সাংবাদিকতা : পেশার মর্যাদা ও অপসাংবাদিকতা

বৃহস্পতিবার, মে ৯, ২০১৩

লিয়াকত আলী খান

এডমন্ড বার্ক বলেছেন ‘পার্লামেন্টের তিনটি রাষ্ট্র রয়েছে। কিন্তু ঐ যে দূরে সাংবাদিকদের আসন সারি সেটি হচ্ছে পার্লামেন্টের চতুর্থ রাষ্ট্র’ এবং আগের তিনটি রাষ্ট্রের চেয়ে তা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ’! এডমন্ড বার্কের সে উক্তি থেকে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অনুধাবন করলে সহজেই বোঝা যায় যে, পার্লামেন্ট ও সংবাদপত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা দু’টি ভিন্ন বিষয় হলেও পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। সংবাদপত্র ছাড়া সাংবাদিকতা যেমন ভাবা যায় না, তেমনই সাংবাদিকতাকে বাদ দিয়ে সংবাদপত্রেরও অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেননা সাংবাদিকতা হচ্ছে ব্যক্তি এবং সংবাদপত্র হচ্ছে প্রতিষ্ঠান।

সংবাদপত্রের জন্য কোন ব্যক্তি যখন সংবাদ সংগ্রহকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে তখন তাঁকে বলে সাংবাদিক। আর তাঁর পেশাকে বলা হয় সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা হচ্ছে সেবামূলক একটি পেশা। পেশাটি খুবই সহজ বা আরামের বলে অনেকের কাছে প্রতীয়মান হলেও আদতে সাংবাদিকতা ব্যতিক্রমধর্মী পেশা- যা কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় অন্য সব পেশার চাইতে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুনিয়ার তাবৎ সমাজ ও অস্থিতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে অনেক প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, দায়িত্ব পালনও করতে হয় বিচক্ষণতার সাথে। আধাত্মিক জ্ঞান, প্রতিভা বা মেধা না থাকলে প্রকৃত সাংবাদিক যেমন হওয়া যায় না-তেমনই সমাজ বা রাষ্ট্রও তাদের দ্বারা উপকৃত হতে পারে না। উন্নয়নশীল দুনিয়ায় ক্ষুধা-দারিদ্র্যতার কারণে সমাজ ও রাজনীতি অস্থিতিশীল থাকায় দুর্নীতি শক্ত শেকড়ে বিশাল বটবৃক্ষের ন্যায় ক্রমশঃ বিস্তৃত হওয়ায় সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিপরীতে পেশীশক্তিধারী অপসাংবাদিক দাপট-দৌরাত্ম্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে-যা বাংলাদেশে এখন অপ্রতিরোধ্য!

ফাস্টওয়ার্ল্ডে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে যতটা মর্যাদা দেয়া হয় থার্ডওয়ার্ল্ডে তা কল্পনাই করা যায় না! থার্ডওয়ার্ল্ডে ক্ষুধা-দারিদ্র্যতার কারণে সুশিক্ষা বঞ্চিত ও অপসংস্কৃতিসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে মূল জনগোষ্ঠির ৯০% নাগরিকরা অসচেতন বিধায় তাদের অনেকই ভাগ্য বিধাতার ওপর নির্ভরশীল। যে ১০% নাগরিককে সচেতন বলা হয়েছে তন্মধ্যে ৯৫% অর্থাৎ আমলা, পুলিশ আর সমাজপতিরা রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষবৃক্ষের সেবাযতœ করে তার ক্রমবিস্তৃতি ঘটানোর প্রয়াস পাচ্ছে। এতে করে মূল জনগোষ্ঠির ৯০% মানুষের রক্ত চুষে ওরা স্বীয় ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দুর্নীতিকে লালন করতঃ ফাস্টওয়ার্ল্ডের মুনাফাখোরদের ইন্ধনে থার্ডওয়ার্ল্ডের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে রাখছে। ফলে উন্নয়নশীল দুনিয়ায় অনেক কিছুই আর্থিক মানদন্ডে তুলনা করা হয় বিধায় সাংবাদিকতা পেশায় সৎভাবে অর্থ উপার্জনে স্বল্পতার কারণে অনেকের কাছে পেশাটি এক্কেবারে নগণ্য! বিশেষ করে বাংলাদেশের অসাধু রাজনীতিবিদ আর আমলা-পুলিশ কর্তাদের কাছে সাংবাদিকতা পেশাটি অর্থের বিনিময়ে পাওয়া কতিপয় চাকর-চামচাদের মতই বর্তমানে গণ্য হচ্ছে!

বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে শিক্ষা, সংস্কৃতির তথা জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশার মান বৃদ্ধি পেলেও মর্যাদাশীল বলতে যা বোঝায় তার স্বীকৃতি পাওয়া এখনো সম্ভব হচ্ছেনা। একজন সাংবাদিককে অনেকগুলো গুণের অধিকারী হতে হয়, তন্মধ্যে নিরহংকার, নির্লোভ ও অহিংসার মনোভাব সহ চরম ধৈর্য্য ও পরমত সহিষ্ণুতা তাঁর মধ্যে থাকতে হবে। কঠিন সাধনা ও অধ্যবসায় সহ সুকুমার গুণের অধিকারী না হলে এ পেশায় বেশীদিন টিকে থাকাও সম্ভব নয়! পেশাগত দায়িত্ব পালনে ত্যাগ ও অবদানের তুলনায় বাংলাদেশে প্রাপ্তিটা এক্কেবারে নগণ্য হওয়ায় সামাজিক ভাবে মর্যাদাশীল ভাবা না হলেও আত্মতৃপ্তিটা বড়কথা হওয়ায় অনেকে এ পেশাকে বেছে নিয়েছেন এবং এখানো নিতে চাচ্ছেন। কিন্তু অপসাংবাদিকরা এ পেশাটিকে আজ মর্যাদা সম্পন্ন না করে সাংঘাতিক বলে ভূক্তভোগি অনেকের কাছে তিরস্কারের পেশা হিসেবেও প্রমাণ করাচ্ছে।

সৎভাবে সাহসিক ভূমিকা নিয়ে বিবেকের দায়বোধে বা কর্তব্যের কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিতরা দেশ ও জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারলে জাতি তাঁর মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। সংবাদপত্র জাতির দর্পণ যদি প্রতিষ্ঠানটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে পেশার স্বকীয়তা ও পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে পারে। যিনি বা যাঁরা কর্তব্য পালনে নির্ভীক কেবল মাত্র তিনি বা তাঁরাই পারেন বা পারবেন সমাজের অনাচার পাপাচার আর দুর্নীতি-দুর্বৃত্তপনার তথ্যচিত্র সার্চ করে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ পরিবেশনে ভূমিকা রাখতে। শুধু তাই নয় সমালোচনার বিপরীতে গঠনমূলক আলোচনা করতঃ দেশ ও সমাজকে প্রগতির পথেও এগিয়ে নেয়ার ভূমিকাও জাতির বিবেক হিসেবে সাংবাদিকরা রাখতে পারেন।

দুনিয়ার বহু দেশে সাংবাদিকতা পেশাটি এখন প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা লাভ করলেও বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে সংবাদপত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিপরীতে হলুদ ও অপসাংবাদিকতার দাপট দৌরাত্ম্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ায় বিশেষ করে চামচামি, দালালী ও অনৈতিকভাবে অর্থলোভের কারণে এ পেশাটি এখনো প্রথম শ্রেণীর মার্যাদা লাভ করতে পারছে না। তবে হ্যাঁ! বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সহ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা যেসব সংবাদপত্রের রয়েছে তারা ইতিমধ্যে প্রথম শ্রেণীর মার্যাদ লাভেও সক্ষম হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডিলাসো রুজভেল্ট সংবাদপত্র প্রসঙ্গে স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন; ‘যদি কখনো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে খর্ব করা সম্ভব হয়, তবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার স্বাধীনতা, বক্তব্য রাখার স্বাধীনতা ইত্যাদি মৌলিক অধিকারও হয়ে পড়বে অর্থহীন’! নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মতই জনগণ ও সরকারের মধ্যে সংবাদপত্রের যোগসূত্র।

রাজনীতিবিদ সাধারণতঃ তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনসাধারণের মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সংবাদপত্রের ভূমিকা তাৎপর্যময় ও ব্যাপক। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে এবং এতদসংক্রান্ত খবরাখবর প্রচার করে সংবাদপত্র। একে যদি গণতন্ত্রের মূল অবয়ব বলা যায় তাহলে তার প্রাণ বলা যেতে পারে সাংবাদিককেই।

উপযুক্ত পরিবেশ ও নিরাপত্তা যে কোন সৃজনশীল কাজের জন্য সার্বাগ্রে প্রয়োজন। নিরাপত্তাহীন বা প্রতিকূল পরিবেশে সৃজনশীল কোন কাজ করাও সম্ভব নয়। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে সংবাদপত্র লাভজনক শিল্প হিসেবে এখন গণ্য হচ্ছে। সংবাদপত্র যদি শিল্প হয় তা’হলে সৎ ও দায়িত্বশীল সংবাদকর্মীরা অবশ্যই তার শিল্পী। সৃজনশীলতা প্রকাশের পূর্বশর্ত হচ্ছে অনুকল পরিবেশ-যা বাংলাদেশে তেমন একটা নেই। আবার অর্থ ও পেশীশক্তির জোরে অনেক সময় সৃজনশীলতা পদদলিতও হয়। দুনিয়া সৃজনকর্তার সৃজনশীলতা ধ্বংস করার সাধ্য ক্ষমতা যেমন কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়-একমাত্র স্রষ্টাই তা ধ্বংসের ক্ষমতা রাখেন। ঠিক তেমনই কিছু সৃজনশীল মানুষও দুনিয়াতে জন্মাচ্ছেন-যাঁদের হত্যা করলেও তাঁর সৃজনশীল কর্ম আর্থিক দৈন্যতার কারণে সাময়িকভাবে পদদলিত করা সম্ভব হলেও নির্মূল করা সম্ভব নয়!

আর্থিক দৈন্যতার কারণে কবি নজরুলকে তখনকার কতিপয় অপসাংবাদিক কারাগারে পাঠালে তিনি আরো তেজোদীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন বলেই তাঁকে বিদ্রোহী কবির খেতাব দেয়া হয়েছিল। হাল আমলের বাউল সম্রাট খেতাব পাওয়া শাহ্ আব্দুল করিম তাঁর গানের পান্ডুলিপির বানান শুদ্ধ-সম্পাদনার জন্য সাংবাদিক নামধারী অনেকের কাছে আকুতি জানিয়ে হিংসার বলি হতেও আমি দেখেছি। কিন্তু হিংসার বলি হয়ে সৃজনশীলতা সাময়িক ভাবে পদদলিত করা সম্ভব হলেও নির্মূল করা যে অসম্ভব-তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ একাডেমিক শিক্ষার সার্টিফিকেধারী না হয়েও জনপ্রিয় গান আর সুর মৃত্যুর পূর্বেই শাহ্ আব্দুল করিমকে বাউল সম্রাট খেতাব পাইয়ে দিয়েছে। এজন্য অনেক বড় মনের মানুষ জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক মরহুম হুমায়ূন আহমদ এর অবদান অনস্বীকার্য। সৃজনশীল মেধা দেশ ও সমাজকে সমৃদ্ধ করার ভূমিকা রেখে ইতিহাসের জন্ম দেয়। কিন্তু যারা এর অধিকারীদের হিংসা বা ঈর্ষা করে ইতিহাসকে রাজহাঁস বা পাতিহাঁস ভেবে নিজের মত করে নিতে চায়-তারা যত সম্পদশালী বা অর্থবলে দালাল চামচা পরিবেষ্ঠিত হোন না কেন একদিন না একদিন ইতিহাসের তিনি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন।

হিংসা প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী লর্ড আর্থার বলেছেন, ‘যারা নীতিতে বিশ্বাসী নয় বিশ্বাসী একমাত্র স্বার্থে; তাদের উন্নতি হয় বটে কিন্তু পতনও আসে অপ্রতিরোধ্য গতিতে’! অধুনালুপ্ত দৈনিক জালালাবাদী ও সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার পত্রিকার মালিকের তখনকার কর্মতৎপরতা সম্পর্কে যারা অবগত আছেন বর্তমানে তাদের কাছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা! সে সময় ঐ পত্রিকা কর্তৃপক্ষের অহংকারী মনোভাব দেখে বার বার মনে হয়েছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ যাদের করেছ অপমান অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান’ কবিতার এপদ্য পংক্তির কথা! সিলেট নগরীর ‘ক্রাইমজোন’ খ্যাত কীনব্রীজ ও সুরমা মার্কেট এলাকার অপরাধী চক্রের অপ্রতিরোধ্য দাপট-দৌরাত্ম্যের কথা কে না জানে? কিন্তু অবৈধ টাকার মোহে অপসাংবাদিকরা ঐ অপরাধী চক্রের অপকর্মের বিরুদ্ধে বা বৃহত্তর কল্যাণে ভূমিকা না রেখে উল্টো ঐ ‘ক্রাইমজোন’র গডফাদার ও তার মূলহোতাকে সম্মানীত বলে ভিকটিমকে করা হচ্ছে সর্বস্বান্ত সহ অপমান-নাজেহাল! এরই নাম কী সাংবাদিকতা? নো! অবশ্যই এটা অপসাংবাদিকতা!

দুনিয়ার অনেক দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকলেও সাংবাদিকের স্বাধীনতা আর মর্যাদা দূরের কথা নিরাপত্তাও তেমন একটা নেই। কোন ভাল মানুষের নিরাপত্তা হচ্ছে তাঁর মান সম্মান-মৃত্যু তো দুনিয়াতে যেদিন আল্লাহ্ পাক পাঠিয়েছেন সেদিনই নির্ধারণ করে দিয়েছেন! তাই শুধু হত্যা-নির্যাতনের ভিকটিমের নিরাপত্তার কথা বলা ঠিক নয়। বিশিষ্ট সাংবাদিক বন্ধুবর আ ফ ম সাঈদ’র কথাই ধরা যাক! আমার দেখা ও জানামতে তাঁর সহকর্মীদের অনেকে একসময় তাঁকেও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত নাজেহাল করেছিল! এমনকি মৃত্যুর সময় গর্ভধারীনি মায়ের পাশে থাকার বদলে তাঁকে থাকতে হয়েছিল কারান্তরালে! মৃত্যুর পর প্যারোলে মুক্তি দেয়ার ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়েছিল অনেক বাধা!

গণমাধ্যমের সৃজনশীল শিল্পী হওয়ায় তিনি আজ শতবর্ষের ঐতিহ্যে লালিত সিলেট প্রেসক্লাবের সহ সভাপতি। এরপরও শুনতে হয়েছে তাঁর মেধা ও রক্ত ঘামের বদৌলতে অর্জিত অর্থ দ্বারা ক্রয়কৃত ভিটেমাটি বেহাত হবার উপক্রমের কাহিনী! অপকর্মের নায়ক ঐ ব্যক্তিও নাকি সাংবাদিক নামধারী! বড় বৈচিত্রময় এদেশ-সত্যি সেল্যুকাস! তাই বলা চলে উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক দুর্নীতি ও অর্থ-পেশীশক্তির দাপটে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিপরীতে অপসাংবাদিকতার দাপট-দৌরাত্ম্য শুধু ব্যাপক আকার ধারণই করছে না-অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে!

একদা সাংবাদিকতা কোন পেশা ছিলনা-ছিল সৃজনশীল কিছু মানুষের কৌতুহলী নেশা। কালের বিবর্তনে আর মানব সভ্যতার ক্রম বিকাশে সাংবাদিকতা হয়ে উঠেছে আজ দুনিয়ার তাবৎ অন্ধকার দূরীকরণের প্রজ্জ্বলিত মশাল-যা তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে পরিণত হয়েছে লাভজনক শিল্প হিসেবে। সৎ, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার আদর্শে অটল থাকলে ফাস্টওয়ার্ল্ডে এর কদর ও মুনাফা বেশী হলেও থার্ডওয়ার্ল্ডে কিন্তু রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ অবস্থা! এহেন পরিস্থিতিতে স্বাধীনভাবে মত বা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক পালন করতে পারেন না। বর্তমান জটিল সমাজ ব্যবস্থায় একজন সাংবাদিক তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা টুকুও অনেক সময় প্রয়োগ করতে পারেন না।

কারণ এক্ষেত্রে তাঁর সামনে চারটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। আর তা হচ্ছে (১) মালিক (২) সরকার (৩) প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও (৪) অপরাধী চক্র। এর যে কোন একজনের বিরাগ ভাজন হলেই সমস্যা বা বিপদ। কেননা ঐ ৪টি বাধার সৃষ্টিকারীকেই অনেক সময় দেখা যায় পরস্পর পরস্পরের বন্ধু-সুহৃদ! যার জন্য সাংবাদিকরা গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছেন সামাজিক সংগঠন বা প্রেসক্লাব। দুনিয়ার দেশে দেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে সাংবাদিকদের সমাজিক সংগঠনও গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র থেকে বৃহদাকারে।

কিন্তু দুর্ভাগ্য! রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে জাতির বিবেক খ্যাত সাংবাদিকদের সামাজিক সংগঠনগুলোও উন্নয়নশীল দেশে বহুধা বিভক্ত! ফলে এক কাকের দুর্গতি দেখে হাজারো কাক কা কা করে সহানুভূতি জানালেও এক সাংবাদিকের দুর্গতিতে আরেকজন বাহবা দেয়-এমনকি অর্থ উপার্জনে ডেমকেয়ার মনোভাবও দেখায় অনেকে!

বৈচিত্রময় এ দুনিয়ায় সৎ ও ভাল মানুষদের শান্তিতে বাস করার সুযোগ এখন আগের মত নেই! তেমনই সৎ, নিষ্ঠাবান ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক অনেক সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের শিকার হলেও তাঁর সাহায্যে ভূমিকা রাখা দূরে থাক সম্ভব হলে তাকে চৌদ্দশিকের ভেতরে ঢুকিয়ে বা গুমখুন করতে সহায়তা দিয়ে কিছু টুপাইস কামাতে পারলেও কম কিসের মনোভাব দেখা যায়! যার ফলে রাষ্ট্র হচ্ছে দুর্নীতিগ্রস্ত, সমাজিক পরিবেশ হচ্ছে কলুষিত। তবে হ্যাঁ! কিশোর কবি সুকান্তের ভাষায় ‘বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষè কর চিত্ত, বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি জেনে নিক (অপসাংবাদিক আর দুর্নীতিবাজ) দুর্বৃত্ত!

একদিন হয়তো কবির একথার বাস্তবতা আসতে পারে! শাহ্বাগের গণপ্রতিবাদ কে গণজাগরণ বলে যারা প্রকৃত গণজাগরণ ঠেকাতে চান-তারা সম্ভবত: ভূতের স্বর্গে বাস করেন। সমাজের অনাচার, পাপাচার আর দুর্র্নীতি-দুর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র তথা দল মত নির্বিশেষে ‘জাগরণের ডাক’ শিরোনামে গণজাগরণের যে গবেষণা চলছে তার বাস্তবতা যখন দেখা দেবে তখন শুধু যুদ্ধাপরাধীরাই নয় সমাজের অনাচার, পাপাচার আর দুর্নীতি-দুর্বৃত্তপনার সাথে জড়িত অসাধু রাজনীতিবিদ, আমলা-পুলিশ ও অপসাংবাদিকতার চর্চাকারীরাও গণজোয়ারের প্রলয়ংকরী তান্ডবে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে! হয়তো তখন আমি বেঁচে নাও থাকতে পারি!

যে রাষ্ট্র ও সমাজ উন্নত, ন্যায়নীতির আদর্শ লালনকারী, দুর্নীতিমুক্ত ও পরমত সহিষ্ণু-সে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রকৃত সৎ, নির্ভীক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা শান্তিতে, সুন্দর ও ঝুঁকিমুক্তভাবে কাজ করতে পারেন। কিন্তু যে সাংবাদিক পরমতসহিষ্ণু নয়, কিছু টাকা হাতে পেয়ে অনুসন্ধিৎসু মনোভাব নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করে মিথ্যে সংবাদ পরিবেশনে দ্বিধাবোধ করে না, ভিন্নমতালবম্বীকে শত্র“ ভাবে, সেখানে বিবেক আর মানবতা হয় পদদলিত-ন্যায়বিচারের বদলে পরিলক্ষিত হয় মানবতার আহাজারী! অপসাংবাদিকতার জোটবদ্ধতা প্রকট হওয়ায় সৃজনশীল সাংবাদিকরা কালো টাকার মালিকদের দ্বারা প্রকাশিত সংবাদপত্রে লেখার সুযোগ না পেলে মামুর পত্রিকা ভাগ্নে সাংবাদিক না হলেও লেখতে জানলে ছদ্মনামেও লেখা প্রকাশ বা সাংবাদিকতা করা যায়! যার মজাই আলাদা। যেমন সিলেট বিভাগ যেদিন আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করছিল সেদিন সিলেটের সব পত্রিকায় ছদ্মনামে একটি লেখা পাঠালে হুবহু ছাপা হয়। আরেকটি পত্রিকায় স্বনামে পাঠালে হিংসায় কাতর থাকা কর্তৃপক্ষ তা ছাপায়নি!

কিন্তু ঢাকা থেকে প্রকাশিত ক্রোড়পত্র প্রকাশকারী একমাত্র পত্রিকাটি আর কোন সাংবাদিকের লেখা না ছাপিয়ে লেখকের স্বনামে পাঠানো ঐ লেখাটি হুবহু প্রকাশ পাওয়ায় সিলেটে তখন বিতর্কের ঝড় বইতে থাকে। এ সময় বিশিষ্ট সাংবাদিক মরহুম মহিউদ্দিন শীরু বলেছিলেন যে, স্বনামে যে লেখাটি ঢাকার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এখানকার পত্রিকায় ছদ্মনামে প্রকাশিত লেখাটির লেখক যে ঐ একই ব্যক্তি তাতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই! হিংসুক ও পরশ্রীকাতর ছিল তা নিশ্চিত হয়ে তাদের এলার্জি বেড়ে যাওয়ায় চুলকাতে চুলকাতে চামড়া খসাতে দেখে শীরু ভাই মজা পেয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন!

যাই হোক বর্তমানে রাষ্ট্র ও সমাজ উন্নত হচ্ছে, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রিন্ট মিডিয়ার গুরুত্ব হ্রাস পেতে পারে বলে এক পরিসংখান থেকে জানা যায়। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলে হয়তো প্রিন্ট মিডিয়ার অস্থিত্ব একসময় নাও থাকতে পারে। ফলে হলুদ বা অপসাংবাদিকতার দাপট-দৌরাত্ম্য কমে যেতে পারে! ১/২শ টাকার ফ্লেক্সিলোড দিয়ে কারো বিরুদ্ধে নামকরা সাংবাদিকদেরও সংবাদ পরিবেশন করে প্রতিদিন প্রায় হাজার টাকা কামানোর পথ রূদ্ধ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং সাধুবেশী সাংবাদিক বন্ধু সচেতন হোন!

লেখক : সাংবাদিক।