এত খবর এত ছবি কোথায় ছাপি

শুক্রবার, ২৬/০৪/২০১৩ @ ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ

গোলাম সারওয়ার::

bakruroকারও সন্তান নিখোঁজ, কারও বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা স্বামী বা স্ত্রী_ সাভারের বিধ্বস্ত রানা প্লাজা ঘিরে বৃহস্পতিবার ছবি হাতে স্বজনের অপেক্ষায় হাজারো মানুষ কাজল হাজরা
গোলাম সারওয়ার
গত দু’দিন ছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য অগি্নপরীক্ষা। বুধবার সকালে ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই সাভারের দুঃসংবাদ ‘ব্রেকিং নিউজ’ হয়ে বিচলিত করল সংবাদকর্মী ও বার্তাকক্ষের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সাংবাদিকদের। সাভারে নয়তলা ভবন ধসে বহু মানুষের মৃত্যু ক্রমে ক্রমে ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি হয়ে কোটি কোটি মানুষকে বিচলিত-উৎকণ্ঠিত করল। বেশির ভাগ টিভি চ্যানেলের সরাসরি সংবাদের প্রতি উদ্বিগ্ন মানুষের চোখ। এক এক ঘণ্টা পেরোচ্ছে, দ্রুত বাড়ছে লাশের সংখ্যা। সমকালের যুগ্ম সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক, সহযোগী সম্পাদক, তিন অতিরিক্ত
বার্তা সম্পাদক, চিফ ও ডেপুটি চিফ রিপোর্টারদের নিয়ে সম্পাদকের জরুরি বৈঠকে ‘সাভার ট্র্যাজেডি’ পরিপূর্ণ ব্যাপ্তি ও সামগ্রিকতায় সমকালে প্রকাশের প্রসঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলো। এর আগে এত বড় পেশাগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি বলে মনে পড়ে না। সকালে মাত্র দু’জন রিপোর্টার, একজন ফটোগ্রাফার পাঠানো হয়েছিল সাভারে। ১১টার মধ্যেই আমরা নিশ্চিত হলাম, ‘সাভার ট্র্যাজেডি’ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে আরও রিপোর্টার পাঠানো হলো। সমকাল অফিসে সার্বক্ষণিক ঘটনা মনিটর করার জন্য ‘সেল’ গঠন করা হলো। টিভি পর্দায় চোখ রাখার দায়িত্ব দেওয়া হলো একাধিক রিপোর্টার ও সহ-সম্পাদককে। প্রথম ও শেষ পাতায় বিজ্ঞাপন সীমিত রাখার জন্য বিজ্ঞাপন বিভাগকে পরামর্শ দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত এর গুরুভার থেকে গত বৃহস্পতিবারের সমকালও রেহাই পায়নি।
‘পুরনো টাকা নতুন টাকাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়’। এ ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের চিত্র একেবারে বিপরীত। ভালো খবরকে ভেতরের পৃষ্ঠায় হটিয়ে প্রথম পাতা দখল করে নেয় যতসব খারাপ খবর। বৃহস্পতি ও শুক্রবার তা-ই ঘটেছে। সন্ধ্যায় নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ও এতদসংক্রান্ত সংবাদ দিয়ে সমকালের বৃহস্পতিবারের প্রথম পাতা সাজানোর পরিকল্পনা ছিল, প্রস্তুতিও ছিল। ‘সাভার ট্র্যাজেডি’র কারণে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান প্রথম পাতার নিচের দিকে ঠাঁই পেল। একাধিক সহযোগী দৈনিক এ খবর ও ছবি শেষ পাতায়, কেউ কেউ ভেতরের পাতায় ছেপেছে।
সমকালের দু’জন আলোকচিত্র সাংবাদিক বুধবার কয়েকশ’ ছবি পাঠালেন। সাতজন রিপোর্টারের অর্ধশতাধিক রিপোর্ট হাতে এলো_ কোথায় ছাপব এত ছবি! এত সংবাদ! কারিগরি সীমাবদ্ধতার জন্য পৃষ্ঠাসংখ্যা বাড়ানো সম্ভব ছিল না। ‘বিশেষ প্রচ্ছদে’র কথাও ভেবেছিলাম_ সময়ের সঙ্গে দৌড়ে না পারার আশঙ্কায় সে চিন্তাও পরিত্যাগ করতে হলো। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্মম সিদ্ধান্তের বলি হয় সমকালের ‘খেলাধুলা’র জোড়া পাতা। বিভাগীয় প্রধানের ম্লান মুখের দিকে না তাকিয়েই খেলার দুটি পাতা দখল করে সাভার ট্র্যাজেডির ২৪টি ছবি ছাপা হলো। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, উনিশ ও শেষ পাতায় ছবি ছাপা হলো আরও ১৫টি। অর্ধশতাধিক রিপোর্টের মধ্যে মাত্র ৩৪টি রিপোর্ট ছাপা সম্ভব হলো। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক রিপোর্টের ওপর নির্মম কাঁচি চালানো হলো। অন্যান্য সহযোগী দৈনিকের চেয়ে আমরা একটু বেশি খবর ছেপেছি, বেশি ছবি ছেপেছি। সমকালের একাধিক সিনিয়র রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফার বিনিদ্র থেকে সাভারে বুধবার রাতের উদ্ধার তৎপরতার খবর ও ছবি সংগ্রহ করেছেন। সেসব রিপোর্ট ও ছবির প্রতিও সুবিচার করা গেল না। সংবাদকে বলা হয় প্রতিদিনের সাহিত্য। হৃদয় থেকে উৎসারিত আবেগ ও বেদনাবোধে শব্দের মালা সাজিয়ে সাহিত্যের সি্নগ্ধতা ছড়িয়ে অতিদ্রুত রিপোর্ট তৈরি সহজ নয়। তবুও বৃহস্পতি ও শুক্রবারের সমকালের অনেক রিপোর্টে যেন অশ্রুবিন্দু মিশে রয়েছে। সম্পাদক হিসেবে আমি বরাবরই একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের। আমার বিশ্বাস, রচনাশৈলী ও আবেগের মিশ্রণে সাভার ট্র্র্যাজেডির কিছু কিছু রিপোর্ট পাঠককে সম্ভবত স্পর্শ করেছে।
গতকাল সম্পাদকীয়তে সমকাল তার ‘গভীর ক্রন্দনের’ কথা বলেছে। স্থানীয় জনগণ, নানা পেশার মানুষ ও সেনা, পুলিশ, বিজিবি, দমকল কর্মীদের উদ্ধারের বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রসঙ্গ তুলে সমকাল বলেছে, ভূপেন হাজারিকার সেই যুগোত্তীর্ণ গান ‘মানুষ মানুষের জন্য’ যেন সাভারে অশ্রুত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে। দিনের শ্রান্তি ও রাতের নিদ্রাকে হারাম করে যারা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ‘সাভার ট্র্যাজেডি’র কারণে ১৮ দল প্রথমে সাভার, কিছুক্ষণ পর ঢাকা জেলা ও পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সারাদেশে হরতাল প্রত্যাহার করে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। দেশের মানুষ চায়, রাজনীতিকরা ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিহার করে সুখে-দুঃখে গণমানুষের পাশে দাঁড়ান। বিরোধী দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীও ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ‘সাভার ট্র্যাজেডি’ আমাদের দীর্ঘদিন বিচলিত ও বেদনাহত করে রাখবে_ সন্দেহ নেই। পুরো বাংলাদেশই এখন ‘রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি’র অন্ধকূপে। দেশের জীবনীশক্তি নিঃশেষ প্রায়। এই ঘোরতর দুর্যোগে হরতালের অভিশাপ থেকে আমরা চিরদিনের জন্য রেহাই চাই।

লেখক: সম্পাদক, সমকাল।