সংখ্যার ভিড়ে হারিয়ে গেল পরিচয়!

শুক্রবার, ০৩/০৫/২০১৩ @ ১১:১২ অপরাহ্ণ

সাহাদাত হোসেন পরশ ::

savarচারদিকে স্বজনহারাদের আর্তনাদ। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল মৃতের সংখ্যা। দেশি-বিদেশি শত শত সংবাদকর্মীও রানা প্লাজার আশপাশে জড়ো হয়েছেন। মহাট্র্যাজেডির ভয়ঙ্কর ক্যানভাসের এক একটি বেদনাবিধূর তথ্যে ভরে যাচ্ছিল সবার নোট প্যাড। সেই প্যাডে বারবারই মৃত আর জীবিত শ্রমিক উদ্ধারের সংখ্যা পরিবর্তন হচ্ছিল। কী ভয়ঙ্কর কথা! মহাট্র্যাজেডির খবর সংগ্রহ করতে এসে মৃত কোনো শ্রমিকের নামই নোট প্যাডে লিখিনি! সত্যি লিখিনি। বারবার লিখছি কত লাশ উদ্ধার হয়েছে সেই সংখ্যা। বুধবার সকালে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর টানা চারদিন সেখানে নিউজ সংগ্রহে গিয়েছি। লাশের দীর্ঘ সারি। পত্রিকার পাতায় এত জায়গা কোথায় তাদের সবার নাম-পরিচয় ছাপানোর!
বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ খবর পেলাম সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনের মৃতদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। রওনা হলাম সাভারের দিকে। গাবতলীতে পৌঁছার পরপরই আবার খবর এলো লাশের সংখ্যা বাড়ছে। ভবনের ভেতর আটকা পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। সে দিন সহকর্মী আতাউর রহমানের সাপ্তাহিক ডে-অফ। তবু ওকে মোবাইল ফোনে সাভারে আসার জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বললাম। ডে-অফে কাজ করতে হবে- এটা হঠাৎ শুনলে কারও ভালো লাগার কথা নয়। প্রথমে ওরও লাগেনি। এরপর ওকে বললাম, রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা হিসেবে রেকর্ড হতে পারে। শত শত শ্রমিক মারা যেতে পারেন! কী মনে হয়েছে জানি না। ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই রানা প্লাজা ধসের পরিণতি কী হতে পারে তার এমন ধারণাই দিচ্ছিলাম ওকে। এরপর আতাউর বলল, প্রয়োজন হলে আমাকে ডেকে পাঠাবেন।

এরপর অনেক উত্তেজনা নিয়ে রানা প্লাজার সামনে গিয়ে পৌঁছলাম। ধসে পড়া ভবন ঘিরে হাজার হাজার মানুষ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়াও সাধারণ মানুষ উদ্ধারে ব্যস্ত। নোট প্যাডে ভয়ঙ্কর এক ট্র্যাজেডির কথা এক এক করে লিখছি। তপ্ত রোদ মাথার ওপর। ধ্বংসস্তূপ থেকে এক এক করে নামানো হচ্ছে আহত-নিহতদের। পথে পথে নানা প্রতিবন্ধকতা আর ভীতিকর পরিস্থিতির পর উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় দিন সকালে আবারও রানা প্লাজার সামনে গিয়ে পৌঁছলাম।
স্বজনহারাদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছিল চারপাশ। শোকে হতবিহ্বল কাকে বাদ দিয়ে কার সঙ্গে কথা বলি। মোবাইলে চরম উত্তেজনা নিয়ে ফোন করি সহকর্মী রাশেদ মেহেদী ভাইকে। ওপাশ থেকে তার উত্তর, আমিও খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। উদ্ধার অভিযানের তৃতীয় দিন ধ্বংসস্তূপের একেবারে ভেতরে যাই। কী বীভৎস। মেহেদি রাঙা তরুণীর নির্জীব হাত বের হয়ে আছে। কারও কপালে লাল টুকটুকে টিপ। হাতে কাচের চুড়ি। বাতাসে লাশের গন্ধ। পাশেই সহকর্মী মাহবুব হোসেন নবীন ভাই। ক্যামেরার ফ্লাশ চাপছিলেন। এর মধ্যেই জীবন্ত একেকটি মানুষকে উদ্ধার করে আনা হচ্ছে। চতুর্থ দিন সকালেও রানা প্লাজার মৃত্যুকূপের সামনে হাজির হই। দুনোমুনো ভাব। ধ্বংসস্তূপে ঢুকব কি ঢুকব না। শেষ পর্যন্ত ঢুকলাম। ছিন্নভিন্ন লাশের পাশেই মৃত্যু উপত্যকা রানা প্লাজায় দাঁড়িয়ে আবার সেই ভয়ঙ্কর কাজটি করেছি। হাত কাঁপছে! আমি লিখছি, গায়ে অ্যাপ্রোন! দোতলায় ফাঁকে পড়ে আছে একটি লাশ! কাছে তবু কত দূরে মনে হয়েছিল, সেবিকার অ্যাপ্রোন পরিহিত দীপিকাকে। পাশেই দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন দীপাকার ভাই। আর বেশি লিখতে পারিনি। দীপিকার ভাইয়ের মোবাইল নম্বর টুকে এনেছি। শেষ কথা- আর কতদিন ট্র্যাজেডির কথা লিখব!

এমন ভয়ঙ্কর খবরের তথ্য নোট প্যাডে টুকতে চাই না। কবে ঘুম ভাঙবে আমাদের।

লেখক: সাংবাদিক, সমকাল।
সৌজন্যে-সমকাল

সর্বশেষ