধৃষ্টতা দেখানো বা সে নীতিমালা রয়েছে কি না সেটিও জানেন না নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। তাই তাদের পক্ষে মিডিয়াকে কর্ডন করে আটকে দেয়ার মতো সামর্থ্য নেই।

এক্ষেত্রে তাহলে করণীয় কী? মিডিয়া কি তথ্য সংগ্রহ করবে না? উত্তরটি দেয়ার আগে দুয়েকটা উদাহরণ দেই। ২০০৫ সালে আমি লন্ডনে পাতাল রেলে বোমা হামালার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখি, যে স্থানটিতে বোমা হামলা হয়েছে সে স্থানের চারপাশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কর্ডন করে রেখেছে, কোনো নিরাপত্তাকর্মী ছাড়া অন্য কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারছিলেন না, মিডিয়াকর্মীদের কেউ জোর করে প্রবেশ করতে চেয়েছেন এমনটা চোখে পড়েনি। একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর পুলিশ ও উদ্ধারকাজে নিয়োজিত দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রেসব্রিফিংয়ে জানাচ্ছিলেন উদ্ধার প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে, মৃতের সংখ্যাইবা কত, আর পুরো প্রক্রিয়াটিতে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছিল হামলাকারীদের ধরতে সরকার কী কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতালগুলোর ভেতরেও ছিল ফিল্মিং নিষেধাজ্ঞা। সংবাদকর্মীরা প্রেসনোটের জন্য অপেক্ষা করেছেন, কোনো সাংবাদিক পাতাল রেলের ভেতরে ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করেননি বা করতে দেয়া হয়নি। পুলিশ কর্ডন করে রাখলে সেখানে দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছাড়া আর কারো প্রবেশ করার অধিকার থাকে না, এটি যুক্তরাজ্যের আইন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার ধস ও সম্প্রতি বস্টনে বোমা হামলার পর আমরা মৃতদেহের ছবি দেখিনি, মৃতদেহ বের করার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিহতের সংখ্যার তথ্যগত সমন্বয়হীনতা দেখা যায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে একেক গণমাধ্যমে একেক রকম সংখ্যা এসেছে, আর বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া তো বলেই ফেলেছেন, সরকার লাশ গুম করছে!

দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের লাগামহীন বক্তব্য আর গণমাধ্যমকর্মীদের সমন্বয়হীনতা হতো না যদি দুর্ঘটনার পর পর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এলাকাটিকে কর্ডন করে ফেলতেন। মিডিয়ার জন্য একটি তথ্যসেল করে নির্দিষ্ট সময় পর পর ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করা যেত। মিডিয়াকে অবশ্যই তথ্য জানাতে হবে, তবে সে তথ্য দায়িত্বশীল ব্যক্তির মাধ্যমে প্রকাশ হওয়াটা জরুরি।

টুইন টাওয়ারের মতো ভবনের ভেতরেও উদ্ধার কাজ চলছে, নিশ্চয়ই শাহীনার মতো অনেকেই সেখানে কেঁদেছেন কিন্তু সেখানে পশ্চিমা সাংবাদিকরা পেশাদারিত্ব দেখিয়ে পুলিশি কর্ডনের বাইরে অপেক্ষা করেছেন আর বাংলাদেশের সাংবাদিকরা, সাংবাদিকতার পাশাপাশি তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধ্বংসস্তূপের ৭২ ফুট নিচে গিয়ে জানতে চেয়েছেন শাহীনা কেমন আছেন, সংবাদের ভিডিও ধারণের পাশাপাশি তাকে অক্সিজেন কিংবা পানি দিয়ে সহায়তা করেছেন। দেশবাসীকে জানিয়েছেন ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রাণের অস্তিত্ব আছে। এটিই হয়তো আমাদের সংস্কৃতি, পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমরা অনেক মানবিক। ট্র্যাজেডি হয়তো অন্যদিকে মোড় নিত যদি সুড়ঙ্গ পথে কোনো সাংবাদিক আটকে যেতেন অথবা আগুনের কুণ্ডলীর মধ্যে যদি কোনো সংবাদকর্মীর মৃত্যু ঘটত, তাহলে কাকে দোষ দিতাম আমরা?

তাই এ ধরনের ঘটনায় মানবিকতার নরম মানুষটাকে বেঁধে ফেলতে হবে পেশাদারিত্ব দিয়ে। এখানেই আমরা থেমে থাকিনি, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিবেদক জুতা পায়ে নেমে পড়েছেন নিহতদের জন্য তৈরি কবরস্থানে! টেলিভিশন চ্যানেলের ওই প্রতিবেদক তার পিস টু ক্যামেরা (পিটিসি) দেয়ার ক্ষেত্রে কবরে জুতাসহ নেমে ভিডিওচিত্র ধারণকে যথাযথ মনে করেছেন। যদিও প্রতিবেদক বলেছেন সেই ছবি প্রচার হয়নি, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটি স্পর্শকাতর ছবি প্রচার হওয়ার পর বিতর্কিত হয়েছে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। সাংবাদিক হলেই আমি সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যাবো, ক্যামেরা আর বুম নিয়ে প্রবেশ করবো সংরক্ষিত স্থানে, আমাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না, এমন দৃষ্টিভঙ্গি মিডিয়ার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

বংলাদেশের সংস্কৃতিতে মানবিক মূল্যবোধের জায়গাটিতে হয়তো নীতিমালার শেকল দিয়ে বাঁধা যাবে না, কিন্তু একজন সাংবাদিক দায়িত্বপালনে আরো বেশি পেশাদারি হবেন এমনটাই কাম্য, অন্যথায় উদ্ধারকাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে নষ্ট হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ আলামত। তবে টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে যেসব তরুণ কর্মী কাজ করছেন তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে মাঠে ছাড়ার দায়িত্ব সংশ্নিষ্ট চ্যানেলের ওপরই বর্তায়। সাভার ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের মিডিয়াকর্মীরা যদি ভবিষ্যতে এ বিষয়গুলোর দিকে আরেকটু নজর দেন তাহলে যেকোনো দুর্যোগে মিডিয়ার মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের সম্ভাবনা কমবে।

তানভীর আহমেদ: একাত্তর টেলিভিশনের লন্ডন প্রতিনিধি।
Email: [email protected]