গরু মেরে জুতা দান

বুধবার, এপ্রিল ১৭, ২০১৩

প্রভাষ আমিন::

Probhash-Amin-2১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ আমার প্রিয় পত্রিকা প্রথম আলোর নববর্ষ সংখ্যায় ‘টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি’ শিরোনামে হাসনাত আবদুল হাইয়ের একটি ছোটগল্প পড়ে মনটাই খারাপ হয়ে গেল, বলা ভালো নববর্ষটাই মাটি হয়ে গেল। প্রথম আলো প্রিয় বলেই কষ্টটা একটু বেশি লাগলো। এক সময় নিজে দীর্ঘদিন প্রথম আলোতে কাজ করেছি। এখনও প্রথম আলোকে নিজের পত্রিকা বলেই মনে করি। গল্পটি পড়ে প্রথম আলোর পরিচিত অনেককেই ফোন করে ক্ষোভের কথা জানিয়েছি। প্রথম আলোর সঙ্গে আমার অতীত সম্পৃক্ততার কারণে বন্ধুদের অনেকেই ফোন করে ক্ষোভ ঝেড়েছেন আমার ওপরেই, আপনার প্রথম আলো এটা কী করলো। আপনি তো মিডিয়ার কিছু হলেই লিখেন, এখন আপনার প্রথম আলোকে নিয়ে লিখবেন না। আমি তাদের বলেছি আমার প্রথম আলো যা করেছে, তাতে আমি লজ্জিত, ক্ষুব্ধ, ব্যথিত।

প্রথম আলো শাহবাগের গণজাগরণের যে ক্ষতি করেছে তা অপূরণীয়। রাজিবের নামে আমার দেশ কুৎসা ছাপিয়ে যতটা ক্ষতি করেছে, হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্প ছেপে প্রথম আলো তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করেছে। তাই আমার দেশ চোর হলে প্রথম আলোকে সাধু বলার কোনো কারণ নেই। ক্ষতিটা অনেক বেশি বলছি এ কারণে যে, এ গল্পটি যদি আমার দেশে ছাপা হতো, তাহলে মানুষ সেটি বিশ্বাস করতো না। আর গল্পটির পাঠকও হতো অনেক কম। প্রথম আলোর দাবি অনুযায়ী বিশ্বের ১৯০টি দেশের ৬০ লাখ পাঠক প্রতিদিন প্রথম আলো পড়েন। আর গল্পটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির পর নিশ্চয়ই তার পাঠক বহুগুণ বেড়ে গেছে। প্রথম আলোতে ছাপা হওয়ায় এটি বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে। প্রথম আলোতে এ ধরনের একটি গল্প ছাপা হওয়ায় উল্লসিত প্রতিক্রিয়াশীলরা। তারা বলছেন, এতদিন আমরা বলেছি, আপনারা বিশ্বাস করেননি। এখন তো প্রথম আলো ছেপেছে। ইতিমধ্যে ব্লগে-ফেসবুকে গল্পটির বিতর্কিত অংশ হাইলাইট করে নানা কুৎসিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রগতিশীল প্রথম আলোর অস্ত্রেই প্রগতিশীল শাহবাগকে ঘায়েল করছে প্রতিক্রিয়াশীলরা।

তবে মানতেই হবে হাসনাত আবদুল হাই গুণী লেখক। এক লেখায় তিনি সব পাখি শিকার করে ফেলেছেন। শাহবাগের গণজাগরণ, স্লোগান কন্যা, রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা, টিভি রিপোর্টার- সবার চরিত্র হনন করেছেন। অবমাননা করেছেন জাতীয় পতাকার। তবে যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়েছে হেফাজতে ইসলামের দাবিনামার। শাহবাগে বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যাভিচার, নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ- হেফাজতের সব অভিযোগ হাসনাত আবদুল হাইয়ের এক গল্পে প্রতিষ্ঠিত। এত ছোট গল্পে এত পারপাস বড় লেখকরাই সার্ভ করতে পারেন। হাসনাত আবদুল হাই আমলা ছিলেন, উন্নাসিকতার জন্য সবাই তাকে এড়িয়ে চলেন। বলতে দ্বিধা নেই; একসময় তার লেখা সুলতান, নভেরা, একজন আরজ আলী পড়েছি মুগ্ধতা নিয়েই। কিন্তু প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া তার গল্পটিকে বুড়ো বয়সের ভীমরতি ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। বাহাত্তুরে বুড়োর আর লেখালেখি করা উচিত নয়। তুমুল বিতর্কের মুখে আবদুল হাই লেখাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এবং ক্ষমাও চেয়েছেন। তবে ক্ষমা চাওয়ার ধরণটি আমার পছন্দ হয়নি, আমার ধারণা কারোই হয়নি।

তিনি বলেছেন ‘কারো কিংবা কোনো গোষ্ঠির মনে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে গল্পটি লেখা হয়নি। দেখা যাচ্ছে বেশকিছু পাঠক গল্পটি পড়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের ক্ষুব্ধ করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।’ মনে হচ্ছে বেশকিছু পাঠক ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণেই উনি ক্ষমা চেয়েছেন, নিজে যে একটি বাজে লেখা লিখেছেন, তা বোঝেনওনি, সেটা নিয়ে কোনো অনুতাপও নেই। তাই আমরা তাকে ক্ষমা করতে পারলাম না। দাবি করছি তার কাছ থেকে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পদকসহ সকল পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার। এ ধরণের বিকৃত মানসিকতার কারো শোকেসে এই সম্মান মানায় না। তবে উনি মূলধারার সাহিত্য বাদ দিয়ে চটি সাহিত্য লেখায় মনোনিবেশ করলে ভালো করবেন। হাসনাত আবদুল হাই আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন এই ভেবে যে তার প্রত্যাহার করে নেওয়া গল্পটি, প্রত্যাহার করেননি এমন অনেক গল্পের চেয়ে অনেক বেশি পাঠক পড়েছেন। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, যত পাঠক পড়েছেন সবাই এক টাকা করে দিলেও বুড়ো বয়সে ব্যাংকক-পাতায়ায় গিয়ে তার বিকৃতি চরিতার্থ করতে পারতেন। তবে যদি সবাই টাকার বদলে একদলা করে থুতু দেন, তাতেও তিনি ভেসে যাবেন।

হাসনাত আবদুল হাইকে যেমন আমি ক্ষমা করতে পারিনি, তেমনি পারিনি প্রথম আলোকে। গল্পটিতে ব্যক্ত মতামত যে তাদের ‘নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়’, এটা বুঝতে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের ৩৬ ঘণ্টা সময় লেগেছে। আসলে ভাব দেখে মনে হচ্ছে তারাও পাঠকের বিপুল ঘৃণার মুখেই লেখাটি প্রত্যাহার করেছেন। সম্পাদকীয় নীতি ও আদর্শ বুঝতে ৩৬ সেকেন্ড লাগার কথা, ৩৬ ঘণ্টা নয়। পাঠক যদি বিরূপ প্রতিক্রিয়া না দেখাতো, তাহলে হয়তো গল্পটি প্রত্যাহারই করা হতো না। ৩৬ ঘণ্টা পর যখন লেখাটি অনলাইন ও ই-পেপার থেকে প্রত্যাহার করা হলো ততক্ষণে সেটি আর কারো পড়ার বাকি ছিল না। হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখাটি মানুষের মননে যে অস্বস্তি আর ঘৃণার স্থায়ী ছাপ ফেলেছে তা কিভাবে অপসারণ করবে প্রথম আলো। আর চার লাখ ছাপা কপি তো বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে রয়েই গেছে। প্রথম আলো বলেছে ‘অসাবধানতাবশত’ লেখাটি ছাপা হয়েছে। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তা ভয়ঙ্কর। প্রথম আলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সেখানে প্রত্যেকটি লেখা একাধিক দায়িত্বশীল লোকের হাত ঘুরে ছাপাখানায় যায়। আর যদি তাতে স্পর্শকাতর কোনো উপাদান থাকে তাহলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমতি ছাড়া তা ছাপা হওয়া অসম্ভব। আর নববর্ষ সংখ্যা একদিনের প্রস্তুতিতে প্রকাশিত হয় না। অন্তত ১৫ দিনের প্রস্তুতি, লেখকদের তাগাদা দেওয়া, লেখা সংগ্রহ, অলঙ্করন- অনেক হাত ঘুরে তবেই বিশেষ সংখ্যা ছাপা হয়। তাই এতগুলো হাত ঘুরেও যদি অসাবধানতাবশত প্রায় ৩০০০ শব্দের একটি গল্প ছাপা হয়ে যায়, তা নিছক অসাবধানতা বলতে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের লজ্জা লাগা উচিত। তার মানে অসাবধানতায় যে কোনো কিছু ছাপা হওয়া সম্ভব। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঠিত বাংলা নিউজ পোর্টালের এতটা অসাবধানতা গ্রহণযোগ্য নয়। বেহুলার বাসরঘরে সুতার ছিদ্র দিয়ে ঢুকে ভয়ঙ্কর সাপ দংশন করেছিল লখিন্দরকে। আর প্রথম আলোতে দেখি অসাবধানতার সিংহ দরজা।

মানুষ তো ঠেকে শেখে। প্রথম আলো তো তাও শেখেনি। বছর পাঁচেক আগে আলপিনের একটি ছোট্ট কার্টুনকে ঘিরে প্রথম আলো যে সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল, তারপরও যদি তাদের শিক্ষা না হয়, তারপরও যদি এত বড় ফাঁক থেকে যায়, তা কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এরচেয়ে অনেক অনেক ছোট ভুলের জন্য মতি ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক বড় বড় বকা খেয়েছি। সেই বকা ছিল আমার কাছে সাংবাদিকতার ক্লাশ। এখন কি সেই ক্লাশ হয় না? শিক্ষক আর আগের মত কড়া নন, নাকি ছাত্ররা অমনোযোগী? কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রথম আলো তো কোনো ক্লাশরুমের প্র্যাকটিক্যাল নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঠিত বাংলা নিউজ পোর্টাল। প্রথম আলোর ক্ষমা প্রার্থনার পরও আামি আশ্বস্ত হতে পারিনি। ভুলের ক্ষমা হয়, অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হয়। এর আগে আলপিনের ভুলের জন্য চাকরি গেছে সুমন্ত আসলামের। নিরপরাধ কার্টুনিস্ট আরিফকে জেল খাটতে হয়েছে, দেশ ছাড়তে হয়েছে। প্রথম আলো তার পাশেও দাঁড়ায়নি। ‘টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি’ ভুল নয়, অপরাধ। এ অপরাধের দায় কার, কী শাস্তি হয়েছে তার? আমার বোনকে অপবাদ দিয়ে, ক্ষমা চাইলেই কী আমরা মেনে নেবো? ধর্ষনের পর ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে কী ন্যায়বিচার? আমার হালের গরু মেরে তা দিয়ে সুন্দর জুতা বানিয়ে আমাকে গিফট করলেই কি আমি বগল বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরে যাবো?

যদি জেনেশুনে বুঝে লেখাটি ছাপা হয়ে থাকে তাহলে তো আরো ভয়ঙ্কর। দুর্জনেরা বলছেন, জামায়াত-শিবিরের বর্তমান ভাবগুরু ফরহাদ মাজহারের ভাবশিষ্যরাই প্রথম আলোর সাহিত্য পাতার ভাবগুরু। তারাই কি অতি সাবধানে ভাবগুরুর ভাবধারা ছেপে দিয়েছে? আমি বিশ্বাস করিনি, কিন্তু দুর্জন হলেও তাদের দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানোর সরল অঙ্কটা উপেক্ষাও করতে পারিনি। এইরকম দুর্জনদের নানা কথাই আমার ভয়টা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির, প্রগতিশীলদের প্রধান আশ্রয়স্থল প্রথম আলো যদি এতটা অসাবধান হয় বা যদি প্রথম আলোর স্খলন হয়, তাহলে যে আমাদের পায়ের নিচে মাটি থাকে না। আমরা দাঁড়াবো কোথায়?

প্রভাষ আমিন
১৬.০৪.২০১৩
[email protected]
সৌজন্যে- পরিবর্তনডটকম