রবিবার, ২১শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সৌন্দর্য আর রহস্যঘেরা রাশ আল খাইমার পাহাড়

সোমবার, অক্টোবর ৮, ২০১৮

পারস্য উপসাগরের তীরে রাশ আল খাইমা আরব আমিরাতের একটি ঐতিহাসিক প্রদেশ। নানা কারণেই প্রদেশটি সমৃদ্ধিশালী, বিশেষত পর্যটনের জন্য রাশ আল খাইমার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে। অনেক হিন্দি সিনেমার শুটিং এখানে হয়ে থাকে। বিশেষ করে রাশ আল খাইমাতে বলিউড নায়ক অক্ষয় কুমারের হিট ছবি ‘এয়ার লিফট’ এর অনেক শট এখানে করা। পাহাড়ে ঘেরা দৃষ্টি নন্দন এই এলাকার পুরনো পরিত্যক্ত বাড়িগুলো বেছে নেওয়া হয় সিনেমার শুটিং করার জন্য। আরব আমিরাতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে হলে রাশ আল খাইমার ‘জিবেল জাইস’ এ যেতে হবে। প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনই নয়, এখানে আছে প্রকৃতির অপরূপ রূপ লাবণ্য। আর মাটি উর্বর। জনসংখ্যা মাত্র তিন লাখ, আরেক পাশে ওমানের সীমান্ত। রাশ আল খাইমা একটি সমুদ্রবন্দরও বটে।

শোনা যেত সেখানকার ভয় লাগানো পাহাড়ের কথা। রাশ আল খাইমাতে যথারীতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার লোকই বেশি। শারজাহ থেকে রাশ আল খাইমা যেতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। সেখানে বেশি থাকেন চট্টগ্রাম আর কক্সবাজারের লোকজন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে ছিলেন সেখানে বসবাসরত হাটহাজারি আমানবাজারের নাহিদ সরকার ও পটিয়ার কে এম তারিক। এছাড়া ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন চৌধুরী, আজিম তালুকদার, মোহাম¥দ গফুর।

আরব আমিরাতের ট্রাফিক ব্যবস্থা, তাদের রাস্তার টার্নওভারগুলো চমৎকার। রাস্তাগুলোর মাঝখানে কোনো প্রতিবন্ধক নেই। নেই কোনো জেব্রা ক্রসিং। রাস্তাগুলোর পরিসর বড়। একাধিক লাইনে সমান গতিতে গাড়ি চলে। কারো তাড়া থাকলে বা কেউ আগে যেতে চাইলে কৌশলে একটি গাড়ি অপর গাড়ির সামনে চলে যায়। সামনের গাড়ি যখন বুঝে যে পেছনের গাড়ি আগে যেতে চাইছে তখন নিজেরাই স্পিড কিছুটা কমিয়ে দেয়, যাতে সামনের গাড়ি অনায়াসে আগে যেতে পারে। হাইওয়েতে ১২০ কিলোমিটার গতিবেগ নির্ধারিত থাকলেও গতিবেগ ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানো যায়। এর বেশি হলেই জরিমানার খড়গ। শারজাহ থেকে রাশ আল খাইমার পথে দেখা মেলে সারি সারি খেজুর গাছ। শহরাঞ্চলে গাছ পালা কম, তাই গরমের তীব্রতা বেশি।

চট্টগ্রামের অনেকে থাকেন শহর থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। নিজস্ব যানবাহনে যাতায়াত করেন। দুরের বাড়িগুলোতে ভাড়াও কম।

রাশ আল খাইমা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৭২ সালে আরব আমিরাতের ফেডারেশনে যোগ দিয়ে নিজের অস্তিত্ব এদের সঙ্গে বিলীন করে। তবে রাশ আল খাইমা যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেন স্বতন্ত্রভাবে। বাংলাদেশিদের ইনভেস্ট ও ভিসার দরজা খোলা আছে এ প্রদেশে। রাশ আল খাইমাতে ঢুকেই মন জুড়িয়ে যায়। পরিচ্ছন্ন একটি শহর। পরিকল্পিতভাবে বহুতলা ভবনের পাশাপাশি চতুর্দিকে সবুজ গাছপালা নজরে পড়ে। প্রতি বছর এখানে বৃষ্টি হয়। ওমানের পাহাড় থেকে পানি বেয়ে নেমে আসে এ অঞ্চলে। তাই এর মাটি উর্বর।

রাশ আল খাইমার মূল শহর থেকে পাহাড়ের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের মতো। পাহাড় পর্যন্ত চলার পথ মসৃণ। দুই লেনের রাস্তা, পাহাড়ি পথ। রাস্তায় চোখে পড়ে আরবদের ঘরবাড়ি, মাঝে মাঝে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। এখানকার পাথর বেশ শক্ত। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে অন্তত ১০ মাইল যেতে হয়। উঠতে হয় উঁচুতে। আঁকা বাঁকা রাস্তা। কোথাও কোথাও মনে হয় বিশাল আকৃতির পিরামিড। আবার কোথাও কোথাও গভীর খাদ। উঁচু উঁচু পাহাড়গুলো একটির সঙ্গে অন্যটি লাগানো।

সঙ্গে থাকা রাশ আল খাইমার অধিবাসী চট্টগ্রামে নাহিদ জানায়, ‘এ অঞ্চলের ইতিহাস অনেক পুরনো। প্রায় হাজার বছর আগে এখানে মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।’ রাশ আল খাইমার ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এক সময় অঞ্চলটি ছিল সমুদ্রের নিচে। কালের বিবর্তনে সাগরের পানি সরে গিয়ে জেগে ওঠে এসব পাহাড়। একসময় এলাকাটির নাম ছিল জুলফার। মোগলরা এ পাহাড়ের ভেতরে তাদের আস্তানা গেড়েছিল বলে জানা যায়। সমুদ্রবন্দরের জন্য এটি বিখ্যাত। রাশ আল খাইমার মূল পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ফুট। আঁকাবাঁকা রাস্তা, যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। যতই উঁচুতে উঠা যায়, ততই তাপমাত্রা কমতে থাকে। অনেক পাহাড়ের কোলঘেঁষে লাগানো হয়েছে পানি প্রবাহের হাজার হাজার ছোট্ট ছোট্ট নল। কোনো এক সময় এখানে পানির স্রোত ছিল। পাহাড়ে কোনো গাছপালা নেই। পরিবেশ রুক্ষ। মাইলের পর মাইল শুধু পাথরের পাহাড়। দেখতে কিম্ভূতকিমাকার। পথে নানা সাবধান বাণী সম্বলিত বোর্ড। পাহাড়ের ওপর প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঠার পর বাধা দেয় পুলিশ। ওপরে উঠতে গেলে ‘তারের ওপর দিয়ে প্যারাগ্লাইডিং’ করে উঠতে হয়। অর্থাৎ পাহাড়ের ওপর দিয়ে যাওয়া তারের চেয়ারে বসে বা শুয়ে অনেকটা বিমানের মতো দ্রুতগতিতে ভেসে যাওয়া যায়। অসম্ভব মনোবল আর সাহস ছাড়া এ ধরনের ‘বিমান যাত্রা’ সম্ভব নয়। পৃথিবীর দীর্ঘতম ‘জিপ লাইন’ বলে এটাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই তারের ওপর দিয়ে যাওয়া যায় প্রায় ৩ হাজার মিটার পর্যন্ত! যার গতি ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। এজন্য গুনতে হবে বাংলাদেশি ৭ হাজার টাকা। রাশ আল খাইমারে পাঁচ তারকা হোটেল, গল্ফ ক্লাবসহ নানা ব্যবস্থার কাজও চলছে। পাহাড়ের নিচে রাতে অনেকে বারবিকিউ পার্টিও করে থাকে। অনুমুতি নিয়ে রাতে তাঁবু টানিয়ে থাকা যায়।

এরপর আল মারজান আইল্যন্ড। যেখানে সূর্য ডোবার দৃশ্যটি আসলেই চমৎকার। আল মারজান দ্বীপটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর থাকা সত্ত্বেও এখানে অনেক কিছু কৃত্রিমভাবে তৈরি। দ্বীপটি পারস্য উপসাগরে নানা ধরনের বাঁধ দিয়ে তৈরি করা বলে জানা গেছে। এ দ্বীপ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন রিসোর্টসহ নানা মনোমুগ্ধকর স্থাপনা। বছরে এক লাখেরও বেশি পর্যটক দ্বীপটি দেখতে আসেন। প্রায় সাড় চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ দ্বীপে আছে গ্রামীণ আবহ, দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আছে ট্রেজার আইল্যান্ড, স্বপ্ন দ্বীপ, বাতি ঘর ইত্যাদি। সমুদ্র সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো তেমন জোরালো না। কারণ সৈকত ঘিরে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যাতে পানির প্রবল স্রোত আটকানো যায়। রাশ আল খাইমার মেরিনা মল আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় হোটেলটির নাম ‘আল হামারা রেসিডেন্ট এন্ড ভিলেজ’। নয়নাভিরাম হোটেলটি দেখতে হাজার হাজার পর্যটক আসেন। বিশাল আকৃতির এ হোটেলটি দেখতে জাহাজের মতো। পাঁচ তারকা মানের এ হোটেলে থাকতে হলে চড়া মূল্য দিতে হয়।

সর্বশেষ