আসলে আমি কেমন সাংবাদিক?

বৃহস্পতিবার, মে ২, ২০১৩

:: কাজী আবুল মনসুর ::

কাজী আবুল মনসুর।

কাজী আবুল মনসুর।

সাংবাদিকতা কঠিন একটি বিষয়। সাংবাদিক হওয়া যত সহজ, একজন ভালো সাংবাদিক হওয়া ততটাই কঠিন। এ পেশায় যেমন আছে দারিদ্র্য, তেমনি আছে অর্থের প্রলোভন। কেউ হার মানে অর্থের কাছে, দ্রুত ধনী হওয়ার সিড়ি পেয়ে যায়, আবার অনেকে অর্থের কাছে হার না মেনে নিজের কষ্ট আড়াল করতে পারে না। ভালো, সত্যনিষ্ট সাংবাদিকতায় পদে পদে বাধাঁ। বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখন সবচেয়ে অনিশ্চয়তার পেশা। শখের বশে লেখালেখি আর এক সময়ে সাংবাদিকতার নেশায় জড়িয়ে পড়ে অনেক সাংবাদিকের অভাবে মৃত্যুর উদাহরণও রয়েছে সমাজে। আবার ভালো সাংবাদিক হতে গিয়ে প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়ে জীবন গেছে অনেকের। তারপরও সাংবাদিকতা পেশার কোন বিকল্প নেই। সম্মান, খ্যাতি সবকিছুই আছে এ পেশাতে। সাংবাদিকতায় সত্যতার জয় সব সময় হয়ে থাকে। সৎ-নিষ্ঠার সাথে যারা সাংবাদিকতা করেন তাদের মাঝে সব সময় ঝুঁকি থাকে। থাকে মৃত্যুর হাতছানি।

২০১২ সালে শুধু বাংলাদেশের সাগর-রুনি নয়, বিশ্বের অনেক দেশের সাংবাদিক খুনের কারন এখনও কারন জানা যায়নি। তদন্ত চলছে। এ বছর ৭৯ জন সাংবাদিক নির্মমভাবে খুন হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খুনের মাত্রাটা বেশি। একই বছর ‘কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট’ এর মতে ৫৬ শতাংশ সাংবাদিক খুন হয়েছেন, ৩৫ শতাংশ সাংবাদিক ক্রসফায়ারে এবং ৮ শতাংশ সাংবাদিক ঝুকিপূর্ন সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে। এসব সাংবাদিক হত্যার কারন অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রিতা নজরে পড়ার মতো। তবে সাংবাদিক হত্যার সাথে কারা জড়িত এ প্রশ্নের উত্তর খুজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে, ১০ শতাংশ ক্রিমিনাল গ্রুপ, ৭ শতাংশ সরকারের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ইশারায়, ১০ শতাংশ স্থানিয় দুর্বৃত্তদের হাতে, ৭ শতাংশ সেনা সদস্যদের হাতে, ৪৮ শতাংশ রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায়, ৩ শতাংশ পার্লামেন্টারী গ্রুপের হাতে খুন হয়েছেন। তবে ২১ শতাংশের কোন ক্লু পাওয়া যায়নি। ২০১২ সালে বিশ্বের ২৬ সাংবাদিক হত্যারও কারন এখনও পুলিশ বের করতে পারেনি।

বাংলাদেশের সাগর-রুনির মতো সোমালিয়ার আবদি রহমান মোহাম্মদ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক চৈতালি সন্ত্র, চন্দ্রিকা রায় ফিলিপাইনের, নেস্টর লিভাটন, ইড্ডি জেসাস, আলদিনো লায়ো, সিরিয়ার সুকরি আবু আল বুরগাল, বারা ইফসুফ, আলি জুবায়েল, ফারা তাহা, ইরাকের কামরান সালেহ উদ্দিন, গাজওয়ান আনাস, মেক্সিকোর ভিক্টর মেনুয়েল, মার্কো আন্তোনিও, গেব্রিয়েল হেগ, গুলারমো লুনা, রেজিনা মার্টিনাজ, হন্ডুরাসের এনজেল আলফ্রেডো, পাকিস্তানের আওরঙ্গজেব, নেপালের যাদব পাটেল, কলম্বিয়ার আরগেমেরো কার্ডিনাস, আফগানিস্তানের সামিদ খান বাহাদারজাই, ব্রাজিলের পাওলো রর্বাতো, নাইজেরিয়ার নানসোক সালাহ। অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং সাহসী এসব সাংবাদিক আততায়ির হাতে খুন হয়েছেন। নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এসব সাংবাদিক পিছ পা হন নি। সারা বিশ্বে খুন হওয়া সাংবাদিকের মধ্যে বাংলাদেশের দুটি সাহসী ও মেধাবী সাংবাদিক সাগর-রুনির নামও তালিকায় উঠে এসেছে। প্রতি বছর সাংবাদিক হত্যার তালিকা বাড়ছে। তারপরও থেমে নেই সাংবাদিকতা।

বিশ্বে দৈনিক সংবাদপত্র পড়ার ক্ষেত্রে জাপানীরা অনেক এগিয়ে। এ দেশের দৈনিক ইফমুরি সিমবুন বর্তমানে সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় পত্রিকা। প্রায় দেড় কোটি মানুষ এ সংবাদপত্রটি পড়েন। বিশ্বে সর্বাধিক প্রচলিত ১০০ পত্রিকার মধ্যে প্রথম পাচঁটিই জাপানের। পার্শ্ববতি দেশ ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার স্থান অষ্টম স্থানে। মজার বিষয় যে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পাঠকের ১৮টি পত্রিকার স্থান এখনও জাপানের দখলে। জাপানী ভাষায় প্রকাশিত এসব দৈনিক জাপানীরা পড়েন। বাংলা ভাষার কোন পত্রিকা এখনও বিশ্বের ১০০টি পত্রিকার মধ্যে না থাকলেও পাকিস্তানের উর্দু ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক ‘জাং’ এর নাম উঠেছে ৭১তম স্থানে। আরবি ভাষায় প্রকাশিত মিশরের দৈনিক আল আহরাম রয়েছে ৫৬তম স্থানে। বিশ্বে দৈনিকের চাহিদা বাড়লেও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত কোন দৈনিক এখনো ১০০তম স্থানে যেতে পারে নি। সারা বিশ্বে পাঠক বাড়ছে, বাড়ছে সাংবাদিকও।

উন্নত দেশগুলোতে সাংবাদিকদের সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়টি অনেকাংশে নিশ্চিত থাকলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সৎ-সাহসী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বের অনেক বড় বড় নেতা তাদের প্রথম জীবনে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়েন, ড্যানিয়েল ডিফো, বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন, এইচ. জি. ওয়েলস, জর্জ বানার্ডশ, সি. ডপ. স্কট মহাত্মা গান্ধী, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জে.বি. প্রিস্লী, রাজা রাম মোহন রায়, জোসেফ এডিসন রিচার্ড স্টিল ও রুডিয়ার্ড কিপলিংসহ অনেকের নামই তালিকায় আছে।

একজন ভালো-সৎ সাংবাদিককে অসৎ মানুষ ভয় করে। হোক না সে কোন দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী। কোন না কোন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা মাফিয়া। ফ্রান্সের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও সেনানায়ক নেপোলিয়ন এর কথা অনেকেরই জানা। যিনি নিজেকে তার সা¤্রাজ্যে একক অধিপতি বলে গর্ব করতেন। তার দাপট এমন ছিলো যে, কেউ তার সামনে কথা বলতে গেলে কেঁপে উঠতেন। সেই নেপোলিয়নের সা¤্রাজ্যের টনক নড়েছিল সাংবাদিকের কলমে। তিনি এক লাখ সঙ্গীর চেয়ে মাত্র তিনটি সংবাদপত্রকে ভয় করতেন বেশী। খ্যাতনামা আইরিশ লেখক ও দার্শনিক এডমান্ড বার্ক বলেছেন, ‘পার্লামেন্টের তিনটে রাষ্ট্র রয়েছে, কিন্তু ঐ যে দূরে সাংবাদিকগণের আসন সারি সেটি হচ্ছে পার্লামেন্টের ‘চতুর্থ রাষ্ট্র এবং আগের তিনটে রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ।’ গণতান্ত্রিক দেশে পার্লামেন্টের পরেই কিন্তু সংবাদপত্রের স্থান। পার্লামেন্ট ও সংবাদপত্র গণতন্ত্রের দুটি স্তম্ভ।

বর্তমানে সাংবাদিকতা দেশের প্রথম শ্রেণীর শক্তিতে উন্নীত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডিলানো রুজভেল্ট এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘যদি কখনো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে খর্ব করা সম্ভব হয়, তবে মত-প্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার স্বাধীনতা, বক্তব্য রাখার ও জনসমাবেশের অধিকার প্রভৃতি গণতান্ত্রিক মৌল অধিকার অর্থহীন হয়ে পড়বে।’ সংবাদপত্র নির্বাচিত একজন রাজনীতিকের মতোই জনগণ সরকারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র। রাজনীতিক প্রধানত: তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সংবাদপত্র ভূমিকা আরও ব্যাপক ও তাৎপর্যময়।

সংবাদপত্র পুরো রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে এবং এ সংক্রান্ত সকল খবরাখবর প্রচার করে। সংবাদপত্রকে যদি গণতন্ত্রের মূল অবয়ব বলা যায়, তা হলে সংবাদ-প্রতিবেদনকে কাগজের প্রাণ বলা যেতে পারে। সংবাদপত্রের প্রভাব প্রতিপত্তির কারনে বিভিন্ন দেশে এখন হলুদ সাংবাদিকের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল বা উঠতি গনতান্ত্রিক দেশগুলোতে অনেকে সাংবাদিকতাকে পুঁজি করে আখের গোছানোর তথাকথিত সাংবাদিকদের অভাব নেই। বাংলাদেশেও এসব সাংবাদিকদের দাপট থেমে নেই। এখন বিভিন্ন সভা-অনুষ্ঠানে সামনের জায়গাগুলো দখলে থাকে অখ্যাত এসব সাংবাদিকের।

অনেকেরই ধারণা, সংবাদ-প্রতিবেদকের কাজ বেশ সুখের। অথচ আসলে সংবাদপত্র-প্রতিবেদকের কর্মদায়িত্ব অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। তাঁকে তাঁর পেশার স্বার্থে অসময়ে অনভিপ্রেত জায়গায় হাজির করতে হয়। তাঁর কাজ রুটিন মাফিক হওয়ার জোঁ নেই, ১০টা-৫টার ধরাবাঁধা সময়সূচী নেই। প্রতিবেদকের কাজ এমনই যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সব সময়েই কাজে নেমে পড়ার জন্যে তৈরী থাকতে হবে এবং যথাসম্ভব আতঙ্কশূন্য হয়ে যথাযোগ্য আগ্রহ সহকারে দায়িত্ব সম্পাদন করতে হবে। রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে অন্দরমহলেও রয়েছে খবরের পেছনের খবর। আর এসব খবর তুলে আনতে সাংবাদিককে ছুটতে হয়। তবে এখনকার রির্পোটার স্পটে যেতে চায় না বলে অনেক সময় সংবাদের পুরো বিষয়টি উঠে আসে না। সাংবাদিককে অবশ্যই স্পটে যেতে হবে। এ প্রকৃত সত্য যারা উপলদ্ধি করেন তারাই হন ভালো সাংবাদিক।

জনস্বার্থ সংক্রান্ত প্রশ্ন তোলা প্রতিবেদকের কাজ। এ কারণে তাঁর লক্ষ্য হবে সত্যিকার বিবেচনাপ্রসূত একটি ভালো সংবাদ-কাহিনী রচনা করা, বাহাদুরী নেওয়া নয়। তবে, আজকাল অবশ্য আমাদের নিকট অত্যন্ত সুপরিচিত শ্রেষ্ঠ দৈনিক সংবাদপত্রগুলো প্রতিবেদকদের নাম তাঁদের সংবাদের সঙ্গে প্রকাশ করছে। এটা হচ্ছে যখন কোনো প্রতিবেদক তাঁর কাজ অত্যন্ত সুচারুরূপে সম্পন্ন করছেন, তাঁদের বেলায়। এটা প্রতিভাবান উঠতি সাংবাদিকদের জন্যে সত্যিই প্রেরণাদায়ক। তবে অনেক ক্ষেত্রে নামের অপব্যবহার সাংবাদিককে আগ্রাসী করে তুলতে পারে। সাফল্য-প্রয়াসী প্রতিবেদককে সকল সময়ে ন¤্র, উদার ও বিবেক সম্পন্ন হতে হবে এবং সকল পরিস্থিতিতে সকলের সঙ্গে প্রফুল্ল­চিত্রে মিশতে হবে।

স্যার লেস্লী স্টিফেন বলেছেন : ‘সফল সাংবাদিকতার মাপকাঠি কি সে-সম্পর্কে তরুণ-বন্ধুরা যখন আমার পরামর্শ নিতে আসেন তখন তাঁদেরকে প্রথমেই যে-কথা বলে রাখি তা হচ্ছে-যা কোনো প্রকারেই হোক আপনারা কোনো কিছুকে সত্যিকারভাবে জানতে চেষ্টা করুন, খাঁটি ও মৌলিক চিন্তা ধারার অধিকারী হোন, খবরের কাগজের গতানুগতিক যান্ত্রিকতার দাস হবেন না, মানুষ হওয়ার চেষ্টা করুন।’ বিখ্যাত বৃটিশ সম্পাদক ডব্লিউ বরার্টসন নিকল হবু সাংবাদিকদের জন্যে পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছেন: ‘সংবাদপত্র-পাঠকের আগ্রহ কতোখানি তার মাঝেই নিহিত রয়েছে একজন দক্ষ সাংবাদিকের পরীক্ষা। তাঁর হয়তো সার্বজনীন অনুসন্ধিৎসা থাকতে পারে। কিন্তু তাঁকে অবশ্যই তাঁর কাজকে ভালোবাসতে হবে এবং এ জন্যে গর্ববোধও করতে হবে।’ সাংবাদিকতা পেশার ক্ষেত্রে যেসব গুণ একান্তই জরুরি সেগুলোর মধ্যে চিন্তাশক্তি দুরদর্শিতা উদ্যোগ ও পরিশ্রমের কথা বলা যেতে পারে। হৃদয়বান হওয়াও প্রতিবেদকের প্রাথমিক গুণাবলীর অন্যতম। তাঁকে অবশ্যই সহানুভূতিশীল হতে হবে, নিন্দা করা চলবে না। যেখানেই সম্ভব জীবনকে বিষয় বস্তুর মধ্যে প্রতিফলিত করা হবে একজন সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব।

যাঁরা সাংবাদিকতায় সাফল্য লাভের অভিলাষী টি.পি.ও কোনর তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেছেন : ‘আপনার লেখার ব্যাপারে সত্যিকার প্রতিভা আছে কি-না সবার আগে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।’ প্রতিবেদক অবশ্যই একাধারে ভাল পাঠক, শ্রোতা ও লেখক হবেন। সর্বোপরি তিনি একজন মিশুক ভদ্রলোক হবেন। আমি ‘সাংবাদিক’ এ কথার দাপটে যেন কেউ অসহায় বোধ না করে তা লক্ষ্য রাখতে হবে। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে সাংবাদিকও একজন সাধারন মানুষ। তার ভেতরে অসাধারনত্ব তখনই প্রকাশ পাবে যখন তিনি এমন কিছু করবেন যাতে সাধারন মানুষ আপনাতেই তার প্রতি কৃতজ্ঞ হন। সাংবাদিকদের সবার মনে একটি প্রশ্ন যেন সবসময় থাকে, তা হলো….আসলে আমি কেমন সাংবাদিক?

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।