আমি সুখী মানুষ, সাংবাদিকতা খুবই উপভোগ করেছি

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১০, ২০১৩

সৈয়দ আবদাল আহমদ
samad
শিশুসুলভ সরলতা, মানুষের প্রতি মমতা আর প্রাণখোলা হাসির জন্য খ্যাতি ছিল দেশবরেণ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদের, আমাদের সবার প্রিয় সামাদ ভাইয়ের। সেই হাসিমাখা মুখ নিয়েই তিনি সোমবার ঢুকেছিলেন এ্যাপোলো হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে।

হাসপাতালের ট্রান্সফার ট্রলিতে করে তাকে যখন অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করানো হয়, ঠিক তার আগ মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন সামাদ ভাই। সেখানে ছিলেন তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাসহ স্বজনরা। স্ত্রী-পুত্র কন্যাকে জড়িয়ে ধরে তিনি স্বভাবসুলভ হাসিমাখা মুখেই বলেন, ‘আমার পরিবারটি খুবই চমত্কার একটি পরিবার। আমি আমার পরিবার নিয়ে সুখী, আমার স্ত্রী একজন ভালো মানুষ। আমার পুত্র-কন্যারা ভালো। আমার স্বজন বন্ধুরাও চমত্কার। এদের নিয়ে আমার জীবনটা খুবই সুখে কেটেছে। আমি একজন সুখী মানুষ। আমার কোনো দুঃখবোধ নেই।’

গত সোমবার সন্ধ্যায় অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার পর হাসপাতালের নিচতলায় দাঁড়িয়ে আমাদের তার এই শেষ উক্তি জানিয়েছিলেন আতাউস সামাদের ছেলে আশিকুস সামাদ। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান কথাগুলো শুনে খুবই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। এই কথাগুলোই যে তার শেষ কথা হবে আমরা বুঝিনি। তিনি পরিবার নিয়েই কথা বলেননি। তার প্রিয় পেশা নিয়েও তার শেষ অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

সাংবাদিকতা পেশায় প্রবাদপ্রতিম সাফল্য আর দেশ-বিদেশে প্রভূত খ্যাতি অর্জনকারী আতাউস সামাদ সাংবাদিকতার মহান পেশাকেও শ্রদ্ধা জানান। আশিকুস সামাদ জানান, তার বাবা বলে গেছেন, ‘সাংবাদিকতাকে আমি খুব উপভোগ করেছি।’ এরপর অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। তারপর চলে দীর্ঘ অপারেশন। অপারেশনের পরে আর জ্ঞান ফেরেনি সামাদ ভাইয়ের। গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় তার মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করেন এ্যাপোলো হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তাররা।
অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগে তার হাসিমাখা মুখের এই অমিয় বাণী শুনে কেউ কি ভাবতে পেরেছিল, ‘আমি সুখী মানুষ’ কিংবা ‘সাংবাদিকতাকে আমি খুব উপভোগ করেছি’ই হবে তার শেষ কথা!

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আতাউস সামাদ। এ দেশের সাংবাদিকতায় তিনি শুধু পথিকৃত্ নন, যে ক’জন দিকপাল সাংবাদিক এ পেশাকে উজ্জ্বল করেছে তাদের একজন তিনি। এ মানুষটি আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ছিল তার সাংবাদিকতা। কখন কী রিপোর্ট করতে হবে, কার রিপোর্ট কেমন হয়েছে, কোথায় ভুল হয়েছে, কোথায় শুদ্ধ করতে হবে—প্রতিদিন অন্তত আমি এ নিয়ে একবার ফোন পেয়েছি। এই ফোন আর কোনোদিন পাব না—এ কথা ভাবতে কষ্টে বুক ভেঙে যাচ্ছে। মানুষের প্রতি অসীম দরদী এই মানুষটি সব সময় সংবাদপত্রে সামাজিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে তাগিদ দিতেন।

হাসপাতালে যাওয়ার কয়েকদিন আগে শেষ লেখাটি তিনি লিখে গেছেন আমার দেশ-এ। গত বছরের ১৬ নভেম্বর তার ৭৫তম জন্মদিনে তিনি সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লিখে যেতে চান। তিনি কথা রেখেছেন। তিনি লিখে গেছেন। তার মতো এত লেখালেখি সম্ভবত কোনো সাংবাদিক লেখেননি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—এসব লেখা বই আকারে বের করার সুযোগ পাননি তিনি। হয়তো এত লেখার চাপের কারণে বই করার সময় তিনি বের করতে পারেননি। পত্রপত্রিকায় তার লেখা আর দেখা যাবে না—এটা বিশ্বাস করতে এ মুহূর্তে খুব কষ্ট লাগছে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ
ও সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
সূত্র: আমার দেশ

সর্বশেষ