সাংবাদিক হত্যার বিচার ও তদন্তে গতি নেই

শুক্রবার, ০৩/০৫/২০১৩ @ ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ

সৈয়দ মো. মুঈনুল হক ::

gonomaddom dibos‘জীবিত মুকুল ছিল সমাজের সবার। আর মৃত মুকুল যেন শুধুই আমার। আমাদের পক্ষে কেউ দাঁড়াচ্ছে না।’
প্রায় ১৫ বছরেও যশোরের সাংবাদিক আর এম সাইফুল আলম মুকুল হত্যার বিচার না পেয়ে কষ্ট-ক্ষোভে কথাগুলো বললেন তাঁর স্ত্রী হাফিজা আক্তার। ১৩ বছরেও বিচার পায়নি যশোরে নিহত আরেক সাংবাদিক শামছুর রহমানের পরিবার। একই রকম কষ্ট আজ নিহত অনেক সাংবাদিকের পরিবারে। স্বজন হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে তারা।
রাজধানীতে খুন হওয়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির পরিবারেরও একই অবস্থা। ১৫ মাসে এ হত্যার রহস্যই উদ্ঘাটিত হয়নি।
সাংবাদিক হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলছে। আহত, নির্যাতিত সাংবাদিকদের করা মামলার অবস্থাও একই রকম। এ পরিস্থিতিতে আজ ৩ মে দুনিয়াজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৩ সালে দিবসটির প্রবর্তন করে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘বাক নিরাপত্তা: সব মাধ্যমে ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা’।
সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সালে বিশ্বে ১০১ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জনকে হত্যার কারণ উদ্ঘাটিত হয়নি।
দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ১৭ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ২০১২ সালেই সাতজনকে হত্যা করা হয়।
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন বাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয় মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যানে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ বছরের মার্চ মাসে ২১ জন সাংবাদিক আহত, সাতজন হুমকির শিকার ও চারজন লাঞ্ছিত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ২০ জন আহত, দুজন হুমকির শিকার, একজন লাঞ্ছিত হন। জানুয়ারি মাসে ২০ জন আহত, দুজন হুমকির সম্মুখীন, একজন লাঞ্ছিত ও নয়জন হয়রানির শিকার হন।
অধিকারের দাবি অনুযায়ী, ২০১২ সালে দেশে ২৮৯ জন সাংবাদিক সহিংসতার শিকার (নিহত, আহত, হামলা, হয়রানি ও হুমকির শিকার) হন। ২০১১ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৫৯।
সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের মতে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের কর্ম-পরিবেশের ক্রমাবনিত ঘটছে। সংস্থাটির করা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক ২০১৩ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪তম। সংস্থাটির ২০১১-১২ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৯তম, ২০১০ সালে ১২৬তম ও ২০০৯ সালে ছিল ১২১তম।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে তথ্য মন্ত্রণালয় একা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও উদ্যোগী হতে হবে। কারণ, তাঁরা হামলা, নির্যাতনের ঘটনা মন্ত্রণালয়ে জানান না। কোনো মহল থেকে হুমকি এলে সঙ্গে সঙ্গে তা তথ্য মন্ত্রণালয়ে জানালে ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হয়।
গণমাধ্যমের পরিচিত মুখ সাগর-রুনি হত্যার রহস্য যেমন উদ্ঘাটিত হয়নি, তেমনি ঢাকার বাইরে কাজ করা সাংবাদিক হত্যারও কুলকিনারা হয়নি। গত বছরের ১৫ জুন রাতে যশোর থেকে প্রকাশিত গ্রামের কাগজ পত্রিকার শার্শা উপজেলার কাশিপুর প্রতিনিধি জামাল উদ্দীনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়নি।
জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম বলেন, এজাহারভুক্ত সাত আসামির মধ্যে তোতা মিয়া, তাঁর স্ত্রী লতা বেগম ও ভাই রাজু মল্লিক কারাগারে আছেন। প্রধান আসামি বজলুর রহমান সম্প্রতি আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদের মধ্যে জসীম উদ্দীন, উকিল মল্লিক ও রমজান মেম্বার পলাতক রয়েছেন। তদন্ত শেষ পর্যায়ে।
এই খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শার্শা থানার গোড়পাড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাসুদুর রহমানকে মনিরামপুর থানায় বদলি করা হয়। পরে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে যশোর পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি তাঁকে যশোর সদর উপজেলার খাজুরা পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে। অপর অভিযুক্ত কনস্টেবল শহিদুল ইসলাম ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত আছেন।
জুনায়েদ আহমেদ হত্যা: হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিবিয়ানার নিজস্ব প্রতিবেদক জুনায়েদ আহমেদ (৩২) গত বছরের জুলাই মাসে খুন হন। কিন্তু মামলা নিতে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানা ও শায়েস্তাগঞ্জ থানা রাজি হয়নি। ফলে জুনায়েদের ছোট ভাই মুজাহিদ আহমেদ হবিগঞ্জ বিচারিক আদালতে মামলা করেন। নিহত ব্যক্তির পরিবারের অভিযোগ, মাদক চোরাচালান নিয়ে প্রতিবেদন করায় ফরিদ মিয়ার নেতৃত্বে জুনায়েদকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের গাফিলতির কারণে প্রধান আসামি ফরিদ মিয়া পালিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন।
বাদী মুজাহিদ আহমেদ বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো দিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। শুনতে পাচ্ছি, চূড়ান্ত প্রদিবেদন দেওয়ার তৎপরতা চালাচ্ছেন।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম বাদীর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
খুলনায় ২০০১ থেকে ২০০৫ সালে পাঁচজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। এর মধ্যে অনির্বাণ পত্রিকার ডুমুরিয়া উপজেলা প্রতিনিধি নওহর আলী, পূর্বাঞ্চল-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হারুন-অর রশীদ, জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বালু হত্যা মামলায় আদালত সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন।
ফরিদপুরে সমকাল-এর নিজস্ব প্রতিবেদক গৌতম দাস হত্যার মামলা আট বছর ধরে চলছে।
হামলা, মারধর: ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি এখন বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে ব্যাপক হারে। সাংবাদিকদের বহনকারী যানবাহনও পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সম্প্রতি।
সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে পাঁচজন নারী সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন। তাঁদের মধ্যে একুশে টেলিভিশনের নাদিয়া শারমিনকে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা রাস্তায় ফেলে মারধর করে।
সৌজন্যে- প্রথম আলো