যুবলীগের রাসেলকে ফাঁসানোর আয়োজনে প্রশ্নবিদ্ধ গণমাধ্যম?

শনিবার, ১৭/০৪/২০২১ @ ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ


প্রেসবার্তা প্রতিবেদন : গণমাধ্যম ঘটনার ঘনঘটায় গা ভাসাচ্ছে। সামনে যেটা আসছে সেটাই তুলে ধরছে। যাচ্ছে না ঘটনার নেপথ্যে। তাকাচ্ছে না আশপাশেও। এই যেমন আল-ফালাহ ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখার ম্যানেজার আব্দুল মোরশেদ চৌধুরীর আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা, সংবাদ সম্মেলন, ফাঁস হওয়ার কল রেকর্ড কিংবা সাংবাদিকদের সামনে হাজির হওয়া নানা তথ্য-উপাত্তের কথাই ধরি, কেউ একটু বিশ্লেষণ করছে না। শুধু ভিক্টিমের পরিবারের অভিযোগকে ভিত্তি ধরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রায়-ই যেন লিখে দিচ্ছে গণমাধ্যমগুলোর কোনো কোনোটি।

চিলে কান নিয়েছে শুনে চিলে পিছেই ছুটছে গণমাধ্যম। কান আদৌ কানের জায়গায় আছে কি-না কানে হাত দিয়ে তা দেখছে না তারা। আবার এমনও হতে পারে, ঘটনার ঘনঘটায় সরকারের দলের রাজনীতিবিদের নাম কিঞ্চিৎ দেখা যাওয়ায় গোটা ঘটনায় দায় চাপানোর চেষ্টায় আছে তাদের শত্রুপক্ষ। পুরনো শত্রুতাকে ঘায়েল করতে কেউ কেউ এই ইস্যুতেই ব্যবহার করছে নিজ নিজ নিয়ন্ত্রনাধীন গণমাধ্যমকে।

রাসেল কি হত্যার হুমকি দিয়েছেন, নাকি অপহরণের- কল রেকর্ড কী বলে :

মোরশেদের আত্মহত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী ইশরাত মামলা দায়ের করেছেন। মামলার নথিতে তিনি বললেন, মোরশেদকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল হক রাসেল। আবার সংবাদ সম্মেলনে বলা হল, মোরশেদকে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্ত্রী ইশরাত ও কন্যা জুমকে অপহরণের হুমকি দিয়েছেন রাসেল।

অথচ মামলায় উল্লিখিত সময়ে যে মোবাইল নম্বর থেকে রাসেল কল করেছেন মোশেদকে, তার কল রেকর্ডে হত্যা বা কাউকে অপহরণের বিষয়ে কোনো কথাই হয়নি তাদের। সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে ইশরাতকে প্রশ্নও করা হয়েছিল। কিন্তু তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি ইশরাত। মুল ধারার গণমাধ্যমের সামনে এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকলেও গণমাধ্যমগুলো সে বিষয়ে কোনো সংবাদ পরিবেশন করেনি।

প্রশ্ন হল, গণমাধ্যম শুধু কি ভিক্টিম বা ভিক্টিমের পরিবারের বক্তব্যকেই ভিত্তি করে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে? রাসেলকে ফাঁসাতে এই মামলার আসামি করা হল কি-না সে বিষয়েও কিন্তু প্রশ্ন তোলার অবকাশ ছিল গণমাধ্যমে। কিন্তু না, সে বিষয় কিন্তু গণমাধ্যম এড়িয়েছে।

চিরায়ত ট্রেন্ডের বাইরে যেতে পারেনি গণমাধ্যম, এই ইস্যুতেও :

আব্দুল মোরশদে চৌধুরী আত্মহত্যা করেছেন গত ৭ এপ্রিল। এ ঘটনায় বেশ কয়েক ধরনের সংবাদ প্রচার হয়েছে গণমাধ্যমে। প্রথমত ডে-ইভেন্ট হিসেবে দেশের প্রায় সবক’টি গণমাধ্যমে এটি প্রচার হল, দ্বিতীয়ত চার দিন পর ওই ব্যাংকারের স্ত্রীর উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন প্রচার হল, তৃতীয়ত ওই সংবাদ সম্মেলনকে ভিত্তি ধরে এই মামলার আসামী নন, এমন ব্যক্তিদেরও সামনে এনে সংবাদ প্রকাশ করলো গণমাধ্যম।
এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের একটি চিরায়ত ট্রেন্ডই পরিলক্ষিত হয়েছে। ভিক্টিম বা ভিক্টিমের পরিবারের বক্তব্যকেই গণমাধ্যম ভিত্তি ধরে একের পর এক সংবাদ উপস্থাপন করেছে। সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্য সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করা সাংবাদিকের ও সাংবাদিকতার অন্যতম চর্চা। তাই বলে এমন চাঞ্চল্যকর ইস্যুতে শুধুমাত্র সংবাদ সম্মেলন, ভিক্টিমের পরিবারের বক্তব্য, অভিযোগের দিকে তাকিয়ে থাকা গণমাধ্যমের একমাত্র ও গ্রহনযোগ্য চর্চা হতে পারে না।

কী তথ্য পাঠক হিসেবে আমরা চেয়েছিলাম গণমাধ্যমে :

ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকের আত্মহত্যার সংবাদ গুরুত্বের ব্যাপকতা আছে। পাঠক এ ধরণের আত্মহত্যার নেপথ্যে বিষয় জানতে চায়। জানতে চায় ঘটনার পেছনের বৃত্তান্ত। প্রথম দিকেই পাঠকের মনে আসবে, আত্মহননকারীর পরিবারের স্থিতিশীলতা কতটুকু, তার কর্মস্থলের পরিবেশ তার অনুকূলে ছিল কি-না, তার সঙ্গে শত্রুতা ছিল কি-না, সুইসাইড নোট ছিল কি-না, থাকলে তাতে কী লিখা ছিল? পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যার দ্বারা তিনি প্রভাবিত ছিলেন তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক কেমন ছিল- এমন অসংখ্য প্রশ্ন হাজির করা এবং এসব প্রশ্নের উত্তর মিলানো জরুরি।

২৫ কোটি টাকা কী কাজে ব্যবহার করেছেন মোরশেদ ও তার স্ত্রী :

আল-ফালাহ আগ্রাবাদ শাখার ম্যানেজার আব্দুল মোরশদে চৌধুরীর আত্মহত্যার পরদিন ৮ এপ্রিল তার স্ত্রী ইশরাত জাহান চৌধুরী জুলি প্রায় ২৫ কোটি টাকার দেনার বিপরীতে ৩৮ কোটি টাকার মত লেনদেনের তথ্য উল্লেখ করে যাদের সঙ্গে লেনদেন ছিল তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের মধ্যে আছেন মোরশেদের ফুফাত ভাই জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, পারভেজ ইকবাল চৌধুরী ও পাঁচলাইশ এলাকার সৈয়দ সাকি নাঈম উদ্দীন। যাদের কাছ থেকে লাভের প্রদানের শর্তে দলিল করে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিলেন মোরশেদ। এই টাকা এমন কোন ব্যবসায় খাটানো হয়েছিল যার মাধ্যমে প্রায় দ্বিগুণ টাকা তিনি লভ্যাংশ দিয়েছেন বা দিতে চেয়েছেন ফুফাতো ভাইদের? আবার তাদের, মোরশেদ ও তার স্ত্রী ইশরাতের ট্যাক্স ফাইলে এই ৩৮ কোটি লেনদেনের কোনো তথ্য আছে কি-না তাও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মানুষের মানে।

আন-রেজিস্ট্রার্ড যে চুক্তিপত্র সাংবাদিকদের হাতে এসেছে তাতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে অনেক কিছুই। যে অঙ্গীকারনামার কপি পাওয়া গেছে তাতে কিন্তু তার স্ত্রী ইশরাত, মোরশেদের ভাই, আত্মীয় আজম খানের স্বাক্ষরও আছে। তারা গ্যারান্টার ছিল। মোরশেদের অনুপস্থিতিতে যেহেতু এই টাকার গ্যারান্টার তার স্ত্রী, ভাই ও নিকটাত্মীয় আজম খান- সেহেতু মোরশেদের আত্মহত্যার পর পাওনাদারদের এই টাকা পরিশোধ না করতেই এই মামলায় পাওনাদারদের ইশরাতের পক্ষ থেকে জড়ানো হয়েছে কি-না সে প্রশ্নও উঠেছে। আবার এই লেনদেনের বিষয়ে এবং এই টাকায় যে বাণিজ্য হয়েছে সে তথ্যও স্ত্রী ইশরাত জানতে পারেন বলেই সাধারণ পাঠকরা ধরে নেবেন। এর বাইরে আরও প্রশ্ন উঠেছে, যে মোরশেদ গত চার-পাঁচ বছর ধরে প্রায় ৪০-৪২ কোটি টাকার লোন মাথায় নিয়ে জীবনযাপন করেছে, পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী ‘হুমকি-ধামকি’ মোকাবেলা করেছে সে মোরশেদ হঠাৎ কোনো ব্যক্তির একটি মাত্র ফোন কল পেয়ে আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি-না। যে ফোন কলের শেষ অংশে মোরশেদ সাবলীলভাবেই রাসেলকে উল্লেখ করেছেন, পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য তিনি টাকা ব্যবস্থা করেছেন। পরদিনই এই টাকা দিবেন। তাহলে তিনি শুধুমাত্র ওই টাকা পরিশোধ ইস্যুতেই আত্মহত্যা করবেন কি-না সে বিষয়টিও রহস্যাবৃত থেকে গেল।

কী আছে রাসেল-মোরশেদের প্রায় ২ মিনিটের কল রেকর্ডে :

এই মামলার আসামিদের তালিকার শেষ নাম হল শহীদুল হক রাসেল। যার অন্য পরিচয় তিনি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। মোরশেদের ফুফাতো ভাইদের সঙ্গে এই লেনদেনের বিষয়ে সমঝোতাকারী হিসেবে যে ক’জনের নাম উঠে এসেছে তাদের একজন রাসেল। সর্বশেষ জাবেদ ইকবালের বন্ধু হিসেবে রাসেলও সমঝোতায় অংশ নেন শেষ দিকে এসে। সমঝোতা অনুযায়ী টাকা পরিশোধের তারিখটি পরিবর্তন করেছেন মোরশেদ। কিন্তু মোরশেদ ও আজম খানের দেওয়া সেই তারিখ অনুযায়ী টাকা পরিশোধ হয়নি। তাই জাবেদ ইকবালের হয়ে তার মুঠোফোন থেকে মোরশেদকে কল দেন রাসেল।

সে কলের রেকর্ড থেকে বুঝা যায়, মোরশেদ তার পাওনাদারের কাছে যথাসময়ে টাকা দিতে পারেননি। রাসেলকে মোরশেদ বুঝানোর চেষ্টা করেছেন দুই দিন ধরে লকডাউনের ফলে ব্যাংকিং লেনদেনে জটিলতা ছিল। তবে তিনি টাকা যোগাড় রেখেছেন। পরদিন দিয়ে দেবেন। সমঝোতা বৈঠকের সিদ্ধান্ত না মেনে বারবার টাকা পরিশোধের সময় পরিবর্তন করার বিষয়ে রাসেল মোরশেদকে বলেন, ‘আমার সাথে এরকম করলে বিপদ হয়ে যাবে।’ তাহলে বিপদ হয়ে যাওয়ার কথা বলা মানেই কি হত্যার হুমকি প্রদান? এর ব্যাখ্যা কি? এই বিপদ বলতে পাওনাদারদের হাতে থামা জামানতের চেকের বিপরীতে মোরশেদের বিরুদ্ধে মামলাও বোঝানো হতে পারে।

কল রেকর্ডে হত্যা বা অপহরণের মত কোনো বিষয় না থাকার পরও যুবলীগ নেতা রাসেলকে এই মামলায় জড়ানোর নেপথ্যে অন্য কোনো বিষয় রয়েছে তাও খতিয়ে উচিত ছিল গণমাধ্যমের।

কল রেকর্ডে আরও স্পষ্ট হয়েছে ওই ফুফাতো ভাইদের কাছে মোরশেদ টাকা পরিশোধে বদ্ধ পরিকর। যদি হত্যা, অপহরণের মত হুমকি দেওয়ার বিষয় থাকতো তাহলে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এ সময়ে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের মত ‘হাইপ্রফাইল’ দায়িত্বে থাকা রাসেল তার নিজ মুঠোফোন নম্বর থেকে মোরশেদের মুঠোফোনে কি কল করতেন? হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা অন্য কোনো যোগাযোগ অ্যাপস ব্যবহার করার সুযোগ কি তিনি নিতে পারতেন না? এর বাইরে রাসেলের সঙ্গে অতীতে আর কোনো সময় মোরশেদের মুঠোফোনে কোনো কথা হয়েছে কি-না সে বিষয়েও মোরশেদের স্ত্রী ইশরাত তার দায়ের করা মামলা বা আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেননি।

তার মানে বুঝা যাচ্ছে রাসেলের সঙ্গে একবারই মোরশেদের আলাপ হয় মুঠোফোনে। এমনকি রাসেল মোরশেদকে গোটা কথপোকথনের মধ্যে ‘আপনি’ করে সম্বোধন করেছেন। যার মাধ্যমে রাসেলের মোরশেদের প্রতি যে কোনো ক্ষোভ ছিল না তাও কিছুটা প্রমাণিত হয়। মুঠোফোনে আলাপের কারণেই কী রাসেলকে এই মামলায় আসামী করা হয়েছে? যদি তা হয়ে থাকে তাহলে গণমাধ্যমের উচিত সেই কল রেকর্ডে কি ছিল এবং কল রেকর্ডে উপস্থাপিত তথ্য যাচাই করে সে বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করা।

আবার ইশরাত জাহানের আত্মীয় আজম খানও গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘আমি মধ্যস্থতা করার পর থেকে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা সুদসহ পরিশোধ হয়েছে। এরপর ৭ কোটি টাকা দাবি করছিলেন পারভেজ। মোরশেদ রাজিও ছিল। মৃত্যুর আগে ৭ এপ্রিল এক দফায় দুই কোটি টাকা লেনদেনের কথা হয়েছিল। এই টাকা ব্যাংকে ট্রান্সফার দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছিলেন মোরশেদ।’

টাকা দিতে রাজি হয়ে পরদিন কেন আত্মহনন করলেন মোরশেদ :

টাকা দিতে রাজি হয়েও কেন মোরশেদ আত্মহত্যা করলো? পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ কি মোরশেদকে এই টাকা পরিশোধ করতে বাধা দিচ্ছিলেন? আসলে এই টাকা লেনদেনের জন্যই কি কেবল মোরশেদ আত্মহত্যা করবে? নাকি অন্য কোনো বিষয় রয়েছে, যা এখনো থেকে গেছে অন্তরালে? পরিবারের প্রধান সদস্য হিসেবে ইশরাত কেন প্রথম দিন মুখ খুলেননি? কেন চার দিন পর সংবাদ সম্মেলন করলেন? এসব প্রশ্নও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন পাঠক মহলে।

রাসেলের বিরুদ্ধে ইশরাতের অভিযোগ আসলে কোনটি :

ইশরাত রাসেলের বিরুদ্ধে একেক জায়গায় একেকরকম অভিযোগ এনেছেন। কোথাও তিনি উল্লেখ করেছেন, রাসেল মোরশেদকে জীবননাশের হুমকি দিয়েছেন। কোথাও ইশরাত ও তার কন্যাকে অপহরণের হুমকি দিয়েছেন। অথচ মোরশেদের আত্মহত্যার পরদিন পাঁচলাইশ থানায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে মোরশেদের স্ত্রী ইশরাত অভিযোগ করেছেন, রাসেল মোরশেদকে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্ত্রী ইশরাত ও তার কন্যা জুমকে অপহরণের হুমকি দিয়েছেন। আবার চার দিন পর সংবাদ সম্মেলনে মোরশেদের স্ত্রী ইশরাতের অভিযোগ, রাসেল মোরশেদকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। মামলার নথির সঙ্গে তাহলে কেন সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের মিল নেই? স্বামীর বিপুল পরিমাণ লোনের গ্যারান্টার হিসেবেও নাম আছে ইশরাত জাহানের। মোরশেদের স্ত্রীর ইশরাত জাহানের দায়ের করা মামলার এজাহার ও মোরশেদের সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যের মধ্যেও যুবলীগ নেতা শহীদুল হক রাসেলের ইস্যুতে যে দ্বিমুখী বিষয় আছে তাও সংবাদে উঠে আসার বিষয় ছিল।

এজাহারে যুবলীগ নেতা রাসেলের বিষয়ে উল্লেখ করে ইশরাত লিখেছেন, ‘….০৬/০৪/২১ইং তারিখে দিবাগত রাত বা দিনের যেকোনো সময় মোবাঃ ০১৭১১-৭৫০৪১৫ হইতে আমার স্বামীর ব্যবহৃত মোবাইলে কথিত যুবলীগ নেতা রাসেল পরিচয় প্রদান করিয়া উক্ত নাম্বার হইতে আমার স্বামীকে বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়া আমাকে ও আমার মেয়ে মোবাশ্বেরা জাহান চৌধুরী জুম (১২) কে অপহরণ করিবে বলিয়া হুমকি প্রদান করে।’

অথচ ঢাকাপোস্টের নিউজে উল্লেখ রয়েছে, ইশরাত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, ‘আত্মহত্যার আগের দিন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা রাসেল মোবাইল ফোনে আমার স্বামীকে জীবননাশের হুমকি দেন’

মামলার এজাহারে বলেছেন তাকে ও তার মেয়েকে অপহরণের হুমকির কথা। আবার সংবাদ সম্মেলনে বললেন, তার স্বামীকে জীবননাশের হুমকি দিয়েছেন রাসেল। অথচ মোরশেদকে জীবননাশের হুমকি কিংবা মোরশেদের স্ত্রী ইশরাত ও তার মেয়েকে অপহরণের মত কোনো কথা রাসেল এবং মোরশেদের ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের কল রেকর্ডে উঠে আসেনি। রাসেল ও মোরশেদের মধ্যে কথা হয়েছে কেবলই
পাওনা টাকা যথাসময়ে পরিশোধ বিষয়ে। এই কল রেকর্ডের বক্তব্য অনুযায়ী মোরশেদ সাবলীলভাবেই পরদিন টাকা পরিশোধে সম্মত হয়েছেন।

জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করলেই চুক্তি হয় না :

এই ইস্যুতে সবচেয়ে বড় সংবাদ হল, জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বাজার থেকে কিনে তাতে শর্ত জুড়ে দিয়ে ২৫ কোটি টাকা লেনদেনের বিষয়টি। আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ ছাড়াই তারা ২৫ কোটি টাকা ধার দিলেন মোরশেদকে। আবার মোরশেদও এই টাকা ওই স্ট্যাম্পকে ভিত্তি ধরেই নিলেন। অথচ আইনের দৃষ্টিতে রেজিস্টার্ড আমমোক্তারনামা না হলে তার কোনো মূল্য নেই। এ বিষয়টিও সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারতো।

আবার একজন ব্যাংকারের ২৫ কোটি টাকার বিনিময়ে ৩৮ কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা উচিত। কী এমন ব্যবসা তিনি করতেন যার ফলে এত টাকা লাভ হলো? এই পুরো প্রক্রিয়ায় মোরশেদের স্ত্রী ইশরাতও শুরু থেকে জড়িত বলে বিভিন্ন নথিপত্র ও ইশরাতের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। ইশরাতের কোনো বৈধ ব্যবসা ছিল কিনা, তার ব্যাংক একাউন্টে লেনদেনের বিষয়ও তদন্তে উঠে আসা জরুরি।

ইশরাত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এত টাকা পাওয়ার কথা বলে স্ট্যাম্পে জোর করে মোরশেদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তাহলে এ বিষয়ে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা তিনি তখন নেননি কেন? জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিলেও যেহেতু সেটি আন-রেজিস্টার্ড স্ট্যাম্প সেহেতু মোরশেদ টাকা দিতেও বাধ্য নন। কিন্তু মামলার এজাহার, দুইপক্ষের মধ্যে হওয়া চুক্তি ও কল রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে মোরশেদের কাছ থেকে তারা টাকা পান। সর্বশেষ রাসেলের সাথে কথোপকথনে মোরশেদ টাকা ফেরত দিতে সম্মত হন। স্ত্রী ইশরাত দাবি করেছেন, এই টাকা লাভের (সুদ) টাকা। অথচ রাসেলের সাথে কথোপকথনের রেকর্ডে এই টাকা সুদের কিংবা আসল সে বিষয়ে কোনো তর্কে জড়াননি।

মোদ্দা কথা, মোরশেদের স্ত্রী ইশরাতের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য, ইশরাতের দায়ের করা মামলার এজাহার, দুইপক্ষের মধ্যে হওয়া আন-রেজিস্টার্ড চুক্তিনামা ও যুবলীগ নেতা রাসেলের সঙ্গে মোরশেদের মুঠোফোনে কথোপকথনের রেকর্ডের তথ্যের সমীকরণ মিলিয়ে সংবাদ উপস্থাপন আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু গণমাধ্যম সহজপ্রাপ্য হিসেবে শুধুমাত্র মোরশেদের স্ত্রী ইশরাতের একচেটিয়া বক্তব্যকেই ভিত্তি ধরে প্রচার করছে, যা গণমাধ্যমের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সর্বশেষ