কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার

শুক্রবার, ১৯/০৪/২০১৩ @ ৮:০০ পূর্বাহ্ণ

প্রেসবার্তাডটকম প্রতিবেদন::

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার

কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার

কাঙ্গাল হরিনাথ তথা হরিনাথ মজুমদার (জন্ম: ১৮৩৩ – মৃত্যু: ১৬ এপ্রিল, ১৮৯৬) বাংলাদেশের গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত বাউল সঙ্গীতের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি সর্বসমক্ষে ফকির চাঁদ বাউল নামেও পরিচিত ছিলেন।
অর্থাভাবে নিজে খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিতে পারলেও কাঙাল হরিনাথ সারা জীবন বাংলার অবহেলিত ও শোষিত মানুষের শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে গেছেন। গ্রামবাংলার অসহায় মানুষগুলোর পক্ষে কথা বলার জন্য তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তবে নির্যাতিত মানুষদের সাহায্যে কাঙাল হরিনাথ শুধু সাংবাদিকতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। অশিক্ষার অন্ধকার দূর করার লক্ষ্যে তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিনা বেতনে শিক্ষকতা করেছেন।

প্রারম্ভিক জীবন
তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নদীয়া জেলার কুমারখালীতে (বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলা) জন্মগ্রহণ করেন। খুব ছোটবেলায় তাঁর পিতা-মাতা লোকান্তরিত হন। তাঁর পিতার নাম হরচন্দ্র মজুমদার। বাল্যকালে কৃষ্ণনাথ মজুমদারের ইংরেজি স্কুলে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। কিন্তু অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষায় বেশীদূর অগ্রসর হতে পারেননি। তবে সারাজীবন অবহেলিত গ্রামবাংলায় শিক্ষাবিস্তারের জন্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের মাধ্যমে আন্দোলন করেছেন তিনি। অতঃপর গোপাল কুণ্ডু, যাদব কুণ্ডু, গোপাল স্যান্যাল প্রমূখ বন্ধুদের সাহায্যে ১৩ জানুয়ারি, ১৮৫৫ সালে নিজ গ্রামে একটি ভার্নাকুলার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন হরিনাথ মজুমদার। এরপর বেশ কিছুদিন ঐ বিদ্যালয়েই বিনাবেতনে শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁরই সহায়তায় ২৩ ডিসেম্বর, ১৮৫৬ সালে কৃষ্ণনাথ মজুমদার কুমারখালিতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।

সাংবাদিকতা::
অত্যাচারিত, অসহায়, নিষ্পেষিত কৃষক-সম্প্রদায়কে রক্ষার হাতিয়ারস্বরূপ সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন হরিনাথ মজুমদার। অল্পশিক্ষা নিয়েই তিনি দারিদ্র্য ও সচেতনতা বিষয়ক লেখনি সংবাদপত্রে প্রকাশ করতেন। প্রথমে সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় লিখতেন। প্রাচীন সংবাদপত্র হিসেবে বিবেচিত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাটি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

পরবর্তীকালে ১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে কুমারখালি এলাকা থেকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি। মাসিক এ পত্রিকাটি কালক্রমে প্রথমে পাক্ষিক ও সবশেষে এক পয়সা মূল্যমানের সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। এতে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়মিত মুদ্রিত হতো। এছাড়াও, কুসীদজীবী ও নীলকর সাহেবদের শোষণের কেচ্ছা-কাহিনীও প্রকাশিত হতো। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ও দেশী জমিদারদের অব্যাহত হুমকিও তাঁকে এ-কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি।

নিঃস্ব কাঙ্গাল হরিনাথ সারাজীবনে সচ্ছলতার মুখ দেখতে না পেলেও ১৮৭৩ সালে কুমারখালির নিজ গ্রামেই গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকাটির নিজস্ব ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৮ বছর রাজশাহীর রাণী স্বর্ণকুমারী দেবী’র অর্থ আনুকূল্যে কাগজ চালানোর পর আর্থিক কারণে ও সরকারের মুদ্রণ শাসনের ব্যবস্থার জন্য পত্রিকাটিকে বন্ধ করে দিতে হয়।

উপমহাদেশের প্রথম ছাপখানা, সাপ্তাহিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ আর কাঙাল হরিনাথ::
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি, পদ্মার পাড় দিয়েই আর গড়াই এর কোল ঘেষে ঐতিহাসিক একটি জায়গা । ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময়কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমি । যেখান থেকে বিপ্লবী বাঘা যতীন এর উত্থান, জমিদার দর্পন এর নাট্যকার মীর মোশাররফ হোসেনের ক্রমশ বিপ্লবী লেখক হয়ে ওঠা । লালনের বিপ্লবী ন্যাংটা বাহিনীর ইংরেজ লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর ইতিহাস । কিন্তু তার ও মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক বিস্ময়কর ইতিহাস ।

উপমহাদেশের প্রথম ছাপখানা

উপমহাদেশের প্রথম ছাপখানা

উনিশ শতকের ভারতবর্ষ আর এই বাংলা ভূখন্ড মূলত ইংরেজ শাসনের কফিন তৈরি করেছে। সেই সময় কাঙাল হরিনাথ এর আবির্ভাব হয়েছিল সাপ্তাহিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামের সংবাদপত্রের মধ্য দিয়ে,বাংলা ১২৭০ সালের ১লা বৈশাখ । এই সেই ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ যার পাতায় পাতায় একজন গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক তুলে এনেছিলেন ইংরেজ শাসনের দুরাচার , অন্যায় । আবার তুলে এনেছিলেন মুক্তির পথ । তার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বিপ্লবের শপথ, মুখবন্ধ, বিপ্লবীদের বীরত্বগাথা। অনুপ্রাণিত করা হয়েছে বিপ্লবীদের । আবার আঘাত করা হয়েছে ব্রিটিশ শাসনের মূলে ।

এই মানুষটি, যার সাহস আর সংগ্রামে তেঁতে উঠেছিল শাসকগোষ্ঠী , যাকে খুন করার জন্য ইংরেজদের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল, তার লেখনীই বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। লালন সাঁইএর ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাঙাল হরিনাথকে একবার জমিদারদের লাঠিয়ালরা ধরে নিয়ে যেতে আসছে শুনে লালন তার বাউলদের দলবল নিয়ে যে ঘরে তাকে পাহারা দিয়েছিলেন সেটি উপমহাদেশের বিখ্যাত এম.এন প্রেস। আবার বলছি, কাঙাল হরিনাথের বংশভিটা কুমারখালির কুন্ডুপাড়া উপমহাদেশের প্রথম প্রেস বা ছাপাখানা । কাঙাল হরিনাথ প্রথম ছাপাখানা তৈরি করেন তার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ কে সচল রাখার জন্য । কিন্তু যে মেশিনটি তিনি ব্যবহার করেছেন তা এসেছিল স্বয়ং ইংল্যান্ড থেকে ।

লন্ডনের ১০ ফিন্সবারি স্টিটের ক্লাইমার ডিক্সন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে কলম্বিয়া প্রেস মডেলের ১৭০৬ নম্বর এ মুদ্রনযন্ত্রটি তৈরি করা হয় ১৮৬৭ সালে। প্রয়াত এডওয়ার্ড বিভান এ যন্ত্রটি পেটেন্ট করেন। ৩০-৩৫ মণ ওজনের ডাবল ক্রাউন সাইজের বিশাল মেশিন। দেখতে একটি দানবের মতো। এ মেশিনে কাগজ ছাপাতে তিনজন লোক লাগত। এখন একটি গল্প প্রচলিত আছে যে ইংরেজদের কাজে লাগাতে দুইটি মেশিন আনা হচ্ছিল জাহাজে করে ।

পথিমধ্যে জাহাজডুবিতে মেশিনদুইটি তলিয়ে যায় বলে ধারণা করা হয় । কিন্তু জাহাজডুবির আগেই একটি মেশিন কোন এক বাঙালী গোপনে সরিয়ে ফেলেন । সেই মেশিনটি পরে কাঙাল হরিনাথের হস্তগত হয় এবং ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ হতে থাকে ইংরেজদের নাকের ডগার উপর দিয়ে । দীর্ঘ ২৫ বছর দৈনিক পাক্ষিক, সাপ্তাহিক হিসা‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ বের হতে থাকে ।

১৯৭১ সালে প্রেসঘরটির ওপরে পাকিস্তানি হানাদারেরা বোমা ফেলেছিল। যন্ত্রটি রক্ষা পেলেও ঘরের ছাদ ও দেয়াল ভেঙে যায়। ১০-১২ বছর আগে থেকে এটিতে আর কোনো কাজ করা যায় না। কয়েক বছর আগে যন্ত্রটির গায়ে থাকা পিতলের লোগো ও ছাপা প্লেটটি চুরি হয়ে যায়।

সরকারি সাহায্যের অভাবে , ভারতবর্ষ তথা উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রন প্রেস বা ছাপা খানা এম.এন প্রেস আজ পরিত্যক্ত একটি বসতবাড়ি । কুমারখালির কুন্ডুপাড়া গেলে দেখে আসতে পারেন কাঙাল হরিনাথ নামের আজন্ম বিপ্লবী মানুষটির স্মৃতিবিজড়িত জায়গা আর একটা ঘরে পরিত্যক্ত সেই মুদ্রনমেশিন । যে ঘরে মীর মোশাররফ হোসেন, লালন শাহ, কাজী নজরুল এসেছেন বার বার , সাহিত্য সৃষ্টি করেছে আন্দোলনের বহমান নদী , বজ্রকঠিন শপথ । বর্তমানে সে ঘরটির ইটগুলো খসে পড়ছে, দেয়াল ভাঙা। দরজা-জানালা ভেঙে পড়েছে। ধসে গেছে মেঝেও। আগাছা জন্মে টিনের চালার ঘরটি রূপ নিয়েছে ঝোপঝাড়ে। আছে মাকড়সার বসতিও।

ছাপখানাটি দেখাশোনা করেন হরিনাথের পঞ্চম পুরুষ অশোক মজুমদার। তিনি বলেন, ‘যে যন্ত্রে কাঙাল, লালন, মীর মশাররফ ও জলধর সেনের হাতের স্পর্শ, সেখানে আমি হাত রাখতি পারিছি, এর চেয়ে সৌভাগ্য আর কি আছে! বয়স হয়েছে, কখন ওপরের ডাক চলে আসে। তখন কী হবে ঐতিহাসিক প্রেসের? সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এটা সংরক্ষণ করত, তাহলে শান্তি পেতাম।’

বাউল সঙ্গীত::
দীর্ঘ আঠারো বছর গ্রামবার্তা প্রকাশিকা সম্পাদনা করার পর সাংবাদিকতা পেশা পরিত্যাগপূর্বক ধর্ম সাধনায় মনোনিবেশ করেন তিনি। হরিনাথ মজুমদার আধ্যাত্মিক গুরু ও মহান সাধক ফকির লালন শাহের লালন গীতির একান্ত অনুরাগী ছিলেন। ধর্মভাব প্রচারের জন্য ১৮৮০ সালে তিনি নিজস্ব একটি বাউল সঙ্গীতের দল প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি কাঙ্গাল ফকির চাঁদের দল নামে পরিচিতি ছিল।

হরিনাথের স্বরচিত গানগুলোও আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর ছিল। গান রচনায় তিনি অসম্ভব পারদর্শিতা ও পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। স্বলিখিত গানে কাঙ্গাল ভণিতার ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় ছিল। তাঁর রচিত বাউল সঙ্গীতগুলো ফকির চাঁদের বাউল সঙ্গীত নামে সুপ্রসিদ্ধ ছিল। ধর্ম সাধনার অঙ্গরূপে তিনি বহু সহজ-সুরের গান রচনা করে সদলবলে সেই গান গেয়ে বেড়াতেন। হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হ’ল গানটি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। গানটির প্রথম চার চরণ নিম্নরূপ :-

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পাড় কর আমারে।
তুমি পাড়ের কর্তা জেনে বার্ত্তা তাই ডাকি তোমারে।।
আমি আগে এসে ঘাটে রইলাম বসে।
যারা পরে এল আগে গেল আমি রইলাম পরে।।

রচনাসমগ্র::
গদ্য এবং পদ্য রচনায়ও হরিনাথ মজুমদার যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর মুদ্রিত গ্রন্থের সংখ্যা আঠারোটি। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে –
• বিজয় বসন্ত (১৮৫৯)
• চারু-চরিত্র (১৮৬৩)
• কবিতা কৌমুদী (১৮৬৬)
• অক্রুর সংবাদ (১৮৭৩)
• চিত্তচপলা (১৮৭৬)
• কাঙ্গাল-ফিকির চাঁদ ফকিরের গীতাবলী (১২৯৩-১৩০০ বঙ্গাব্দ)
• দক্ষযজ্ঞ
• বিজয়া
• পরমার্থগাথা
• মাতৃমহিমা
• ব্রহ্মাণ্ডবেদ

প্রভাব::
হরিনাথের গানগুলো অনেক লেখক, সঙ্গীত বোদ্ধাদের মন জয় করে ও ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে। তন্মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অন্যতম। আমৃত্যু বঙ্গদেশে শিক্ষার প্রসার ও সর্বপ্রকার শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছিলেন তিনি।
সাহিত্যকর্মে তাঁর সুযোগ্য শিষ্যগণের মধ্যে – অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, দীনেন্দ্রনাথ রায়, জলধর সেন প্রমূখ ব্যক্তিত্ববর্গ পরবর্তী জীবনে যথেষ্ট খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেছিলেন।

মহাপ্রয়াণ::
১৬ই এপ্রিল, ১৮৯৬ সালে এই ক্ষণজন্মা লেখক, শিক্ষানুরাগী ও সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে ইন্ডিয়ান মিরর পত্রিকা মন্তব্য করেছিল যে, “নদীয়া জেলাবাসী একজন মহান ব্যক্তিত্বকে হারালো”।
মৃত্যু পরবর্তীকালে ১৯০১ সালে হরিনাথ গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হয়।