সংঘাতের সময় মানবিক সাংবাদিকতার প্রয়োজন বেশি

মঙ্গলবার, এপ্রিল ৩০, ২০১৩

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা::

songorshoসাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে এক কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে। সংঘাত, সংঘর্ষ, হত্যা, আর সহিংসতার খবরেই ভরপুর পত্রিকার পাতা, টেলিভিশনের পর্দা। সাংবাদিকদের মুহুর্ত থেকে ঘন্টা, সব সময় জড়িয়ে থাকতে হয় বৈরী রাজনৈতিক সংবাদের মাঝে।

দেশব্যাপী রাজনৈতিক আর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলছে, তার খবর সংগ্রহ আর প্রচারের কঠিন কাজটি করছে গণমাধ্যম কর্মীরা। সংঘাতময় পরিস্থিতির সাথে গণমাধ্যমের সম্পর্ক বরাবরই গভীর। সংঘাত বিশ্বব্যাপী বড় সংবাদ বিষয় হিসেবে স্বীকৃত, অন্যদিকে এর সাথে জড়িয়ে আছে একটি রাষ্ট্র ও তার মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই এমন পরিস্থিতি হলে গণমাধ্যম ঝাপিয়ে পড়ে। চাপ, ঝুঁকিকে মোকাবেলা করে সাংবাদিকের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে যতটা সম্ভভ ভালো কাভারেজ নিশ্চিত করার।

প্রযুক্তির কল্যাণে সরাসরি সম্প্রচার এখন সময়ের দাবি। আর তা করাও হয় অনেক সময় ধরে। সংঘাতের সময়ে, গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজে সহিংসতা তৈরী করে, মানুষে মানুষে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয় এমন কাজ থেকে বিরত থেকে মানুষের মাঝে সম্প্রীতি বাড়ায় এমন কাজ করাই সংঘাতময় পরিবেশে গণমাধ্যমের দায়িত্ব। কিন্তু দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে আমার দেশ সহ যেসব গণমাধ্যম সম্প্রতি যে উন্মত্ততা দেখিয়েছে, তাদের কী গণমাধ্যম বলা যায়?

সংঘাত আর সংঘর্ষের সময় গণমাধ্যমের কাজ হলো এমনভাবে রিপোর্ট, মন্তব্য ও ছবি ছাপা ও লেখা যেন ব্যাপক মানুষের শান্তির পক্ষে অবস্থান নেয়। কখনো কখনো তা করতে সব গণমাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়ে।

সারাদেশে যেভাবে গত ফেব্রুয়ারী থেকে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ ধংসের উন্মাদনা চলেছে, মন্দির ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি হামলা হয়েছে, আমরা গণমাধ্যমে রিপোর্ট দেখেছি, ছবি দেখেছি, নানা ধরনের মন্তব্য দেখেছি ও শুনেছি, কিন্তু একটি সমন্বিত উদ্যোগ দেখিনি, সবার একটি সাধারণ আবেদন দেখিনি যে এসব বন্ধ করতে হবে।

ইউনেস্কো বলে, সংঘাত আর সংঘর্ষের সময় গণমাধ্যম পেশাজীবীদের নিজেদের মধ্যে সংলাপ আর যোগাযোগ বাড়াতে হয়, যেন প্রতিটি ঘটনার সঠিক খবর উঠে আসে সব মাধ্যমে।

সশস্ত্র সংঘাতে মানবিক সাংবাদিকতার বড় বেশি প্রয়োজন। এসময়ে সাধারণ ভাবে স্বীকৃত মানুষের মানবাধিকার কোথায় কোথায় ঝুঁকির সম্মুখে, কোথায় তা লঙ্ঘিত হচ্ছে, তা বেশি করে উঠে আসতে হবে গণমাধ্যমে যেন ব্যাপক মানুষ উদ্যোগী হয় সংঘাত থামাতে।

প্রথমত: মানুষকে তার বর্বর আচরণ থেকে কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তার পথ দেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত: আইন-শৃখলা বাহিনী কতটা শৃংখলার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করছে সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং তৃতীয়ত: সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শক্তিগুলো কত দ্রুত আলোচনায় বসতে পারে সে ধরনের সংবাদ আর মন্তব্য বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। সবক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা মানুষের মানবিক মর্যাদার প্রতি, আর সংবাদ, ছবি আর মন্ত্যবের মাধ্যমে কত কম ক্ষতি করা যায়। জাতি, ধর্ম,বর্ণ, সংস্কৃতি, আদর্শ নির্বিশেষে মানুষের কল্যাণই সংঘাতের সময় গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় বিবেচনা।

বর্তমান সময়টা তথ্যের যুগ। মানুষের তথ্য পাওয়ার মতো মাধ্যমের আভাব নেই। তাই এ সময়ে গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও চ্যালেঞ্জিং। এসময়ে বিবাদমান পক্ষের মধ্যে তথ্যের লড়াইটাও চলে সংঘর্ষের মতোই ভয়ানক তালে। তাই স্বীকৃত ভালো মানের গণমাধ্যম সঠিক পথে থেকে মানুষের কাছে ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য তথ্য পৌছে দেয়া খুব সহজ কাজ নয়।

সন্ত্রাসের সময়, মানুষের মন ভীত থাকে। এমন সময়ে মানুষের সেই ভীত ও সন্ত্রস্ত মনকে শৃংখলায় রাখে এমন সাংবাদিকতা করা খুব সহজ নয় কারণ, সন্ত্রাসী চক্রের দর্শন হলো “যত খুন, তত বড় শিরোনাম”।

আর এই সন্ত্রাসী চক্র গণমাধ্যম কর্মীদেরও ছাড় দেয় না এমন সময়ে। বিশ্বব্যাপী যত সাংবাদিক খুন হন, তার বড় অংশই মারা যুদ্ধে বা সংঘাতের সময়ে। তবুও সংবাদ মাধ্যম আর সাংবাদিকদের কাজ করতে স্বাধীন সাংবাদিকতা পথে থেকেই।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ সময়ের দিকে সেসময়ের ম্যানচেষ্টার গার্ডিয়ান পত্রিকার সম্পদাক সি পি স্কট বলেছিলেন, “If people knew the truth the war would be stopped tomorrow. But of course they don’t know, and they can’t know.”

মানুষ খুব কম সময়েই সত্যটা জানে, বা জানতে পারে। সত্য জানলে সে সংঘাত থেকে সরে আসে। তাই এসময়ে গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশা সততা, বস্তুনিষ্ঠতা, এবং ন্যায্যতা।

তাই গণমাধ্যম যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, (মালিক/সাংবাদিক) তাদের নৈতিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার উপর নির্ভর করে কী আচরণ করবে সেই গণমাধ্যম।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
পরিচালক বার্তা
একাত্তর টেলিভিশন