দুর্যোগকে কেবল সাংবাদিক হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা উচিত

শনিবার, ১১/০৫/২০১৩ @ ৬:০৫ অপরাহ্ণ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ::

22092012090229pmIstiak_Rezaসাভারের রানা প্লাজা থেকে ১৭ দিন পর প্রাণ নিয়ে রেশমার ফিরে আসা এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম। রেশমাকে অভিনন্দন, অভিনন্দন উদ্ধারকারী দলের প্রতিটি সদস্যকে।

কিন্তু এত আনন্দের মধ্যে সাংবাদিকদের দুঃখও আছে। দুঃখ এ জন্য যে, দিনরাত শ্রম দিয়ে তারা জাতিকে যখন শেষ সংবাদটুকু দিয়ে যাচ্ছেন, তখন দুয়েকজন সাংবাদিকের কারণে তাদের তথা পুরো গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা এখন প্রশ্নের মুখে।

রেশমা উদ্ধারের পর উদ্ধারকারী দলের এক সেনা কর্মকর্তাকে একজন সিনিয়র সাংবাদিক যেভাবে প্রশ্নবানে জর্জরিত করছিলেন, তখন অনেকেরই হয়তো মনে হয়েছিল যে, রেশমাকে জীবিত উদ্ধার করতে পারাটাই যেন একটি অপরাধ। এ নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনার ঝড় বইছে, তা সাধারণ সাংবাদিকদের ক্লান্ত করছে, ব্যথিত করছে।

দুর্যোগের সময় জরুরি পেশাজীবী যেমন উদ্ধারকারী দল, স্বেচ্ছাসেবক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মতো গণমাধ্যম কর্মীরাও ছুটে যান ঘটনাস্থলে। তাই তাদের বলা হয় ‘fist-responders’। তারা প্রত্যেকে যে যার অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সবার কাজের মধ্যে একটা সমন্বয় থাকে।

মানুষকে সবশেষ তথ্য দেয়ার যে দায়িত্ব গণমাধ্যমকর্মীরা পালন করেন, তা কিন্তু সহজ নয়। বিশেষ করে টেলিভিশন কর্মীদের জন্য। ঘটনাস্থলে রিপোর্টার আর বার্তা কক্ষে যারা ব্যবস্থাপনায় থাকেন, তারা অনেক সময়ই এক ধরনের সংকটে পড়ে যান, যাকে বলা যায় ‘in the midst of breaking crisis’। এই পরিস্থিতিটা প্রকৃত অর্থেই খুব চ্যালেঞ্জিং আর সেই চ্যালেঞ্জটা এক ‘unusual challenge’ অর্থাৎ যা সচরাচর ঘটে না।

কেননা একদিকে তাদের দায়িত্ব দর্শক-শ্রোতাদের জানানো কী ঘটেছে, কী ঘটছে, কেন ঘটেছে এবং তার ফলাফলই বা কী হতে পারে। সেইসঙ্গে তার পেশাদারিত্ব ও নৈতিক অবস্থানও বজায় রাখতে হয়।

সাভার ট্র্যাজিডি বা তাজরীন ফ্যাশনসের আগুনের মতো ঘটনায় আমরা গণমাধ্যকর্মীদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেখেছি।

এ ধরনের ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীরা তার ডেডলাইন মিস করতে চান না বলে অনেক ঝুঁকি নেন। আগে খবর দেয়ার ক্ষেত্রে একটা প্রতিযোগিতার মনোভাবও থাকে। এই দুই কারণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে অনেক। তবে প্রতিটি পদক্ষেপে সাংবাদিককে সাবধান থাকতে হয়, সমানুভূতির সাথে বিবচেনা করতে হয়, অনুভব করতে হয় তাদের কথা, যারা এই মহাদুর্যোগ থেকে ফিরে এসেছেন, যারা এই ঘটনায় প্রিয়জন হারিয়েছেন। সাংবাদিকের প্রতিটি কথা, বর্ণনা, সাক্ষাৎকার, ছবি প্রদর্শন, সবক্ষেত্রেই প্রিয়জন হারানো মানুষের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়।

সাংবাদিকের কাজ হলো পুরো বিষয়টিকে প্রথমত মানুষ হিসেবে এবং দ্বিতীয়ত সাংবাদিক হিসেবে দেখা। তাই তাড়াহুড়ো করে সাক্ষাৎকার (বিশেষ করে দুর্যোগ থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষের) নেয়ার প্রয়োজন নেই। নিজে দুর্যোগে পড়লে যে ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করে একজন মানুষ, সাংবাদিককেও সেভাবে ভাবতে হয়। তাই কাভারেজের ধরন বুঝতে হয়। তথ্য ও নির্ভেজাল তথ্য দেয়াই সাংবাদিকের কাজ, অনুমাননির্ভর কথা বলা উচিত নয়। বিবেচনায় রাখতে হয়, ঘটনার শিকার যারা, যারা মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন, যারা স্বজন হারিয়েছেন তারাসহ সাধারণ নাগরিক সমাজও এসব সংবাদ দেখছেন।

ঘটনার পরপরই কোনো বিশষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নেয়ার ক্ষেত্রেও বিবেচনা জরুরি। একটা কথা বলে রাখা ভালো, যারা সত্যিকারের বিশেষজ্ঞ তারা কিন্তু কোনো ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রয়া দেন না, তারা স্বীকার করেন, তারা আসলে এতটা জানেন না।

তাছাড়া এখন সাংবাদিকদের আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন থাকতে হয় এ কারণে যে, এখন যুগটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের। সামান্য একটু এদিক-সেদিক হলেই ওইসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুকে ঝড় উঠতে সময় লাগে না। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সামাজিক মাধ্যম বিভাগের পরিচালক লিজ হেরন বলেন ‘Journalists have to almost look at social media as a physical space’। তাই সতর্কতা আর সংবেদনশীলতা আরো বাড়াতে হয়।

আরেকটি বিষয় হলো সামাজিক মাধ্যম থেকে কোনো তথ্য বা ক্লু নেয়ার চেষ্টা করা। কোনো ঘটনায় সমাজিক মাধ্যমে নানা তথ্য আসতে থাকে, নানা ক্লু পাওয়া যায়। এসবের বেশিরভাগই আনেক সময় সত্য হয় না। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্যান্ডি হুক স্কুলের ঘটনায় ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে আততায়ীর নাম। অনেকেই ফেসবুকের সূত্রে রায়ান ল্যাঞ্জা নামে একজনের নাম প্রচার করে দেন। এমনকি তার প্রোফাইল ছবিটিও প্রচার করে দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে আততায়ী ছিলেন রায়ান ল্যাঞ্জার ভাই অ্যাডাম ল্যাঞ্জা। তাই সামাজিক মাধ্যমের কথা বা ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া, রিপোর্ট করার চেষ্টা করা বড় ধরনের সমস্যা ডেকে আনতে পারে।

‘দুর্যোগ কোনো মাধ্যম কতটা দেখাতে পারছে’ – সামাজিক মাধ্যমের এমন একটা চাপও থাকে গণমাধ্যমের ওপর। এমন সংকটের সময় সাংবাদিকদের দেয়া তথ্যগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সাধারণের মধ্যে। তাই খুব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়ে তথ্য দেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

আর এমন সংকটে কর্তৃপক্ষের দিক থেকে সংকট ব্যবস্থাপনার সংকট (crisis in crisis management) হওয়ার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই যারা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকেন, তাদের নিজেদের সমন্বয়টা খুবই জরুরি। গণমাধ্যমের কাছে কোনো তথ্য দেয়ার আগে নিজেদের নিশ্চিত হতে হয়। দুর্যোগস্থলে যোগাযোগ কেন্দ্র থাকা এবং তার ব্যবস্থাপনায় যারা থাকবেন, তারা সকলে গনমাধ্যমের সামনে এক ভাষায় কথা বললে সংশয় অনেক কম থাকে।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন
ইমেইল: [email protected]
সৌজন্যে-নতুন বার্তা ডটকম