মৃত্যুর পরও তিনি ‘মানুষের জন্য’

বৃহস্পতিবার, ১০/০১/২০১৩ @ ১১:২৫ অপরাহ্ণ

প্রেস বার্তা ডেস্ক:
image_888আজীবন তার ব্রত ছিল সাম্যবাদের লড়াই। শেষ ইচ্ছা ছিল গবেষণার জন্য দেহ দান। সে অনুসারেই বাম নেতা সাংবাদিক নির্মল সেনের শেষ ঠিকানা হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ)।
পরিবারের সদস্যরা বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় নির্মল সেনের মরদেহ বিএসএমএমইউ’র পরিচালক আব্দুল জলিল ভূইয়ার কাছে হস্তান্তর করেন।

এর আগে সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির কার্যালয়ে নেতা-কর্মীরা দলের সভাপতি নির্মল সেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

তারপর জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকরা এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া এই বাম নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়। খবর রিডিনিউজের।

ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় বেশ কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গত ৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে মারা যান নির্মল সেন।

অকৃতদার নির্মল সেনের বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তার জন্ম ১৯৩০ সালের ৩ অগাস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়।

২০০৩ সালে ব্রেইনস্ট্রোক হলে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নেন এই সাংবাদিক। এরপর থেকে তিনি কোটালীপাড়ার দীঘিরগ্রামে নিজের বাড়িতেই ছিলেন।

শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও লাবণ্য প্রভা সেনগুপ্তের আট সন্তানের মধ্যে পঞ্চম নির্মল সেনের রাজনীতিতে হাতেখড়ি তরুণ বয়সে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে।

কলেজ জীবনে তিনি ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরে তিনি রেভ্যুলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টিতে (আরএসপি) যোগ দেন।

ভারত ভাগের আগে ১৯৪৬ সালে পুরো পরিবার বাংলাদেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে গেলেও থেকে গিয়েছিলেন নির্মল সেন। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ও এমএ পাস করেন তিনি।

নির্মল সেন দীর্ঘদিন শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দলের নেতৃত্ব দেন, পরে দলটি গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টিতে একীভূত হয় এবং নতুন দল গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সভাপতি হন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে তার মরদেহ ল্যাব এইডের মরচুয়ারি থেকে তোপখানা রোডে দলীয় কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখানে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানান দলীয় নেতাকর্মীরা। এরপর কফিন নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় প্রেসক্লাবে।

সেখানে অস্থায়ীভাবে নির্মিত কালো কাপড়ে ঢাকা একটি মঞ্চে প্রয়াত সহকর্মীর প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা জানান সাংবাদিকরা।

প্রথমে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ শ্রদ্ধাপত্র পাঠ করে প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে নির্মল সেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এই ক্লাবের আজীবন সদস্য ছিলেন নির্মল সেন।

অখণ্ড সাংবাদিক ইউনিয়নে সভাপতি কামাল লোহানী বলেন, “নির্মল দা ছিলেন আমাদের অধিনায়ক। সারাজীবন তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ও মেহনতি মানুষের পক্ষে কথা বলে গেছেন।”

“নির্মল সেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছিলেন। তার মৃত্যুতে সাংবাদিকতা পেশার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এটা কখনো পূরণ হবে না।”

অখণ্ড সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “সাংবাদিকদের প্রবাদ পুরুষ, কিংবদন্তী নেতা ছিলেন প্রিয় নির্মল দা।”

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর অগোছালো সাংবাদিকতা পেশা তার নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে উঠেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি ইকবাল সুবহান চৌধুরী বলেন, “সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলাম সেখানে হুইল চেয়ারে বসে নির্মল দা আমাদের কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে সাহস যুগিয়েছিলেন।”

“তার মৃত্যুতে আমাদের অঙ্গীকার হবে, সাংবাদিকদের ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। আসুন আমরা আজ এই শপথগ্রহণ করি।”

এরপর পর্যায়ক্রমে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক মহাসচিব আলতাফ মাহমুদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের অপর অংশের বর্তমান সভাপতি ওমর ফারুক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি কাজী রওনক হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী প্রমুখ নির্মল সেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য দেন।

ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, জাতীয় প্রেস ক্লাব কর্মচারী ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্মল সেনের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এছাড়া প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ দিদার বখত, ডিপি বড়ুয়া, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আহ্বায়ক সাইফুল হক, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নুরুল হক চৌধুরী মেহেদী, জাসদ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. আবদুল জলিল, এফডিসির মহাপরিচালক পিযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নির্মল সেনের প্রতি।
এরপর সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমেই রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের পক্ষে নির্মল সেনের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। তার পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন একান্ত সচিব এ কে এম মনিরুল ইসলাম।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এবং বিএনপির পক্ষে সাদেক হোসেন খোকাও এই কমিউনিস্ট নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, “যে সাম্যবাদের দীক্ষা তিনি জীবণের শেষ দিন পর্যন্ত দিয়ে গেছেন, তা এদেশের গণআন্দোলনের জন্য রূপরেখা হয়ে থাকবে। নব্বইসহ যে কোনো গণআন্দোলনে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।”

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “তিনি কলম দিয়ে সংগ্রাম করে সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি এ দেশে গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকার, সাম্যবাদের জন্য নিরলস কাজ করেছেন। তার সংগ্রামী জীবন ছিল অতি সাধারণ।”

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইদুল হক বলেন, “তিনি সারা জীবন নিপীড়িত মানুষের পক্ষে থেকেছেন। তার আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে চলার পাথেয় হয়ে থাকবে।”

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, “নির্মল সেন যে সময় রাজনীতি করেছেন সে সময় স্বাভাবিক জীবন ও মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি ছিল না। ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নেতা হিসেবে তিনি সব সময় আমাদের আদর্শ হয়ে থাকবেন।”

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), সাম্যবাদী দল, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ছাত্র ফেডারেশন, যুব মৈত্রী, গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশন, জেএসডি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, ছাত্র ঐক্য ফোরাম, গরিবী হটাও আন্দোলন, ছাত্র-শ্রমিক ফেডারেশন, পথনাটক পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাবি শিক্ষক সমিতি, এফডিসি, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, কেন্দ্রীয় ১৪ দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এ সময় নির্মল সেনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

শহীদ মিনার থেকে এই সাংবাদিকের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে(বিএসএমএমইউ)।

নির্মল সেনের ভাইয়ের ছেলে চন্দন সেন বলেন, “উনার শেষ ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মরদেহ বিএসএমএমইউ’র এনাটমি বিভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রাখা হবে।”

সম্পূর্ণ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে নির্মল সেনের শ্রাদ্ধ হবে বলেও জানান তিনি।