একমাত্র বিকল্প ভালো মানুষদের সক্রিয়তা

শুক্রবার, ০৫/০৪/২০১৩ @ ৩:১২ অপরাহ্ণ

আরিফ জেবতিক::

arif-jabtikরাসেল পারভেজ আর তাঁর স্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা গিয়েছিলেন। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তাঁরা চাইলেই বিদেশে থেকে যেতে পারতেন, নিশ্চিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর জীবনযাত্রা উপভোগ করে খুব সহজেই ফেলে আসা স্বদেশকে দুটো গালি দিয়ে আর করুণার চোখে তাকিয়ে তাঁরা জীবন পার করে দিতে পারতেন। কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে ছিল বাংলাদেশ।
এই দেশটা এমনভাবে তাঁদের হৃদয়ে গেঁথে ছিল যে যখন স্ত্রীর পিএইচডি শেষ হতে দেরি হচ্ছে তখন রাসেল তাঁর নিজের দুই বছরের শিশুকে নিয়ে একাই বাংলাদেশে চলে এসেছেন, স্ত্রীর লেখাপড়া শেষ করতে আরো কয়েক বছর লেগেছে, এই সময় রাসেল তাঁর শিশুপুত্রকে বাংলাদেশ দেখাবেন বলে ঘাড়ে করে নিয়ে বইমেলায় ঘুরেছেন, শহীদ মিনারে গিয়েছেন, রমনার বটমূলে গান শুনেছেন।
কর্পোরেট উচ্চ বেতনের হাতছানি উপেক্ষা করে বাচ্চাদেরকে বিজ্ঞান শেখানোর ব্রত নিয়ে রাসেল পারভেজ স্কুলমাস্টার হয়েছেন। রাসেলের স্ত্রীও দেশে ফিরে এসে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ, ঘাতক জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অনলাইন প্রচারণায় রাসেল পারভেজ সবসময়ই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন।
দেশের প্রতি তাঁদের এই প্রেম, এই মমত্বের প্রতিদান আজ এই দম্পতি পাচ্ছেন। রাসেলের সামনে কম্পিউটার দিয়ে ডিবি পুলিশ তাঁকে এমনভাবে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করেছে, মনে হয় যেন চোরাই কম্পিউটার মার্কেটের সর্দারকে তারা গ্রেফতার করেছে। এই হচ্ছে রাসেল পারভেজের সাধের বাংলাদেশ!

হতাশার বিষয় হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের নামে জামায়াত-শিবিরকে রক্ষার মিশনে সরকার যেভাবে তাল মেলাচ্ছে এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা যেভাবে শুধু মাথা বাড়ানোর নামে ঢালাওভাবে ব্লগারদের বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে, তাতে করে বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা বলতে বিন্দুমাত্র কিছু আর অবশিষ্ঠ থাকবে বলে মনে হয় না।

সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের কার্যক্রম শুরুই করেছে মিথ্যাচার দিয়ে। ব্লগার রাজিব হত্যাকাণ্ডের অপরাধীদের গ্রেফতার ও বিচারকাজে বিভিন্ন সহায়তা করতে ব্লগার বিপ্লব এর আগেও অনেকবার ডিবি অফিসে গিয়েছেন। ঘটনাচক্রে ঐদিন রাসেল পারভেজ বিপ্লবের সঙ্গে থাকায় তিনিও শুধু সঙ্গ দিতে ডিবি অফিসে যান। তারপর বিপ্লবের পাশাপাশি রাসেলকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। রাসেলের জায়গায় যদুমধু যে-ই থাকত, তাঁকেই গ্রেফতার করা হতো। হেফাজতে ইসলামকে তুষ্ট করার জন্য এভাবে শুধু সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কোনোরকম বাছবিচার ছাড়া ব্লগার গ্রেফতারের এই অভিযান যে-কোনো সুস্থ মানুষকেই বিস্মিত করবে। সন্ধ্যা রাত থেকেই যেখানে সবাই জেনে যায় যে ব্লগার বিপ্লব এবং ব্লগার রাসেলকে ডিবি অফিসে আটক করা হয়েছে, রাত ১১টার সময় যখন অনলাইনে খবর চলে আসে ব্লগার শুভকে সাদা একটি মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে গেছে আইনশৃংখলা বাহিনী সেখানে ডিবি পুলিশ পরের দিন সাংবাদিকদেরকে জানায় যে গভীর রাতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে এই ব্লগারদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সামান্য গ্রেফতারের তথ্য নিয়ে যারা এরকম অসত্য তথ্য দিতে পারে, তারা গ্রেফতার করা মাত্র যেকোনো ব্লগারকে যেকোন মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পারে তা বলাই বাহুল্য।

বাজারে ’নাস্তিক ব্লগারদের তালিকা’ নামে একটি রহস্যময় তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেই তালিকার অধিকাংশই ছদ্মনাম। আর এখানেই হচ্ছে ষড়যন্ত্রের মূল কাহিনী। নিরীহ স্কুল মাস্টারকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে যে কাউকেই এই ছদ্মনামের যেকোনো একটি বা সব কয়টির লেখক হিসেবে স্বীকারোক্তি আদায় করে ফেলা খুব কঠিন কাজ হবে না। ন্যায় বিচার নিশ্চিত হলে এসব মিথ্যা মামলার ঘেরাটোপ কাটিয়ে যদি বা রাসেল পারভেজ কোনো একদিন জেল থেকে বেরিয়েও আসতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশে তাঁর আর থাকা হবে না সেটা নিশ্চিত। তাঁকে মিডিয়ার সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে মগজ ধোলাইকৃত আরো কিছু তরুণ যে কোনদিন তাঁকেও বাসার সামনে জবাই করে রেখে যাবে, এটা নিশ্চিত।
সুতরাং সাধের বাংলাদেশ ছেড়ে রাসেল পারভেজ আর তাঁর স্ত্রীকে যেতে হবে নির্বাসনে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সোচ্চার দুই তরুণ-তরুণী আগামী নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন না, এভাবে আরো কত রাসেল পারভেজরা যে আগামী কয়েকমাসের মধ্যে দেশান্তরী হতে বাধ্য হবেন সেটা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না- হেফাজতকে খুশি করতে গিয়ে এটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের অর্জন! এতে করে সরকার হয়তো হেফাজতে ইসলামের বাহবা কুড়াতে পারবেন, কিন্তু একথা ভোটের রাজনীতিতে বাক্সটা উনাদের খালিই পড়ে থাকবে, হেফাজত এসে উনাদের ভোটের বাক্স ভরে দিয়ে যাবে না।

প্রগতিশীল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে শুধু যে জামায়াত-শিবির কাজ করছে এমনটা নয়, বরং সরকারের একটি অংশও এ ব্যাপারে সক্রিয় আছে। বিটিআরসি নিজের কাজকর্ম ফেলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর দোহাই দিয়ে বাংলাদেশে ব্লগ নিয়ন্ত্রণে নেমেছে। কিন্তু এই আইন প্রয়োগের কোনো ক্ষমতা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ এর বিধান বলে গঠিত বিটিআরসির হাতে কবে ন্যস্ত হলো তার কোনো ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেনি। কিন্তু তাঁরা সেটাতে ভ্রুক্ষেপ না করে কোনো প্রকার ঘোষণা না দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে আমারব্লগ.কম নামের ব্লগ সাইট। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচাইতে বড় ও দুর্লভ আর্কাইভের সংরক্ষণ হচ্ছে এই ব্লগে। আমারব্লগের রিসার্চ বিভাগ মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ ফুটেজ এবং দলিল সংগ্রহ করে এবং ইতিহাস বিকৃতির সব অপপ্রয়াসকে রুখে দিয়ে তরুণ সমাজকে সঠিক ইতিহাস জানাতে নিরন্তর কাজ করছে। অথচ বিটিআরসির কর্মকর্তারা এই ব্লগ বন্ধে অত্যুৎসাহ দেখাচ্ছেন। এটা দেখাতে গিয়ে তারা কোনো প্রকার নিয়মনীতির ধার ধারেন নি, এমনকি ব্লগ সাইট থেকে প্রাপ্ত ইমেলগুলো পর্যন্ত তারা তাদের পছন্দের সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করার মতো অনৈতিক কাজ করতেও পিছপা হচ্ছেন না। সরকারি এজেন্সিগুলো প্রগতিশীল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্লগারদের ঠিকানা ঠিঁকুজি উদ্ধারে যে পরিমাণ তৎপর তার একাংশও যদি সঠিক কাজে ব্যয় করতেন তাহলে তারা জানতে পারতেন যে কোথায় কোথায় রেল লাইনের ফিসপ্লেট তুলে ফেলা হয়েছে এ ব্যাপারে অনলাইনে আগে থেকেই জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লায় ঘোষণা দেয়া থাকে, সেই অনুযায়ী কাজ করলে অন্তত রাষ্ট্রীয় রেলগুলোর অপচয় খানিকটা বন্ধ করা যায়।

হেফাজতের হুংকারে বিপর্যস্ত আমাদের আইনমন্ত্রী এখন পাঞ্জাবি পরে সংবাদ সম্মেলন করে বেড়াচ্ছেন। সেই সম্মেলনে তিনি জানাচ্ছেন যে ধর্মানুভূতি রক্ষায় বাংলাদেশে আইনকে আরো কঠোর করা হবে। এই সর্বনাশা উস্কানির ফল শুধু ব্লগাররাই ভোগ করবে না, ভবিষ্যতে কিন্তু আইনমন্ত্রী আর তাঁর দলের নেতাকর্মীদেরও ভোগ করতে হবে। পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনের কথা বলে মিথ্যা মামলা দায়ের করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর হামলা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে রামুতেও এরকম মিথ্যাচার করে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি এই আগুনে ঘি ঢালার নিয়ত করে থাকে, তাহলে তারা নিজেদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে।

একটা উদাহরণ এখানে দেয়া যায়। আমার নামে ওয়ার্ডপ্রেসে একটি ভূয়া ব্লগ খুলে সেখানে ধর্ম অবমাননাকর বিভিন্ন লেখা ঢুকিয়ে রেখেছে কোনো একটি চক্র। সেই ভূয়া ব্লগের রেফারেন্স দিয়ে আমার বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছে শিবিরের বাঁশের কেল্লা। হাজার হাজারবার সেই মিথ্যা ব্লগ শেয়ার হচ্ছে এবং উন্মাদ জনগোষ্ঠি ফেসবুকে হুংকার ছাড়ছে আমাকে কীভাবে হত্যা করা হবে সেটা বর্ণনা করে। পড়ে দেখলাম, আমার হাত পা কেটে এবং আমার আঙুলগুলো বিচ্ছিন্ন করে মুখে ভরে দিয়ে মুখ সেলাই করে দেয়া হবে যাতে ওভাবেই আমার মৃত্যু হয়-এটা হচ্ছে সেই হত্যা বর্ণনাগুলোর একটি!

ঘটনা জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে আমি থানায় জিডি করেছি এবং বিটিআরসির চেয়ারম্যানকেও জানিয়েছি। আজ প্রায় দুই সপ্তাহ হয়ে গেল, সরকারি তরফ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই, বিটিআরসি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্লগগুলো ব্লক করে দিলেও এই ভূয়া ব্লগটি বন্ধ করেনি। এর মানে হচ্ছে সরকারের সমালোচনায় আমি উচ্চবাচ্য করলেই এই ব্লগের দায়দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ফেলে ডিবি পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে দুই বছরের জন্য জেল খাটিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু আমিই শেষ লোক নই, দিন বদল হলে হয়তো আজকের আইনমন্ত্রী আর তার দলের অনেকের নামেও এরকম ভূয়া ব্লগ খোলা হবে, সেই ব্লগের দোহাই দিয়ে ডিবি অফিসে কম্পিউটার সামনে রেখে ফটোসেশণ হবে। আইনমন্ত্রী আজকে উৎসাহের সঙ্গে শাস্তি বৃদ্ধির আইন করে রেখে গেলে তো সোনায় সোহাগা, আমি না হয় বর্তমান আইনে দুই বছর জেল খেটে মুক্তি পাব, আইনমন্ত্রীর দলের নেতাকর্মীরা কিন্তু বৃদ্ধি করা শাস্তি ভোগ করবেন। মৌলবাদীদের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর করার আগে বিষয়গুলো যদি উনারা মাথায় নেন, তাহলে আখেরে দেশের সবারই উপকার হবে।

বর্তমান সময়ে সবচাইতে হতাশার বিষয় হচ্ছে আমাদের প্রগতিশীল শক্তিগুলোর নিষ্ক্রিয়তা। সরকার সবার মনে এমন ভয় ঢুকাতে সক্ষম হয়েছে যে ব্লগ আর ফেসবুকে যুদ্ধাপরাধীদের দোসররা এককভাবে হুংকার দিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্লগাররা এখন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আমরা কেউই জানি না পরবর্তী কোপটি কার ঘাড়ে পড়বে। পান থেকে চুন খসলেই যেখানে হাইকোর্টে রিটের বন্যা জমে যায় সেখানে বাকস্বাধীনতার উপর এতবড় হস্তক্ষেপেও কোনো আইনজীবিকে একটি রিট নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখলাম না। একেবারেই সাধারণ ফেসবুক আর ব্লগ ব্যবহারকারীরা এখন প্রোফাইল পিকচার থেকে শাহবাগের ছবি মুছে দিয়ে চিংড়ি মাছের মালাইকারির রেসিপি লেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে মুষ্টিমেয় খারাপ মানুষের জন্য একটি দেশ ধ্বংস হয় না, বরং দেশ ধ্বংস হয় ভালো মানুষদের নিস্ক্রিয়তায়। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিকে এক দফায় নামিয়ে আনা যায় যদি বাংলাদেশের নাম পাল্টে আফগানিস্তান রাখা হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের সবগুলো রাজনৈতিক দল সেই কাজে প্রতিযোগিতা দিয়ে নামছে। এই সময়ে ভালো মানুষদের সক্রিয়তা একমাত্র বিকল্প পথ। দেশ আফগানিস্তান হলে আমার হয়তো গর্দান যাবে, কিন্তু আপনার গর্দানটি রক্ষা পাবে এমনটা আশা করে বসে থাকলে ভুল করবেন।

আরিফ জেবতিক: সাংবাদিক ও ব্লগার।