গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সরকারভেদে পরিবর্তন হয় যার সংজ্ঞা

রবিবার, ১২/০৫/২০১৩ @ ১০:৩০ অপরাহ্ণ

ইব্রাহিম বিন হারুন ::

ibrahimভার্সিটিতে পড়ার সময়ে বেশ কয়েকবার অপরাজেয় বাংলার উপরে উঠতে হয়েছে আমাকে। গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের ওপর কোন ধরনের হামলা হলে, আমাদের বিভাগের পক্ষ থেকে যে প্রতিবাদের আয়োজন করা হতো, তার অংশ হিসেবে মাঝেমধ্যে ভাস্কর্যগুলোর চোখে কালো কাপড় বাঁধতাম আমি। বুঝাতে চাইতাম, আমাদের দেখতে দাও,দেখার সব বাধা দুর করে দাও। তখন সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের হয়রানি-নিপীড়ন হয়তো খুব নিয়মিত ঘটনা ছিল, তাই বেশ কয়েকবারই কাজটি করতে হয়েছে। এমন প্রতিবাদ নিয়ে আমাদের, শিক্ষার্থীদের, বেশ আগ্রহ-উত্তেজনা ছিল। তবে এর পুরোভাগে থাকতেন বিভাগের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ) সম্মানিত শিক্ষকরা। একটি ব্যানার নিয়ে সবাই দাঁড়াতাম অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে; ফটোসাংবাদিকরা ছবি তুলতো, শিক্ষকরা বক্তব্য দিতেন। একটি বক্তব্য খুব মনে পড়ে, ‘জানালা খোলা রাখলে ধুলোবালি আসবেই, তাই বলে জানালা বন্ধ করা যাবে না।‘ স্বাধীন গণমাধ্যমের পক্ষে বিভাগের এমন অবস্থানে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব গর্বিত বোধ করতাম। সাংবাদিক হত্যা, সাংবাদিক নির্যাতন, এমনকিমনে পড়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অলোক স্যারের আত্মহত্যার ঘটনায় সরকারকে দোষারোপ করে আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। ক্যাম্পাস ছেড়ে আসার পরও দেখেছি, আমার বিভাগের শিক্ষকরা গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টার বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। কিছুদিন আগেই, ইউটিউব বা ব্লগ বন্ধের ঘটনায় তাদের লেখাবা বিবৃতি দেশবাসী দেখেছে।

তবে, অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, বিকল্প মাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ নিয়ে সোচ্চার সে-ই শিক্ষকরা পরপর কয়েকটি মূলধারার গণমাধ্যম বন্ধের পরও নিশ্চুপ। যে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একজন সাংবাদিকের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদে রাস্তায় নামতাম, শত শত সাংবাদিকের পেটে লাথি মারার পরও তাদের কোন প্রতিক্রিয়া নেই। আমি বাস্তবতা বুঝি; স্বীকার করি, যে দুটি চ্যানেল বা পত্রিকাবন্ধ করা হয়েছে সেগুলোর কর্মকাণ্ড বিতর্কিত, মালিকানা জামাতিদের। আমি জীবনে কখনো সজ্ঞানে ইসলামিক টিভি দেখেছি বলে মনে পড়ে না, সবমিলিয়ে ৫ মিনিটও দিগন্ত টিভি দেখেছি কিনা সন্দেহ। তবে, আমার সহপাঠী, আমাদের বিভাগের ছাত্রী নাদিরা ইয়াসমিনের মতো অনেক সাংবাদিকই দিগন্ত টিভিতে চাকরি করছেন। একেবারে ছোটবেলা থেকে কচিকাঁচার আসর করা নাদিরা তো প্রগতিশীলতার কোন মানদণ্ডে কারো চেয়ে পেছনে না। তাহলে ওর কী দোষ! ওর আয়ের পথটা কেন হুমকিতে পড়লো। আর রাতের আঁধারে, বিনা নোটিশে, গায়ের জোরে কি একটি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া যায়? এই যুগেও এটা মুখ বুজে মেনে নিতে হবে!

আমি জানি, আমার বিভাগের অনেক শিক্ষকই নিজস্ব ফোরামে চ্যানেল বন্ধের সমালোচনা করছেন। তবে কেন বিভাগের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ হলো না-তা বুঝতে পারছি না। এক বন্ধু বললো, ‘প্রতিবাদ না করার কারণ-এখন ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। আর আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, এমন মানুষতো কেউ নেই গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে।‘ তাহলে কি বিএনপির আমলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য যে কর্মসূচি ছিল, তা আসলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবিতে ছিল না! ছিল কেবল রাজনৈতিক স্টান্টবাজি আর মিডিয়ার নজরে ‘মহামানুষ’ হওয়ার কৌশল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সত্যিকার অবস্থান থাকলে সে অবস্থান সব সরকারের আমলেই অপরিবর্তিত থাকার কথা। সরকারভেদে কি এমন একটা মৌলিক অবস্থান পাল্টানো উচিত! নেতিবাচক এই ভাবনা আমি ভাবতে চাই না। আমি ভাবতে চাই, সময়ের অভাব ও ভীষণ ব্যস্ততায় দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি বন্ধের প্রতিবাদে কোন কর্মসূচি পালন করতে পারেননি বিভাগের শিক্ষকরা।আশা করি, ৫-১০ মিনিট সময় বের করে, নামকাওয়াস্তে হলেও, নাদিরার মতো বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য হলেও, বিভাগের পক্ষ থেকে একটা প্রতিবাদের আয়োজন করা হবে। যাতে বিভাগের নৈতিক অবস্থান কিছুটা হলেও ঠিক থাকে।