ব্রাক্ষ্রণ সমাজে আমি যেনো নমশূদ্র!

সোমবার, এপ্রিল ১৫, ২০১৩

সুলতানা রহমান::

sultana rahmanনিজের সম্পর্কে নিজের লেখা বড় বিব্রতকর। কিন্তু এখন নাকি সময়টাই এমন যে, ‘নিজের ঢোল নিজেকেই বাজাইতে হয়, অন্যকে বাজাইতে দিলে ভাঙ্গিয়া যাইবার সম্ভাবনা থাকে।‘ কেউ ‘ভাঙ্গিয়া’ ফেললেও সমস্যা ছিলোনা, সমস্যা হলো কেউ এখন আর অন্যের ঢোলের সন্ধান রাখতে চায়না। তবু প্রতিটি মানুষেরই একটা গল্প থাকে। সফল হলে সেই গল্প অমৃতসুধার মতো। সফলতা ব্যথর্তার হিসেব করার সময় আমার এখনো হয়নি। তবু অবেলায় নিজের ঢোলখানা নিয়ে বসলাম। দীর্ঘ সময় ভেবেও তাল লয় কিছুই ধরতে পারলাম না। নিজের ঢোল নিজে বাজানোও কম কঠিন কাজ নয়!

ঢোল-বাজনার চিন্তা বাদ রেখে চোখ বন্ধ করে দেখছি নিজেকে। ১৯৯৪ সালের কথা। এইচএসসি পাস করে ঢাকায় এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। প্রথম দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলামনা। একই সময়ে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্বিবদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় নৃবিজ্ঞান বিভাগে প্রথম হলাম। ভর্তি হলাম। মাত্র তিনমাস পড়ার সুবাদে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম হ্যানরী মরগ্যান এর মতো নৃবিজ্ঞানী হওয়ার। স্বপ্নে নিজেকে দেখতাম বান্দরবান কিংবা খাগড়াছড়ির কোন গুহায় আদিবাসীদের সঙ্গে জীবন যাপন করছি। কিন্তু সেই স্বপ্নে পানি দিতেই বোধহয় আমার মা’র সংকল্প ছিলো আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে আবারও পরীক্ষা দিতে হলো এবং সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সুযোগও পেলাম। আমার মা তবু অখুশি। কারন ইংলিশ বা আইন বিভাগে ভর্তি হতে পারিনি।

ছোটবেলা থেকে মানুষ কত কিছুই না হতে চায়! জীবনে প্রথম চেয়েছি পাইলট হতে, ৮/১০ বছর বয়েস। তারপর দেখলাম পৃথীবী আরও সুন্দর। বাদামওয়ালা, রিকশা ওয়ালা থেকে শুরু করে কিনা চেয়েছি হতে! কলেজে পড়ার সময় দুস্পর্কের এক মামাকে দেখে সাংবাদিক হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হ্যানরী মরগ্যান তা চুরমার করে দিলেও সাংবাদিকতা পড়ার সুবাদে সেই ইচ্ছা আবারো তীব্র হলো। ৯৫-৯৬ সেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটর হওয়ার চেষ্টা শুরু করলাম। না চিনি ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট, না চিনি পত্রিকার লোকজন। ‘সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ি’ শুধু এই পরিচয়কে সাথে নিয়ে একদিন রওয়ানা হলাম ভোরের কাগজ অফিসে, ১৯৯৮ সালে। পত্রিকার পেছনে ছাপার অক্ষরে লেখা ঠিকানা দেখে রিকশা ঠিক করলাম বাংলা মোটর। বাংলামোটর এসে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে দেখি দৈনিক জনকন্ঠ। রিকশা থামালাম। এক মিনিট ভাবলাম। কি হয় জনকন্ঠে গেলে? ভোরের কাগজেও আমার চেনাজানা কেউ নেই, জনকন্ঠেও না। সুতরাং ঢুকে পড়লাম জনকন্ঠে। বিশাল অফিস, তার চেয়েও বিশাল সেখানে প্রবেশের আয়োজন। রিসেপশনিস্ট জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাবেন? বললাম, অপরাজিতা পাতার সম্পাদকের কাছে।

আপনাকে চেনে?

জ্বিনা।

ওনার নাম জানেনন?

জ্বিনা।

তাহলে আপনার পরিচয় কি বলবো?

সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ি আমি।

১০/১৫ মিনিট পরে যিনি এলেন তাকে দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা থাকলোনা। ছোটখাটো পুতুলের মতো অপার্থিব এক মেয়ে, সে নাকি সম্পাদক! তিনি শান্তা মারিয়া। বিস্ময়ের ঘোর থেকে বেড়িয়ে বললাম, আপু আমি সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ি। কাজ করতে চাই।

আগে কাজ করেছো?

জ্বিনা।

পারবে?

নিশ্চয়ই পারবো।

কি করে বুঝলে পারবে?

চেষ্টা করলে কিনা পারে মানুষ!

শান্তা মারিয়া তার পাতার জন্য আমাকে একটি পরীক্ষামূলক ফিচার লিখতে দিলেন। বাংলামোটর থেকে এক টাকা বাস ভাড়া দিয়ে শাহবাগ নেমে পায়ে হেটে ফিরলাম রোকেয়া হলে। দু’দিন পর লেখা নিয়ে হাজির হলাম শান্তা মারিয়ার দরবারে। এরপর ২/৩ সপ্তাহ কেটে গেলো। লেখা ছাপা হয়না। অপেক্ষা যেনো ফুরায়না। ভাবলাম আমাকে দিয়ে বোধহয় হবেনা। এক মঙ্গলবার অপরাজিতা পাতায় আমার লেখা ফিচারটি ছাপা হলো। আমার নামটি মনে হলো বেশি জ্বলজ্বল করছে! সেই শুরু। আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ছাত্রবাস্থায় কিন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করেছি ভোরের কাগজ, আজকের কাগজ, ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সাপ্তাহিক প্রতিচিত্র এবং নিউজ নেটওয়ার্কে। রিপোর্টার হিসেবে ৯৮ সালে যোগ দেই দৈনিক প্রাইম নামে একটি ট্যাবলয়েডে। কিন্তু মাস তিনেক কাজ করে সেটি ছেড়ে দেই। পড়ালেখা, বিশ্ববিদ্যালয়ে নানামুখী আন্দোলনে সক্রিয়তা, পত্রিকায় চাকরি-সব মিলিয়ে সবকিছুই যেনো গোবলেট পাকিয়ে গেছে, এমন মনে হতে থাকে। ২০০০ সালে মাস্টার্স পরীক্ষার পরপরই যোগ দিলাম দৈনিক মুক্তকন্ঠের খেলাধুলা শাখায়। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে নাঈমুল ইসমাম খানের অনুপ্রেরনায় আজকের কাগজে রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করলাম। বেতন সাড়ে চার হাজার টাকা। এই টাকায় যাতায়াত ভাড়াও হতোনা, তাই বুদ্ধি করে আম্মুর হাতে বেতনের পুরো টাকা দিয়ে দিতাম। আর আম্মু বলতো, চাকরি শুরু পর থেকে আমার পেছনে তার খরচ বেড়ে গেছে!

আজকের কাগজে শুরু থেকেই সিনিয়র সহকর্মীদের কাছ থেকে যে সহযোগীতা পেয়েছি, তা অতুলনীয়। বিশেষ করে আহমেদ ফারুক হাসান এবং মারুফ চীনু-এই দুই জন ছিলেন সাংবাদিক গড়ার কারিগর। ফারুক ভাইয়ের রুক্ষ ব্যবহার আর চীনু ভাইয়ের মোলায়েম বকুনী-বিপরীত মুখী ধাচ, লক্ষ্য একটাই-কাজ শেখানো। তাদের সহযোগীতায় শুরুর একমাসের মাথায় লিড স্টোরী করেছিলাম। ২০০১ সালে চারুকলার ছাত্রী সিমির আত্ত্বহত্যার ঘটনাটি আমিই প্রথম ব্রেক করেছিলাম। ছোটখাটো প্রেস রিলিজ থেকে শুরু করে দুই একটি বড় ঘটনা কভার করার সৌভাগ্য হয়। সৌভাগ্য বলছি এই কারনে যে সে সময়ে পত্রিকাগুলোতে নিউজ রুমে নারী রিপোর্টার ছিলো শতকরা একজন (বেশিরভাগ পত্রিকায় ছিলোইনা), অনেকটা ‘সাইনবোর্ডের’ মতো ‘আমাদেরও একখানা আছে’। তাদের জন্য বরাদ্দ থাকতো নারী ও শিশু বিট। আমি ছিলাম এর ঘোর বিরোধী। এ নিয়ে নিউজরুমে সব সময় ‘গন্ডগোল’ পাকিয়েই রাখতাম। চীফ রিপোর্টার মেসবাহ ভাই বাধ্য হয়েই আমাকে অন্যান্য বিটের কাজ দিতেন। তার সম্মান রক্ষার্থে আমিও মাঝে মাঝে নারী শিশু বিষয়ক এসাইনমেন্ট কভার করতাম। এই বীটে সেখানে আরেক রিপোর্টার ছিলেন রিতা নাহার। ওর অনুপস্থিতিতে আমাকে করতে হতো। তবে সব বিটে সমান ভাবে কাজ করার সুবাদে আমার ‘নিউজ সেন্স’ সম্পর্কে আত্ত্ববিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলাম।

একটি ঘটনা না বলে পারা যায়না। আজকের কাগজের নিয়ম ছিলো একজন রিপোর্টার প্রতিদিন সকাল দশটায় এসে ওইদিনের সব পত্রিকা স্ক্যান করবে। মিটিং এ রিপোর্ট দেবে। এই কাজের দায়িত্ত্ব ছিলো রিতার। আমি যোগদান করার পর আমাকেও দায়িত্ত্ব দেয়া হলো। কিছুদিন পর দেখলাম কাজটি বড়ই বিরক্তিকর। সবচেয়ে বড় কথা এরপরে রিপোর্টিং এ বের হওয়ার মতো সময় থাকেনা। কিছুদিন পর চীফ রিপোর্টারকে বললাম, এই কাজ আমরা দুইজন কেনো করবো? মেসবাহ ভাই বললেন, অফিসের সিদ্ধান্ত রিপোর্টারদেরই এটি করতে হবে। আমি পেয়ে গেলাম সুযোগ। বললাম, সব রিপোর্টারকে একদিন করেই দিলেই তো পুরা মাস কাভার। আমিও আমার রিপোর্ট ঠিক মতো করতে পারি। মেসবাহ ভাই মানলেননা। শেষমেষ আমি আর রিতা বুদ্ধি করে গেলাম নির্বাহী সম্পাদক কাজী নাবিল আহমেদের কাছে। তাকে বোঝাতে পারলাম, দশের কাজ দুইজনের মাথায় নিয়ে আমাদের রিপোর্টিং এর বারোটা বাজছে। শেষমেষ রায় গেলো আমাদের পক্ষে। আজকের কাগজের একমাত্র বিশেষ প্রতিনিধি আনিস আলমগীর ভাইয়ের যেদিন ওই দায়িত্ত্ব পড়তো সেদিন আমি পালিয়ে বেড়াতাম! অবশ্য পরে তিনি রেহাই পেয়েছিলেন। অফিসে আমার নাম হয়ে গেলো প্রীতিলতা! সেখানকার অধিকাংশ সহকর্মী আমাকে অশেষ স্নেহ করতেন, তাদের সঙ্গে আজো আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। বিপদে আপদে এখনো তাদের সহযোগীতা পাই।

২০০২ সালে একদিন কিছুটা অভিমানে হঠাৎ করেই আজকের কাগজ ছেড়ে দিলাম। যোগ দিলাম নিউজ টু ডে পত্রিকায়। বেতন দেয়, দেয়না। নতুন ভাবনা এলো। ইংরেজিতেই যদি কাজ করতে হয় তাহলে কেন ডেইলি স্টার এ নয়? শুধু এই প্রশ্ন মাথায় রেখে একদিন সিভি এবং আমার কয়েকটি রিপোটের ফটোকপি রেখে এলাম কারওয়ান বাজারে ডেইলি স্টারের রিসেপশনে। সেখানে দু চারজন যে চেনাজানা ছিলো না, তা নয়। তবে আমি সব সময় নিজের যতটুকু পরিচয়, ততটুকু্ নিয়েই চলতে স্বচ্ছ্যন্য বোধ করেছি। আমার এখনো মনে আছে ২০০২ সালের ২২ ডিসেম্বর। বিকেল বেলা। আমি ঢাকা কলেজের সামনে রিক্স্ করে যাচ্ছিলাম। আমার মোবাইলটি বেজে উঠলো। অপর প্রান্ত থেকে একজন বললেন, ‘আমি ডেইলি ষ্টার থেকে বলছি, মাহফুজ আনাম।‘ শুনে আমি বোধহয় রিক্স্র ওপরই দাড়িঁয়েই গিয়েছিলাম্। মাহফুজ আনামকে তখনো আমি চর্মচোক্ষে কোনদিন দেখিনি। আমার কাছে বিশাল এক নাম। তিনি ফোনে বললেন, আপনার একটি সিভি পেয়েছি। ইন্টারভিউ এর জন্য আগামী ২৮ তারিখ বিকেলে আসতে পারবেন? বললাম ‘নিশ্চয়ই পারবো’।

দুরু দুরু মনে যথাসময়ে হাজির হলাম। ডাক পরলো আমার। কাঁপাকাঁপা পায়ে গেলাম সম্পাদকের রুমে। তিনি আমার সিভি দেখালেন, কাঠ পেন্সলে গোল গোল করে সার্কেল করা সিভি। বললেন, সার্কেল করা শব্দগুলো অশুদ্ধ, বানান ভুল। সম্পাদক সাহেব বললেন, এমন ভুল ইংরেজি নিয়ে কি করে ইংরেজি পত্রিকায় কাজ করেব? লজ্জায় মাথা নত করলাম। মুখে বললাম, ভাষা একটি চর্চার বিষয়। আমি বরাবর বাংলা মাধ্যমে পড়ালেখা করেছি, কাজ করেছি। চেষ্টা করলে ইংরেজিও ভালো করতে পারবো। প্রায় আধাঘন্টা আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। বুঝলাম আমার সিভির সঙ্গে রিপোর্টগুলো মাহফুজ ভাইয়ের ভালো লেগেছে। তিনি সেগুলোর প্রশংসা করলেন। আমার আত্ত্বপ্রত্যয় কিছুটা হলেও সম্পাদকে মুগ্ধ করেছিলো। তিনি তৎক্ষনাৎ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফাহিম মোনায়েমের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। বলেছিলেন, আমাকে একটি সুযোগ দিতে চান যা তার পক্ষ থেকে আমার জন্য নতুন বছরের উপহার। আমি ধন্য হলাম।

দ্যা ডেইলি স্টার এ প্রথম কয়েকটি দিন আমার মনে হলো ‘দ্যা ডেইলি পেইন’। মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় বুঝতে পারলাম কোথাও কোনো সমস্যা আছে। আমাকে কোন এসাইনমেন্ট দেয়া হয়না। দু চারটা প্রেস রিলিজ দেয়া হয় যা ছাপা হবেনা। ফলে আমি যে প্রেস রিলিজটিকে সংবাদ আকারে লিখছি তা সঠিক হলো কি হলোনা বোঝার কোন সুযোগ আমার ছিলোনা। সঙ্গে ছিলো চীফ রিপোর্টারের ভয়ানক কটাক্ষ। মনে হতো, ব্রাক্ষ্রান সমাজে আমি নমশূদ্র! ভাবতাম অদৃশ্য হওয়ার অলোকিক ক্ষমতাটি যদি আমার থাকতো! চোখের পানি মুছতে মুছতে বাসায় ফিরতাম। অফিসের বাথরুমে লুকিয়ে কেঁদেছি কতদিন! পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলাম। আমাকে যে প্রেস রিলিজগুলো দেয়া হতো সেগুলোর প্রিন্ট কপি জমানো শুরু করলাম। এরইমধ্যে একদিন মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে সিঁড়িতে দেখা। তিনি বললেন, ‘তোমার নাকি নিউজ সেন্স-ই নেই?” এই প্রশ্নে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। জবাব দিতে পারলাম না। কারন আমি আমার নিউজ সেন্স নিয়ে আত্ত্ববিশ্বাসী ছিলাম। ঘন্টাখানেক পর চীফ রিপোর্টার ডাকলেন আমাকে। চেয়ারে বসে উচ্চস্বরে বললেন, ‘মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে তো আপনার কথা হয়েছে। কাল থেকে আর আসতে হবেনা আপনার।‘ আমার চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলো। আজ এই সুযোগে সেই চীফ রিপোর্টারের প্রতি আমার চীর কৃতজ্ঞতা প্রাকাশ করছি। কারন যে অপমান আর কটাক্ষ দিয়ে তিনি আমার ভেতরে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, আমি তাতে পুড়তে পুড়তে খাঁটি হওয়ার চেষ্টা করে গেছি।

সেদিন বাসায় ফিরে একটানা পাঁচদিন রুম বন্ধ করে নিজেকে বন্দী করে রাখলাম। আত্ত্ববিশ্বাস নেমে এলো শূন্যের কোটায়। সেই শূন্যতায় ভর করে বাসা থেকে বের হলাম। সরাসির এপি’র ব্যুরো চীফ ফরিদ হোসেনের কাছে। প্রেস রিলিজ থেকে করা আমার নিউজ আইটেম গুলো তাকে দেখিয়ে জানতে চাইলাম সেগুলো ঠিক আছে কিনা। তিনি দেখলেন। বললেন, ‘দু একটি গ্রামাটিক্যাল মিসটেক আছে, নিউজ স্ট্রাকচার ঠিকই আছে।‘ আমি যেনো দম ফিরে পেলাম। তবু যেনো সংশয় কাটেনা। বৃত্তান্ত কিছু না বলে সেখান থেকে বেড়িয়ে গেলাম আরও দু একজন সম্পাদকের কাছে। তারাও বললেন একই কথা। আমি আত্ত্ববিশ্বাস কিছুটা ফিরে পেলাম। বেশি কিছু না ভেবেই রওয়ানা হলাম ডেইলি স্টারে। সম্পাদকের কাছে।

মাহফুজ আনামের প্রতি ছিলো আমার শ্রদ্ধা মিশ্রিত অগাদ বিশ্বাস-আস্থা। বললাম, “ আমি সাংবাদিক হতে চাই। কিন্তু নিউজ সেন্স না থাকলে সেই চেষ্টা করা বৃথা। আপনি আমাকে এসাইনমেন্ট দেন। তারপর আপনি যদি বলেন, সুলতানা, তোমার নিউজ সেন্স নাই, তবে এই পেশায় আমার চেষ্টা না করাই ভালো।“ আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। সম্পাদক বোধহয় কিছুটা অসহায় আর অনেকখানী করুণা বোধ করলেন। নাছোড়বান্দা আমাকে তিনি এসাইনমেন্ট দিলেন। পরের দিন প্রেসক্লাবে বিএমএ’র সংবাদ সম্মেলন। বাসায় ফিরে এলাম। অপারেশন ক্লিনহার্ট নিয়ে এক্রক্লুসিভ কিছু তথ্য দিয়ে একটি স্পেশাল স্টোরি লিখে ফেললাম। পরের দিন প্রেস কনফারেন্স কভার করে সম্পাদকের রুমের পাশের একটি রুমে বসে সেটি লিখলাম। দুটি রিপোর্ট-ই দিলাম সম্পাদকের কাছে। রিপোর্ট পড়ে মাহফুজ আনাম কিছুক্ষন চুপ করে থাকলেন। কিছুটা ইতস্তত মনে হলো। আমার দু্‌ই চোখ আবারও ভিজে গেলো, কান্নায় কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে যেতে চাইছিলো। আত্ত্বাসম্মানবোধ চাপা দিয়ে বলেছিলাম, ‘বেতন চাইনা, সুযোগ আমাকে দিতে হবে। কোনও অপবাদ নিয়ে এখান থেকে আমি যাবনা।‘ আমার এই দাবী মাহফুজ ভা্‌ই অগ্রাহ্য করতে পারেননি। বলেছিলেন, ‘আমরা একটি নতুন পাতা বের করবো। স্টার সিটি। তুমি ওখানে রিপোর্টিং করো। আর এরমধ্যে ইংরেজীর দক্ষতা বাড়াও।“ আমার অন্য কোন উপায় ছিলোনা। কারন ‘নিউজ সেন্স নেই’ এই অভিযোগে এখান থেকে বের হলে মিডিয়াতে আমার জায়গা পাওয়া কঠিন হবে।

একদিন ডেইলি ষ্টারের নোটিশ বোর্ডে দেখলাম, ইউএনফপিএ পুরষ্কারের জন্য রিপোর্ট জমা দেয়ার সার্কুলার দিয়েছে। সাত আট মাস আগে নিউজ নেটওয়ার্ক থেকে প্রকাশিত আমার একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট চুপিচুপি জমা দিলাম। বিস্ময়কর ভাবে পুরুষ্কারটি আমিই পেলাম। এরপর জীবনে বহু পুরষ্কার পেয়েছি, কিন্তু এতো আনন্দ আর কখনো পাইনি। ওই পুরুষ্কারের ক্রেস্ট একটানা ১৫ দিন ব্যাগে নিয়ে নিয়ে ঘুরেছি! সবাইকে বের করে দেখাতাম। আমি যেনো আরও আত্ত্ববিশ্বাসী হয়ে উঠলাম।

মাহফুজ ভাই প্রায়শই এক সাধুর গল্প আমাকে বলতেন। সাধু পূণ্য লাভের আশায় সকাল বেলায় গঙ্গা স্নান করতেন। একদিন স্নান সেড়ে ঘাটে উঠতেই কতগুলো দুষ্ট ছেলে সাধুর গায়ে থুতু দিলো। সাধু কিছু না বলে আবারও স্নান করলো। দুষ্টরা আবারও থুতু দিলো।সাধু আবারও স্নান করলেন। কিছুক্ষন এমন চলতে থাকলো। এক সময় দুষ্ট ছেলেরা হাল ছেড়ে দিয়ে সাধুকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা সাধু, তুমি আমাদের কিছু বলছোনা কেন? সাধু বললেন, আমার তো উচিত তোমাদের ধন্যবাদ দেয়া। তোমাদের কারনে আমি বেশি পূণ্য লাভ করেছি! দুষ্টরা বিস্মিত হলো। সাধু বললেন, তোমরা যতবার আমার গায়ে থুতু দিয়েছো ততবার আমি স্নান করেছি, ততবার আমি পূন্য লাভ করেছি। দুষ্টের দল সাধুর কাছে মাথা নত করলো।

এই গল্প শুনে আমার ভেতরের সত্ত্বা চিৎকার করে বলতো, ‘আমি কোন সাধু নই, অতি সাধারন একজন মানুষ আমি।‘ কিন্তু আমার কিছুই বলা হয়না। মাহফুজ আনাম এই গল্প কেনো আমাকে বলতেন, আমি বুঝতাম। আমি শক্তি পেতাম। উৎসাহ পেতাম। মেনে নিতাম, প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। তার উৎসাহ আমার জীবনে এক পরম পাওয়া। তার প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। এখনো বিপদে আপদে তাঁর দ্বারস্থ হই। ডেইলি ষ্টারে আমি যা শিখেছি, তা আমার সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বুঁনিয়াদ। সেখানেই আছেন আমার সাংবাদিকতার গুরুতুল্য মোর্শেদ আলী খান। দুষ্টামী করে আমি ডাকি ‘মোর্শেদ আব্বা’। তাকে যে কতটা ত্যাক্ত করেছি, ধৈর্য্য নিয়ে আমার সব যন্ত্রনা তিনি সহ্য করেছেন! অনেক বকাবকিও করেছেন, কিন্তু বুঝতাম তা স্নেহমাখা।

ডেইলি স্টারের ‘স্টার সিটি’ ছিলো শুধু ঢাকার ওপর রিপোর্টিং। থাকতো সফট নিউজ, হার্ড নিউজ। আমি বরাবরই হার্ড নিউজ এবং ইনভেস্টিগেটিভ নিউজ পছন্দ করি। আমার হাতে এমন এমন নিউজ আসতো যা অনেক সময়ই গরুর রচনার মতো টেনেটুনে সিটি পেইজ এ নিয়ে আসতে হতো। কারন আমি সিটি পেজ এর রিপোর্টার। সেই একই নিউজ মূলধারার রিপোর্টারা করলে মূল পত্রিকার লীড স্টোরী হতো। এমনটা অনেকবারই ঘটেছে। পরে আমারও বেশ কিছু রিপোর্ট ফ্রন্ট পেইজে ছাপা হলো, কয়েকটি লীড স্টোরীও হলো।

‘তুমি যদি মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন দেখো, অন্তত চাঁন পর্যন্ত যেতে পারবা”-নাঈমুল ইসলাম খানের উৎসাহ সূচক এই কথা আমাকে বরাবরই প্ররোচিত করেছে। কিছু পারি আর না-পারি, স্বপ্ন কখনো কম দেখতে পারিনা। নাঈম ভাই আমার এমন এক অনুপ্রেরনার উৎস যে মানুষটি না থাকলে এই পেশা থেকে অকালেই ঝরে যেতাম। উৎসাহে ঘাটতি হলে, সাহসে অভাব হলে, আত্ত্ববিশ্বাসে চীর ধরলে-নাঈম ভাই আমার ভরসা। একটি দরজা বন্ধ হলে তিনি তিনটি নতুন দরজা দেখিয়ে দেন! ডেইলি স্টারের শুরুর দিনগুলোতে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত আমাকে নাঈম ভাই-ই বাধ্য করেছিলেন সেখানে কাজ করে যেতে। বলেছিলেন, ‘আজ তুমি মাথা নিচু করে কাজ করো, একদিন সবার চেয়ে উঁচুতে থাকবে তোমার মাথা।‘

একটা সময়ে ডেইলি স্টারে আমার অবস্থান পাকাপোক্ত হলো। মনে হলো যেন বিশ্ব জয় করেছি। কিন্তু বুঝলাম এখানে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখলে আমার বেড়ে ওঠা কঠিন। একদিন আমার বন্ধু তখন এনটিভি’র রিপোর্টার কিশোয়ার লায়লাকে বললাম, ডেইলি ষ্টার ছেড়ে দিতে চাই। বললো এনটিভিতে কাজ করবো কিনা। টেলিভিশনের প্রতি রয়েছে আমার দারুন অভিমান। প্রথম একুশে টিভি ছিলো এক স্বপ্নের নাম। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জনকন্ঠের কন্ট্রিবিউটর হিসেবে সাক্ষাৎকার নিতে গেলাম তরুন সাহিত্যিক সরকার আমীনের। সাক্ষাৎকার শেষে তিনি বললেন, ‘আবেদ খান সাংবাদিকতা বিভাগের দু তিনজন ছেলেমেয়ে খুঁজছে একুশে টিভির জন্য। আমার মনে হয় তুমি খুব ভালো করবে’। আমি ব্যাপক উৎসাহ বোধ করলাম। একুশে টিভিতে কয়েকদফা সাক্ষাৎকার দিলাম। শেষে কিছুই জানালোনা। বিষয়টি আমার তরুন বয়সের আত্ত্বসম্মানবোধে খুব লেগেছিল। এরপর এনটিভি’র যাত্রা শুরু আগে আজকের কাগজের সহকর্মী ফরিদ আলম সেখানে যোগ দিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। আমি আগ্রহ বোধ করিনি। কারন মনে তখন ডেইলি স্টারে অপমানের প্রতিশোধের স্পৃহা। কাজ দিয়ে আমি তা শোধ করেছিলাম। কিশোয়ার লায়লাকে বলেছিলাম, অফিসে কথা বলে আমাকে জানাতে।

২০০৫ এর আগস্টের কোন একদিন গেলাম এনটিভিতে। সাক্ষাৎকার নিলেন হাসনাইন খুরশীদ। টেলিভিশনের পর্দায় তাকে দেখেছিলাম, এই প্রথম দেখলাম সরাসরি। অক্টোবরে জয়েন করার প্রস্তাব দিলেন। কথা আধা-পাকা করে ফিরে এলাম ডেইলি স্টারে। মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরঘুর করছে, এই কথা কি ভাবে মাহফুজ ভাইকে বলবো? মনে কিছুতেই সাহস আনতে পারছিলামনা। মাহফুজ আনাম এমন এক যাদুকর, অসামান্য ব্যক্তিত্ত্ব যার কথা শুনে আমি আমি হিপনোটাইসড হয়ে যেতাম। ভাবি এমন কি শুধু আমারই হয়? দু’ একজন সহকর্মীর সঙ্গে আলাপে জানলাম তাদেরও হয়। জীবনে কত মানুষ দেখলাম, উপমহাদেশের ডাকসাইটে অনেক সম্পাদকও দেখেছি-কিন্তু মাহফুজ আনাম আমার কাছে উজ্জ্বলতর। একে তো অমন ব্যক্তিত্ত্ব, তারওপর রয়েছে কৃতজ্ঞতা, ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই আমি লজ্জিত বোধ করছিলাম। সাহস করে একদিন গেলাম সম্পাদকের রুমে। বললাম, ‘ছেড়ে দিতে চাই। কোনও অভিযোগ নেই।‘ তিনি আমার সমস্যা জানতে চান। আমি কিছুই বলতে পারিনা। বলতে পারিনা, সেখানে আমার গন্ডি খুব ছোট, অন্য দশটি রিপোর্টার কাজের যতটা সুযোগ পায়, আমিও ততটা চাই। বলতে পারিনা, আমি বড় হতে চাই, আর বনসাই হয়ে থাকতে চাইনা। আমার আবেগপ্রবন দুই চোখ শুধু ভিজে যায়!

একদিকে এনটিভিতে সুযোগের হাতছানী আরেকদিকে বনছাই হয়ে থাকা! অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম। রিজাইন লেটার হাতে গেলাম সম্পাদকের রুমে। কিন্তু চিঠিটি তাকে দেয়ার সাহস পেলামনা। হিপনোটাইসড হয়ে ফিরে এলাম। সেই চিঠি হাতে ঘুরলাম কয়েক দফা। এদিকে এনটিভি থেকে এপোয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে এসেছি। কঠিন এক অবস্থা। অবশেষে চিঠি জমা দিলাম ডেইলি স্টারের এইচআর বিভাগে। মাহফুজ ভাই এতো রেগে গেলেন যে সেদিনই আমার দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। আমি আর বছরখানেক তার সামনে যাইনি! জানি, তিনি এখনো আমাকে অনেক স্নেহ করেন।

শেষের দিনগুলোতে ডেইলি ষ্টারে আমি ভালোই ছিলাম। নির্ঞ্জাট। তবু প্রতিষ্টানটি ছাড়ার পরে মনে হলো আমি যেনো শৃঙ্খলমুক্ত হতে পেরেছি। এনটিভিতে শুরু হলো আরেক সংগ্রাম। টেলিভিশন সাংবাদিকতার কিছুই বুঝিনা। প্রথম দিন এসাইনমেন্টে আমার সঙ্গে ছিলেন এনটিভির সেসময়ের চীফ ক্যামেরাম্যান হুমায়ূন কবীর ভাই। জিজ্ঞেস করলেন, টিসি লাগবে? আমি আকাশ থেকে পরলাম। টিসি আবার কি! বললেন, টাইম কোড। জানতে চাইলাম, টিসি কি কাজে লাগে। সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন। আমার দৌড় কতদূর তিনি বুঝে গেলেন! এনটিভি-তে সপ্তাহখানেকের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস হয়েছিলো। সেটি খুব কাজে দিলো। তবে কাজ শিখলাম মূলত: ক্যামেরাম্যান এবং ভিডিও এডিটরদের কাছে। আমি সভাৌগ্যবান যে দেশের সেরা পেশাদার ক্যামেরাম্যান ভিডিও এডিটর সেখানে পেয়েছিলাম। তাদের অনেকে অনেক রিপোর্টারের চেয়েও বেশি দক্ষ। প্রখর নিউজ সেন্স সম্পন্ন। আসলে টেলিভিশন হোক আর প্রিন্ট-ই হোক, সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি একই। শুধু দুই মাধ্যমের ভাষা ভিন্ন। টেলিভিশনের ভাষা ছবি, পত্রিকার ভাষা শব্দ। বিষয়টি হাতে কলমে বুঝতে সময় লেগেছিলো। সেখানে তখন মোস্তফা ফিরোজ, সুপন রায়, আমিনুর রশিদের মতো স্টার ঝানু সব রিপোর্টার। কিছুদিন পর মনে হতে লাগলো, আমাকে যেনো কেউ সহজ ভাবে নিতে পারছেনা! কেউ বলে, তোমার কন্ঠস্বর রুক্ষ, জন্মের পর বাবা-মা মধু খাওয়ায়নি। কেউ বলে, কিছুই হয়না। পত্রিকাই তোমার জন্য ভালো ছিলো। তবে আমার দিক থেকেও মনযোগে ঘাটতি ছিলো। এনটিভিতে কাজ শুরুর মাত্র ছ’মাস আগে সংসার শুরু করেছি, এরও চারমাসের মাথায় অন্ত:সত্ত্বা হলাম। সেসময় কেউ কেউ পরামর্শ দিলেন, ছুটি নিতে কিংবা চাকরি ছেড়ে দিতে। আমি তা মানতে পারিনি। ওই অবস্থায় আমাকে কাজ দিতে অফিস উৎসাহী ছিলোনা। আমার জন্য মহামুশকিল। অফিসের জন্যও মুশকিল। তারা হয়তো ভেবেছে, এসাইনমেন্ট দিলে সবাই ভাববে এই অবস্থায়ও আমাকে কাজ দিয়েছে। তাদেরকে কেমন করে বোঝাই, কাজ-ই আমার অষুধ! এসাইনমেন্টের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরতে লাগলাম। দু’একটা যা পেতাম তাতে প্যাকেজ তো দূরের কথা উভ-ও হয়না! শেষমেশ রাগ করে সিদ্ধান্ত নিলাম, রাতে কাজ করবো। কারন একমাত্র ওই সময়েই সব ক্যামেরা স্টোরে পরে থাকে। ক্যামেরা নাই-এই অজুহাত দিতে পারবেনা। আইডিয়া দিলাম। ঢাকা শহরের মাদক ব্যবসা। কেউই ততটা উৎসাহ দেখালোনা। আমি নাছোড়বান্দা। সন্ধ্যার পর ক্যামেরা নিয়ে বের হতাম। কাজটি ছিলো খুবই ঝুকিপূর্ণ। পাঁচমাসের অন্তসত্ত্বা অবস্থায় অতটা সাহস আমি কোথায় পেয়েছিলাম ভাবলে এখনো আমি শিউরে উঠি। পাঁচ পর্বের সিরিজ রিপোর্ট করেছিলাম যা মানুষ এখনো আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমি বুঝতে শিখলাম, কোনও পথই আমার জন্য মসৃন নয়। এনটিভিতে প্রায় দুই বছর কেটে গেলো। মন মতো কাজ করতে পারিনা। বেশির ভাগ সময় হয় ‘স্ট্যান্ড বাই’, না হয় এমন কোনও এসাইনমেন্ট যা হয়তো একবার অন এয়ার হলেও হতে পারে। প্যাকেজ বানাতে পারতাম কালেভদ্রে। একবার একমাসের এসাইনমেন্ট সিট জমা করে হিসেব করে দেখিয়েছিলাম আমাকে কতটুকু কাজ দেয়া হয়। আমি হয়ে গেলাম ‘অভিযোগকারী।“ একই দশা ছিলো আরও কয়েকজনের। তাদের একজন দিনের আলোচিত খবরের নাম দিলো ‘মাখন’। বুঝেছিলাম, মাখন পাওয়ার সম্ভাবনা আমার কম। তাই সে আশা বাদ দিলাম। অনুসন্ধানী রিপোটিং এর দিকে বেশি মনোযোগ দিলাম। মাখন না খেয়েও আমি আমার নিজস্ব স্টাইল দাঁড় করাতে সক্ষম হলাম।

জহিরুল আলম যেদিন এনটিভি’র চীফ অব করোসপন্ডেন্টস এর দায়িত্ত্ব পেলেন, আমি বলেছিলাম, ‘অন্য দশজন রিপোর্টারকে আপনি যতটুকু সুযোগ দেন, বেশি চাইনা, আমাকে ততটুকু দিয়েন। অন্য দশজন রিপোর্টারের জন্য যতটুকু চিন্তা করেন, ততটুকু আমার জন্য করেন।‘ জহির ভাই সেই সুযোগ আমাকে দিয়েছিলেন। আমি তার সদব্যবহার করতে পেরেছি বলে বিশ্বাস করি।

এনটিভিতে মাতৃত্ত্বকালীন ছুটি তিন মাস, কিন্ত আমি নিলাম দেড় মাস। ছেলের লালান পালন যত্নআত্ত্বিতে আমার মা এবং ছোটবোনের তটস্থতায় আমি করনীয় তেমন কিছু খুঁজে পাইনা। তাই ছুটির বাকী দেড় মাস অফিসে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকলাম। অফিসের অসাধারন সহযোগীতা তখন পেয়েছি আমি। বলে রাখি, আমার ছেলে প্রথম ছ’মাস বুকের দুধ ছাড়া কিছু খায়নি। পুরো এক বছর তাকে আমি ব্রেস্ট ফিডিং করিয়েছি। ডাক্তার কাজী নওশাদুন্নবী অন্য মায়েদের কাছে আমার উদাহরন দিতেন। এই প্রসঙ্গটি উঠালাম এ কারনে যে, কর্মক্ষেত্রে পুরুষরা নারীদের সঙ্গে ‘ডুয়েল রোল’ প্লে করে। যদি একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ এসাইনমেন্টে দু চারদিন আপনাকে বাসার বাইরে থাকতে হয়, আপনার সন্তানের দেখভাল কে করবে, মা হয়ে আপনি কিভাবে থাকবেন, সন্তান আপনাকে খুঁজবেনা-এ ধরনের প্রশ্ন করে পরোক্ষ ভাবে আপনার মাতৃত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইবে, অপরাধবোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করবে। যেনো আপনার সন্তান-সংসারের ভালোমন্দে তার অনেক দায়িত্ত্ব। কিন্তু সেই ব্যক্তিটিই পুরো বিপরীত রুপ ধারন করবে যদি আপনি সন্তানের অসুস্থতার কারনে কিংবা সংসারের অন্য জরুরী প্রয়োজনে অফিসে আসতে দেরি করেন, কিংবা ছুটি চান। বলবে, ‘এই জন্যইতো মেয়েদের চাকরী দেয়া ঝামেলা।“ এটি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মজ্জাগত রোগ। অনেক নারীও এই রোগে আক্রান্ত। আমার এই লেখাটি যদি ওই রোগাক্রান্তদের কেউ পড়েন, বলবেন, “বাবারে! এদের ছেলেমেয়েদের খোঁজখবরও নেয়া যাবেনা! নারীবাদী!“

এনিটিভি’র অনেকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, নানা কারনে। হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের বাসায় মানুষ যতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, এনটিভি আমার কাছে আজো ততটাই নিজের। আমার যদি সামান্যতম অর্জন থাকে, তার পূর্নতা আমি পেয়েছি এখানে। সিএনই খা্য়রুল আনোয়ার মুকুল ভাই আমার কাছে পিতৃতুল্য। তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যায়। তিনি সমব্যাথি হতে জানেন। ক’জন তা পারে!

মাছরাঙা টেলিভিশনের গল্প বাকি থাকলো। বেঁচে থাকলে, সময় সুযোগ হলে, একদিন বলতে চাই। আত্ত্ববিশ্বাসের সঙ্গে বলছি, সেইদিন এদেশের গোটা সাংবাদিক সমাজ আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে।

আমাদের সমাজ কাঠামোয় কোনও মেয়ের জন্য কোনও কাজই সহজ নয়। মাত্র ২৭ বছর বয়সে বিধবা, অর্ধশিক্ষিত আমার মা সবসময় বলেন, ‘একটি মেয়ের ক্ষমতা অসীম। কিন্তু অধিকাংশ মেয়েই তা জানেনা। যারা জানে, তারা আত্ত্ববিশ্বাসী হয়। অন্তরের ভয় ভীতি সংশয় আড়াল করে শামুকের খোলসটি ধারন করতে পারলে একটি মেয়ের ব্যক্তিত্ত্বের সামনে পুরুষরা তুলার মতো উড়ে যায়।‘ দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এমএ পাশ করেও আমি ওই একই সত্য জেনেছি। তাই নিজের চেহারায় সবসময় সাহস আর আত্ত্ববিশ্বাস রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা মেয়েদের ওই আত্ত্ববিশ্বাসী চেহারার মধ্যে খুঁজে পায় ঔদ্ধত্য, বেয়াদবী। ‘নারীবাদী’ বলে গালি দেয়। আমি করুণা বোধ করি! তবে জীবনে দু’টি নীতি আমি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছি। এক. পরচর্চা না করা। দুই. কোন মেয়ের বিপক্ষে না যাওয়া। পক্ষে যাওয়া সম্ভব না হলে নিরবতা পালন করা। অক্ষরে অক্ষরে এই নীতি আমি মেনে চলি। শিক্ষাটি আমি পেয়েছি মাহফুজ আনামের কাছে।

বাবা নেই, ভাই নেই, চাচা মামাও জীবনে দেখেছি খুব কম। পুরুষহীন পরিবারে বড় হয়ে পুরুষের সমাজে চলা বড় কঠিন। তবে ওই কারনেই আমি আজীবন স্বাধীনচেতা। জড়াতাহীন। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস করতে শিখেছি, ‘পাঁচজনে পারে যাহা আমিও পারি তাহা’। এ জন্য পদে পদে যেমন ভুগেছি তেমনি কতজনের যে সহযোগীতা, সহমর্মীতা, অনুপ্রেরণা পেয়েছি তাদের নাম বলতে গেলে এই লেখা শুধু দীর্ঘতরই হবে। সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

‘সবার উপরে স্বামী সত্য তাহার উপরে নাই’-মুখে বলি এই কথা কিন্তু কাজেকর্মে ভিন্ন আমি। আমার সঙ্গে সংসার পেতে জীবনে যে ‘ভুল’ আমার স্বামী-বন্ধুটি করেছে, বুঝতে অসুবিধা হয়না প্রতিনিয়ত তাকে সেই ‘মাশুল’ গুনতে হয়। আমার সবটুকু ঋণ কেবল তারই কাছে।

দীর্ঘ এই লেখাটি কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেউ কষ্ট পেলে আমি দু:খিত। লজ্জিত নই। কারন একটি কথাও ভুল লিখিনি। এই লেখাটি সেইসব নারী সাংবাদিকদের জন্য যারা অনাগত, যারা নতুন, যারা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে নিজের সম্ভাবনাটুকু প্রকাশের পথ পায়না-কেবল তাদেরই জন্য।

লেখক: সংবাদকর্মী

সৌজন্যে-আরনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম