একজন শাহীনা এবং আমাদের সাংবাদিকতার ইনসাফ প্রসঙ্গ

শনিবার, মে ৪, ২০১৩

সুজন কবির ::

sujon kabirঅফুরান প্রাণশক্তি ছিল শাহীনার। সাভারের মৃত্যুকূপে আটকে ছিলেন শাহীনারা চারজন। টানা চারদিন আটকে থাকার পর গলা ছেড়ে শাহীনা বলেছিলেন, ‘আমি শাহীনা-বাড়ি কুষ্টিয়া’। কোনো ছবি নয়, শাহীনার এই একটি বাক্যই শুনেছিলেন টিভি দর্শকরা। যে বাক্যটি হয়ে উঠেছিল আমাদের গরিবের ঘরে প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কন্যা-জায়া-জননীদের এক চিরন্তন প্রতীক। শাহীনা হলেন সেই মানুষ, যাকে বাঁচাতে টানা ৩০ ঘণ্টা একের পর এক হাজারটা বাধার সঙ্গে লড়ে গেছেন উদ্ধারকর্মীরা। যার প্রতিমুহূর্তের খবর জানতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি সেটের সামনে বসেছিলেন কোটি দর্শক। নজর রেখেছেন শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিটি মুহূর্তের দিকে।

তারপরও তৃষ্ণা মেটেনি দর্শকদের। অনেক মানুষ সংবাদকর্মীদের কাছে, গণমাধ্যমের কাছে, ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে তার খবর জানতে চেয়েছেন। হাজারো না পাওয়ার এই গরিব দেশে শাহীনাদের জীবন কেবল জয়ী হওয়ার জন্য নয়, সম্ভবত এই কঠিন সত্যকে জানান দিতেই হেরে গেলেন শাহীনা। অদেখা কোনো এক শাহীনার জন্যে ভালোবেসে কাঁদলেন এই দেশের কোটি মানুষ। সাভার ট্র্যাজেডির অন্যতম এক ট্র্যাজিক প্রতীক হয়ে রইলেন দেড় বছরের এক শিশু সন্তানের এই মা।

সাভার ট্র্যাজেডি কেড়ে নিয়েছে শত শত শাহীনার প্রাণ। তাহলে কেন একজন মাত্র শাহীনা আলাদা করে সবার নজর কেড়ে নিলেন? কেন শাহীনার জন্য উদ্ধারকর্মী থেকে শুরু করে কোটি মানুষের এই চোখের জল?

কারণটা হলো মিডিয়া।

গণমাধ্যমই শাহীনাকে এই ট্র্যাজিক উপাখ্যানের অন্যতম বিয়োগান্তক এক চরিত্র করে তুলেছে। গণমাধ্যমের এই কাজে সাফল্য যেমন আছে, তেমনি আছে ব্যর্থতাও। কারণ সাভারের একই মৃত্যুকূপের কোনো এক সিঁড়ির আড়ালে আটকে থাকা একজন শাহজাহানের জন্যে কিন্তু কোটি মানুষ কাঁদেনি। একাত্তর টেলিভিশনের সহকর্মী মহিম মিজান তার খোঁজ পেয়েছিলেন। বাঁচার আপ্রাণ আকুতি জানিয়েছিলেন শাহজাহানও। কিন্ত ধ্বংসস্তুপের অতলে হারিয়ে যান তিনি। শাহীনার মতো শাহজাহানের কণ্ঠ শোনাতে পারেনি মিডিয়া। তাকে খবর করে তুলতে পারেনি। তাই শাহজাহান জীবিত না মৃত- এই প্রশ্নের মীমাংসা ছাড়াই সাভারের ধ্বংসস্তূপে চেপে বসে বুলডোজার। এমনি আরো শত শত শাহজাহান আর শাহীনার জীবন-মৃত্যুর কোনো মীমাংসা জানাতে পারেনি মিডিয়া। এই ব্যর্থতা যতটা না মিডিয়ার, এর চেয়ে বেশি আমাদের গরিব দেশের অসহায় উদ্ধার-তৎপরতার।

একটু পেছনে তাকানো যাক। ২০০৭ সালের সিডর দুর্যোগের পর আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় দুর্যোগ বলা যায় সাভার ট্র্যাজেডিকে। সিডরের সময় দেশে কোনো ২৪ ঘণ্টার সংবাদভিত্তিক চ্যানেল ছিল না। যতদূর মনে পড়ে, একমাত্র এনটিভি ছাড়া আর কোনো চ্যানেলের এসএনজি সুবিধাও তখন ছিল না। সরাসরি সম্প্রচার বা ছবি পাঠানোর ইন্টারনেট-আশ্রয়ী এত সুযোগ-সুবিধার তো প্রশ্নই আসে না। দুর্গম উপকূলীয় এলাকা থেকে রাতে টেপ পাঠাতেন সংবাদকর্মীরা। সেই টেপ সকালে ঢাকা পৌঁছাতো। তারপর রিপোর্ট হতো। আর ফোনই ছিল তাৎক্ষণিক সংবাদ জানানোর একমাত্র ভরসা। সেই হিসেবে বাংলাদেশের টিভি সংবাদের ইতিহাসে সাভারই হলো প্রথম ঘটনা, যেখানে দেশের চারটি ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলসহ প্রায় প্রতিটি টেলিভিশন টানা নয়দিন ধরে, এই জাতীয় দুর্যোগটি নানাভাবে কাভার করেছে (এখনো করছে)। টিভি সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এতো বড় একটি ঘটনার ম্যাসিভ কাভারেজ দিতে গিয়ে আমাদের টেলিভিশনগুলো দর্শকের সব প্রত্যাশাই পূরণ করতে পেরেছে- এমন দাবি করব না। তবে মোটা দাগে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ভালোভাবেই মোকাবেলা করেছেন সংবাদকর্মীরা। এমনটা বললে নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলা হবে না।

তারপরও কিছু বিষয় নিয়ে ফেসবুক-ব্লগে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। প্রশ্ন উঠেছে, সংবাদকর্মীরা শাহীনার খোঁজ দিতে গিয়ে অতিরিক্ত হিরোইজম দেখালেন কি না? গোটা বিষয়টাকে রিয়েলিটি শো করে তুলেছেন কি না? ট্রমা সিচুয়েশানে একজন মরণাপন্ন মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তার মধ্যে বিভীষিকা উসকে দেয়া হলো কি না? রিপোর্টাররা লাইভে দাঁড়িয়ে তথ্য বলার চেয়ে প্রকৌশল সংক্রান্ত বিশ্লেষণী বক্তব্য দিলেন কি না? সবশেষ জুরাইনে কবরের ভেতর দাঁড়িয়ে একজন সংবাদকর্মীর লাইভ রিপোর্টিং কতোটা সুস্থবোধ সম্পন্ন কাজ হলো? মোটা দাগে এই হলো আলোচনা-সমালোচনার নানাবিধ প্রসঙ্গ। শুরু করব সংবাদকর্মীদের হিরোইজম প্রসঙ্গ দিয়ে।

আবারো একটু পেছনে যেতে হয়। আমাদের দেশে সাংবাদিকতার ইতিহাস হলো অ্যাক্টিভিজমের ইতিহাস। রুটি-রুজির জন্য নয়, নিজের দর্শনের লড়াই আর দেশের জন্যে কিছু করার মাধ্যম হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছিলেন আমাদের পূর্ব-প্রজন্ম। সেই ইতিহাস পেরিয়ে আমাদের গণমাধ্যম আজ বিকাশমান এক শিল্প। পূর্ব প্রজন্মের সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজো আমাদের সংবাদকর্মীরা কখনো কখনো অ্যাক্টিভিস্ট এবং একাধারে সংবাদকর্মী।

বলছিলাম সিডরের কথা। তখন সহকর্মী আতিক রহমান পুর্ণিয়াকে এক হাতে নাক চেপে আরেক হাতে লাশের খাটিয়া বইতে হয়েছিল। একই কারণে রাশেদ নিজাম, ফারজানা রুপা কিংবা পারভেজ রেজাদেরও প্রাণের মায়া ভুলে ধ্বংসস্তূপের ৭২ ফুট গভীরে গিয়ে শাহীনাদের খোঁজ নিতে হয়। ‘‘‌আটকে পড়া মানুষদের বাঁচানোটা বেশি জরুরি নাকি তার খবর দেয়াটা বেশি জরুরি?” এ কারণেই সাংবাদিকতার এই ক্ল্যাসিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের সংবাদকর্মীদের অনেকেই শাহীনাদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার কিংবা পানির বোতল বয়ে নেন। চোখের জল লুকিয়ে কোটি দর্শককে জানিয়ে দেন শাহীনাদের বেঁচে থাকবার খবর। সাভারের ধ্বংসস্তুপে এপি’র এক পশ্চিমা সাংবাদিক আমার সহকর্মীদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি মাথায় নেয়ার কাণ্ড দেখে চোখ কপালে তুলেছিলেন। বলেছিলেন, “তোমরা কুকুর না পাঠিয়ে নিজেরা কেন যাচ্ছ?” কুকুর নয়, ভাই-বোনদের বাঁচাতে এই দেশের লক্ষ কোটি ভাই-বোনই মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইন্স্যুরেন্স আছে কি নেই- সেই তোয়াক্কা করেন না। এটাই আমাদের অ্যাক্টিভিজম-আমাদের সংস্কৃতি। আর এখানেই পশ্চিমা ধাঁচের করপোরেট সাংবাদিকতার সঙ্গে মোটা দাগে আমাদের পার্থক্য। পশ্চিমাদের কখনো দেশ বাঁচাতে কলম হাতে নিতে হয়নি। আমাদের পূর্ব-পূরুষকে নিতে হয়েছে।

শাহীনাদের খবর নিতে সংবাদকর্মীদের মৃত্যুকূপে যাবার বিষয়টা নিঃসন্দেহে চোখ কপালে তোলার মতো। কিন্তু তাঁরা কি নেহাত হিরো হবার মতো স্থূল বাসনা থেকে ওই কাজ করেছেন? আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, সমাজে হিরো খ্যাতির খায়েশ তাদের কারো ছিল না। যা ছিল তা হলো নিখাদ পেশাদারিত্ব। নিজের চ্যানেলের খবরটাকে অন্যের চেয়ে আলাদা করার একটা
প্রতিযোগিতামূলক চেষ্টা। যারা পেশাদারিত্বকেও ছাপিয়ে গেছেন তারাই ভূমিকা রেখেছেন অ্যাক্টিভিস্টের। তারা না চাইলেও তাদের কাজ ওই সংবাদকর্মীদের হিরো ইমেজ দিয়েছে। সেজন্য নিশ্চয়ই তারা সমালোচনার পাত্র হতে পারেন না।

তবে একই সঙ্গে ব্যক্তি সাংবাদিকের অ্যাক্টিভিজমের বিপরীতে দাঁড়াতে দেখা গেছে তার প্রতিষ্ঠানকে। এটি প্রতিষ্ঠানের পুঁজি আর শ্রেণি-চরিত্রের সমস্যা। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নেতাদের জন্য যখন দিনের পর দিন হরতাল হয়, গাড়ি ভাঙা হয়, জনজীবনে নাভিশ্বাস ওঠে, তখন আমরা তাকে বিশৃঙ্খলা বলি না। কিন্তু শত শত সহকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু যখন পোশাক-শ্রমিকদের বিক্ষোভের মাঠে নামায় তখন গণমাধ্যমের কাছে সেটি আখ্যায়িত হয় বিশৃঙ্খলা নামে। প্রতিষ্ঠানের এই শ্রেণি-চরিত্রের প্রকাশ ভিন্ন আলোচনার দাবি রাখে। তাই সবিস্তারে যাচ্ছি না।

এই স্যাটেলাইটের যুগে পশ্চিমা গণমাধ্যম আমাদের দেখার বা জানার অভ্যাসে কিছু আরোপিত আল্লাদ বা আদেখলাপনা তৈরি করেছে। কথিত নিরাপত্তা সেই রকম একটা ইস্যু। কোন নিরাপত্তার কথা আমরা বলছি? আমাদের হাজারো ভাইবোন যখন মৃত্যুকূপে বাঁচার আশায়, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী নেই, যন্ত্রপাতি নেই, সমন্বয় নেই, সরকারি কাজে মানুষের আস্থা নেই, মৃত্যুকূপে কত মানুষ আটকা আছে- সেই সংখ্যা জানা নেই, তখন কথিত এই নিরাপত্তার বাণী কি হাস্যকর নয়? আমার দেশের অর্থনীতি সংস্কৃতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, রাজনীতি- এর কোনোটার সঙ্গে কি পশ্চিমের কোনো মিল আছে? তাহলে কেবল সাংবাদিকতায় আমরা কেন সেটা আশা করি? আর নিরাপত্তাই যদি ধ্রুব হবে, তাহলে এই দুর্যোগই তো ঘটার কথা না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আমাদের অর্থনীতি আর রাজনৈতিক শিষ্টাচার যেদিন বিশ্বমানের হবে, সেদিন আমাদের সাংবাদিকতা আজকের পশ্চিমা দুনিয়াকেও ছাড়িয়ে যাবে।

সাভারের ঘটনাকে টেলিভিশনগুলো রিয়েলিটি শো বানিয়েছে, এটা আরেকটি অভিযোগ। আমি বলব, টেলিভিশনগুলো রিয়েলিটি শো বানিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পুরোপুরি সফল হয়নি। হলে একটা কাজের কাজ হতো। এই রিয়েলিটি শো-টা সফল হলে, চিলির সেই শ্রমিকদের মতো জীবিতদের তিনমাস বাঁচিয়ে রেখে, মৃত্যুকূপে হাইড্রোলিক লিফট পাঠিয়ে একে একে সবাইকে জীবিত উদ্ধার করতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করা যেত। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচা করে দুনিয়ার সেরা যন্ত্রপাতি এনে উদ্ধার চালাতে সরকারকে বাধ্য করা যেত। দেশের সক্ষমতা, সেই সঙ্গে গণমাধ্যমের দক্ষতার অভাবের কারণে আমরা সেটা পারিনি। আমাদের টেলিভিশনগুলোর ২৪ ঘণ্টার সরাসরি সম্প্রচার বা এই রিয়েলিটি শো-র কারণেই বিবেকবান মানুষ সাভারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ জীবিত ফিরে এসেছে। ওষুধ রক্ত স্বেচ্ছাসেবক আর সাহায্যের কোনো অভাব হয়নি। বলে রাখি যে, চলমান যেকোনো ঘটনার ২৪ ঘণ্টার কাভারেজই তো রিয়েলিটি শো। চিলির টানা তিনদিনের উদ্ধার তৎপরতার বেলায় বিবিসি-সিএনএন-আল জাজিরাও রিয়েলিটি শো-ই করেছে।

প্রশ্ন উঠেছে এই মানবিক বিপর্যয়ে টেলিভিশনগুলোর প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও। দর্শক যখন দেখেন তখন ভুলে যান মুক্তবাজারের এই দুনিয়ায় টেলিভিশন হলো তথ্য বেচার দোকান। নির্মম হলেও সত্য, এই ব্যবসার পণ্য হলো শাহীনা আর তার জন্যে হাজারো মানুষের আহাজারি। বাণিজ্যের এই যুগে এটি মানবিক সাংবাদিকতার অন্যতম এক প্যারাডক্সও বটে। তাই অ্যাক্টিভিস্ট মানসিকতা পোষণ করার পরও আমাদের সংবাদকর্মীদের এক্সক্লুসিভ খবর নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হয়। সবার আগে শাহীনার লেটেস্ট খবরটা জানাতে হয়। আবার একজন সংবাদকর্মীর এই চাওয়ার পেছনেই জড়িয়ে থাকে শাহীনাদের জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা। শুরুতেই বলেছি, আমরা যদি শাহজাহানের মতো আরো জীবিত মানুষের খবর দিতে পারতাম, তাহলে হয়তো জাতিকে তাদের করুণ মৃত্যুর শোক বইতে হতো না। আমি বলব, পেশাদারী প্রতিযোগিতা যদি আরো বেশি হতো, তাহলে এতো শোকের মধ্যেও আমাদের অভিজ্ঞতায় জড়িয়ে থাকতো জীবনজয়ী হবার কিছু অনন্য উপাখ্যান।

এতো বড় একটি ঘটনা কাভার করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরা বরাবরের মতো একটি পরিচিত ভুলই কিন্তু বারবার করেছেন। সেটা হলো ট্রমা সিচুয়েশানে সাংবাদিকতা। আইসিউতে থাকা মরণাপন্ন কোনো ভিকটিমকে, ‘আপনার এখন কেমন লাগছে’ জাতীয় প্রশ্ন কিন্তু কেবল সাভারেই নয়, যেকোনো ঘটনাতেই আমরা দেখে আসছি। এ ব্যাপারে যেমন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায় আছে, তেমনি সংবাদকর্মীর বিবেচনা বোধের অভাবও আছে। একই কথা বলা যায় ট্রমা সিচুয়েশানে থাকা শিশুদের সাক্ষাৎকার নেয়ার বেলায়ও। ‘তোমার বাবা কোথায়’- এমন নির্দয় প্রশ্ন করে কচি শিশুর শোক আর চোখের জলকে পুঁজি করার লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি অনেকেই। জুরাইনে জুতা পায়ে কবরের ভেতর দাঁড়িয়ে কোনো এক রিপোর্টারের ক্যামেরার সামনে কথা বলার একটি স্টিল ফটো ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। এখানেও নির্দিষ্ট ওই রিপোর্টারের বিবেচনা বোধের প্রশ্ন ওঠে। মৃত্যুশোক তুলে ধরার জন্যে কবর নয়, কবরস্থানই যথেষ্ট। এইসব প্রবণতা নিয়ে বারবার সংবাদকর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, হচ্ছে। সমস্যাটি সংবাদকর্মীদের নয়, ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষের। এ ধরনের বড় দুর্যোগ কাভার করার কোনোরকম কোনো প্রশিক্ষণ আমাদের সংবাদকর্মীদের নেই।

তারপরও বয়োজ্যেষ্ঠরা তাৎক্ষণিকভাবে কর্মীদের নির্দেশনা দিতে পারতেন। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতায় জানি, বার্তাকক্ষের তাৎক্ষণিকতায় এই কাজটি করা হয়ে ওঠে না। সার্বিকভাবে আমার মনে হয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আর জার্নালিজম ইন ট্রমা- এই দুটি বিষয়ে আমাদের সংবাদকর্মীদের প্রশিক্ষণটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়া, এতো বড় মাপের একটি দুর্যোগ কাভার করার মতো কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া, জোড়াতালি দেয়া গরিবি হালের যন্ত্রপাতি দিয়ে সাভারকে যেভাবে গত নয়দিনের ২৪-টা ঘণ্টা টেলিভিশনগুলো দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছে, তা নিশ্চয়ই এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। দেশের টিভি সাংবাদিকতার পরম্পরা যদি কোনোদিন লেখা হয়, ইতিহাস নিশ্চয়ই সেদিন সাভারের অবমানবিক ঘটনায় আমাদের মানবিক সাংবাদিকতার অবদানকে অস্বীকার করবে না।

তবে আরো কিছু দায় গণমাধ্যমের ওপর বর্তায়। স্পেকট্রাম আর তাজরীনের মতো আমরা যেনো সাভার ট্র্যাজেডিকে বেমালুম ভুলে না যাই। নিখোঁজ মানুষদের খতিয়ান, বিজিএমইএ’র টালবাহানা কিংবা ক্ষতিপূরণের বাস্তবচিত্র যদি গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত সমাজে জারি রাখে, তাহলেই আমাদের অ্যাক্টিভিজমের প্রতি ইনসাফ করা হবে। সমাজে রাষ্ট্রে যদি ইনসাফ না থাকে, তাহলে কেবল সংবাদকর্মী আর গণমাধ্যমের কাছে ইনসাফ আশা করা ভুল। সংবাদকর্মীরা নিৎসের সেই সুপারম্যান নন। তারাও পোড় খাওয়া এই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। যেদিন আমাদের এই গরিব দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা রফতানিমুখী গার্মেন্টস বা জনশক্তি শিল্পে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন নিশ্চয়ই আমাদের সাংবাদিকতাও হয়ে উঠবে আরো মানবিক, আরো গণমুখী, আরো কল্যাণকর। তাই ইনসাফই সার কথা।

সুজন কবির: বার্তা সম্পাদক, একাত্তর টেলিভিশন।
sujonkabir@gmail.com