অর্ধশত পুরুষ মিলে একজন নারীকে মারধর কী সমর্থনযোগ্য?

রবিবার, ০৭/০৪/২০১৩ @ ৮:০৮ অপরাহ্ণ

শরীফুল ইসলাম রুকন::

nadia shaemeen-2 হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে নারী সাংবাদিক কেন’, ‘ রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মাথায় কাপড় নেই কেন’—এ ধরনের অজুহাতে গতকাল শনিবার রাজধানীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের চার থেকে পাঁচজন নারী সাংবাদিক মারধর, হামলা ও বিভিন্নভাবে লাঞ্ছনার শিকার হন।
একুশে টেলিভিশনের নিজস্ব প্রতিবেদক নাদিয়া শারমিনকে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা বেধড়ক মারধর করলে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়। এছাড়া আরো কয়েকজন নারী সাংবাদিক তাদের আক্রমণের শিকার হন।

একজন নারীকে অর্ধশত পুরুষ একত্রিত হয়ে মারধর করার বিষয়টি ইসলাম সমর্থন করে কি না? ইসলামকে হেফাজত করতে আসা হেফাজতে ইসলাম এর লংমার্চকারীদের কাছে প্রশ্নটি রইল।
ইসলাম শান্তির ধর্ম। হেফাজতের যে সকল কর্মীরা এ মহৎ কাজে! অংশ নিয়েছেন তারা কী জানাবেন, একজন মহিলাকে অর্ধশত পুরুষ মিলে এভাবে নির্দয়ভাবে পেঠানোর অনুমতি ইসলামের কোথায় উল্লেখ আছে?
এখন আপনারা সংবাদ সম্নেলন করে বলছেন যে, সাংবাদিক পেঠানোর বিষয়টা সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা করেছে।
যুক্তির খাতিরে মানলাম সেদিন কয়েক লাখ হেফাজত কর্মীর মধ্যে সরকার দলীয়রা ঢুকে এ কাজটি করেছে।

আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, ঘটনাস্থলটি সেসময় আপনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সামান্য কিছু সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের কবল থেকে তখন একজন নারীকে হেফাজত করতে পারলেন না, এখন আপনারা কীভাবে ইসলামকে হেফাজত করবেন?
নারীকে নিরাপত্তা দেয়ার, সম্মান করার বিধান ইসলামে রয়েছে। পুরুষেরা এমন কাজ করতে পারে না, কাপুরুষেরা পারে।

আরো প্রশ্ন, যে স্থানে ঘটনা ঘটেছিল সেখানে পুলিশ কী কাজে নিয়োজিত ছিলো? তাদের কি কিছুই করণীয় ছিল না? রাষ্ট্র নিশ্চয় এটা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে আমরা অন্তত এটা আশা করতে পারি।

নাদিয়া শারমিন সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “ওরা আমাকে পরিকল্পিতভাবে গনপিটুনী দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছিলো। সহকর্মীরা এগিয়ে না আসলে ওরা আমাকে মেরে ফেলতো। পল্টন মোড় থেকে বিজয় নগর পর্যন্ত ওরা আমাকে মারতে মারতে ৬ থেকে ৭ বার ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে এলোপাতাড়ি লাথি মারে। যখন উঠে দৌড়াতে থাকি পেছন থেকে আবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে আমার মাথায় লাথি মারে। বারবার তারা আমার কাপড় টেনে হিঁচড়ে কিল ঘুষি মারতে থাকে।”

নাদিয়া জানান, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ও সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহের জন্য শনিবার বেলা ১২টা থেকে পল্টন মোড় এলাকায় পুলিশের ব্যারিকেডের পাশে অবস্থান করছিলেন তিনি। বিকেল আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে লম্বা সাদা আলখেল্লা (লম্বা পাঞ্জাবি) পরা কয়েক জন এসে নাদিয়া কে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে, “আপনি মহিলা মানুষ, আপনার এখানে কি? আপনি এখান থেকে চলে যান।”

Nadia Sharmeen-5উত্তরে নাদিয়া বলেন, “আমি মহিলা না, এক জন সাংবাদিক। সংবাদ সংগ্রহ করতে এখানে এসেছি।” একথা শেষ হত্তয়া মাত্র হেফাজতে ইসলামের ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মী আমার দিকে তেড়ে আসে, আমাকে আচমকা চর-খাপ্পড় মারতে থাকে। নাদিয়া সেখান থেকে দ্রুত চলে আসার চেষ্টা করলে হেফাজতে ইসলামের সদস্যরা প্রথমে পিছন থেকে তাকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ও ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকে।

পরে তারা নাদিয়াকে কিল ঘুষি মারতে থাকে। ঘটনার শুরু থেকে সেখানে উপস্থিত বিপুল সংখ্যক পুলিশ সবকিছু দেখলেও তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি আরো জানান, পল্টন মোড় থেকে মারতে থাকলে বাঁচার জন্য নাদিয়া ড্যাবের (ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)এর একটি ভ্রাম্যমান চিকিৎসা কেন্দ্র মাইক্রোবাসে উঠে পরেন। কিন্ত তারপরও হেফাজতের লোকজন তাকে সেখান খেকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে এসে বেধড়ক পেটায়।এরপর নাদিয়া কয়েকজনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দৌঁড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যার্থ হয়।পিছন থেকে হেফাজত কর্মীরা বার বার তাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে মারধর করে। এ সময় তারা নাদিয়াকে বলছিলো আমাদের ১৩দফা পড়োনি? সেখানে নারী নীতিতে মেয়েদের অবাধ চলাফেরা নিষেধ করা হয়েছে, একথা বারবার বলতে থাকে আর মারধর করতে থাকে, বলেন নাদিয়া।

এ সময় নাদিয়া ৬ থেকে ৭ বার মাটিতে লুটিয়ে পরে উঠে দাঁড়ানো পর সহকর্মীসহ দিগন্ত টেলিভিশনের ক্যামেরাপার্সন খলিলের সহযোগিতায় তার অন্য সহকর্মীরা তাকে একটি মাইক্রোবাসে তোলে। এরপর হেফাজতের কর্মীরা গাড়ীটি লক্ষ করে ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এসময় নাদিয়া মাথায়, বাম পা, বাম পাঁজর, বাম বাহুতে আঘাত পান।

বর্তমানে নাদিয়া শারমিনকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। এই কামনা করছি।

লেখক: সংবাদকর্মী, চট্টগ্রাম।