ছোট হয়ে আসছে মিডিয়া

বুধবার, মে ৮, ২০১৩

মতিউর রহমান চৌধুরী ::

motiur rahman chyছোট হয়ে আসছে মিডিয়া। বলছি বাংলাদেশী মিডিয়ার কথা। ইলেকট্রনিক বলুন আর প্রিন্ট বলুন, সবখানেই এক অবস্থা। বন্ধ হয়ে গেছে দুটি টিভি নেটওয়ার্ক। একটি সংবাদপত্র বন্ধ হয়েছে আগেই। চাপের মধ্যে রয়েছে একটি টিভি আর দুটি সংবাদপত্র। বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। টিভির টকশোগুলো ভীষণ চাপের মধ্যে রয়েছে।

যে কোন সময় খড়গ নেমে আসতে পারে। নব্বই দশকের পর আর কিছুর উন্নতি না হলেও মিডিয়া এগিয়ে যাচ্ছিলো। প্রশংসিত হচ্ছিলো দেশ-বিদেশে। এটা অনেকেরই পছন্দ নয়। তাই চাপ বাড়ছে মিডিয়ার ওপর। রাজনীতি অসুস্থ হলে মিডিয়া সুস্থ থাকে কি করে। গুটিয়ে নেয়া হচ্ছে রাজনীতি। কেউ বুঝুন আর না বুঝুন, রাজনীতি চার দেয়ালে বন্দি হতে যাচ্ছে সহসাই। আনুষ্ঠানিক কোন ঘোষণারও দরকার হবে না।
বিরোধী রাজনীতিবিদরাই এ সুযোগ করে দিয়েছেন। দিনের পর দিন হরতালের কালচারকে তারা যেভাবে লালন-পালন করছেন তাতে সুস্থ রাজনীতি যে বিদায় নেবে এমনটা পাগলও বুঝে। বোঝেন না শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিকরা। এর মূল্য একদিন বাংলাদেশকেই দিতে হবে। টিভি মাধ্যমগুলো বড্ড চাপের মধ্যে। এই চাপ মোকাবিলা করার মতো শক্তি অনুপস্থিত। সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন জিইয়ে রাখা হয়েছে এজন্যই। এই বিভাজন গোটা সংবাদ মাধ্যমকে বড় এক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

কোন টিভি বা সংবাদপত্র বন্ধ হলে বা সংকটে পড়লে এক পক্ষ দূর থেকে বাহবা দিচ্ছে। আরেকপক্ষ প্রেস ক্লাবের সামনে রাজপথে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলো দুয়েকটা বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত। তাদেরইবা কি করার আছে। এখানে রাজনৈতিক শক্তি অসহায়ের মতো বসে থাকে। মাঝে মধ্যে বিবৃতি দেয় অবশ্য। স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না এটা আমরা সবাই জানি। এর জন্য রাজনৈতিক পণ্ডিত হতে হয় না।

যারা রাজনীতিকে সংকুচিত করতে যাচ্ছেন বা করছেন তারাও ভাল করেই জানেন আখেরে কোন ফায়দা হবে না এতে। তারপরও তারা করছেন। অন্যরা যদি অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ করেন তখন এর সুযোগ কে নেবে না বলুন। যাই হোক, যেভাবে প্রেসের ওপর চাপ আসতে শুরু করেছে তাতে করে কোনদিকে যাবে পরিস্থিতি তা বলা সত্যি কঠিন। শুধু এটুকু বলা যায়, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে মানুষ গুজবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে শতভাগ। এর ফলে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। দেশের ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

আমরা বড়াই করে বলতাম, কোন মুসলিম দেশে সংবাদ মাধ্যম এমন স্বাধীনতা ভোগ করে না। এখন বা তখন আমরা কি বলবো। অবাধ স্বাধীনতার নামে হটকারিতায় আমি বিশ্বাস করি না। সব খবর অনেক সময় খবর নয়। এর একটা সীমারেখাও রয়েছে। আমরা হটকারিতার পথও বেছে নেই মাঝে-মধ্যে। মনে রাখতে হবে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার বয়স কিন্তু বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বয়সের সমান। এজন্য ধন্যবাদ দিতে হয় সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে।

সাপ্তাহিক খবরের কাগজ বন্ধ হওয়ার পর আদালতে গিয়েছিলেন কাজী শাহেদ আহমেদ। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন খবরের কাগজের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। সে রায় না হলে হয়তো বন্দি থাকতো গণমাধ্যম। দুর্নীতিপরায়ণদের উললাসের নৃত্য লেখার কারণে সাপ্তাহিক খবরের কাগজ বন্ধ হয়েছিল এরশাদের জমানায়। আমার নামে এজন্য হুলিয়াও জারি হয়েছিল। ৪২ বছরে অনেক দেখলাম। চাকরিও হারালাম বার কয়েক। গ্রেপ্তারও হলাম একবার। সহকর্মী আমীর খসরুর কারণেই সংবাদ মাধ্যম নিয়ে লিখতে হলো।

আমি আসলে এ নিয়ে লিখতে চাই না। কারণ, সত্য বলা যায় না। প্রতি মুহূর্তে যেখানে আপস করতে হচ্ছে সেখানে সংবাদ মাধ্যম নিয়ে কি লিখবো বলুন। এ মুহূর্তে আমি কি অবস্থায় আছি তা আমি ছাড়া কে জানে। প্রয়াত ফয়েজ ভাইয়ের কথায় বলতে হয়, সত্য বাবু মারা গেছেন। আমি শঙ্কিত এই ভেবে- সংবাদ মাধ্যম কেন, দেশটা আসলে যাচ্ছে কোথায়? এভাবে কি জঙ্গি দমন হবে?

লেখক: সম্পাদক, মানবজমিন।
সৌজন্যে- আমাদের বুধবার