প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার: একই মালিকানায় ভিন্ন দুই নীতি

শনিবার, ২০/০৪/২০১৩ @ ৯:৪৪ অপরাহ্ণ

সুলতানা রহমান::

sultana rahman-2মালিকানার সঙ্গে সংবাদপত্রের নীতিগত অবস্থানের গভীর যোগসূত্র দেখেন গনমাধ্যম বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গণমাধ্যমের নীতিমালা মালিকানা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সেখানে মালিকের ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রতিফলিত হয়। এ কারনেই কোন সুনির্দিষ্ট পত্রিকা বা টেলিভিশনের নাম নির্দেশ করে সেই প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অবস্থানটি। আর পক্ষপাতিত্ত্বের দায় ভার সাধারন ভাবে বর্তায় মালিকের কাধে। আমার মনে হয়, এটি নিতান্তই একটি সাধারন দৃষ্টিভঙ্গি, এর সঙ্গে আমার অনেকাংশে দ্বিমত রয়েছে। মালিকানার চেয়েও দায়ভারটি বেশি বর্তায় সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারনী পর্যায়ের সাংবাদিকদের ওপর। আমার মতে, গণমাধ্যমের প্রধানতম সমস্যা সাংবাদিকদের ‘সেল্ফ-সেন্সরশিপ’।

সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের নীতিমালা একটি মৌলিক এবং গুরুত্ত্বপূর্ন বিষয়। নীতি বলতে আমি মৌলিক ‘থাম রুল’ এর কথা বলছি। যেমন প্রতিষ্ঠানটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকবে কিনা, রাজনৈতিক অবস্থান কেমন হবে-এ ধরনের অল্প কয়েকটি বিষয় নিয়ে ‘থাম রুল’ হয় এবং এর আওতায় আরো অনেক নিয়ম কানুন থাকতে পারে যা পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিতও হতে পারে। কো্ন সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হলে সাংবাদিকদের এই নীতিমালা মেনেই কাজ করতে হয়। নিউজ রুম লীডার এবং নীতি নির্ধারকরা ওইসব নীতিমালা বাস্তবায়ন করেন। তারা নীতিমালা প্রভাবিতও করেন।

মালিকের রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে অনেক নীতি-নির্ধারনী পর্যায়ের সাংবাদিকরা কখনো কখনো এতো বেশি ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’ আরোপ করেন, যা খালি চোখে মালিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিবিম্ব বলে ভ্রম হয়। মালিকরা যে সবাই ধোয়া তুলসি পাতা তা নয়, কিন্তু মূল সমস্যাটি সাংবাদিকদেরই বলে আমার হরহামেশা মনে হয়েছে। ‘জ্বি স্যার জ্বি স্যার’ করা নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের সাংবাদিকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। সাংবাদিকদের এই অংশটি নিজেদেরকে মালিকের রাজনৈতিক বিশ্বাস-মতাদর্শের অজ্ঞাবহ অনুসারী দেখাতে মরিয়া থাকেন। ‘রাজা যত কহেন, পারিষদ কহেন তত বেশি’ মানে মালিকের চাওয়াকে তারা ফুলিয়ে ফাপিয়ে মারাত্ত্বক আকার দেয়ার ‘যার পর নাই’ চেষ্টা করেন যা মালিক হয়তো অতটা কল্পনাও করেননি। আবার আরেক শ্রেনীর সাংবাদিক আছেন, যারা নিজেরাই এতো বেশি মটিভেটেড থাকেন যে মালিকের কোনও কিছু চাপিয়ে দেয়ার প্রয়োজনই হয়না। কিন্তু এসবের ব্যতিক্রম নজিরও আছে মেলা, তাদের কারনেই সংবাদপত্র এখনো মানুষের শেষ ভরষার জায়গা।

মালিকানার প্রভাব সংক্রান্ত সাধারন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেনীর কয়েকটি সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন চ্যানেলের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সেই প্রতিষ্ঠান গুলোতে মালিকের সরাসরি কোনও ভূমিকাই নেই। এমন কি মালিক পক্ষ কোনও ভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে বলেও কখনো শুনিনি। একই মালিকানাধীন হয়েও দু’টি সংবাদপত্র কিভাবে নীতিগত অবস্থানে বিপরীত মুখী হতে পারে প্রথম আলো এবং দ্যা ডেইলি স্টার তার জ্বলজ্যন্ত উদাহরন।

বাইরে থেকে অনেকেই পত্রিকা দু’টিকে এক কাতারে দেখেন। কখনো কখনো এমন হাস্যকর কথাও শুনেছি যে নামে ভিন্ন হলেও আসলে একই পত্রিকার- ইংলিশ ভার্সন এবং বাংলা ভার্সন। কিন্তু বাস্তবে এইসব অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন, কল্পনাপ্রসূত। এই দুই পত্রিকার শ্রদ্ধেয় দুই সম্পাদককে ‘একনায়ক’র সঙ্গে তুলনা করে কেউ কেউ ‘ওয়ান ম্যান শো’ এর অভিযোগও তোলে। সেই অভিযোগ যে একেবারে অমূলক তা নয়, তবে ডেইলি ষ্টারের ক্ষেত্রে ততটা প্রযোজ্য নয় যতটা প্রযোজ্য প্রথম আলোর ক্ষেত্রে। কখনো কখনো মিলে যায় বটে কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই পত্রিকা দু’টির নীতিগত অবস্থান থাকে ভিন্ন মেরুতে। সেই মেরুকরনটি সাধারনত এতো সূক্ষ থাকে যে সাধারন পাঠকের পক্ষে ধরা মুশকিল হয়ে ওঠে। কিন্তু দেশের সংকট সময়ে পত্রিকা দু’টির সেই নীতিগত পার্থক্য দিন-রাতের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১/১১ এর সময় সেই পার্থক্য যেমন স্পষ্ট ছিলো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের নীতিগত পার্থক্য দিন-রাতের মতো স্পষ্ট।বলা আবশ্যক, দুটি পত্রিকার ওপরই সব সরকার সব সময় নাখোশ থেকেছে। আওয়ামীলীগ মনে করে, এরা বিএনপি পন্থি, বিএনপি মনে করে আওয়ামী ঘরানার পত্রিকা। বাস্তবে তারা কখনো কোনও দলকে ছাড় দেয়না বলেই উভয় পক্ষের রোষানলে পড়ে। কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায় আর সেকারনেই আজ এতো কথার অবতারনা।

গত ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে ডেইলি ষ্টারের সম্পাদক, উপসম্পাদক যে সব সাহসী গঠনমূলক ‘কমেন্ট্রি’ লিখেছেন, পত্রিকাটি যত ব্যাখ্যামূলক সংবাদ এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, প্রথম আলো সেই তুলনায় পরিবেশ শুধু ঘোলা-ই করে গেছে। প্রথম আলোর ভুমিকা ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের মতো, কখনো কখনো ‘ধরি মাছ না ছুই পানি’ টাইপের। সাংবাদপত্রের দায়িত্ত্ব যদি হয়, পাঠকদের কাছে সঠিক তথ্য সহজ কথায় পৌছে দেয়া, সেই দিক থেকে প্রথম আলো বর্তমান সময়ে শুধু ব্যর্থ-ই নয়, তারা পরিস্থিতিকে স্থূল ভাবে ঘোলাটে করেছে এবং তা কম বেশি সব পাঠকের চোখেই ধরা পড়েছে। অথচ ভাষাগত পার্থক্য এবং পাঠক ভিন্নতার কারনেই ডেইলি ষ্টারের ওইসব সাহসী এবং স্পষ্ট ভূমিকাটি প্রথম আলো করতে পারলে সাধারন পাঠক লাভবান হতো এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা লাভ করতে সক্ষম হতো।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, এই দেশের অগ্রগতিতে প্রথম আলোর ভূমিকা অনন্য, পত্রিকাটি শুধু একটি সংবাদপত্র নয়, একটি ইন্সটিটিউশনের মতো হয়ে দাড়িয়েছে। যে কারনে একই ধাচের লেখা অন্য পত্রিকায় ছাপা হলে প্রতিক্রিয়া হয়না, প্রথম আলো ছাপলে হয়। প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ব্যবধানের কারনে আজকে এক অনাকাক্ষিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও সেই ব্যবধান সব সময় ছিলো, কিন্তু মধ্যবিত্ত তখন রাজপথে ছিলোনা বলে সংগঠিত প্রতিবাদ দেখা যায়নি। পাঠকের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা একটি পত্রিকা পূরন করতে পারেনা, কিংবা পাঠক যা চায় তা-ই বলতে হবে-এমন নয়। পাঠকের প্রত্যাশার বাইরে কিছু যা কিছু আছে তা যদি বস্তুনিষ্ঠ ভাবে, তথ্য-প্রমান দিয়ে উপস্থাপন করা হয়, তাতে পাঠকের আপত্তি থাকার কথা নয়। পাঠক-সম্পাদকের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, প্রত্যাশা বাদ দিয়ে বস্তুনিষ্ঠতাই তো সংবাদের ভাষা হওয়া উচিত। প্রথম আলো এ থেকে মাঝে মাঝে বিচ্যুত হয় এবং তাতে পাঠকের চোখে তাদের ‘হিডেন এজেন্ডা’ ধরা পড়ে।

পাঠক সংখ্যার দিক দিয়ে এই দুই পত্রিকার ব্যবধান বিশাল সত্য, কিন্তু প্রথম আলোর পাঠক যদি হয় সব শ্রেনীর পেশার মানুষ বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, তাহলে ডেইলি স্টারের পাঠক নীতিনির্ধারনী পর্যায়ের গুরুত্ত্বপূর্ন মানুষ। শুধু সংখ্যার বিচারে এই দুই শ্রেনীর পাঠকের গুরুত্ত্ব এবং ভূমিকা বিচার করলে হবেনা। সাধারন মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর যে ভূমিকা, দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের মানুষ, কূটনীতিক, এলিট শ্রেনীকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ডেইলি স্টারের সেই ভূমিকা। ফলে নীতিগত অবস্থানের বিষয় আসলেই প্রথম আলো তাদের যে বিশাল পাঠক গোষ্ঠীর মন-মানসিকতা এবং তাদের প্রতিক্রিয়ার অজুহাত দাড় করানোর চেষ্টা করে, তা একটি অপকৌশল মাত্র।

ডেইলি স্টার নীতিগত ভাবে (থাম রুল) মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সত্যিকারের প্রগতিশীল একটি পত্রিকা। ডেইলি স্টার কখনোই বিরজনীতিকরনের পক্ষে নয়, প্রথম আলো বরাবর বিরাজনীতিকরনের পক্ষে সূক্ষ-স্থূল প্রচারনা চালায়। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আর প্রথম আলো সম্পাদক ৭১ এ কোথায় ছিলেন, কি করেছেন, অজানা। মুক্তিযুদ্ধ করলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারন করবেন-তা নয়, তবে এই দুই সম্পাদকের ব্যক্তিগত প্রোফাইল, তাদের রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক মেরুকরন, মানবিক মূল্যবোধ বিশ্লেষন করলেই পত্রিকা দু’টির মৌলিক ব্যবধান, নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়।

(প্রথম আলো এবং ডেইলি ষ্টার-এ দু’টি পত্রিকা-ই আমার খুব প্রিয়। এখানকার সাংবাদিকরাও আমার খুব পছন্দের।)

লেখক: সুলতানা রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।
সৌজন্যে-আরনিউজ