সাংবাদিকতার নীতির কতটা বাইরে যেতে পারি

শুক্রবার, মে ৩, ২০১৩

ইকরাম কবীর ::

Ekramul Kabirএক টেলিভিশন সাংবাদিকের ছবি ফেসবুকে ঘুরছে। তিনি একটি চ্যানেলের প্রতিবেদক। তাকে দেখা যাচ্ছে জুরাইন কবরস্থানে একটি খোঁড়া কবরের মধ্যে মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে পিটিসি (পিস টু ক্যামেরা) দিচ্ছেন। দৃশ্যটি হয়তো টেলিভিশনে প্রচারিতও হয়েছে। একজন ফটোগ্রাফার ওপর থেকে তুলছেন দৃশ্যটা। তবে প্রতিবেদক দাবি করেছেন, এটা সম্প্রচারিত হয়নি। কিন্তু ছবিটি সাংবাদিকতার যা ক্ষতি করার করে দিয়েছে। ছবিটা টেলিভিশনের চেয়েও বড় মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে।

ছবিটি দেখার পর এই প্রতিবেদক সম্পর্কে কী ধারণা হয়েছে দর্শকের, তা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগছে। প্রতিবেদনটি ছিল সাভার ভবনধসে নিহত নাম-পরিচয় না-জানা মানুষের জুরাইনে দাফন করা নিয়ে। মৃতদেহ দাফন করার সময় কী এমন অ্যাংগেল ওই প্রতিবেদনে থাকতে পারে, যার জন্য আমাকে কবরে নামার দরকার হতে পারে? কতক মৃত মানুষ নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে কী এমন তথ্য আমি দর্শককে দিতে পারি যে আমাকে কবরের মধ্যে নামতে হবে?

একটি খবর কিংবা ছবি কয়েক হাত ঘুরে তারপর সম্প্রচারিত হয়। একজন প্রতিবেদক কিছু একটা পাঠালেই সেটা হুবহু প্রচারিত হয়ে যায় না, এটা আমরা ভালো করে জানি। দৃশ্যটি প্রচার করার আগে যাদের হাতে গিয়েছে, তাদেরও এখানে দায়িত্ব ছিল এটি সম্পাদনা করার। একজন প্রতিবেদক তার পারফরম্যান্স দেখাতে গিয়ে অনেক বিষয়ই তুলে আনবেন, কিন্তু কতটুকু প্রচার হবে তার জন্য দায়িত্প্রাপ্ত ব্যক্তি আছেন। কবরের ভেতর থেকে একজন প্রতিবেদকের পিটিসি যে দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, তা কি তাদের মাথায় আসেনি? নাকি আমরা সাংবাদিকতার চেয়ে নাটকীয়তার দিকেই জোর দিচ্ছি এখন? নাটকীয়তা করলে আমাদের টেলিভিশনে বেশি দর্শক হবে, এমনটা ভাবা কি ঠিক হচ্ছে?

টেলিভিশন, দৈনিক কাগজ, রেডিও ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সংবাদ সংস্থায় সম্পাদকীয় নীতিমালা বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের বিভিন্ন খবরের ক্ষেত্রে এ কথাটি বেশ উচ্চারণ করেন। কিন্তু তাদের লিখিত বা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে বলে কোনো নজির পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত খবর-ছবি দেখে বরং এটা স্পষ্ট হয়, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে চলার ক্ষেত্রে তারা উদাসীন। জুরাইন কবরস্থানে কবরের ভেতর দাঁড়িয়ে পিটিসি দেয়ার বিষয়টি তা-ই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ছবিটি দেখে আরো বোঝা যায়, এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নীতি বা এথিকস মানা হয়নি। যদি কোনো সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকত, তাহলে কোন পরিস্থিতিতে প্রতিবেদককে কী করতে হবে, সেখান থেকে তিনি তা জানতে পারতেন। কাজের সময় এসব বিষয় মাথায় থাকত।

সাভারে সাংবাদিকরা যা করেছেন, তা যে বিপর্যয়কালীন সাংবাদিকতা তা আমরা সবাই বুঝি। আমরা উদ্ধারকাজ দেখিয়েছি; উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি; যারা ভবনের নিচে চাপা পড়ে ছিলেন তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছি; যারা জীবিত উদ্ধার পেয়েছেন তাদের সঙ্গে কথা বলেছি; মৃতদেহের ছবি দেখিয়েছি। ধসে যাওয়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে হতাহত মানুষের অবস্থা দেখে একজন প্রতিবেদকের আবেগাপ্লুত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পরিস্থিতির নিরিখে লাইভ-এ দাঁড়াতে হয়েছে, ফুটেজ ও প্রতিবেদন পাঠাতে হয়েছে। মাঝে মাঝে সাংবাদিকরা অবাক করা সাহস দেখিয়েছেন।

সব মিলিয়ে সাংবাদিকরা যত তথ্য জনগণকে দিয়েছেন, তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তারা সেখানে না থাকলে দেশের মানুষ হয়তো বঞ্চিত হতেন ঘটনার ভয়াবহতা, পারিপার্শ্বিক অবস্থাসহ অনেক কিছু জানা ও দেখা থেকে।

তবে সাভার ভবনধসের ঘটনায় মৃতদেহ যেভাবে দেখানো হয়েছে, সেটা কতটা সঠিক হয়েছে, তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমেরিকায় ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষ মারা যায়, কিন্তু গণমাধ্যমে মৃতদেহ দেখানো হয়নি বললেই চলে। সারা বিশ্বে সাংবাদিকতার যেসব নীতি মেনে চলা হয়, সেগুলো আমরাও মানব কি না, তা ভাবার সময় এসেছে।

সরাসরি সম্প্রচার করতে গিয়ে আমরা কতখানি উদ্ধারকাজে বাধা দিয়েছি, তা-ও বোধহয় ভেবে দেখা দরকার। আমরা সাধারণ মানুষের ভিড় নিয়ে প্রতিবেদন দেখিয়েছি, কিন্তু আমাদের জন্য উদ্ধারকাজে কতটা অসুবিধা হয়েছে, তা হয়তো ভাবিনি। আমরা উদ্ধারকারীদের করা সুড়ঙ্গপথে ঢুকে গিয়েছি। যতক্ষণ আমি নিচে ছিলাম, হয়তো ততক্ষণ উদ্ধারকাজ বন্ধ ছিল। আমাকে নিচে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়েও সময় খরচ হয়েছে। একটা ধসে পড়া ভবনের সুড়ঙ্গপথে আমার যাওয়ার সাহস কতটা করা উচিত, তা ভাবার সময় এসেছে।

শাহীনাকে খুঁজে বের করে আমরা অনেক দর্শককে কাঁদিয়েছি, বিপদগ্রস্তদের জন্য পানি বহন করে আত্মতুষ্টি পেয়েছি। দিন শেষে আমার নিজের কাছেই হয়তো ভালো লেগেছে এই ভেবে যে, আমি একটু হলেও এই দুর্যোগে সাহায্য করতে পেরেছি। এটা ঠিক যে সাংবাদিকরা সেখানে না থাকলে কেউই সংবাদ সম্মেলন করতেন না, কারোরই কোনো জবাবদিহি থাকত না।

তবে, একজন কেবলই বেঁচে বের হলেন, তার অনুভূতি জানতে চাওয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। আমার খবরের জন্য ক্ষুধা রয়েছে; আমার জানার প্রয়োজন রয়েছে, ভবনের নিচে আর কতজন আছেন, এই তথ্যগুলো উদ্ধারকারীদেরও কাজে আসবে। কিন্তু যে মানুষটি সদ্য মৃত্যু্র হাত থেকে বেঁচে এলেন, তাকে ধাতস্থ হতে সময় দেয়া উচিত। তিনি ওই মুহূর্তে কেমন আছেন, শুধু সেটুকুই আমার প্রথমে জানতে চাওয়া উচিত, এর বেশি নয়।

সাভার কাভারেজের সময় আমাদের কাজের কিছু দিক উন্মোচিত হয়েছে। আমরা যেসব ঝুঁকি নিয়েছি, তা কতখানি যুক্তিপূর্ণ ছিল; আমরা সেখানে যেভাবে পুরোদস্তুর আ্যক্টিভিস্টের ভূমিকা নিয়েছিলাম, তার মাত্রা কতখানি ছিল; আমাদের কারণে উদ্ধারকারীদের কাজের কোনো অসুবিধা হয়েছে কি না; আমরা দর্শকদের কী পরিমাণ তথ্য দিতে পারলাম; এমন একটা ঘটনায় কতটা অনুসন্ধানী হতে পারলাম, আমার কাজটা কতটা শোভন হলো– এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে।

শুরুর কথাটি আবার বলতে চাই। আমাদের প্রতিটি টেলিভিশন স্টেশন বা সংবাদপত্রের স্বতন্ত্র সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যা লিখিত থাকবে। নিজের একটি সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকলে সাংবাদিকতার ইতিবাচক দিকগুলো আরো সুন্দরভাবে সবার কাছে পৌঁছাবে।

সাভারের ঘটনার আগেও এমন অনেক দুর্ঘটনা আমাদের কাভার করতে হয়েছে। তাজরীন, স্পেকট্রাম, ফিনিক্স– অনেক ঘটনা। সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আগে আমরা কেউ ওই ঘটনাগুলোর কোনো ফলোআপ প্রতিবেদন করিনি। করলাম, যখন রানা প্লাজা ভেঙে পড়ল। ফলোআপ প্রতিবেদন করার কথা যদি সম্পাদকীয় নীতিমালায় বলা থাকে, তাহলে তা প্রতিনিয়ত করা সহজ হয়। আবার শুধু সম্পাদকীয় নীতিমালা থাকলেই যে সব হবে, তা নয়। নীতিমালার চর্চা কতটুকু হচ্ছে, তাও খেয়াল রাখা জরুরি।

প্রয়োজনীয় নীতিমালা থাকলে কবরের ভেতর নেমে পিটিসি দেয়ার মতো ঘটনা যে আর ঘটবে না, সে ব্যাপারে কিছুটা হলেও নিশ্চিত হওয়া যায়।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন বার্তা ডটকম
সৌজন্যে-নতুন বার্তা ডটকম