জার্নালিজমকে কবরে নিয়ে গেল সাংবাদিক?

বুধবার, ০৮/০৫/২০১৩ @ ৬:০৭ অপরাহ্ণ

যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ::

zakaria_ibn_Yusuf.সাভারের রানা প্লাজায় উদ্ধারকাজ আটকে রেখে এক টিভি সাংবাদিককে কংক্রিটের ছাদের ফুটো দিয়ে ক্যামেরা এগিয়ে দিতে দেখলাম। অপর একটি টিভি চ্যানেলের সিনিয়র সাংবাদিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েই সম্পদহানিতে (প্রাণহানি নয়) যারপর নাই উদ্বীগ্ন হয়ে বললেন, “উদ্ধারকর্মীদের চোখে চোখে রাখতে, অনেক কিছুই খোয়া যেতে পারে। তারা জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যেতে পারে।” স্বজনহারাদের আহাজারিতে যখন বাতাস ভারি ওই সময় আরেক সাংবাদিক তাদের প্রশ্ন করে বসলেন, “এই মুহুর্তে আপনার অনুভূতি কি?”

সর্বশেষ এক সাংবাদিককে দেখা গেল, ঘটনাকে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য (!) করতে লাইভ কাভারেজ দিতে রানা প্লাজার নিহতদের কবরে নেমে গেলেন! তা-ও আবার জুতা পায়ে!

আমরা দেখেছি, পুরান ঢাকায় নিরীহ যুবক বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে খুন করেছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সে-ই ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র যত্নের সাথে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ধারণ করেছিলেন সংবাদকর্মীরা। স্পটে গিয়ে সাংবাদিক কি শুধুই একজন প্রফেশনাল নিউজ ম্যান হবেন? নাকি সামাজিক-মানবিক দায়বদ্ধতাও মেনে চলবেন? প্রশ্নটার জবাব পাওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

নব্বইয়ের দশকে বিখ্যাত সাংবাদিক কেভিন কার্টারের আলোচিত একটি আলোকচিত্র এখনও সমালোচনার খোড়াত যোগায়। দুর্ভিক্ষ কবলিত সুদানে তিনি ওই ছবি তুলে পুলিৎজার পুরস্কারও পান। ছবিটি এমন অল্প বয়সের একটি কঙ্কালসার শিশু যে কিনা অতিকষ্টে জাতিসংঘের খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের দিকে এগোতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে; হামাগুড়ি দিয়ে সামান্য একটু এগিয়েই মাটিতে মাথা রেখে বিশ্রাম নিচ্ছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। যদিও তখন তার চোখ কাঁদতে কাঁদতে অশ্রুশূণ্য হয়ে গেছে। ঠিক তখনই একটি শকুন শিশুটির পেছনে উড়ে এসে বসে। শকুনটি একদৃষ্টিতে মৃতপ্রায় শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইল তার মৃত্যুর অপেক্ষায়। আর কেভিন তখন ব্যস্ত বিবেক বর্জিত হয়ে ‘ভালো’ একটি ছবি তোলার জন্য। ছবিটি তোলায় সফলও হয়েছিলেন। কপালে জুটেছিল পুলিৎজারের মতো পুরুস্কার।

কিন্তু পরবর্তীতে আত্নদংশনে জ্বলতে থাকেন তিনি। আত্নহত্যা করে সেই ‘পাপমোচন’ করেছিলেন এই প্রখ্যাত আলোকচিত্রী। এই ক্ষণে বাংলাদেশের এই আমরা যারা সাংবাদিকতার পেশায় আছি, তাদের অনেকেই এই ‘পাপটা’ করে চলেছি।

টেইলার্সে কাজ করা বিশ্বজিৎকে বাঁচানোর চাইতে চাপাতির নীচে পড়া একজন মানুষের ছটফাটানির ছবি বা ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করছি। রক্তমাখা বিশ্বজিতের লাল শার্টের দাম আমাদের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠেছে। মানবিক সাংবাদিকতা উঠে যাচ্ছে হৃদয় থেকে। ১৫ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে জনা পঞ্চাশেক সাংবাদিক কিন্তু রুখে দিতে পারতেন। অনেকে বলবেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ সংবাদকর্মীরা কেন করতে যাবে? কথা ঠিক, এটাও ঠিক যে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গিতে আজ পরিবর্তনের সময় এসেছে। ‘যদি কেউ না আসে তবে’ সাংবাদিকরা বসে থাকতে পারি না।

রানা প্লাজার ঘটনা, কিংবা বিশ্বজিৎ খুনের ঘটনার পর ‘কতিপয়’ সাংবাদিকদের এহেন ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, এখনও চলছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। ফেসবুকের ওয়ালে ঘুরে বেড়িয়েছে বিশ্বজিতের নৃশংস্য ছবিগুলো। সাংবাদিকদের নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফেসবুক বা ব্লগ হলো ফ্রিল্যান্সার জার্নালিজমের উৎকৃষ্ট জায়গা। মালিকানাধীন মিডিয়া কোনো না কোনোভাবে মালিকের হয়ে কথা বলে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এটার বালাই নেই। এটা স্বাধীন। তাই তো রানা প্লাজার সংবাদ কাভার করতে গিয়ে যখন টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক বলেন “ভলান্টিয়ারদের উদ্ধারকার্য এলাকা থেকে একটু দূরে রাখা দরকার, তা না হলে বিল্ডিংয়ের ভেতরের যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে যেতে পারে।” তখন ক্ষোভে ফেটে পড়েন সোশ্যাল মিডিয়ার নেটিজেনরা। যখন হাজারো মানুষ জীবন মুত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তখন এমন মন্তব্য কিভাবে করতে পারেন সাংবাদিক!

সেই সমালোচনার রেশ এখনও কাটেনি, এরমধ্যেই এক সাংবাদিককে দেখা গেল, রানা প্লাজার হতভাগ্য পোশাকশ্রমিকদের জন্য খুঁড়ে রাখা সারি সারি কবরগুলোতে নেমে গেলেন তিনি। তা-ও আবার জুতা পায়ে! ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোতে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই ছবি। কিন্তু কেন? এভাবে টিআরপি বাড়াতে হবে কেন? এভাবে কাটতি বাড়াতে হবে কেন?

আপনার পত্রিকা/টিভির কনটেন্ট বস্তুনিষ্ঠ, সত্যনিষ্ঠ হলে এমনিতেই কাটতি কিংবা টিআরপি বাড়বে। সত্য কখনো চাপা থাকে না। মুমূর্ষের আর্তচিৎকার বেচার দরকার নেই, কবরে নেমে লাইভ দেখানোর দরকার নেই। দরকার মনুষত্বের। দু মিনিট ক্যামেরা চালিয়ে আপনি যদি বিশ্বজিৎকে বাঁচাতে পারতেন আমি মনে করি সেই নিউজ হতো সবচেয়ে বড় নিউজ। আটকে পড়া নারীর আর্তচিৎকার ধারণ করার চেয়ে সেই নারীকে যদি বাঁচাতেন তাহলে সেই নিউজ হতো আলোড়িত করার মতো নিউজ। ভাই, দয়া করে সাংবাদিকতাকে কবরে পাঠাবেন না আপনারা। বিবেক জাগ্রত করুন। সাংবাদিকতাকে বাঁচান।
সৌজন্যে- পরিবর্তন।