টেলিভিশন তো দেখতেই চাই, কিন্তু কেন দেখব?

মঙ্গলবার, এপ্রিল ২, ২০১৩

পলাশ আহসান

polashভাবতে ভালোই লাগে। আমাদের টেলিভিশনে প্রচুর কাজ হচ্ছে। গণমাধ্যকর্মী হিসাবে আমি খুবই উচ্ছ্বসিত। কিন্তু এই আমিই যখন দর্শক। তখন নিজেকে প্রশ্ন করেছি, আমি এত টেলিভিশন কেন দেখব ? তখন চুপসে যায় আমার উচ্ছ্বাস। অনেকটা ফাটা বেলুনের মতো। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কেন হঠাৎ করে দর্শক হিসেবে ভাবতে গেলাম। কারণ, পেশাগত নিরাপত্তা। দর্শকই রাজা। সেই যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে আমার অস্তিত্বই থাকে না। তাই দর্শক চাই আমার। চাই প্রতিটা টেলিভিশন সুস্থ সবল হয়ে বেঁচে থাকুক।

আমি টেলিভিশন দেখি নিয়মিত। কারণটা পেশাগত । কিন্তু দর্শক সারিতে যখন দাঁড়াই , তখন এত টেলিভিশন দেখার কোনো কারণ খুঁজে পাই না। এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমি কোনো অনুষ্ঠান বা সংবাদের মান নিয়ে কথা বলছি না। আমার প্রশ্ন গোটা কাঠামো নিয়ে। কারণ এখন একটা টেলিভিশন থেকে আরেকটাকে আলাদা করা কঠিন। নাটক ,অনুষ্ঠান, সংবাদ যাই বলি,সবই একই রকম। যদি কোনো দর্শক মনে করে আমি একটা টেলিভিশনই দেখব তাতে তার কোনো ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু দর্শক টেলিভিশন না দেখলে ক্ষতি হবে টেলিভিশনের।

কেউ কেউ হয়তো টেলিভিশন দেখার জন্য অনুষ্ঠান বা সংবাদের মান বিচার করার উপদেশ দেবেন। প্রতিযোগিতার মাঠে নামাতে চাইবেন গণমাধ্যম কর্মীদের। তারপর আপ্তবাক্য ছাড়বেন, যে যোগ্য সেই টিকে থাকবে । আমি ব্যক্তিগতভাবে এ জাতীয় ভাবনার সঙ্গে একমত নই। আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ খুব ছোট। এখানে যে কোনো সংস্কৃতি খুব দ্রুত ছড়ায়। এর মানও মোটামুটি একই রকম থাকে। যে কারণে আমাদের পর্দাগুলোর মানের দিক থেকে খুব একটা হের ফের হয় না। তাহলে কেন এত টেলিভিশন? শুধুই কী ব্যবসার জন্য? বিজ্ঞাপন বাণিজ্য যেন মনোপলি না হয় সে জন্য? নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে ?

কারণ আর যাই থাক, যে প্রশ্নগুলো তুললাম, এর কোনোটার উত্তরই স্বাস্থ্যকর নয়। ধরে নিতে পারি, এত টেলিভিশন প্রচারের নীতিগত সিদ্ধান্ত যারা নিয়েছেন, তারা সৎ উদ্যেশ্যেই নিয়েছেন। সে উদ্দেশ্যগুলো জানা না গেলেও অনুমান করা যায় কিছুটা । মোটা দাগে বলা যায়, টেলিভিশনকে মানুষের প্রয়োজনীয় মাধ্যম হিসেবে পরিণত করতেই এই উদ্যোগ। বিনোদন শুধু নয়। টেলিভিশনের মাধ্যমে মানুষের জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আনা। কিন্তু এটা করতে গেলে টেলিভিশন দেখা হওয়া উচিত মানুষের জীবন যাপনেরই অংশ।

এখন প্র্শ্ন হচ্ছে, তাহলে কি ধরণের অনূষ্ঠান প্রচার করলে টেলিভিশন সবাই দেখবে? এটা নির্ধারণ করবেন গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা। আর আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি তাদের উচিত, কেন মানুষ টেলিভিশন নির্ভর নয়, সেটা খুঁজে বের করা। ধরা যাক একজন দর্শক সন্ধ্যায় বসেছেন টেলিভিশন দেখতে, হাতে রিমোট কন্ট্রোল। প্রথমে একই সঙ্গে ৩/৪ চ্যানেলের সংবাদ দেখলেন তিনি। তারপর দেখতে বসলেন অনুষ্ঠান। যখনই বিজ্ঞাপন, তখনি অন্য চ্যানেলে, অন্য কোনো অনুষ্ঠান । আসলে কেউ যদি তাকে প্রশ্ন করেন ভাই আজ টিভিতে কি দেখলেন ? ভদ্রলোক পরিস্কার করে কিছু বলতে পারবেন বলে মনে হয় না। হয়তো তিনি কোনো বিশেষ বিষয়ে আরো একটু বেশি তথ্য চাচ্ছিলেন। অথবা তিনি চাচ্ছিলেন নির্মল বিনোদন । হয়তো সিনেমা দেখতে পারলে ভালো লাগতো।অথবা পরপর কয়েকটি গান । এমনও হতে পারে তিনি চান ধর্মীয় কোনো বক্তৃতা শুনতে। কিন্তু তিনি জানেন না কোন চ্যানেলে কী হচ্ছে? আর তাই রিমোট হাতে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করেছেন ।

ভদ্রলোক যদি জানতেন এই চ্যানেল এই বিষয়ক অনুষ্ঠান বা সংবাদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে তিনি হয়তো সঙ্গে সঙ্গে রিমোট নিয়ে ওই চ্যানেলে চলে যেতেন। দর্শক ভাগ হতো হয়তো। তবুও টেলিভিশন তো দেখতো সবাই। এতে একদিকে যেমন অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হতো না। অন্যদিকে, গণমাধ্যম কর্মীদের গুরুত্ব বাড়তো । এমনকি বিজ্ঞাপনদাতারাও তাদের বাজেট বাড়াতে বাধ্য হতেন।

সকালে টেলিভিশন ট্রাফিক আপডেট দেখে বাইরে বের হতে পারেন যেকোনো দর্শক। ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর চ্যানেল দেখে বুঝে নিতে পারেন অর্থনীতির অবস্থা। যখন তখন খেলাধুলা বিষয়ক চ্যানেলে বসে পড়তে পারেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। সিনেমা বা গানের জন্যে আলাদা চ্যানেল থাকলে ভালো হতো।শুধু সিনেমা বা গানের আলাদা দর্শকও আছেন। আবার শুধু রাজনৈতিক আলোচনার জন্য কোনো চ্যানেল থাকতে পারে। এতে খুশি হবেন রাজনীতিকরা।

এছাড়া বিশেষ শ্রেণী বা পেশার মানুষের কথা বলেও কোনো চ্যানেল নিজেকে আলাদা করতে পারে। প্রসঙ্গ উঠলো বলেই বলে রাখি, এরই মধ্যে আমাদের দেশের একটি চ্যানেল কৃষকদের কথা বলে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছে। কৃষকের আনন্দ, বেদনা, বঞ্চনা যে খবরই জানতে ইচ্ছে করুক, শুরুতে ওই চ্যানেলটির কথা মনে পড়ে দর্শকের।

বাংলাদেশে বিশেষায়িত টেলিভিশন সৃষ্টির চর্চা হওয়া উচিত। প্রচারের শুরুতে যদি ঘোষণা করা হয় ওই চ্যানেলের প্রচারণায় কোনো বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। তাহলে দর্শকদের জন্যে ভালো হয়।

এবার আসি সংবাদ প্রচারের কথায়। সংবাদ প্রচার করে বাংলাদেশের সবগুলো টিভি চ্যানেল। এর মধ্যে আবার আলাদা করে কোনো কোনো চ্যানেলকে ২৪ ঘণ্টা সংবাদ প্রচারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এতে এমনি এমনিই বিশেষত্ব সৃষ্টি হয়েছে ওই চ্যানেলগুলোর। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলের প্রচার আমরা দেখেছি, তাতে সাধারণ চ্যানেল থেকে ওই চ্যানেলকে খুব একটা আলাদা করা সম্ভব হয়নি। ধরা যাক, দিনভর একটি ঘটনা ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলে দেখলাম। আমি ওই সংবাদের সবশেষ তথ্যটিও জানি। তাহলে দিন শেষে কেন ওই সংবাদের জন্যে মিশ্র চ্যানেল দেখবো ? অথবা ওই চ্যানেলটিই বা কেন ওই সংবাদটি প্রচার করবে? আমার তো মনে হয় এটি এক ধরনের পুনঃপ্রচার। এতে যেমন টেলিভিশন কোম্পানির অর্থ অপচয়, তেমনি দর্শকের সময় অপচয়। যেন প্রচারের জন্যেই প্রচার।

আমি কিন্তু এই অপচয় সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার খুব সহজ রাস্তা দেখতে পাই। সারাদিন একটি সংবাদ প্রচারের পরেও ওই সংবাদটি প্রচারের যৌক্তিক কারণ সৃষ্টি করতে পারে নিউজরুম। অর্থাৎ ওই ঘটনার গভীরে আর কোনো খবর আছে কি না, সেটা খুঁজে বের করতে পারে। যেমন রাজধানী বা অন্য কোথাও একটি ভবন ধসে পড়ল, আমাদের সংবাদ প্রচারের সংস্কৃতি অনুযায়ী সব চ্যানেলগুলো একই সঙ্গে ওই সংবাদটি দেখাতে শুরু করলো। সব চ্যানেলে একই খবর। অনুষ্ঠান বন্ধ। আমি জানি না এরকম একটি ঘটনার ওপর সবাই একসঙ্গে হামলে পড়ার দরকার আছে কী না। চরিত্র অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলগুলোই সরাসরি প্রচার করতে পারে। আর মিশ্র চ্যানেলগুলোর তাদের নির্ধারিত খবরে ঘটনাটি প্রচার করতে পারে। দিন শেষে এমন একটি রিপোর্ট তারা করতে পারে, যার মধ্যে ওই ধস সংক্রান্ত অনেক অজানা তথ্য আছে। ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল যে এধরনের খবর বানাতে পারবে না ,তা নয়। কিন্তু প্রতি মুহুর্তে সংবাদ বদলের ব্যস্ততায় তাদের জন্যে কাজটি বেশ কঠিন।

দু ‘ধরনের চ্যানেলে কাজ করার সুবাদে আমি যতদূর বুঝি, তাতে মনে হয় , ২৪ ঘণ্টার চ্যানেলগুলো যদি প্রতিদিনের ঘটনানির্ভর হয়, আর মিশ্র চ্যানেলের সংবাদে যদি বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা কিংবা ইন- ডেফথ খবরের বেশি গুরুত্ব দেয় হয়, তাহলে দুই চ্যানেলে সংবাদ দেখার যুক্তিপূর্ণ কারণ তৈরি হয় দর্শকের।

খুব স্বচ্ছ সম্পাদকীয় নীতি একটি চ্যানেলকে প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে। স্পষ্ট সম্পাদকীয় নীতির প্রয়োজনীয়তা ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলে সবচেয়ে বেশি। অবশ্য মিশ্র চ্যানেলগুলিও এই প্রয়োজনীয়তার বাইরে নয়।

এছাড়া একটি টেলিভিশনের আলাদা বৈশিষ্ট্য সৃষ্টির আরো অনেক কারণ আছে। যেমন নিজেকে আলাদা করতে গেলে অনুষ্ঠানের কিছু না কিছু মান বাড়াতে হয়। বর্তমানে যে ধারায় টেলিভিশন চলছে এতে বেশিরভাগ অনুষ্ঠান নির্মাণের মান এক জায়গায় আটকে আছে। বাড়ছে না। দর্শকদের প্রতি কোনো দায়িত্বশীলতা তৈরি হচ্ছে না গণমাধ্যকর্মীদের। ভাবখানা যেন এমন , ‘আমি যা বানাচ্ছি ইচ্ছে হলে দেখ না হলে দেখ না’। এ ধরনের দায়িত্বহীন অনুভুতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা মাধ্যমটি। এভাবে চলতে থাকলে এই খাতে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। মুখ ফিরিয়ে নেবেন বিজ্ঞাপনদাতারাও।

লেখার শুরুতে প্রশ্ন তুলেছিলাম, আমি এতগুলো টেলিভিশন কেন দেখব ? এখন দর্শক হিসেবে আবারো বলছি, প্রয়োজনে আমি ৩৭টি টেলিভিশন দেখতে রাজি আছি। কিন্তু ওই প্রয়োজনটা সৃষ্টি হতে হবে। আর এর দায়িত্ব টেলিভিশন কর্মী এবং কর্তৃপক্ষের।

পলাশ আহসান: গণমাধ্যমকর্মী।
palash_ahasan2003@yahoo.com
সূত্র: নতুন বার্তা