সাভার ট্র্যাজেডি ও আমাদের সাংবাদিকতা

বৃহস্পতিবার, ০৯/০৫/২০১৩ @ ১০:২১ অপরাহ্ণ

শাইখ সিরাজ ::

এ ছবি আর আমরা দেখতে চাই না

এ ছবি আর আমরা দেখতে চাই না

একজন সাংবাদিকের জন্য একেকটি বড় দুর্ঘটনা আসে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার নতুন এক শিক্ষা হয়ে। সাভার ট্র্যাজেডিও ঠিক তাই। আমাদের ক্রমবিকাশমান টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য আকস্মিক দুর্যোগ রিপোর্টিংয়ের এক সুযোগ হিসেবে উপস্থিত হলো। এই দুর্যোগ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সাংবাদিকেরা রেখেছেন বড় ভূমিকা। টানা কয়েক দিন টেলিভিশনজুড়ে ছিল ভূরি ভূরি সরাসরি সংবাদ, সংগৃহীত সংবাদ, এক্সক্লুসিভ সংবাদ। মানুষ টেলিভিশনের সামনে থেকে যেন চোখ সরাতে পারেনি। এ দেশের ২৪টি টেলিভিশনের কমপক্ষে শতাধিক রিপোর্টার, শতাধিক ক্যামেরাম্যান পালাক্রমে ঘটনাস্থলে থেকে কঠিন পরিশ্রম করে রিপোর্টিং করেছেন। সবাই যাঁর যাঁর অবস্থানে থেকে চেষ্টা করেছেন কৃতিত্বপূর্ণ সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপনের। সাভারের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর উদ্ধার অভিযানে যে সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তার পেছনে টেলিভিশন সাংবাদিকদের বিরামহীন সাংবাদিকতার অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের গণমাধ্যমে, বিশেষ করে টেলিভিশন পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা না থাকার কারণে পর্দায় অনেক কিছু দেখানো হয়, যা গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদের ক্ষেত্রে এখনো প্রধানত আত্মনিয়ন্ত্রণ কাজ করে। সে ক্ষেত্রে একজন প্রতিবেদক, ক্যামেরাম্যান, বার্তা সম্পাদক কিংবা টেলিভিশন মালিক ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে মনে করেন যে বীভৎস ওই ছবিটি প্রচার হতে পারে ৩০ সেকেন্ড, এক মিনিট, দুই মিনিট কিংবা তারও অধিক সময় ধরে। এটি তাঁর ব্যক্তি অবস্থান থেকে সেলফ সেন্সরশিপ। এখানে তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে সেলফ সেন্সরশিপ কাজ করছে। পাশাপাশি অন্য একজন সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান, বার্তা সম্পাদক কিংবা টেলিভিশন মালিক মনে করছেন, দৃশ্যটি প্রচার করা উচিত নয় বা করলেও খুব সীমিত সময়ের জন্য। এটিও ওই ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অবস্থান থেকে সেলফ সেন্সরশিপ। দুটি অবস্থানই নেতিবাচক। এখানে প্রয়োজন গাইডলাইন।
গণমাধ্যমের সেন্সরশিপ কিংবা সাংবাদিকদের নিজস্ব সেন্সরশিপ যেমন উপেক্ষিত হয়েছে, একইভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংবাদিক সর্বোচ্চ সাহসিকতার সঙ্গে টেলিভিশনের দর্শকদের ধ্বংসস্তূপের বহু নিচে চাপা পড়া একজন মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। একেকজন সাংবাদিক নিজেই উদ্ধারকর্মীর ভূমিকা পালন করেছেন। দর্শক কোনো কোনো ঘটনায় চরম বিরক্তও হয়েছে। ৫০ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা একজন অর্ধমৃত মানুষের কাছে টিভি সাংবাদিক যখন তাঁর বুম এগিয়ে নিয়ে জানতে চান তাঁর অনুভূতি, আর সেটি যখন সরাসরি প্রচার হয়ে যায়, তখন দর্শকের বিরক্তি মোটেই অসম্ভব নয়। সরাসরি সম্প্রচার বলে কথা। এমনও দেখা গেছে, হাসপাতালের বিছানায় অঙ্গহীন একজন যখন কাতরাচ্ছেন, তখন তাঁর কাছে সাংবাদিক গিয়ে জানতে চাইছেন তাঁর অনুভূতি। এ কোন সাংবাদিকতা? পরিস্থিতি যদি সাংবাদিককে তাঁর পেশাগত দায়িত্বের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও সচেতন না রাখতে পারে, তাহলে তো আর সংবাদের উদ্দেশ্য থাকে না। এবার সুস্পষ্টভাবেই দেখা গেছে, যখন সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে, তখন ক্যামেরাম্যানের নিজস্ব সেন্সরশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর চারদিকে যখন ভবনের নিচে চাপা পড়া ক্ষতবিক্ষত মানুষ, তখন তাঁকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এর কতখানি টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো সমীচীন। এ বিষয়ে মনে পড়ছে, চ্যানেল আই সংবাদের শুরুর দিকে মেঘনায় লঞ্চডুবির পর দু-একটি টেলিভিশন দেদার বিকৃত বীভৎস লাশের ছবি দেখাচ্ছে। চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরা সব ছবি ধারণ করার পরও পরিমিতভাবে তা প্রচার করছে। অবশেষে দর্শকেরা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফোন পর্যন্ত করে বসলেন, আমরা কেন লাশের ছবি ব্যাপকভাবে দেখাচ্ছি না। আমরা কি ছবি সংগ্রহেই ব্যর্থ হয়েছি? দেখলাম, ওই বিকৃত বীভৎস ছবি কারও কারও দৃষ্টিতে টানছে। না বুঝেই তিনি দেখতে চাইছেন ওই বীভৎস দৃশ্য। অবশেষে আমরা ছবি দেখালাম, কিন্তু ছবির ওপরে একটি অস্বচ্ছ ভিডিও লেয়ার দিয়ে। নিচে লিখে দেওয়া হলো, ‘বীভৎস দৃশ্য দেখানো থেকে বিরত থাকা হলো।’ এটিও চ্যানেল আইয়ের সম্পাদকীয় অবস্থান থেকে সেলফ সেন্সরশিপ। একই ঘটনা ঘটেছে দেশে বিভিন্ন এলাকায় যখন ব্যাপক জঙ্গি তৎপরতা। একসঙ্গে ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলা হলো। গাজীপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন স্থানে আদালত প্রাঙ্গণে বোমা হামলায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটল। তখন একটি ভবনের দরজার তালার ওপর একতাল মাংস ঝুলছে, কিংবা বরিশালে বোমা হামলার পর গাছের ডালে একজনের দেহের ছেঁড়া অংশ ঝুলছে, এমন দৃশ্যও আমাদের টেলিভিশনে দেখতে হয়েছে। ড্রইংরুম মিডিয়া হিসেবে পরিবারের সব বয়সী ও পর্যায়ের সদস্য যখন একসঙ্গে বসে টিভি দেখে, তখন এ ধরনের দৃশ্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন এই বীভৎস ও বিকৃত কিছু দেখানোর এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে আমাদের গণমাধ্যমে। সাধারণ দর্শকও ওই দৃশ্যগুলো দেখতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও—এগুলোই যেন টেলিভিশনের আদর্শ দৃশ্যপট হয়ে উঠছে। সাভার ট্র্যাজেডির ভেতরও এ বিষয়গুলো লক্ষ করা গেছে। অথচ এ বিষয়টি দেশের সব সাংবাদিকেরই দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ক্ষতবিক্ষত কোনো মানুষকেই আন্তর্জাতিক টেলিভিশনগুলো দেখানো থেকে বিরত থাকে। গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটে স্কুলে সন্ত্রাসী হামলায় ২০টি শিশুসহ প্রায় ২৬ জন মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায়। কিন্তু কোনো গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ কোনো টেলিভিশনই দেখায়নি। একইভাবে সাম্প্রতিক সময়ে বোস্টনে বোমা হামলার ঘটনাটির কথাও বলা যায়। একেই বলে পজিটিভ মিডিয়া সেন্সরশিপ। এটি খুব প্রয়োজন।
২৪ এপ্রিল ট্র্যাজেডির শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মীদের মতোই তৎপর হয়ে কাজ করছে মিডিয়াগুলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত পেশাদারিত্বের কি কোনো উন্নয়ন লক্ষ করা যাচ্ছে? এখনো একই গতিতে সাংবাদিকেরা উদ্ধার অভিযান নিয়ে তথ্য দিয়ে চলেছেন। মানুষ তথ্য পাচ্ছে এ কথা যেমন ঠিক, আবার একইভাবে বারবার একই তথ্যের পুনরুচ্চারণ, একেক সাংবাদিকের একেক রকমের ভাষাগত ব্যাখ্যায় অনেক সময় জনগণ বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে। দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সময় ব্যবহারের জন্য বিষয়ভিত্তিক শব্দ ও পরিভাষা রয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে ধারণা না থাকা বা কম ধারণার কারণে সাংবাদিক সঠিকভাবে একটি তথ্য তুলে ধরতে পারছেন না। উদ্ধার অভিযানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, পদ্ধতি ও প্রযুক্তির পৃথক পৃথক নাম ও বিশেষণ রয়েছে, এগুলো প্রকাশ করার জন্য রয়েছে কারিগরি কিছু পরিভাষা। দৃশ্যত তা সাধারণ জনগণের কাছে অপরিচিত হতে পারে, সে ক্ষেত্রে একটি সঠিক পরিভাষা ব্যবহার করে তার অর্থও জনগণের স্বার্থে টেলিভিশনে স্পষ্ট করা হলে এর মধ্য দিয়ে সাধারণ দর্শকদের অনেক কিছুই জানা ও বোঝার সুযোগ সৃষ্টি হতো।
মনে পড়ছে, এখন থেকে ২৭ বছর আগে সিঙ্গাপুরের ব্রডওয়ে হোটেল ধসে পড়ার সেই ঘটনা দেখেছিলাম। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকর্মী, প্রশাসন সবার দায়িত্ব পালনের সঠিক পরিভাষাগুলো সাংবাদিকদের মুখ থেকে উঠে আসার কারণে জনগণ সহজে পৌঁছতে পেরেছিল ঘটনার গভীরে। আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে সাংবাদিকের নিজস্ব নিরাপত্তা বা সাবধানতা ও পোশাক। একটি বিশাল বিপর্যয়কর দুর্ঘটনার সময়ও সাংবাদিকদের দিশেহারা হয়ে পড়ার সুযোগ নেই। তাঁর পূর্ব সতর্কতা, পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার মতো কারিগরি প্রস্তুতি—সবই থাকা প্রয়োজন। এবার দেখেছি, অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে সাংবাদিক সরাসরি রিপোর্টিং করছেন, আবার এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনার ভেতর সাংবাদিকের যে ধরনের পোশাক কাঙ্ক্ষিত নয়, সে ধরনের পোশাক পরেই চলছে রিপোর্টিং। সব মিলিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, খুব বেশি প্রতিযোগিতামুখী চিন্তার কারণে সবকিছু গুছিয়ে উঠতে পারছে না টেলিভিশনগুলো। আমি বা আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। এত কিছুর পরও গণমাধ্যমের অপলক দৃষ্টি ও অতন্দ্র ভূমিকার কারণে সাভার ট্র্যাজেডির এই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে প্রায় দুই হাজার ৪৩৭ জন জীবিত এবং প্রায় সাড়ে ৪০০ মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই হচ্ছে গণমাধ্যম আর তার শক্তি।

 শাইখ সিরাজ: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই।
[email protected]
সৌজন্যে- প্রথম আলো।

সর্বশেষ