সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা

মঙ্গলবার, ০৯/০৪/২০১৩ @ ১০:৩১ অপরাহ্ণ

মাহমুদুর রহমান দিলওয়ার::

‘গত ১৭ মার্চ রাত ৩ টার সময় তিন ট্রাকবোঝাই রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ দৈনিক গণকন্ঠ কার্যালয়ে প্রবেশ করে এবং সোমবার প্রকাশিতব্য শেষ ফর্মা (১ম ও ৮ম পাতার) মেশিন হইতে নামাইয়া ফর্মাটি ভাঙ্গিয়া ফেলে। তারা কার্যালয়ের প্রতিটি কক্ষের জিনিসপত্র তছনছ করে এবং কর্মরত কর্মচারীদের উপর নির্যাতন চালাইয়া ৭ জনকে গ্রেফতার করে। একই সময় বাসভবন হইতে গণকণ্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদকেও গ্রেফতার করা হয়। একই সময় ছাপাখানা হইতেও সোমবারের শেষ ফর্মার সিলোফিন পেপারসহ প্লেটটি আটক করে। সোমবারের পত্রিকা প্রকাশ কার্যত বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। সোমবার ও মঙ্গলবার সারাদিন ও রাত ধরিয়া পুলিশ ও রক্ষীবাহিনী কিছুক্ষণ পরপর গণকন্ঠ কার্যালয়ে যাইয়া সেখানে কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হইয়াছে। পত্রিকার বার্তা সম্পাদকসহ অন্য সাংবাদিকরা বাড়ি-ঘর ছাড়িয়া অন্যত্র রাত কাটাইতে বাধ্য হইতেছেন। রিপোর্টাররা সংবাদ সংগ্রহ করিতে যাইয়া হুমকির সম্মুখীন হইতেছেন। কারাগারে গণকন্ঠ সম্পাদকের সহিত সাক্ষাতের চেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে। তাহাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখা হইয়াছে বলিয়া খবর পাওয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া মফস্বল সংবাদদাতাসহ গণকন্ঠ কার্যালয় থেকে গ্রেফতারকৃতদের কোন সন্ধান পাওয়া যাইতেছে না।’ (২১ মার্চ ১৯৭৪, দৈনিক ইত্তেফাক)
দৈনিক ইত্তেফাকের এই রিপোর্টই প্রমাণ করছে- তৎকালীন সময়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার রূপ কেমন ছিল। সত্য প্রকাশে আপোষহীন প্রতিটি সংবাদপত্রের জন্য নেমে আসে অমানিশা, মহাবিপদ। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন ভয়াবহ রূপ নিলো সেই নগ্ন হস্তক্ষেপ। এ দিনটিতে বাকশাল সরকার ‘দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজার্ভার ও টাইমস’ এই ৪টি পত্রিকা ছাড়া সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিল। সংবাদপত্রের কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়, শত শত সাংবাদিক সেদিন চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন বিএফইউজে ও ডিইউজে দিনটিকে ‘কালো দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি সংবাদপত্রবিহীন রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রবিহীন সংবাদপত্র-এ দু’টোর মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়, আমি শেষেরটি পছন্দ করবো।’ যে সংবাদপত্রের এত গুরুত্ব, সেই সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে যদি চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র হয়- তা নিঃসন্দেহে ব্যক্তি, সমাজ, জাতি তথা দেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ। আজও সেই ষড়যন্ত্র চলছে। যা আমরা কখনই কামনা করি না।
সাংবাদিকরা জাতির জাগ্রত বিবেক। জাতিকে সমৃদ্ধি ও উন্নতির স্বর্ণশিখরে পৌঁছাতেই তাদের স্বাপ্নিক পথচলা। সমাজ ও জাতির চলমান অবস্থা তুলে ধরেন তারা। তাদের কলমের অাঁচড়ে ফুটে ওঠে সমস্যা ও সম্ভাবনার সুন্দর চিত্র। জাতিকে সঠিক নির্দেশনা প্রদানে তাদের ভূমিকা অত্যাবশ্যকীয়। তাই প্রয়োজন সাংবাদিকদের বাক-স্বাধীনতা, লিখনীর স্বাধীনতা যা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা অনিবার্য শর্ত। স্বাধীন মানসিকতা নিয়ে শক্তিশালী কলম সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ সাংবাদিক বন্ধুগণ। স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের অনন্য গুণ হওয়া উচিত ‘নিরপেক্ষতা’। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ সাংবাদিকদের পদমর্যাদাকে সমুন্নত করে। নিরপেক্ষতা যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়-তখনই সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাসে ঘাটতি হয় যা সম্পূর্ণরূপে অনাকাঙ্ক্ষিত অপ্রত্যাশিত।
বাধা-প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়েই সংবাদকর্মীদের ছুটে চলা। কখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। ক্লান্তি, দুঃখ কিংবা হতাশা তাদের থামাতে পারে না। বিপদ-মুসিবত কিংবা হুমকি-ধমকিকে উপেক্ষা করেই সাংবাদিকদের সাহসী পথচলা যা আমাদের প্রেরণা যোগায়।
আমাদের একান্ত দাবি-সত্য, সুন্দর আর আদর্শিক পথচলায় সময়ের সাহসী ও দক্ষ সৈনিক সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধের অপপ্রয়াস চিরতরে বন্ধ হোক। সংবাদ মাধ্যমের সাথে রয়েছে আপামর জনতার আত্মার সম্পর্ক। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিটি সচেতন নাগরিক অগ্রণী ভূমিকা পালনে বদ্ধপরিকর।
যোগ্যতা, দক্ষতা, স্বাধীনতা আর নিরপেক্ষতা নিয়ে সাফল্যের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন হোক-সত্য ও সুন্দরের ধ্বজাধারী সাংবাদিক বন্ধুদের এগিয়ে চলা। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করছি।

লেখক : [email protected]