বিস্তৃত হলুদ সাংবাদিকতা

মঙ্গলবার, ০৯/০৪/২০১৩ @ ১০:৩৫ অপরাহ্ণ

সুকান্ত পার্থিব::

প্রকৃত সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি ও প্রধান লক্ষ্য নিরপেক্ষ, সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপন করা। কোন সত্য ঘটনাকে মুক্ত দৃষ্টিকোন থেকে চিন্তা করে সম্যক বিশ্লেষনের মাধ্যমে তথ্য প্রমানসহ পাঠকের কাছে তুলে ধরা যেখানে নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রয়োজনিয়তা একান্ত কাম্য । আসলে কি আমরা সব গনমাধ্যমে নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার সাক্ষর দেখতে পাচ্ছি ? নাকি হলুদ সাংবাদিকতা চর্চার মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আক্রোশ ভঙ্গিমায় অপপ্রচার চালানো হচ্ছে ? ভুমিদস্যুরা কালো টাকা সাদা করার লক্ষ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গনমানুষের সামনে মুখোশ পড়ে নিজেদের অপরাধ-কুকীর্তিকে ঢাকতে গনমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের শক্ত ভিতের আবাসের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করছে । প্রকৃত সাংবাদিকতা আজ কালোবাজারি কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের হাতে বন্দি হয়ে গেছে । গনমাধ্যমের মালিকদের একাধিপত্যের কারনে অনেক মিথ্যা রাতারাতি সত্যের খোলেসে ঢুকে সাময়িক সত্যের রুপধারন করছে । নিজেদের অবস্থান টিকে রাখার লক্ষ্যে সেই কারনেই কতিপয় বিজ্ঞ সম্পাদক, অসংখ্য সিনিয়র সাংবাদিক এবং মফস্বলের বেশীরভাগ সাংবাদিক নিজেদের বিবেক অসততার জলে বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করছেন না !

এ ধরনের সাংবাদিকতার উৎকৃষ্ঠ উদাহরন ব্যাপকভাবে পাওয়া যাচ্ছে নতুন প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমগুলোর হিংসা ভাবাপন্ন সংবাদে । প্রকৃত সত্য গোপন রাখার শপথ গ্রহন করে এবং মূল ঘটনাকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার জন্যে সেইসব গনমাধ্যম নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে অন্য সব বস্তুনিষ্ঠ গনমাধ্যমকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের সম্পর্কে কুৎসা রটাচ্ছে । ২০০৪ সালের ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার ছয় বছর পর একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রকৃত সত্য উদঘাটনের অর্জনকে গোপন করে আরব্য রজনির কাহিনির মতো গল্প বানিয়ে সব দোষ প্রথম আলো’র সম্পাদক মতিউর রহমান এর উপর চাপিয়ে দাওয়ার জন্যে বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও পোষ্টারিং করছে এবং তাদের গনমাধ্যমকে ব্যবহার করে মিথ্যা-উৎভট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত-বানোয়াট সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে জনমনে অহেতুক প্রশ্নের ঝড় তুলছে এবং সন্দেহ ঢোকাচ্ছে । আশা করি, সচেতন জনমহলে সকলেরই জানা উক্ত গ্রেনেড হামলার পরপরই প্রথম আলো নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্র হিসেবে নিষ্ঠার সাথে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আপ্প্রান চেষ্টা চালিয়েছে । তার উৎকৃষ্ট প্রমান পাওয়া গেছে ২০০৮ সালের ২১ আগষ্টে সত্য, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও প্রমানের ভিত্তিতে উক্ত গ্রেনেড হামলা সম্বন্ধে বিশেষ কভার পেইজ (৪ পৃষ্ঠা) প্রকাশ হবার পর । সেখানে সুস্পষ্ট তুলে ধরা হয়েছিল বিএনপি- জামায়াত জোট সরকার ঐ ঘটনাকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে নিরাপরাধিদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল অপরাধির তালিকায় । তাছাড়াও হামলাকারীদের জবানবন্দি, জড়িতদের নাম প্রকাশ করা সহ আহতদের শারিরিক ও জীবিকার অবস্থার সচিত্র বিবরন তুলে ধরা হয়েছিল সেদিনের সংখ্যায় । সেসময় এই সাহসিক পদক্ষেপ জনমনে সত্য উদঘাটনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল । ঐ ঘটনার মূল হোতা কারা তা বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের উর্ধ্বমহলের ভালভাবেই জানা ! ব্যক্তিগতভাবে কারো প্রতি আক্রমন করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের গোপন রাখার পাঁয়তারা করার মহৎ পেশার নামই কি সাংবাদিকতা ? ব্যক্তি আক্রোশ চালিয়ে হলুদ সাংবাদিকতার বীজ বপন করার দায়ে ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারী ভারতীয় উপমহাদেশে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র বেঙ্গল গেজেট (হিকির গেজেট) সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নতুন পথের সন্ধান দিলেও তার কন্ঠস্বর ১৭৮২ সালে চিরতরে রোধ হয়েছিল । এই করুন ইতিহাস জ্ঞান ও তথ্য সন্ধানী সকল সাংবাদিকের অবশ্যই জানার কথা !

গনমাধ্যম হলো এমন একটি মাধ্যম যা গনমানুষের দুঃখ-দুর্দশা, সমস্যা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, অধিকার অর্জনের চিত্র তুলে ধরবে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে । সরকার, রাজনৈতিক দল ও সমাজ ব্যবস্থার নানা অন্যায়-অনাচার-অসংগতি গঠনমূলক সমলোচনার মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে ফুটিয়ে তুলবে নিরক্ষাধর্মী বিশ্লেষনের দ্বারা । কিন্তু, গত ২১ সেপ্টেম্বর হলুদ সাংবাদিকতা চর্চারত কিছু গনমাধ্যমের ভিত্তিহীন সংবাদকে প্রাধাণ্য দিয়ে কয়েকজন এম,পি, মন্ত্রি এবং স্পিকার মহোদয় মহান জাতীয় সংসদে যেভাবে প্রথম আলো, সমকাল এবং আমাদের সময় এর ঘোর মিথ্যে সমলোচনায় মুখর হয়ে তাদের সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করলেন, দেখে মনে প্রশ্ন জাগল এ দেশে কি গনত্রন্ত্র নতুন রুপধারন করে ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে ? যেখানে গনমানুষের গনমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি হস্তক্ষেপ করা হয়, সেখানে লোক দেখানো তথাকথিত ‘গনত্রন্ত্র’ ফ্যাসিবাদ শাসন বাবস্থারই পূর্বাভাস দেয় । সরকার দলীয় নেতা-জনপ্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে গনমানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও প্রকাশ্যে দলীয়করনের বক্তব্য জাহির করলে গনমাধ্যমে তার প্রকৃত চিত্র খবরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুললেই অপরাধ ? এই হলো আমাদের দেশে জনগনের মূল্যবান ভোটে নির্বাচিত অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন কিংবা জ্ঞানপাপী জনপ্রতিনিধির অবিবেচক কর্মকান্ড ! সরকারের আধিপত্যে অবরুদ্ধ গনমাধ্যমের স্বাধীনতা ! এই ইতিহাস স্মরন করে দেয়া অতি জরুরী যে- দেশ স্বাধীনের কয়েক বছর পর ১৯৭৫ এর ১৬ জুন শেখ মুজিবুর রহমান ‘নিউজ পেপার ডিক্লারেশন এনালমেন্ট অর্ডিন্যান্স’ জারি করে বাংলাদেশে চারটি সংবাদপত্র ব্যতিত সকল দৈনিক পত্রিকার প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষনা করে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় চরম আঘাত হানেন এবং সাংবাদিকদের উপর ক্রোধের খড়গ ছুড়ে মারেন । এমন দৃষ্টান্ত কিছুটা হলেও বর্তমান মহাজোট সরকারের অদক্ষ্য রাজনীতিবিদগণের বিতর্কিত বক্তব্যে ও কার্যকলাপে পরিলক্ষিত হচ্ছে !

কোন গনমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর যদি এ ধরনের ব্যক্তি আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, তবে কিভাবে সত্য টিকে থাকবে সঠিক মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সংগে নিয়ে । কালোবাজারিদের মিথ্যে প্ররোচনায়-আধিপত্যে কতকাল নির্ভীক সাংবাদিকগণ মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকবে ? সত্যকে গোপন করতে বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে কতদিন পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে এই বাংলাদেশের মাটিতে ঐ সব গনমাধ্যম টিকে থাকবে ?

প্রকৃতপক্ষে, গনমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখা দরকার গনমানুষের মূল্যবোধ, চিন্তা-চেতনার বিকাশ, অবস্থা এবং ব্যবস্থার পরিবর্তন আনয়নের স্বপক্ষে ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আক্রোশমূলক বানোয়াট সংবাদ প্রকাশে নয় । তাহলে সেই মাধ্যম শুধু ব্যক্তিস্বার্থ সাধনের জন্যে, কখোনই জনগনের মঙ্গলে ভূমিকা রাখতে পারে না । বস্তুনিষ্ঠ গনমাধ্যমগুলোর অবশ্যই সচেষ্ট ভুমিকা রাখা উচিত তরুন সমাজ ও নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরে দেশাত্ববোধের প্রত্যয়ে শোষনমুক্ত, বিভেদ-বৈষম্যহীন, মৌলবাদ-জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অভিপ্রায় ।

কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের মিথ্যে শৃঙ্খল ভেঙ্গে এই কলুষিত ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে কলমসৈনিক সাংবাদিকদের বলিষ্ঠ হাতের সাহসী উদ্দ্যোগ ও অমিত লেখনী শক্তিই পারে উত্তরনের পথ সম্মুখে প্রশস্ত করতে । তারাই পারে নিজেদের সত্য প্রকাশে অটল রেখে স্বচ্ছ, সৎ , বস্তুনিষ্ঠ হিসেবে গড়ে তুলতে । যুগে-যুগে, কালে-কালে প্রমানিত হয়ে এসেছে সত্য চিরদিন অন্ধকারে গোপন থাকে না, সূর্যের আলো’কে সঙ্গে করে নিয়ে অবশ্যই প্রখর কিরনে আলোকিত করবে বিশ্ব-ভুবন ।

সর্বশেষ